নতুন বাচ্চা বাসায় আসার প্রথম ক’টা সপ্তাহ মোটামুটি ধাক্কায় কেটে যায়। তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে এসে হঠাৎ মনে হতে পারে, সব গুলিয়ে গেল। কাল পর্যন্ত যে বাচ্চা ঠিকঠাক দুধ খেত, ঘুমাত, মাঝেমধ্যে হাসির মত মুখ করত, আজ সে সারাক্ষণ কাঁদছে, বুক বা বোতল ছাড়ছে না, কোলে থেকে নামালেই কান্না, ঘুম ক’টা মিনিট পরপর ভাঙছে বা উল্টো আবার অস্বাভাবিক বেশি ঘুমাচ্ছে।
মনে হওয়াটা স্বাভাবিক:
«হঠাৎ বাচ্চা এত বিরক্ত আর কাঁদছে কেন?»
«আমি কি কিছু গোলমাল করলাম?»
«আমার দুধ কি কম পড়ছে?»
একটু থামুন, শ্বাস নিন। খুব সম্ভবত আপনার বাচ্চা একটা গ্রোথ স্পার্ট এর মধ্যে আছে - মানে দ্রুত বেড়ে ওঠার একদম স্বাভাবিক, আর আসলে বেশ ভাল লক্ষণ।
এবার দেখি, এই ৩–৪ সপ্তাহের গ্রোথ স্পার্ট এর সময় আসলে কী হয়, আর আপনি কীভাবে এই টানা ক’টা তীব্র দিন একটু আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামলাতে পারেন।
আমরা সাধারণত নবজাতকের গ্রোথ স্পার্ট বলতে শুধু শারীরিক বৃদ্ধি বুঝি - লম্বা হচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথার সাইজ বড় হচ্ছে, নতুন কেনা ছোট জামা টাইট লাগছে। এগুলো ঠিকই হয়, কিন্তু গল্পের অর্ধেকটা মাত্র।
জন্মের পর প্রথম ক’টা সপ্তাহে বাচ্চাদের মধ্যে একেক সময়ে হয় -
এই ছোট, তীব্র সময়গুলোকে অনেকেই বলেন গ্রোথ স্পার্ট বা ডেভেলপমেন্টাল লিপ। এই লিপের সময় বাচ্চার মস্তিষ্ক হঠাৎ নতুনভাবে দুনিয়াকে ধরতে শিখছে। যেন হঠাৎ কারও জীবনে আলো আর শব্দের ভলিউম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এত পরিবর্তন একসাথে সামলানো ছোট্ট শরীর আর মস্তিষ্কের জন্য বেশ কষ্টকর। তাই বাচ্চা তার একমাত্র চেনা ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায় - বেশি কাঁদে, বেশি চিপকে থাকে, বারবার দুধ খেতে চায়, আর যেন «আগের মত» থাকে না।
ভাল দিকটা হল,
এই সব পর্যায় অল্প ক’দিনের, আর প্রায়ই দেখবেন এই ফেজের শেষে বাচ্চা হঠাৎ যেন এক ধাপ বড় হয়ে গেছে - নতুন কোনো দক্ষতা, বেশি চোখে চোখ রাখে, আরও রেসপনসিভ।
প্রায় ৩ সপ্তাহ বয়সে, কারও কারও ক্ষেত্রে ৪ সপ্তাহের দিকে, অনেক মা-বাবা হঠাৎ টের পান, «৩–৪ সপ্তাহের শিশুর আচরণ পরিবর্তন» হয়ে গেছে।
খোঁজ করতে গিয়ে আপনি হয়তো গুগল করছেন:
একদম একা নন, প্রায় সব নতুন মা-বাবা এই সার্চগুলো করেন।
এই ৩–৪ সপ্তাহের গ্রোথ স্পার্ট আসলে জন্মের পরের প্রথম বড় লাফগুলোর একটি। আপনার বাচ্চা তখন:
এই বাড়তি সচেতনতা, সঙ্গে শারীরিক বাড়ন্ত - দু’টো মিলে শিশুর মেজাজকে বেশ এলোমেলো করে দিতে পারে।
প্রতিটি বাচ্চা আলাদা, তবে ৩–৪ সপ্তাহের দিকে কিভাবে বুঝবেন শিশুর গ্রোথ স্পার্ট চলছে, তার কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে। আপনার বাচ্চার ক্ষেত্রে সবগুলো নাও মিলতে পারে, কিছু মিললেই বোঝার জন্য যথেষ্ট।
আগে অপেক্ষাকৃত শান্ত যে বাচ্চা ছিল, সে হঠাৎ:
অনেক মা বলেন, বাচ্চা হঠাৎ «খুব রাগী» বা «সব সময় অখুশি» মনে হচ্ছে, কিন্তু কেন, বোঝা যাচ্ছে না। এই প্রশ্নটাই তখন মাথায় ঘোরে - শিশু বেশি কাঁদছে কেন?
এটা খুব ক্লাসিক সাইন।
গ্রোথ স্পার্টের সময় অনেক বাচ্চা ক্লাস্টার ফিডিং শুরু করে - খুব অল্প বিরতিতে বারবার খেতে চায়, কখনো কখনো ২০–৩০ মিনিট পরপরই আবার দুধ চায়।
আপনি যদি বুকের দুধ খাওয়ান, এটা মোটেই এমন না যে, আপনার দুধ কম। বরং নবজাতক দারুণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে:
বোতল/ফর্মুলা খাওয়ালে দেখবেন:
কথাটা মাথায় রাখুন:
এটা আপনার দুধ বা ফিডিং পদ্ধতির ব্যর্থতা না, গ্রোথ স্পার্টের স্বাভাবিক আচরণ।
অনেক মা এখানে সার্চ দেন - «বাচ্চা বেশি খেতে চায় কেন» - বেশিরভাগ সময় উত্তরটা হল, সে বড় হচ্ছে।
গ্রোথ স্পার্টের সময় ঘুম দুই দিকেই যেতে পারে:
তাই শিশু বেশি ঘুমায় কেন বা হঠাৎ কম ঘুমাচ্ছে কেন, দুই ক্ষেত্রই এই সময়ে দেখা যায়। প্যাটার্নটা কয়েকদিনের জন্য বদলে যেতে পারে, মানেই যে খারাপ কিছু হয়েছে, তা নয়।
এ সময় অনেক মা-বাবার মনে প্রশ্ন জাগে:
৩ সপ্তাহের ডেভেলপমেন্টাল লিপ বা একটু এদিকসেদিক হলে ৪ সপ্তাহের দিকে, বেশিরভাগ বাচ্চাই প্রায় সারাক্ষণ গা লাগিয়ে থাকতে চায়। বুকের উপর, বেবি ক্যারিয়ার/স্লিং এ, অথবা একদম পাশে না থাকলে শান্ত হতে চায় না।
বাইরের লোকজন অনেক সময় বলে - «এভাবে কোলে রাখলে অভ্যাস নষ্ট হবে», «বেশি আদর করলে নষ্ট হয়ে যাবে» ইত্যাদি। আসলে এই চিপকে থাকার প্রবণতা ওর ছোট্ট নার্ভাস সিস্টেমের ভাষা -
«আমার চারপাশ হঠাৎ খুব বেশি জোরে লাগছে, তুমি কাছে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করি»।
৩ সপ্তাহের গ্রোথ স্পার্ট এর আরও কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ:
এর মধ্যে যদি আবার জ্বর আসে, খুব কষ্টে জাগে বা একদম অস্বাভাবিক ঢলে পড়ে থাকে, প্রস্রাব/ভেজা ডায়াপার খুব কমে যায়, বা আপনার মন বলছে «কিছু ঠিক নেই» - তখন দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান। বাংলাদেশে পেডিয়াট্রিশিয়ান, কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা ৯৯৯ জরুরি নম্বরে পরামর্শ নিতে পারেন।
গ্রোথ স্পার্ট স্বাভাবিক, কিন্তু একই সময়ে অসুখও হতে পারে, তাই নিজের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিন।
নবজাতকের গ্রোথ স্পার্ট এর সবচেয়ে টানা, তীব্র অংশ আসলে বেশি লম্বা হয় না।
অধিকাংশ বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতায় ৩–৪ সপ্তাহের এই গ্রোথ স্পার্ট সাধারণত:
রাত ৩টায়, যখন সারারাত ভাঙা ভাঙা ঘুম হয়েছে, তখন মনে হবে এই অবস্থা আর কোনোদিন শেষ হবে না। কিন্তু সত্যিই, ক’দিনের মধ্যেই একটা পরিবর্তন দেখা যায়।
অনেকেই বলেন:
তাই যখন ভাবছেন, «গ্রোথ স্পার্ট কতদিন স্থায়ী হয়?», মনে রাখুন, সাধারণত ক’টা দিন খুব কষ্টকর, তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে ফেরে।
বাচ্চা কোনোভাবেই «দুষ্টুমি» করছে না, ইচ্ছে করে আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে না। এর পেছনে একেবারে বাস্তব, শারীরবৃত্তীয় কারণ আছে।
প্রথম মাসটায় শিশুর মস্তিষ্ক অবিশ্বাস্য গতিতে বড় হয়। ৩ সপ্তাহের ডেভেলপমেন্টাল লিপ এর সময় বাচ্চা ধীরে ধীরে:
এই অতিরিক্ত প্রসেসিং, অর্থাৎ শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশ লক্ষণ হিসেবে আমরা বাইরে থেকে দেখি বেশি কান্না, বেশি চিপকে থাকা, সহজে শান্ত না হওয়া।
গ্রোথ স্পার্টের সময় বাচ্চারা সাধারণত:
তাই এই সময় এত বারবার খেতে চাওয়া একদম স্বাভাবিক। যারা খোঁজ করেন, «বাচ্চা বেশি খেতে চায় কেন» - উত্তরটা বেশিরভাগ সময়ই এই দ্রুত বাড়ন্ত।
জন্মের পর প্রথম কয়েকদিনের নবজাতকের দুনিয়া একটু ঝাপসা, সে প্রায়ই ঘুমঘুম থাকে, তাড়াতাড়ি ওভারস্টিমুলেটেড হয়। ৩–৪ সপ্তাহের দিকে এসে ইন্দ্রিয়গুলো আরও ধারালো হয়ে যায়।
তখন আপনার বাচ্চা:
বাইরের চোখে এসব «অকারণ রাগ» বা «বিনা কারণে কান্না» মনে হলেও, মনে রাখুন ওর দুনিয়া হঠাৎ অনেক আলো–শব্দে ভরে উঠেছে।
অনেকে The Wonder Weeks নামের বই বা অ্যাপের কথা শোনেন, যেখানে জন্মের পর প্রায় ২০ মাস পর্যন্ত বাচ্চাদের বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল লিপ নিয়ে বলা হয়েছে।
ওই ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী:
আপনার যে ৩–৪ সপ্তাহের গ্রোথ স্পার্ট চলছে, সেটা এই প্রথম লিপের একদম শুরুতে মিলেও যেতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে ৫ম সপ্তাহে আরেকটা ফুসি ফেজ দেখা যায়। সব বাচ্চা বই/অ্যাপের টাইমলাইন একদম ফলো করে না, তবে অনেক মা-বাবা এই ধারণা থেকে মানসিক সাপোর্ট পান।
আপনি ওয়ান্ডার উইকসের হিসেব মানুন বা না মানুন, আসল কথাটা একটাই:
আপনার বাচ্চা শুধু লম্বা-ভারীই হচ্ছে না, মানসিকভাবেও দ্রুত বড় হচ্ছে, আর এটা সাময়িকভাবে সবার জীবন ওলট–পালট করে দিতে পারে।
গ্রোথ স্পার্ট থামানোর দরকার নেই, পারাও যাবে না। এটা ভাল সাইন। তবে আপনি আর বাচ্চা - দু’জনের জন্যই এই সময়টাকে একটু সহনীয় করার কিছু উপায় আছে।
বাচ্চা যদি দুধ খাওয়ার সিগন্যাল দেয় - মুখ ঘুরিয়ে বুক খোঁজা, ঠোঁট চুষচুষ করা, হাত মুখে নেওয়া, কেঁদে বুক/বোতলের দিকে ঝুঁকে পড়া - তাহলে দুধ দিন, আটকাবেন না।
বুকের দুধ খাওয়ালে:
ফর্মুলা খাওয়ালে:
চিন্তাটাকে একটু ঘুরিয়ে দেখুন:
স্কিন–টু–স্কিন শুধু ডেলিভারির পর এক ঘন্টার ব্যাপার না। গ্রোথ স্পার্টের সময়ও এটা দারুণ কাজ দেয়:
আপনি ব্লাউজ/কামিজ একটু খুলে নিন, বাচ্চাকে কেবল ডায়াপার/ল্যাঙ্গট জড়িয়ে আপনার খালি বুকে শুইয়ে নিন, ওপরে হালকা চাদর দিন।
বাবা বা অন্য কেয়ারগিভারও একইভাবে করতে পারে - বাচ্চার কাছে আসল বিষয় নিরাপদ গা গরম, কে সেই বুকটা দিচ্ছে সেটা না।
একাই সব সামলানোর কথা ভেবে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলার দরকার নেই।
যদি সম্ভব হয়:
একলা থাকলে? ভাবুন, আশেপাশে কি কোনো আত্মীয়/বন্ধু/পাড়া-প্রতিবেশী আছে, যারা:
অনেকে সাহায্য করতে চায়, কিন্তু কিভাবে করবে বুঝতে পারে না। দরকার হলে একদম স্পেসিফিকভাবে বলুন - «তুমি কি কাল বিকেলে আধা ঘন্টার জন্য এসে বাচ্চাকে কোলে রাখবে? আমি একটু গোসল করে নেব»।
এই ক’টা দিন নিজের ওপর কম আশা রাখুন:
এই সময় আপনার মূল কাজ:
এর বাইরে যা করতে পারেন ভাল, না পারলে অপরাধবোধের দরকার নেই।
প্রতিটি বাচ্চার শান্ত হওয়ার ধরণ আলাদা। কিছু চেষ্টা করতে পারেন:
৩ সপ্তাহ বয়সী বাচ্চাকে কোলে নিয়ে শান্ত করতে করতে «খারাপ অভ্যাস» তৈরি হয় না। বরং ওর মস্তিষ্ককে শেখাচ্ছেন - দুনিয়া নিরাপদ, কান্না করলে কেউ সাড়া দেয়।
ঘুমের অভাব, সারাক্ষণ গা-ঘেঁষাঘেঁষি, মানসিক টেনশন - এগুলো খুব স্বাভাবিক। দুর্বলতার লক্ষণ নয়।
যতটা পারেন:
যদি দেখেন:
তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলর বা অভিজ্ঞ কারও সাথে কথা বলুন। বাংলাদেশে প্রসব পরবর্তী ডিপ্রেশন আর উদ্বেগ অনেক বেশি সাধারণ, আর চিকিৎসাযোগ্য। বাচ্চার মত আপনিও সাপোর্ট পাওয়ার যোগ্য।
এখানেই একটু আশার খবর।
এই ৩–৪ সপ্তাহের গ্রোথ স্পার্ট পেরিয়ে গেলে বেশিরভাগ মা-বাবা লক্ষ্য করেন, বাচ্চা:
অনেকে বলেন, বাচ্চা যেন কয়েকদিনের «ঝড়» পেরিয়ে হঠাৎ করে অনেক বড় হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
তাই এখন যদি আপনি কোলে একটা কাঁদতে থাকা, চিপকে থাকা, অবিরাম খেতে চাওয়া নবজাতক নিয়ে বসে ভাবছেন, «আমি কি কোনোদিন আর গরম চা/কফি শান্ত মনে খাব?» - মনে রাখুন:
একটা একটা ফিড, একটা একটা কোল আর ছোট ছোট ঘুমের মাঝখানে আপনি ধীরে ধীরে এই ৩–৪ সপ্তাহের গ্রোথ স্পার্ট পেরিয়ে যাবেন। ওদিকে আপনার বাচ্চা হবে একটু বড়, একটু বেশি সচেতন, আর একদমই নিজস্ব স্বভাবের এক ছোট মানুষ।
আর আপনি? আপনি তখন এমন এক মা বা বাবা, যিনি জীবনের প্রথম বড় একটা লিপ সাফল্যের সাথে পার করলেন। এটাও কম কৃতিত্ব না।