নবজাতকের চোখ ও নাকের যত্ন: দৈনন্দিন রুটিন, স্যালাইন, ম্যাসাজ এবং সতর্কতার লক্ষণ

নবজাতকের চোখ পরিষ্কার ও নাক স্যালাইন দেওয়ার ছবি

বাচ্চাকে প্রথম দিন বাসায় নিয়ে এলে সবকিছুই একসঙ্গে খুব সুন্দর আর একটু ভয়েরও লাগে। এত ছোট ছোট চোখ, এত নরম নাক - অনেকে শুধু ছুঁতে গেলেই কেমন ভয় পেয়ে যান।

আপনি একা নন।

এই সহজ গাইডটা মূলত নবজাতকের চোখের যত্ন আর শিশুর নাকের যত্ন নিয়ে। ধাপে ধাপে লেখা, সোজা ভাষায়, অযথা ভয় দেখানো কিছু নেই। কী করলে হবে, কী স্বাভাবিক, আর কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত ডাক্তার, চাইল্ড স্পেশালিস্ট, কমিউনিটি ক্লিনিক বা বাংলাদেশে ১৬২৬৩ / ৩৩৩ নম্বরে ফোন করবেন - সেটাই এখানে পরিষ্কার করে লেখা আছে।


নবজাতকের চোখের যত্ন

নবজাতকের চোখ দেখতে খুব ভঙ্গুর লাগে, কিন্তু একটু নরম হাত আর নিয়মিত যত্ন থাকলে শিশুর চোখের যত্ন বেশ সহজেই করা যায়।

চোখ পরিষ্কার রাখার সহজ দৈনিক রুটিন

খুব দামী কিছু লাগবে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নবজাতকের চোখ পরিষ্কার করার নিয়ম মানে হলো সিদ্ধ করে ঠান্ডা করা পানি বা স্যালাইন ব্যবহার করা।

যা যা লাগবে:

  • নতুন করে ফোটানো, সম্পূর্ণ ঠান্ডা করা পানি অথবা স্টেরাইল স্যালাইন (লবণ পানি)
  • পরিষ্কার কটন প্যাড (কটন বাড নয়)
  • একখানা পরিষ্কার তোয়ালে বা মসলিন কাপড়

কীভাবে করবেন (দিনে একবার বা প্রয়োজনমতো):

  1. হাত ধুয়ে নিন
    সাবান আর পানি দিয়ে দু’হাত ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। শিশুর চোখ ধরার আগে এটাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন।

  2. পানি বা স্যালাইন তৈরি করুন

    • যদি সিদ্ধ পানি নেন, কেটলি বা হাঁড়িতে পানি ফোটান, পুরোপুরি ঠান্ডা হতে দিন।
    • সামান্য পরিমাণ একেবারে পরিষ্কার বাটিতে নিন।
    • ফার্মেসি থেকে কেনা স্যালাইন হলে সরাসরি বোতল থেকে ব্যবহার করতে পারবেন।
  3. প্রতিটি চোখের জন্য আলাদা প্যাড

    • কটন প্যাডটাকে পানি বা স্যালাইনে ভিজিয়ে নিন।
    • বাড়তি পানি চিপে বের করে দিন, যেন ভেজা থাকে কিন্তু ঝরঝর করে না পড়ে।
  4. ভিতরের দিক থেকে বাইরের দিকে মুছুন

    • খুব নরম হাতে চোখের ভেতরের কোণা (নাকের দিক) থেকে কানের দিকের বাইরের কোণা পর্যন্ত একবারে মুছুন।
    • এক স্ট্রোক করার পরই সেই প্যাড ফেলে দিন।
    • অন্য চোখের জন্য নতুন কটন প্যাড নেবেন, আগেরটা যতই পরিষ্কার মনে হোক।
  5. প্রয়োজনে আবার করুন
    যদি নবজাতকের চোখে স্রাব বা শুকনো দাগ থাকে, নতুন প্যাড নিয়ে একইভাবে আবার এক-দুবার মুছতে পারেন, সবসময় ভেতর থেকে বাইরে।

  6. এলাকাটা শুকিয়ে নিন
    পরিষ্কার নরম কাপড় দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে মুছে নিন, বা স্বাভাবিকভাবে শুকাতে দিন।

এটা সাধারণত দিনে একবার, সকালবেলার গোসল বা ধোয়া-মোছার সময় করা ভালো। আর চোখ বেশি স্টিকি লাগলে অতিরিক্তও করতে পারেন।

নবজাতকের চোখে কী কী স্বাভাবিক

ছোট্ট একটু স্রাব বা হালকা লেগে থাকা দেখলেই অনেক বাবা-মা ভয় পান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো নবজাতকের চোখের স্বাভাবিক পরিবর্তন

যা দেখতে পেতে পারেন:

  • ঘুম থেকে উঠলে চোখের কোনায় হালকা স্রাব বা শুকনো পুরু দাগ
  • জন্মের প্রথম ক’দিন হালকা ফোলা বা ফুলে থাকা পাতা, বিশেষ করে ডেলিভারি লম্বা হলে বা ফোর্সেপ / ভ্যাকুয়াম ব্যবহার হলে

সাধারণত:

  • এই স্রাবটা পরিষ্কার বা একটু সাদা ধরনের হয়।
  • ফোলা ভাব কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই কমে যায়।

বাচ্চা যদি মোটামুটি ভালো থাকে, ঠিকমতো দুধ খায় আর চোখের সাদা অংশ লাল না হয়ে স্বাভাবিক থাকে, তাহলে এগুলো সাধারণ নবজাতকের চোখের যত্নের অংশ বলেই ধরা যায়।


চোখে স্টিকি ভাব বা পানি পড়া: টিয়ার নালী বন্ধ হলে

প্রথম কয়েক সপ্তাহে শিশুর চোখে বারবার স্টিকি হয়ে যাওয়া খুব কমন। আপনি মুছলেন, একটু পর আবার জমল। আবার পরিষ্কার করলেন, পরের ফিডের সময় আবার জমে গেল।

এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো চোখের নালী বন্ধ নবজাতক, মেডিক্যাল ভাষায় যাকে বলা হয় ড্যাক্রিওস্টেনোসিস (dacryostenosis), অর্থাৎ নবজাতকের চোখে টিয়ার নালী বন্ধ

ড্যাক্রিওস্টেনোসিস আসলে কী

আমাদের চোখের পাশ দিয়ে ছোট ছোট চ্যানেল আছে, এটাকে টিয়ার নালী বলা হয়। এখান দিয়ে চোখের পানি নাকের ভেতরে চলে যায়। অনেক বাচ্চার ক্ষেত্রে জন্মের সময় এই নালী পুরোপুরি খোলে না। তখনই এই সমস্যা হয়।

  • এটি খুবই সাধারণ, নানা স্টাডি অনুযায়ী প্রায় প্রতি ৫ জনে ১ জন নবজাতকের এই সমস্যা থাকতে পারে।
  • এক চোখে যেমন হতে পারে, তেমনি দুই চোখেই হতে পারে।
  • বেশিরভাগ সময়ই নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়, মারাত্মক কিছু হয় না।

নবজাতকের চোখে টিয়ার নালী বন্ধ থাকলে কী কী লক্ষণ থাকে

আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন:

  • বারবার পানি পড়ে, বাচ্চা না কাঁদলেও চোখ ভেজা ভেজা থাকে
  • হালকা হলুদ বা একটু সেঁটে থাকা স্রাব, বিশেষ করে ঘুমের পর
  • চোখের পাপড়ি গামি গামি হয়ে থাকে, একসঙ্গে আটকে যায়
  • এক চোখ সারাক্ষণই আরেক চোখের চেয়ে বেশি ভেজা দেখায়

এক্ষেত্রে সাধারণত চোখের সাদা অংশ লাল থাকে না। এইটাই চোখের ইনফেকশন আর টিয়ার নালী বন্ধ থাকার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য।

বাড়িতে যা করতে পারেন: টিয়ার নালী খোলার ম্যাসাজ

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘরেই কিছু ম্যাসাজ আর সঠিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দিয়ে অনেকটাই ভাল করা যায়।

ধাপ ১: চোখ পরিষ্কার রাখুন

আগের বর্ণনা অনুযায়ী দৈনিক চোখ পরিষ্কারের রুটিন মেনে চলুন:

  • ঠান্ডা সিদ্ধ পানি বা স্যালাইন
  • এক চোখে এক প্যাড
  • সবসময় ভেতরের কোণা থেকে বাইরের দিকে মুছবেন
  • স্রাব বেশি হলে দিনে কয়েকবার করতে পারেন

ধাপ ২: ল্যাক্রিমাল স্যাক ম্যাসাজ (দিনে ২-৩ বার)

অনেকে এই অংশটাই সবচেয়ে বেশি ভয় পান। আসলে খুব সহজ। নিচে নবজাতকের টিয়ার নালী কীভাবে ম্যাসাজ করবেন তার ধাপগুলো থাকল:

  1. হাত ধুয়ে নিন, নখ বড় হলে কেটে নিন।

  2. সঠিক জায়গা খুঁজে নিন

    • আপনার ছোট আঙুল বা রিং ফিঙ্গার সবচেয়ে নরম থাকে, সাধারণত এটা ব্যবহার করা ভালো।
    • আঙুলের ডগা রাখুন চোখের ভেতরের কোণার কাছে, যেখানে চোখ আর নাক মিলেছে
    • নাকের পাশের ছোট হালকা উঁচু অংশটার উপরে আঙুলটা স্থির করুন।
  3. নরম চাপ দিয়ে নিচের দিকে টানুন

    • খুব নরমভাবে মুখের দিকে একটু চাপ দিয়ে তারপর নাকের পাশ দিয়ে প্রায় ১ থেকে ১.৫ সেন্টিমিটার নিচের দিকে একটানা স্লাইড করুন।
    • একবারে ৪-৫ বার এই স্লাইডিং মুভমেন্ট করুন।
    • ব্যথা লাগার মতো চাপ দেওয়া যাবে না। একটু অস্বস্তি লাগায় বাচ্চা কেঁদে উঠতে পারে, কিন্তু স্পষ্ট ব্যথা পাওয়া উচিত না।
  4. দিনে ২-৩ বার করুন
    সকাল, সন্ধ্যা আর চোখ খুব স্টিকি থাকলে আরেকবার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

ভাবতে পারেন আপনি খুব আস্তে আস্তে সেই পাতলা ঝিল্লিটাকে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যেটা টিয়ার নালী আটকে রেখেছে। সময়ের সাথে সাথে এই ম্যাসাজ টিয়ার নালী খুলে যেতে সাহায্য করতে পারে।

কতদিনে ভালো হয়

বেশিরভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রে চোখের নালী বন্ধ নবজাতক সমস্যাটা ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং:

  • অনেকেরই ৬ মাসের মধ্যে প্রায় পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়
  • প্রায় সব বাচ্চারই ১ বছরের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়

তারপরও যদি একদমই ভাল না হয়, শিশুর ডাক্তার শিশু চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে পারেন।

নবজাতকের চোখে স্রাব বা পুঁজ দেখলে কখন ডাক্তার দেখাবেন

যদিও ড্যাক্রিওস্টেনোসিস সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ নয়, তবুও কিছু লক্ষণ থাকলে তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো জরুরি:

  • চোখের সাদা অংশ বা পাতা লাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে
  • চোখের চারপাশে ফোলা বা খুব চওড়া ফুলে থাকা, যা স্বাভাবিক নবজাতকের সামান্য ফোলাভাবের চেয়ে অনেক বেশি
  • ঘন সবুজ বা হলুদ পুঁজের মতো স্রাব, বারবার বের হচ্ছে
  • বাচ্চা স্পষ্ট কষ্ট পাচ্ছে, চোখ শক্ত করে বন্ধ করে রাখে বা চোখের পাশে হাত দিলে কাঁদতে থাকে
  • জ্বর, অস্বাভাবিক অস্থিরতা, বা আপনার মনে হচ্ছে „কিছু একটা ঠিক নেই“

বাংলাদেশে এ ধরনের ক্ষেত্রে:

  • দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞ বা চোখের ডাক্তারকে দেখান
  • নিকটস্থ হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কমিউনিটি ক্লিনিকে যান
  • জরুরি পরামর্শ দরকার হলে স্বাস্থ্য বুলেটিন নম্বর ১৬২৬৩ বা সরকারি সেবা নম্বর ৩৩৩ এ ফোন করতে পারেন

চোখের ইনফেকশন অবহেলা না করাই ভাল, কারণ দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে।


নবজাতকের নাকের যত্ন

নবজাতককে ডাক্তাররা বলেন প্রধানত নাক দিয়ে শ্বাস নেয় এমন শিশু। মানে:

ওরা মূলত নাক দিয়ে শ্বাস নিতেই অভ্যস্ত, মুখ দিয়ে খুব ভালভাবে নিতে পারে না।

মুখ খুলতে পারে ঠিকই, কিন্তু জন্মের প্রথম কয়েক মাস মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কৌশল খুব ভালোভাবে ওরা জানে না। তাই সামান্য শিশুর নাকে সর্দি বা জমে থাকা থকথকে স্রাবও অনেক বেশি খারাপ মনে হতে পারে।

নবজাতকের নাকে বারবার বন্ধ লাগা এত কমন কেন

কয়েকটা কারণ আছে, যা নবজাতকের নাক পরিষ্কার বিষয়টাকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে:

  • নাকের ভেতরের রাস্তা খুব সরু
    এত ছোট নাক, তার ভেতরের এয়ারওয়েও ততটাই সরু। অল্প একটু সর্দিও অনেক বেশি শব্দ করে।

  • চারপাশের বাতাস শুষ্ক হলে
    শীতকালে ফ্যান, গরম কক্ষে হিটার, আর গরমকালে এসি থাকলে বাতাস শুকিয়ে যায়, এতে সর্দি আরও ঘন হয়ে যায়।

  • ধোঁয়া আর ধুলাবালি
    সিগারেটের ধোঁয়া, রান্নাঘরের অতিরিক্ত ধোঁয়া, তীব্র পারফিউম, ক্লিনিং স্প্রে, বাসার ধুলা, পোষা প্রাণীর লোম - সবকিছুই নবজাতকের নাকের ভেতরকে উত্তেজিত করতে পারে।

ফলাফল হিসেবে যা থাকে:

  • সারাক্ষণ নাক দিয়ে ছোট ছোট স্নর্ট, স্নাফলিং সাউন্ড
  • মাঝে মাঝে হালকা ঘ্যাঁচঘ্যাঁচে শব্দ
  • বারবার হাঁচি (নবজাতকের হাঁচি খুব কমন, এটা অনেক সময়ই স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অংশ)

শুধু এই শব্দগুলো থাকলেই যে আপনার বাচ্চার সর্দি বা ঠান্ডা হয়েছে, তা নয়।


শিশুর নাক পরিষ্কার কিভাবে করবেন নিরাপদভাবে

শিশুর নাক পরিষ্কার কিভাবে করতে হয় এটা শিখে নিলে খাওয়ানো, ঘুম, আর বাচ্চার আরাম - সবকিছুই অনেক সহজ হয়ে যায়।

নবজাতকের নাকে স্যালাইন ব্যবহার

স্যালাইন মানে শরীরের পানির মতো ঘনত্বের লবণ পানি। ফার্মেসি থেকে ছোট বোতল বা একবারে ব্যবহার করা যায় এমন ভায়াল আকারে শিশুর নাকের জন্য স্যালাইন পাওয়া যায়।

স্যালাইন ড্রপ ব্যবহার করার নিয়ম (প্রতি নাকে ১-২ ফোঁটা):

  1. বাচ্চাকে ঠিকভাবে শুইয়ে নিন

    • বাচ্চাকে পিঠের উপর শুইয়ে মাথা সামান্য উঁচু ও পিছনে রাখুন।
    • কাঁধের নিচে ছোট তোয়ালে গুটিয়ে দিলেও হয়, অথবা কোলে নিয়ে একটু মাথা পেছনে রেখে ধরতে পারেন।
  2. স্যালাইন দিন

    • এক এক করে প্রতি নাকে ১-২ ফোঁটা স্যালাইন ঢালুন।
    • খুব বেশি লাগবে না, এত ছোট নাকে সামান্যই যথেষ্ট।
  3. প্রায় ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন

    • স্যালাইন যাতে সর্দি নরম করে দিতে পারে, তার জন্য এই সময়টা দিন।
    • এ সময় বাচ্চা স্নাফলিং বা হাঁচি দিতে পারে, এটা স্বাভাবিক।
  4. এবার সর্দি বের করুন
    এখন চাইলে নাসাল অ্যাসপিরেটর বা বাল্ব সিরিঞ্জ ব্যবহার করে নরম হওয়া সর্দি টেনে বের করতে পারেন।

শিশুর নাকে বাল্ব সিরিঞ্জ ব্যবহার করার নিয়ম

অনেকেই প্রথমবার ব্যবহার করতে গিয়ে ভয় পান। কয়েকবার করলেই খুব নরমাল মনে হয়।

নিচে ধাপে ধাপে শিশুর নাকে বাল্ব সিরিঞ্জ ব্যবহার করার নিয়ম দেওয়া হলো:

  1. আগে বাল্বটা চেপে ধরুন

    • নাকের কাছে নেওয়ার আগেই বাল্বটা ভালো করে চেপে ধরে ভেতরের সব বাতাস বের করে দিন।
    • চেপে ধরা অবস্থায়ই রাখুন।
  2. নাকের কাছে হালকা লাগান

    • বাল্বের মাথাটা নাকের ভেতরে গুঁজে দেবেন না।
    • কেবল নাকের ছিদ্রের ঠিক মুখে হালকা লাগান, যেন ঢুকেও না যায়, আবার একদম বাইরে থেকেও না থাকে।
  3. ধীরে ধীরে চাপ ছেড়ে দিন

    • চেপে ধরা হাতটা আলগা করলে ভেতরে হালকা সাকশন তৈরি হবে, এতে সর্দি বাল্বের ভেতরে চলে আসবে।
  4. বের করে ফেলে দিন

    • নাক থেকে বাল্বটা সরিয়ে নিন।
    • এবার টিস্যু বা টিস্যু পেপারের উপর বাল্ব চেপে ভেতরের সর্দি বের করে ফেলুন।
    • মাথাটা মুছে নিন।
  5. প্রয়োজনে আবার করুন

    • প্রতিটি নাকে ১-২ বার এর বেশি করার দরকার হয় না।
    • অনেক বেশি বার করলে নাকের ভেতরের নরম অংশে জ্বালা ধরে যেতে পারে।
  6. ব্যবহারের পর পরিষ্কার করুন

    • কুসুম গরম সাবান পানিতে বাল্বটা কয়েকবার ভরে চেপে ধুয়ে নিন।
    • তারপর পরিষ্কার পানিতে আবার কয়েকবার ধুয়ে নিয়ে পানি বের করে শুকাতে দিন।

টিউব দিয়ে টেনে নেওয়া নাসাল অ্যাসপিরেটরগুলোর নিয়মও মোটামুটি একই, শুধু সাকশনটা আপনি মুখ দিয়ে তৈরি করেন, ফিল্টার দিয়ে সুরক্ষিত থাকে। যেটাই ব্যবহার করুন, মূল কথা হলো অল্প, ধীরে আর নরমভাবে ব্যবহার করা

নবজাতকের নাকের যত্নে যা করবেন না

কিছু কাজ একেবারে না করাই ভালো:

  • নাকের ভেতরে কটন বাড ঢুকাবেন না
    এতে নাকের ভেতরের নরম অংশে ঘা হতে পারে, আবার সর্দি আরও ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।

  • বড়দের ডিকনজেস্টেন্ট স্প্রে / ড্রপ ব্যবহার করবেন না
    এগুলো নবজাতকের জন্য নিরাপদ না, ডাক্তার বিশেষভাবে প্রেসক্রাইব না করলে একেবারে ব্যবহার করবেন না।

  • অ্যাসপিরেটর দিয়ে সারাক্ষণ টেনে টেনে পরিষ্কার করবেন না
    মাঝে মাঝে, বিশেষ করে দুধ খাওয়ানোর আগে আর রাতে ঘুমের আগে ব্যবহার করা ঠিক আছে। সারাদিন ধরে বারবার করলে উল্টা নাকের ভেতরটা আরও ফুলে যেতে পারে।

অনেক সময় শুধু নবজাতকের নাক পরিষ্কার করতে স্যালাইন দিনের কয়েকবার ব্যবহার করলেই বাচ্চা অনেক আরাম পায়।


নোইজি ব্রিদিং: নাক ভরা না থাকলেও শব্দ বেশি শোনায় যখন

ছোট্ট বাচ্চারা অনেক শব্দ করেই শ্বাস নেয়। আপনি হয়তো শুনবেন:

  • ছোট ছোট স্নর্ট
  • হালকা সিটি দেওয়ার মতো শব্দ
  • মাঝে মাঝে ছোট ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ
  • একটু একটু নাক ডাকার মতো আওয়াজ

এসবের বেশিরভাগই হয় নাকের সরু রাস্তা আর সামান্য স্বাভাবিক স্রাব থেকে। মানেই যে সবসময় ভয়ংকর শিশুর নাক বন্ধ হয়েছে, তা নয়।

সাধারণভাবে, চিন্তার কারণ কম যদি:

  • বাচ্চা ভালভাবে বুকের দুধ বা ফর্মুলা খাচ্ছে
  • বুকে আর পেটে নরম, নিয়মিত ওঠা-নামা হচ্ছে, খুব তাড়াহুড়া করে শ্বাস নিচ্ছে না
  • শ্বাস নিতে গিয়েও কষ্ট করছে বলে মনে হয় না (নাক ডানদিকে-বাঁদিকে ফুলে উঠছে না, পাঁজরের মাঝখানের চামড়া ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে না)
  • ফিডের মাঝের সময়গুলোতে ভালোভাবে ঘুমিয়ে, নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে পারছে

সন্দেহ হলে একবার ঘুমন্ত শিশুকে একটু মন দিয়ে দেখুন। যদি সে শান্তভাবে ঘুমায়, গায়ের রং গোলাপি বা স্বাভাবিক, শ্বাস নিয়মিত - তাহলে নাকের শব্দ বেশি শোনা গেলেও সাধারণত খুব ভয় পাওয়ার কিছু থাকে না।


কখন শিশুর নাক বন্ধ থাকলে দুশ্চিন্তা করবেন

কখনো কখনো নাক বন্ধ থাকা শুধু সর্দি বা সামান্য জমাটের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার:

  • নাকের জন্য ঠিকমতো খেতে না পারা
    দুধ খেতে শুরু করলেই দু’তিন ঢোকের বেশি খেতে না পেরে ছেড়ে দেয়, নাক দিয়ে শ্বাস নিতে না পেরে কষ্ট পায়।

  • খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া
    বিশ্রামে থাকা অবস্থায় প্রতি মিনিটে প্রায় ৬০ বারের বেশি শ্বাস নিচ্ছে এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরেই এমন আছে।

  • নাকের পাশ ফুলে উঠছে
    প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাকের দুই পাশ স্পষ্টভাবে চওড়া হয়ে উঠছে।

  • বুকের ভেতর চামড়া ঢুকে যাচ্ছে
    পাঁজরের মাঝখানে, নিচে বা গলার গোড়ায় চামড়া প্রতি শ্বাসে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।

  • জ্বরসহ নাক বন্ধ
    তিন মাসের কম বয়সী শিশুর তাপমাত্রা ৩৮° সেলসিয়াস বা তার বেশি আর সঙ্গে নাক বন্ধ, সর্দি বা কাশি আছে।

  • অল্প সাড়া দেওয়া বা দুধ কম খাওয়া
    বাচ্চা খুব ঢুলু ঢুলু, ডাকলে ঠিকমতো সাড়া দিচ্ছে না, শরীর একটু ঢিলে মনে হচ্ছে, বা হঠাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম দুধ খাচ্ছে।

এই অবস্থায়:

  • কাছের শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি হাসপাতাল বা বিশ্বাসযোগ্য ক্লিনিকে দ্রুত যান
  • প্রয়োজনে রাত-দিন খোলা জরুরি বিভাগে দেখাতে দ্বিধা করবেন না
  • না পেলে ফোনে কমপক্ষে ১৬২৬৩ বা ৩৩৩ নম্বরে কথা বলে পরামর্শ নিন

নিজের মনের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। বাচ্চাকে সবচেয়ে বেশি আপনি চেনেন।


হিউমিডিফায়ার আর ঘরের ছোট ছোট পরিবর্তন

কিছু সহজ পরিবেশগত পরিবর্তন শিশুর নাক বন্ধ বা সর্দি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।

কুল মিস্ট হিউমিডিফায়ার ব্যবহার

কুল মিস্ট হিউমিডিফায়ার বা আর্দ্রতা বাড়ানোর যন্ত্র ঘরের বাতাসে সামান্য আর্দ্রতা যোগ করে। এতে:

  • ঘন সর্দি একটু নরম হয়
  • নাকের ভেতর শুকনো ভাব কমে, আরাম লাগে
  • রাতে নাকের শব্দ কিছুটা কম শোনা যেতে পারে

নিরাপদে ব্যবহার করতে:

  • রুমের আর্দ্রতা প্রায় ৪০-৬০% রাখার চেষ্টা করুন (অনেক মেশিনেই ছোট ডিসপ্লেতে দেখায়)
  • হিউমিডিফায়ারটা বাচ্চার খাট বা বেড থেকে কিছুটা দূরে, ঘরের এক কোণে রাখুন
  • সবসময় কুল মিস্ট ব্যবহার করুন, গরম স্টিম ব্যবহার করলে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে
  • নিয়মিত মেশিন পরিষ্কার রাখুন, না হলে ছাঁচ বা ব্যাকটেরিয়া জমে যেতে পারে

হিউমিডিফায়ার না থাকলে, সহজ পদ্ধতি হলো যেখানে বাচ্চা ঘুমায় সেই ঘরে কাপড় শুকাতে দিন (তবে রোদে বা গরমের একদম ওপর না, সামান্য দূরে)। কাপড় শুকাতে শুকাতে বাতাসে আর্দ্রতা কিছুটা বাড়ে।

আর কী কী করতে পারেন

  • পুরো ঘর ধোঁয়ামুক্ত রাখুন
    সিগারেট, বিড়ি, হুক্কা বা রান্নাঘরের অতিরিক্ত ধোঁয়া থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখুন।

  • তীব্র গন্ধ কমান
    ভারি পারফিউম, রুম ফ্রেশনার, সুগন্ধি মোমবাতি, ফ্লোর ক্লিনার বা ফিনাইলের গন্ধ যতটা সম্ভব বাচ্চার রুমে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

  • ম্যাট্রেস উঁচু করার ব্যাপারে সাবধান
    অনেকেই একটু বড় বাচ্চার ক্ষেত্রে খাটের এক পাশ সামান্য উঁচু করে দেন। কিন্তু একদম নবজাতকের জন্য সবসময় সেফ স্লিপ গাইডলাইন মানা জরুরি: শক্ত, সমতল জায়গায়, সবসময় চিত হয়ে শোওয়া। ম্যাট্রেস উঁচু করার আগে আপনার গাইনী ডাক্তার, মিডওয়াইফ বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো।


শেষ কথা

নবজাতকের যত্ন নিতে নিতে মনে হয় কত কিছুই না জানার আছে। কিন্তু নবজাতকের চোখের যত্ন আর শিশুর নাকের যত্ন মিলিয়ে আসলে মূল কথাগুলো খুব সহজ:

  • নিয়মিত নরমভাবে পরিষ্কার রাখা
  • কোনটা স্বাভাবিক আর কোন লক্ষণ চিন্তার - এটা একটু খেয়াল রাখা
  • স্যালাইন আর নরম সাকশন ঠিকভাবে ব্যবহার করা
  • মনে সন্দেহ হলেই দ্রুত পরামর্শ নেওয়া

নবজাতকের চোখে স্রাব, শিশুর চোখে পুঁজ মনে হওয়া, চোখের নালী বন্ধ নবজাতক, বারবার নবজাতকের নাক পরিষ্কার করা আর শিশুর নাক বন্ধ থাকা - এগুলো প্রায় সব বাবা-মাকেই কমবেশি সামলাতে হয়।

একটু নিয়ম মেনে চললে, ধৈর্য ধরে কয়েকদিন দেখলে আর কখন ডাক্তার দেখাতে হবে সেটা জানলে, এগুলো সামলানো কঠিন নয়।

আর কোনও সময় যদি মনে হয়, „এটা কি ঠিক হচ্ছে তো?“ - লজ্জা না পেয়ে আপনার শিশুর ডাক্তারকে, কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীকে বা সরকারি হেল্পলাইনকে ফোন করুন। ছোট্ট একটি প্রশ্নও অকারণ নয়, যখন বিষয়টা আপনার শিশুর চোখ আর নাকের স্বাস্থ্যের।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই প্রবন্ধগুলি আপনার জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।