ব্লকড ডাক্ট বনাম মাস্টাইটিস: চিনার লক্ষণ, ঘরোয়া চিকিৎসা ও কখন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে

মা স্তন পরীক্ষা করছেন, লাল ও ব্যথাযুক্ত অংশ পর্যবেক্ষণ

ব্রেস্টফিডিংয়ের প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ অনেকের কাছেই একেবারে ফুল-টাইম চাকরির মত মনে হয়। ঘুম নেই, শরীর ব্যথা, মানসিকভাবে ভীষণ ঝাঁকুনি খাওয়া, তার মধ্যে আবার বুঝে উঠতে পারছেন না কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা সমস্যা। হঠাৎ যদি স্তন ফোলা, শক্ত, গরম বা ব্যথা হয়ে যায়, ভয় পাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

এ গাইডটা আপনার জন্য যদি আপনার মাথায় বারবার ঘুরছে -
«এটা কি ব্লকড ডাক্ট নাকি মাস্টাইটিস? আর এখন আমি কী করব?»

এখানে আমরা থাকছি - ব্লকড ডাক্ট বনাম মাস্টাইটিস, দুটোর পার্থক্য, মাস্টাইটিস কীভাবে চিনবেন, ঘরে বসে কী কী নিরাপদভাবে করতে পারেন, কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি আর কখন এটাকে একেবারে জরুরি অবস্থা ধরে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। লক্ষ্য একটাই - আপনি চাইলে যেন ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে যেতে পারেন, আপনার স্বাস্থ্যের সুরক্ষা থাকে, আর দুশ্চিন্তা যেন একটু হলেও কমে।


ব্লকড ডাক্ট কি?

ব্লকড ডাক্ট (blocked milk duct) হয় যখন স্তনের কোনও অংশ থেকে ঠিকমতো দুধ বেরোতে পারে না। ওই অংশে দুধ জমে থাকে, ভিতরে চাপ পড়ে, ফলে জায়গাটা ফোলা ও ব্যথা করে।

শিশু জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহে এটি খুবই সাধারণ। তখন দুধের সরবরাহ ঠিকঠাক সেট হচ্ছে, খাওয়ানোর রুটিন এখনও তৈরি হয়নি, সব মিলিয়ে একটু অগোছালো সময়।

ব্লকড ডাক্ট লক্ষণ সাধারণত এরকম হয়:

  • স্তনের মধ্যে স্পষ্ট একটা ব্যথাযুক্ত গুটি বা মোটা অংশ টের পাওয়া
  • বাচ্চা দুধ খাওয়ার সময় ওই জায়গায় বাড়তি টান বা জ্বালা ধরা অনুভূত হওয়া
  • গুটির উপরকার চামড়া সামান্য গোলাপি বা হালকা লালচে দেখাতে পারে, কিন্তু উজ্জ্বল লাল নয়
  • সাধারণত সারা শরীরে খুব বেশি অসুস্থ লাগবে না, জ্বর থাকলে সামান্য থাকতে পারে, অনেকের একদমই থাকে না
  • ব্যথা মূলত স্তনের এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে, পুরো স্তনে নয়

অনেক মা এই অনুভূতিটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন -
«মনে হয় যেন নরম জায়গার ভিতরে শক্ত মার্বেলটা আটকে আছে, আর সেখানে নীলদাগের মত ব্যথা করছে।»

সময়মতো টের পেলে আর ঠিকমতো যত্ন নিলে সাধারণত ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্লকড ডাক্ট সেরে যায়।


কেন ব্লকড ডাক্ট হয়?

সংক্ষেপে, ব্লকড ডাক্ট মানে স্তনে ড্রেনেজ বা দুধ বেরোনোর সমস্যা। দুধ তো তৈরি হচ্ছে, কিন্তু স্তনের কোনও অংশ থেকে ঠিকমতো বেরোচ্ছে না, সেই পথটাই যেন আটকে গেছে।

কয়েকটা সাধারণ কারণ:

  • কম ঘন ঘন খাওয়ানো বা পাম্প করা

    • খাওয়ানোর মাঝে অনেক লম্বা বিরতি থাকা (উদাহরণ - বাচ্চা হঠাৎ রাতে লম্বা ঘুমিয়ে দেওয়া, বা আপনি কোনো ফিড বাদ দিয়ে ফেললেন)
    • হঠাৎ কাজের চাপে, বাইরে যাওয়ার কারণে, বা বাচ্চাকে নিয়মে আনার চেষ্টায় দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ফিড দেওয়া
  • স্তনের উপর চাপ পড়া

    • টাইট ব্রা বা স্পোর্টস ব্রা, বিশেষ করে আন্ডারওয়ার, শক্ত হুক বা সিম যেখানে স্তনের গায়ে গেঁথে থাকে
    • কাঁধে ঝোলানো ভারী ব্যাগের স্ট্র্যাপ সবসময় এক জায়গায় চাপ দিয়ে যাওয়া
    • একদিকে কাত হয়ে সবসময় ঘুমালে, নিজের শরীরের ওজন স্তনের উপর পড়ে থাকা
  • বাচ্চার ল্যাচ বা পজিশন ঠিক না হওয়া

    • বাচ্চা ঠিকমতো স্তনের একটা দিক থেকে দুধ তুলতে পারছে না
    • সবসময় একই পজিশনে বা একই স্তনে বেশি খাওয়ানো, ফলে স্তনের কিছু ডাক্ট তুলনামূলক কম ব্যবহার হচ্ছে
  • খাওয়ানোর প্যাটার্ন হঠাৎ পাল্টে যাওয়া

    • বাচ্চা প্রথমবারের মত একটানা দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে দেওয়া
    • ফর্মুলা যোগ করা শুরু করেছেন বা হঠাৎ অনেকগুলো ফিড একসাথে কমিয়ে ফেলেছেন

অনেক সময় মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, সারাদিন ব্যস্ততায় বসে ঠিকমতো দুধ না খাওয়ানো - এগুলাও ভূমিকা রাখে। আপনার শরীর এই সময়ে বিরাট কাজ করছে, তাই সেটাকে নিয়মিত দুধ খাওয়ানো আর একটু বিশ্রাম দেওয়াটা খুব দরকারি।


ব্লকড ডাক্ট কীভাবে ঠিক করবেন

ভালো খবর হল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্লকড ডাক্ট ঘরোয়া চিকিৎসা নিয়েই ঠিক হয়ে যায়। যত দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন, মাস্টাইটিস হওয়ার ঝুঁকি তত কমে যাবে।

১. ঘন ঘন দুধ খাওয়ান (ব্যথাযুক্ত স্তন থেকেই শুরু করুন)

চেষ্টা করুন প্রতি ২-৩ ঘণ্টা অন্তর বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে, দিনে যেমন, রাতে সম্ভব হলে এক-দু রাতের জন্য এভাবে চালিয়ে যান।

  • যে স্তনে গুটি বা ব্যথা আছে, সেখান থেকেই ফিড শুরু করুন।
    খাওয়ানোর শুরুতে বাচ্চার টান সাধারণত বেশি থাকে, এতে ব্লকড জায়গাটা দ্রুত খুলতে সাহায্য করে।
  • যতক্ষণ বাচ্চা ওই দিকের স্তন থেকে খেতে চায়, ততক্ষণ খেতে দিন, পরে অন্য স্তন দিন।

যদি দেখেন বাচ্চা ব্যথার দিকে পুরোটা খালি করতে পারছে না, তাহলে পরে হাতে দুধ বের করুন বা পাম্প ব্যবহার করুন, তবে এত বেশি করবেন না যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা একেবারে শূন্য করার মত পাম্প চলছে। লক্ষ্য হচ্ছে ভালো ড্রেনেজ, অতিরিক্ত উদ্দীপনা না।

২. ব্লকড ডাক্টে মালিশ

মালিশ একটু অস্বস্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু এতে দুধের স্রোত এগিয়ে যেতে সুবিধা হয়।

  • ফিড শুরুর আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন
  • আঙুল দিয়ে গুটি বা শক্ত অংশটা খুঁজে বের করুন।
  • আঙুলের ডগা বা হাতের তালু দিয়ে গুটির পেছন দিক থেকে নিপলের দিকে চাপ দিয়ে টেনে আনুন। ভাবুন, যেন ভেতরের দুধটা আপনি আস্তে আস্তে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। সবসময় নিপলের দিকে ‘প্রেস আর সুইপ’।
  • বাচ্চা খাওয়ার সময়ও আলতো করে গুটির উপর চাপ দিয়ে, সেখান থেকে নিপলের দিকে টেনে আনতে পারেন।

মালিশ দৃঢ় হবে, কিন্তু বর্বর হবে না। কাজ শেষে যদি নীল-কালো দাগ পড়ে যায়, বুঝবেন জোর বেশিই হয়ে গেছে।

৩. উষ্ণ সেক

হালকা গরমে দুধ সহজে বের হয়।

  • ফিডের আগে ৫-১০ মিনিটের জন্য গরম নয়, উষ্ণ সেক দিন।
  • পরিষ্কার কাপড় গরম পানিতে ভিজিয়ে নিংড়ে নিন, পাতলা টাওয়েলে মোড়া উষ্ণ জেল প্যাক ব্যবহার করতে পারেন, অথবা গরম পানির ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতেই পারেন, সেই সময়টায় গুটির উপর আস্তে আস্তে মালিশ করতে পারেন।

এরপর জায়গাটা যখন উষ্ণ, তখনই বাচ্চাকে সেই স্তন ধরান

খুব বেশি গরম পানির ব্যাগ বা সরাসরি গরম পানির বোতল ত্বকে দেবেন না। এখনকার যন্ত্রণার উপর আবার পুড়ে যাওয়ার কষ্ট যোগ করার দরকার নেই।

৪. খাওয়ানোর ভঙ্গি বদলে দেখুন

একই পজিশনে সবসময় দুধ খাওয়ালে স্তনের কিছু অংশ কম ড্রেইন হতে পারে। পজিশন বদলালে আলাদা আলাদা জায়গা থেকে দুধ ভালোভাবে বের হয়।

কিছু কৌশল:

  • ‘নাক বা থুতনি গুটি দিকে’ ফর্মুলা: বাচ্চার নাক বা থুতনি যেন গুটির দিকের দিকে থাকে, এমনভাবে পজিশন নিন। মুখের ওই অংশ দিয়ে সাধারণত বেশি জোরে টানে, গুটি সেদিকে থাকলে দ্রুত সাফ হতে পারে।
  • রাগবি/ফুটবল হোল্ড: বাচ্চাকে আপনার বাহুর নিচ দিয়ে পাশে রেখে স্তন ধরান, আমাদের দেশে যাকে অনেকে ‘কাঁখের নিচ দিয়ে ধরা’ পজিশন বলেন। বাইরের দিকে থাকা ব্লকড ডাক্টের ক্ষেত্রে ভালো কাজ করে।
  • সাইড-লায়িং পজিশন: পাশে কাত হয়ে বাচ্চাকে নিয়ে শুয়ে শুয়ে খাওয়ানো, এতে আপনি একটু বিশ্রামও পাবেন।
  • লেইড-ব্যাক ফিডিং: আপনি হেলান দিয়ে আধাশুয়ে থাকবেন, বাচ্চা আপনার বুকের উপর। এতে অনেক সময় গ্র্যাভিটিও সাহায্য করে।

অনেক রকম ঝামেলা না করে, এক-দুইটা নতুন পজিশন বেছে নিয়ে দিনের মধ্যে সেগুলো পালা করে ব্যবহার করলেই অনেক সময় কাজ হয়ে যায়।

৫. বিশ্রাম, পানি আর নিজের প্রতি একটু দয়া

নবজাতকের মা হয়ে ‘বিশ্রাম নিন’ কথা শুনে অনেকেরই রাগ উঠে যায়, বোঝাই যায়। তারপরও, দেহ যখন বিশ্রাম পায়, সেরে ওঠাও তখনই দ্রুত হয়।

  • অন্তত কিছু ফিড এমন রাখুন যেখানে আপনি শুয়ে বা আধাশুয়ে থেকে খাওয়াতে পারেন।
  • নিয়ম করে পানি খান, যেখানেই বসে খাওয়ান না কেন, পাশে একটা বোতল রাখুন।
  • দিনে কয়েকবার পেট ভরে কিছু খেয়ে নিন, ঝামেলা না করেও খাওয়া যায় এমন কিছুই যথেষ্ট - রুটি, ডাল, ডিম, মাখন-পাউরুটি যাই হোক।

অften দেখা যায়, ঘন ঘন খাওয়ানো, মালিশ, উষ্ণ সেক, ভঙ্গি বদল আর অল্প বিশ্রাম - এই পাঁচটার কম্বিনেশনে বেশিরভাগ ব্লকড ডাক্ট ভালো হয়ে যায়।

তবু যদি ঠিক না হয়, বা লক্ষণ বাড়তে শুরু করে, তখন সংক্রমণ জেঁকে বসতে পারে, সেখান থেকেই শুরু হয় মাস্টাইটিস।


ব্লকড ডাক্ট থেকে মাস্টাইটিস: কীভাবে বুঝবেন অবস্থা বদলাচ্ছে?

মাস্টাইটিস মানে স্তনের প্রদাহ, বেশিরভাগ সময় সেখানে ইনফেকশনও জোটে। সাধারণত ব্লকড ডাক্ট ঠিকমতো সাফ না হলে, সেই জমাট দুধের জায়গায় ত্বক বা শিশুর মুখের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রমণ করে।

ব্লকড ডাক্ট বনাম মাস্টাইটিস পার্থক্য করার মূল জায়গা হল -
শুধু স্তনের ব্যথা না, আপনার পুরো শরীর কেমন লাগছে

মাস্টাইটিস লক্ষণ: কী কী খেয়াল রাখবেন

ব্রেস্টফিডিং মাস্টাইটিস কি বুঝতে সাধারণ লক্ষণগুলো হল:

  • স্তনের কোথাও গরম, লাল, খুবই ব্যথাযুক্ত একটা অংশ তৈরি হওয়া
    • লালচে অংশটা অনেক সময় ত্রিভুজ বা প্যাচের মত থাকে, ব্লকড ডাক্ট থেকে চারদিকে ছড়াতে থাকে
  • জায়গাটার ত্বক টানটান, চকচকে আর প্রচণ্ড স্পর্শকাতর লাগতে পারে
  • জ্বর সাধারণত ৩৮.৫° সেলসিয়াসের উপরে উঠে যায়
  • ফ্লু-এর মত লক্ষণ - কাঁপুনি, গা-হাত-পা ব্যথা, মাথা ধরার মত ব্যথা, সারাদেহে ভীষণ ঝিমঝিম ভাব
  • অনেক মা বলেন, হঠাৎ করে এমন লাগে যেন «ট্রাক ধাক্কা দিয়েছে» - হুট করে ভীষণ অসুস্থ লাগে

গুটি সাধারণত থাকে, কারণ ব্লকড জায়গাটা থেকেই আসলে সমস্যা শুরু হয়েছে, তবে এখন পুরো অঞ্চলটাই বেশি ফুলে ব্যথা করে।

যদি স্তনে ব্যথার সঙ্গে গরম, লাল জায়গা থাকে, আর আপনি কাশতে না কেশেই কাঁপুনি, গা ব্যথা, জ্বর অনুভব করেন, ধরে নিন এটা মাস্টাইটিস, আর দেরি না করে ব্যবস্থা নিন।


মাস্টাইটিসের চিকিৎসা: আসলে কী করলে কাজ হয়

ঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে মাস্টাইটিস সাধারণত ভালোভাবে সেরে যায়। লক্ষ্য থাকে তিনটা:

  • জমে থাকা দুধ বা মিল্ক স্টেসিস কমানো
  • ইনফেকশন থাকলে এন্টিবায়োটিক দিয়ে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা
  • ব্যথা কমিয়ে আপনাকে ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে যেতে সাহায্য করা, যদি আপনি চালিয়ে যেতে চান

১. দুই দিক থেকেই ব্রেস্টফিডিং (অথবা এক্সপ্রেসিং) চালিয়ে যান

হঠাৎ একেবারে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিলে মাস্টাইটিস আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন স্তনে আরও বেশি দুধ জমে, চাপ বাড়ে, ব্যথাও বাড়ে।

সংক্রমিত স্তন থেকেও বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো নিরাপদ, কারণ দুধের ভেতর দিয়ে রোগ সরাসরি শিশুর শরীরে চলে যায় না। বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, সাধারণ ব্রেস্টফিডিং-সেইফ এন্টিবায়োটিক খাওয়ার সময়ও দুধ খাওয়ানো চলতে পারে, ডাক্তার সেভাবেই ওষুধ বেছে দেবেন।

  • যতটা সম্ভব ঘন ঘন খাওয়ান, সহ্য করতে পারলে সেই ব্যথাযুক্ত দিক থেকেই শুরু করুন।
  • যদি ব্যথায় একেবারেই স্তন ধরাতে না পারেন, হাতে দুধ বার করুন বা পাম্প ব্যবহার করে আলতো করে মিল্ক ড্রেইনিং চালিয়ে যান
  • আবারও মনে রাখুন, প্রতি ঘণ্টা ধরে স্তন একেবারে ফাঁকা করার মত অতিরিক্ত পাম্প করবেন না, শুধু স্বস্তি আর নিয়মিত ড্রেইনেজ হলেই যথেষ্ট।

২. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তার দেখান

মাস্টাইটিসের জ্বর যদি ৩৮.৫° সেলসিয়াসের বেশি হয়, বা ফ্লু-এর মত অবস্থা হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত, পরে দেখা যাবে ভেবে কয়েকদিন অপেক্ষা করে থাকবেন না।

ডাক্তারের কাছে গেলে:

  • স্পষ্ট করে বলুন যে আপনি ব্রেস্টফিডিং করছেন এবং স্তনে ব্যথা, লালভাব, জ্বর হয়েছে
  • কতদিন ধরে ব্যথা বা গুটি আছে, জ্বর কবে থেকে শুরু হয়েছে, সেটা জানান
  • প্রয়োজনে লাজুক না হয়ে লালচে অংশটা দেখান, এতে রোগ বোঝা সহজ হয়

ডাক্তার সাধারণত ব্রেস্টফিডিং-সেইফ এন্টিবায়োটিক দেন, বেশিরভাগ সময় ৭-১০ দিনের কোর্স। নিয়ম মেনে, পুরো কোর্স শেষ না করা পর্যন্ত খেয়ে যান, যদিও ২-৩ দিন পরেই অনেকটা হালকা লাগতে পারে।

বাংলাদেশে আপনি গাইনি বা পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বা অভিজ্ঞ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান - যেখানেই সহজ হয় সেখানে সাহায্য নিতে পারেন। অনেক এনজিও ও বেসরকারি সংস্থার ব্রেস্টফিডিং কাউন্সেলরও পাশে থাকেন, তাদের সাহায্যও নিতে পারেন।

৩. প্রচুর বিশ্রাম আর পানি

মাস্টাইটিস আসলে আপনার শরীরের একরকম চিৎকার -
«এবার একটু থামুন, বিশ্রাম নিন, না হলে আমি নিজে থেকেই আপনাকে থামিয়ে দেব।»

  • সম্ভব হলে ১-২ দিন বাচ্চাকে নিয়ে বিছানায় থাকুন, মূল কাজ শুধু দুধ খাওয়ানো আর ঘুম।
  • বেশি বেশি পানি, স্যুপ, ডাবের পানি, ওরসালাইন ইত্যাদি খান। হালকা ভাত-ডাল, খিচুড়ি, শাকসবজি, ডিম এসবই ভালো।
  • ঘরের অন্য কাজকর্ম, রান্না, বড় বাচ্চার দেখাশোনা যতটা সম্ভব অন্য কারও উপর ছাড়ুন। এখন আপনার সুস্থ হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।

৪. ব্যথা কমানোর ওষুধ

ব্যথা সহ্য করতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।

  • আইবুপ্রোফেন সাধারণত মাস্টাইটিসে ভালো কাজ করে, কারণ এটা ব্যথা ও প্রদাহ, দুইটাই কমায়।
  • প্যারাসিটামলও খাওয়া যায়, অনেক ক্ষেত্রে দুটোই নির্দিষ্ট ব্যবধানে একসাথে ব্যবহার করা হয়।

আপনার আগের কোনও অসুখ (যেমন আলসার, কিডনি সমস্যা, লিভারের সমস্যা) থাকলে, বা আপনি অন্য ওষুধ খাচ্ছেন কিনা, সেগুলো মাথায় রেখে নিজের চিকিৎসক বা নিকটস্থ ফার্মাসিস্টের কাছে ডোজ ও নিরাপত্তা জেনে নিন। গাইডলাইন অনুযায়ী, সাধারণ ডোজে এই ওষুধগুলো ব্রেস্টফিডিংয়ের সময় বেশিরভাগ মায়ের জন্য নিরাপদ বলে ধরা হয়।

অনেক মা আরো স্বস্তি পান যখন:

  • ফিডের আগে উষ্ণ সেক দিয়ে দুধের স্রোত বাড়িয়ে নেন
  • ফিডের পরে ঠান্ডা সেক বা কোল্ড প্যাক দিয়ে ফুলে থাকা অংশটা একটু ঠান্ডা করেন

বরফ বা জেল প্যাক সরাসরি ত্বকে দেবেন না, পাতলা কাপড় দিয়ে মুড়ে ব্যবহার করুন।


ব্লকড ডাক্ট আর মাস্টাইটিস প্রতিরোধ করবেন কীভাবে

পুরোপুরি প্রতিরোধ সবসময় সম্ভব হয় না, বিশেষ করে প্রথম দিকের অগোছালো সময়ে। তবু কিছু অভ্যাস নিলে ঝুঁকি অনেক কমে যেতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়:

১. ঘন ঘন খাওয়ান, বাচ্চার সিগন্যাল ধরুন

খুব ছোট বাচ্চার সময়ে ফিডের মধ্যে বেশি বিরতি না থাকাই ভালো।

  • বাচ্চা যখন চুষচুষ করা, হাতে-মুখে দুধ খোঁজার মত নড়াচড়া শুরু করে, তখনই স্তন অফার করুন, কান্না পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই ভালো।
  • যদি দেখেন আপনার স্তনগুলো খুব টনটনে, ভারী বা ব্যথা করছে, তখন বাচ্চা না খেলেও অল্প একটু দুধ বার করে আরাম নিয়ে নিন, যাতে গুটি তৈরি না হয়।

২. টাইট ব্রা ও অতিরিক্ত চাপ এড়িয়ে চলুন

গর্ভধারণের আগের আন্ডারওয়ার ব্রাগুলোকে আপাতত বিশ্রাম দিন।

  • নরম, সাইজ ঠিক রাখা নার্সিং ব্রা ব্যবহার করুন, যাতে তার, শক্ত সিম, বেশি চেপে ধরা ইলাস্টিক না থাকে
  • খুব টাইট স্পোর্টস ব্রা, শেপওয়্যার বা কড়াকড়িভাবে বেঁধে রাখা পেটি-কোট/বডিশেপার এগুলো স্তনের উপরের অংশ চাপা দিলে এড়িয়ে চলুন
  • ব্যাগ, বেবি ক্যারিয়ার, বাচ্চার মাথা ইত্যাদি সবসময় এক জায়গায় চাপ দিয়ে আছে কিনা খেয়াল রাখুন

ঘুম থেকে উঠে দেখেন এক পাশের স্তন অদ্ভুতভাবে ব্যথা করছে, তাহলে হয়ত অনেকক্ষণ সেই দিকটা নিচে নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে ঘুমের পজিশন একটু বদলে দেখুন, বালিশ দিয়ে হাত বা পিঠ সাপোর্ট দিতে পারেন।

৩. খাওয়ানোর ভঙ্গি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করুন

একটা পজিশনে সবসময় না থেকে কখনও কোলে নিয়ে, কখনও পাশে শুয়ে, কখনও রাগবি হোল্ড - এভাবে পজিশন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিলে পুরো স্তন থেকে সমানভাবে দুধ বের হতে সুবিধা হয়।

একটা কঠিন নিয়ম বানানোর দরকার নেই। শুধু খেয়াল রাখুন সবসময় যেন ঠিক একই ভঙ্গিতে, একই দিকেই না খাওয়ান, বিশেষ করে যদি লক্ষ্য করেন কোনও নির্দিষ্ট জায়গা বারবার শক্ত বা লাম্পি হয়ে যাচ্ছে।

৪. ধীরে ধীরে উইনিং, একসাথে আকস্মিকভাবে নয়

হঠাৎ দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিলে, বা একসাথে অনেকগুলো ফিড বাদ দিলে স্তনে প্রচুর দুধ জমে স্তন ফোলা, ব্লকড ডাক্ট এমনকি মাস্টাইটিসও হতে পারে।

দুধ ছাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে:

  • প্রতি কয়েক দিনে একবারে একটিই ফিড কমান
  • স্তনের টান একটু কমে, শরীর নতুন রুটিন মেনে নিলে তারপর পরের ফিড কমান
  • স্তন যদি খুবই ভরা ও ব্যথা করে, হাতে অল্প দুধ বের করে নিন, যাতে আরাম পান কিন্তু পুরোপুরি খালি না হয়, কারণ লক্ষ্য হচ্ছে দুধের সরবরাহ ধীরে ধীরে কমানো

হঠাৎ অসুস্থতা, হাসপাতাল ভর্তি ইত্যাদির কারণে যদি দ্রুত উইনিংয়ের দরকার হয়, তবু যতটা সম্ভব ধীরে ধীরে কমানোর কৌশল মিলিয়ে নিন, এতে আপনার জন্যও আরামদায়ক হবে।


কখন ডাক্তার দেখাবেন: মাস্টাইটিস বা ব্লকড ডাক্ট হলে

কিছু অবস্থায় ঘরোয়া যত্ন আর নিজের খেয়ালই অনেক সময় যথেষ্ট, আবার কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের সাহায্য লাগবে।

এসব হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তার/হাসপাতাল দেখান

  • আপনার মাস্টাইটিস লক্ষণ থাকলে:
    • জ্বর ৩৮.৫° সেলসিয়াসের বেশি
    • ফ্লু-এর মত গা-হাত-পা ব্যথা, কাঁপুনি
    • স্তনে গরম, লাল, খুব বেশি ব্যথাযুক্ত একটা অংশ
  • ব্লকড ডাক্ট লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও,
    • ঘন ঘন খাওয়ানো, মালিশ আর উষ্ণ সেক দেওয়া - এসব সত্ত্বেও ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনও উন্নতি না হলে
  • খুব বেশি দুর্বল, মাথাঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত লাগলে
  • আবার গর্ভবতী অবস্থায় যদি স্তনে লালভাব বা জ্বর হয়

দ্বিধা হলে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বা বিশ্বস্ত বেসরকারি ক্লিনিকের পরামর্শ নিন। সরকারি ৩৩৩ হেল্পলাইন থেকে প্রাথমিক গাইডেন্সও পেতে পারেন।


কখন এটা জরুরি অবস্থা: অ্যাবসেস ও মারাত্মক সংক্রমণ

বেশিরভাগ মাস্টাইটিসই ঠিকঠাক এন্টিবায়োটিক ও বিশ্রামে ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনেকটা হালকা হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইনফেকশন স্তনের ভেতরে গিয়ে অ্যাবসেস তৈরি করতে পারে - অর্থাৎ ভেতরে পুঁজ ভরা থলের মত জমাটবাঁধা অংশ।

এই লক্ষণগুলো থাকলে সাবধান:

  • সঠিকভাবে এন্টিবায়োটিক নেওয়া আর দুধ ড্রেইনিং করার পরও ৪৮ ঘণ্টা কেটে গেছে, তারপরও স্তনের অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে
  • স্তনের ভেতরে নরম, পানি ভর্তি বেলুনের মত নড়বড়ে একটা অংশ টের পাচ্ছেন (ফ্লাকচুয়ান্ট মাস)
  • এক জায়গায় প্রচণ্ড ব্যথা, সেই অংশের চামড়া খুব লাল বা আলোতে চকচকে দেখা যাচ্ছে
  • শরীর ভীষণ খারাপ, জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসছে না, বারবার কাঁপুনি দিচ্ছে

এগুলো তখন আর ঘরে বসে দেখেশুনে রাখার মতো অবস্থা নয়।

এ অবস্থায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন -
ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালের সার্জারি/গাইনি বিভাগ, বড় বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, বা নিকটস্থ এমন কোনও সেন্টার যেখানে ব্রেস্ট অ্যাবসেস ড্রেন করার সুবিধা আছে

অ্যাবসেস সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ড গাইডেড সুচ বা ছোট কাটা দিয়ে পরিষ্কার করে পুঁজ বের করতে হয়, সাথে থাকে যথাযথ এন্টিবায়োটিক। এতে দেরি করলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে যেতে পারে, সেপসিসের ঝুঁকিও থাকে।

লজ্জা বা দ্বিধা করবেন না, «এত সামান্য কিছুর জন্য হাসপাতালে যাব নাকি» টাইপ চিন্তা করবেন না। ব্রেস্ট অ্যাবসেস গুরুতর সমস্যা, দ্রুত চিকিৎসা নিলে একদিকে আপনার কষ্ট কমে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।


শেষ কথা: এতে আপনি ব্যর্থ নন

ব্লকড ডাক্ট আর মাস্টাইটিস দুটোই ব্রেস্টফিডিং-সংশ্লিষ্ট সাধারণ সমস্যা, এটা মোটেও প্রমাণ করে না যে আপনি খারাপ মা, বা আপনার শরীরে ত্রুটি আছে।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অসংখ্য মা, বিশেষ করে বাচ্চার প্রথম ৬-৮ সপ্তাহে, অন্তত একবার ব্লকড ডাক্ট বা ব্রেস্টফিডিং মাসটাইটিস কি সেটা হাড়েহাড়ে টের পান। কিন্তু সময়মতো সঠিক তথ্য আর সাহায্য পেলে, বেশিরভাগই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং যতদিন ইচ্ছা ততদিন ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে যান।

আপনি যদি এখনই ব্যথায় কাতর থাকেন, এক লাইনে গুছিয়ে বলি:

  • ঘন ঘন ফিড দিন, ব্যথার দিক থেকেই যতটা পারেন শুরু করুন
  • ব্লকড ডাক্টে মালিশ, ব্লকড ডাক্টে উষ্ণ সেক, আর ভিন্ন ব্লকড ডাক্টে খাওয়ানোর ভঙ্গি ব্যবহার করুন
  • জ্বর, গা ব্যথা, প্রচণ্ড অবসাদ, গরম লাল জায়গা এসব মাস্টাইটিস লক্ষণ ও চিকিৎসা মাথায় রাখুন
  • এগুলো দেখা দিলেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তারের কাছে যান, ব্রেস্টফিডিংয়ের জন্য নিরাপদ এন্টিবায়োটিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন
  • নিজের গাইনী ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত ল্যাকটেশন কাউন্সেলর, স্থানীয় মা-বাচ্চা সাপোর্ট গ্রুপ, বা হেল্পলাইন থেকে সাহায্য নিন

রাত ৩টায় একা একা মোবাইলে «ব্লকড ডাক্ট কি করবেন» লিখে সার্চ দিতে দিতে কেঁদে ফেলার মত পরিস্থিতি আপনার জন্য একা সামলানোর কথা না। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং নিজের আর বাচ্চার প্রতি যত্নের প্রকাশ। আপনার স্বাস্থ্যের মূল্য আপনার সন্তানের স্বাস্থ্যের সমানই, কখনও কম নয়।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই প্রবন্ধগুলি আপনার জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।