আপনার বেবি এখন ৫ সপ্তাহের। প্রথম দিকের একদম হতভম্ব করে দেওয়া সময়টা একটু একটু করে কাটছে, আপনি নিজেও কিছুটা গুছিয়ে উঠেছেন, আর আপনার ছোট্ট মানুষটি আগের থেকে অনেক বেশি সজাগ। একদম আবছা নবজাতক সময়টা বদলে গিয়ে এখন হচ্ছে এমন কিছু ছোট ছোট জেগে থাকা সময়, যখন আপনার মাথায় আসতেই পারে – “এখন বাচ্চার সঙ্গে কীভাবে খেলব?”
এখানেই কাজে লাগে খুব সাধারণ, ভালোবাসায় ভরা বেবি খেলা আর সহজ কিছু বেবি কার্যক্রম। আলাদা কিছু না, মূলত আপনার মুখ, গলা, হাত - আর কয়েকটি ছোট ছোট নবজাতকের খেলা যেগুলো সহজেই আপনার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরই করে ফেলা যায়।
চলুন আগে দেখে নিই, ৫ সপ্তাহে শিশুর বিকাশ লক্ষণ হিসেবে কী কী বদল হচ্ছে, তারপর ধীরে ধীরে দেখে নেবো আজ থেকেই শুরু করতে পারেন এমন কিছু কাজের ৫ সপ্তাহের বেবি কার্যক্রম।
প্রায় ৫ সপ্তাহ নাগাদ এসে অনেক বাবা-মা স্পষ্ট একটা বদল টের পান। হ্যাঁ, বাচ্চা এখনও একটু কান্নাকাটি করতে পারে (গ্রোথ স্পার্ট, পেটের অসুবিধা ইত্যাদি), কিন্তু সাথে সাথে আপনি আরো কিছু নতুন জিনিস দেখবেন:
আরও বেশি সময় ধরে জেগে থাকা
আগে হয়তো ৫–১০ মিনিট জেগে থাকত, তারপরই আবার ঘুম। এখন কিন্তু একেক বার ২০–৩০ মিনিট শান্তভাবে জেগে থাকতে পারে। এই সময়টাই আপনার জন্য সোনার সময়, বিভিন্ন নবজাতক বেবি খেলা করার জন্য। অনেকেই ভাবেন, নবজাতক কতক্ষণ জেগে থাকে? এই বয়সে সাধারণত দিনে কয়েকবার এমন একটু লম্বা জেগে থাকা সময় পাওয়া যায়।
ডাকে ভালো সাড়া দেওয়া
এখন আপনার মুখের দিকে একদম মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকে। আপনার গলা শুনে চুপ হয়ে যায়, আপনি কথা বললে বা গান গাইলে হাত-পা নেড়ে সাড়া দেয়। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে খুব সাধারণভাবে শিশুকে উত্তেজিত বা স্টিমুলেট করার প্রথম ধাপ।
প্রথম সামাজিক হাসি
শুধু গ্যাসের জন্য হওয়া এলোমেলো হাসি না, চোখে চোখ রেখে যেন বলতে চায়, “আমি তোমাকে চিনেছি।” অনেকেই ভাবেন, প্রথম হাসি কবে আসে, বা শিশুকে হাসাতে কিভাবে। প্রায় এই সময় থেকেই আপনি তার প্রথম আসল হাসি ধীরে ধীরে দেখতে শুরু করতে পারেন।
কু কু শব্দ করা বা ‘কু-মিউ’
ছোট ছোট “উহু”, “আহা” জাতীয় শব্দ বেরোতে শুরু করতে পারে। অনেকে প্রশ্ন করেন, বাচ্চা কবে থেকে কু কু শব্দ করে? অনেক শিশুই সাধারণত ৫–৮ সপ্তাহের মধ্যে এসব শব্দ করা শুরু করে। শুনতে খুব সামান্য মনে হলেও এগুলোই ভবিষ্যতের ভাষা শেখার বীজ।
এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে আপনার শিশুর মস্তিষ্ক খুব দ্রুত গড়ে উঠছে। প্রতিটি কোমল ছোঁয়া, আপনার সব হাসি-ভঙ্গি, তার ডাকে আপনার প্রতিক্রিয়া - সব মিলেই সে শিখছে এই দুনিয়া আর আপনাকে চিনতে।
নির্দিষ্ট বেবি কার্যক্রম শুরু করার আগে একটা জিনিস মনে রাখা দরকার: খেলাধুলার আসল পরিচালক কিন্তু বাচ্চাই।
আপনার ৫ সপ্তাহের বেবি যদি…
তাহলে সেটাকে ধরে নেওয়া যায়, সে ওভারস্টিমুলেটেড বা অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে গেছে। তখন থেমে যান, কাছ করে কোলে নিন, দুধ খাওয়ান বা একটু ঘুমাতে দিন। কয়েক মিনিট আনন্দ করে খেলা হওয়াই ভালো, লম্বা সময় ধরে খেলে শেষে বড় কান্নায় গড়িয়ে পড়ার চেয়ে।
প্রতিদিন সবগুলো এক্টিভিটি করার কোনো দরকার নেই। এগুলোকে ভাবুন নবজাতকের খেলার মেনু হিসেবে। যেদিন যা সহজ মনে হয়, সেদিন ১–২টা বেছে নিন, সপ্তাহজুড়ে অদলবদল করে করুন।
এটা একদম ক্লাসিক ফেস-টু-ফেস শিশুর সঙ্গে হাসির আদানপ্রদান, আর ৫ সপ্তাহের বাচ্চার জন্য সত্যিই জাদুর মতো কাজ করে।
এমন মুখোমুখি আলাপে আপনার বেবি শিখে:
আপনি যদি ভাবেন, শিশুকে হাসাতে কিভাবে বা প্রথম হাসি কবে বের করতে উৎসাহ দেবেন, তাহলে এই খেলাটা আপনার প্রথম পছন্দ হতে পারে।
একদম কাছে যান
বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বা পাশে শুইয়ে নিন। আপনার মুখ যেন তার মুখ থেকে প্রায় ২৫–৩০ সেন্টিমিটার দূরে থাকে (একটা হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত যতটা দূরত্ব হয়, সেটা ধরতে পারেন)। এই দূরত্বেই নবজাতক সবচেয়ে পরিষ্কার দেখতে পায়।
মনে ভরে হাসুন
বড় করে, উষ্ণ একটা হাসি দিন। মুখ যেন রিল্যাক্সড থাকে, তবে এক্সপ্রেশন যেন স্পষ্ট হয়। শিশুরা একটু বাড়িয়ে করা মুখভঙ্গি খুব পছন্দ করে।
গলায় একটু গানির সুর রাখুন
আমাদের দেশে যেমন শিশুদের সঙ্গে মায়েরা স্বাভাবিকভাবেই টানা সুরে কথা বলেন, সেভাবেই একটু উঁচু গলায়, টানা সুরে কথা বলুন, যেমন:
একটু থামুন, অপেক্ষা করুন
কথা বললেন, এবার হঠাৎ চুপ। তার প্রতিক্রিয়া দেখুন। আপনার বাচ্চা হয়তো:
এই সবকিছুই কিন্তু তার ভাষায় আলাপ। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে কথোপকথনের ‘একজন বলছে, আরেকজন শুনছে’ - এই পালা বদল।
একদম আসল আলাপের মতোই জবাব দিন
সে যখন নড়ে, কু কু করে বা মুখ খুলে, আপনি উত্তর দিন:
এই সাদামাটা হাসির আলাপই আসলে ভবিষ্যতের সোশ্যাল কমিউনিকেশন গড়ে তোলার বেসিক। সোফা, বিছানা, বুকের দুধ খাওয়ানোর ফাঁকে, ডায়াপার পরিবর্তনের সময় - সব জায়গাতেই এটা করা যায়। তাই ৫ সপ্তাহের শিশুর খেলা বলতে একে অনায়াসে তালিকার এক নম্বরে রাখা যায়।
হয়তো আপনি ইতিমধ্যে অল্প অল্প টামি টাইম শুরু করেছেন, আবার অনেকে ভাবছেন, পেটে শুইয়ে দিলেই কান্না শুরু হয়, না করালেই কি হয় না? এই টেনশন খুব কমন। ৫ সপ্তাহ বয়সে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে - অল্প অল্প করে, বার বার করা।
দিনে মোট ১৫–২০ মিনিটের মতো, কিন্তু সব মিলিয়ে। একেকবার ১–৩ মিনিট করলেই হয়, একটু পর পর। এমনকি ৩০ সেকেন্ডও গুনে রাখবেন, সব মিলিয়েই হিসাব হবে।
টামি টাইম কিন্তু সব সহজ বেবি খেলার মধ্যে সবচেয়ে কাজের, কারণ এটা:
কান্না করা বাচ্চাদের জন্য এটা সবচেয়ে আরামদায়ক উপায়, বিশেষ করে ১ মাসের শিশু আর আশেপাশের বয়সে।
মাথা খুব বেশি তুলতেই হবে এমন না। ছোট্ট করে ওঠানো, আবার নামানো, একটু হেলে যাওয়া - সবই কাজের।
বাচ্চা শান্তভাবে জেগে থাকলে:
শুরুতে ১–২ মিনিটই যথেষ্ট। কান্না শুরু করলে কোলে তুলে নিন, একটু পরে আবার চেষ্টা করুন। কয়েক দিনের মধ্যে এই ছোট ছোট টুকরো সময়গুলো মিলিয়ে আপনি দেখবেন, মোটামুটি সেই ১৫–২০ মিনিট হয়ে গেছে।
প্রায় ৫ সপ্তাহে এসে বাচ্চার চোখের নড়াচড়া অনেক স্মুথ হয়। আগে যেখানে এলোমেলোভাবে এদিক সেদিক তাকাত, এখন ধীরে ধীরে কিছু একটা দেখছে, অনুসরণ করছে। এই সময়েই খুব সহজ একটা ট্র্যাকিং গেম, মানে চোখ দিয়ে অনুসরণ করার বেবি খেলা দারুণ কাজে লাগে।
আমরা সাধারণত খেলনা বাম-ডানে নড়াই। ৫ সপ্তাহে হালকা করে চেষ্টা করতে পারেন:
অনেক বাচ্চাই এখনো একদম ঠিকভাবে ওপর-নিচ ট্র্যাক করতে পারে না, তাতে সমস্যা নেই। ধীরে ধীরে অনুশীলন করলেই চোখের কাজ আরো পরিপক্ব হয়।
এই খেলাটাও বেশি লম্বা করতে হবে না। ১–২ মিনিট যথেষ্ট। সে যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, চোখ বন্ধ করে, বা কান্না শুরু করে, সেখানেই থেমে যান।
আপনার গলার শব্দ সে মায়ের পেট থেকেই শুনে এসেছে। এখন ধীরে ধীরে সে শিখছে, কোন শব্দটা কোন দিক থেকে আসছে। এই দক্ষতা গড়ে তুলতে খুব সহজ একটা সাউন্ড লোকালাইজেশন খেলা করা যায়।
বাচ্চাকে পিঠের ওপর সমতল জায়গায় শুইয়ে দিন, বা কোলে তুলে সোজা করে রাখুন যেন গলা-ঘাড় সাপোর্ট পায়।
ঝুনঝুনি আগে একবার তার সামনে দেখিয়ে দিন, যেন হঠাৎ ভয় না পায়।
এবার খেলনাটা তার সরাসরি চোখের সামনে থেকে একটু সরে, মাথার বাম পাশে আনুন, প্রায় ২০–৩০ সেন্টিমিটার দূরে।
খুব আলতো করে এক–দুবার ঝাঁকান, তারপর থেমে যান।
দেখুন, আপনার বেবি কি-কী করে:
এবার একইভাবে ডান পাশেও করুন।
অনেক ৫ সপ্তাহের বাচ্চাই খুব সামান্য মাথা ঘোরায়, আবার কেউ কেউ শুধু চোখ ঘুরিয়ে তাকায়। এটুকুই যথেষ্ট। বাইরে থেকে খুব ছোট মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে মস্তিষ্কে ভয়ংকর কাজ হচ্ছে।
খেলাটা যেন পরীক্ষার মত না লাগে। হালকা, আনন্দের ভাব রাখুন। বাচ্চা যদি চমকে ওঠে, শব্দ একটু নরম করুন বা খেলনাটা আরও দূরে নিন।
বাচ্চারা মুখ দেখতে পাগল - আপনার মুখ, বাবার মুখ, এমনকি নিজের মুখও। যদিও এখনো সে বুঝতে পারে না যে আয়নায় যে বাচ্চাটাকে দেখছে, সেটাই সে নিজে, কিন্তু নড়াচড়া আর কনট্রাস্ট তাকে ভীষণ টানে। হঠাৎ ছোট্ট করে “বাচ্চার সঙ্গে কী খেলা করব” মনে এলে আয়না একদম সহজ সমাধান।
সম্ভব হলে বেবি-সেফ প্লাস্টিক আয়না ব্যবহার করুন, না হলে দেয়ালে খুব ভালোভাবে আটকানো ভাঙন-প্রতিরোধী আয়না।
বাচ্চাকে এমনভাবে কোলে নিন, যেন সে আয়নার দিকে মুখ করে থাকে। টামি টাইমের সময় চাইলে তাকে পেটের ওপর শুইয়ে আয়নার সামনে রাখতেও পারেন।
এবার আপনিও আয়নার সামনে যান, যেন আপনাদের দুজনকেই দেখা যায়। মুখে মুখে নানারকম ভঙ্গি করুন:
সাথে কথা চালিয়ে যান, যেন নাটক দেখাচ্ছেন:
আপনার ৫ সপ্তাহের বেবি হয়তো:
এটাও আসলে এক ধরনের ফেস-টু-ফেস নবজাতক খেলা, শুধু আয়নার টুইস্ট যোগ হয়েছে। এতে দৃষ্টিশক্তির উন্নতি হয়, সামাজিক যোগাযোগও বাড়ে, আর আলাদা কিছু কিনতেও হয় না।
ম্যাসাজ আমাদের উপমহাদেশে বহুদিনের অভ্যাস। দাদি-নানিরা যুগ যুগ ধরে নবজাতককে তেল মালিশ করে আসছেন। ৫ সপ্তাহের বাচ্চার জন্য এটা দারুণ এক বেবি কার্যক্রম, যা আপনাদের দুজনেরই উপকারে আসে। এতে বাচ্চা আরাম পায়, ঘুমের আগে শান্ত হয়, নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হয়, আর আপনিও বাচ্চার সঙ্গে একদম মন দিয়ে সময় কাটাতে পারেন।
শিশু বিকাশ এবং বাচ্চার যত্ন নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের কাছে ম্যাসাজ একদম স্নিগ্ধ, আরামদায়ক একটা অপশন।
পা আর পায়ের পাতা
হাত আর হাতের তালু
পেট
পিঠ
পুরো সময়টায় নরম গলায় কথা বলুন, হাম করেন বা প্রিয় লোরি গান গাইুন। বাচ্চা যদি শরীর শক্ত করে, ফুঁপিয়ে ওঠে বা মুখ ফিরিয়ে নেয়, থেমে যান, কোলে তুলে নিন। এখানে লক্ষ্য কিন্তু রুটিন শেষ করা না, বরং দুজনেরই রিল্যাক্স হওয়া।
ম্যাসাজ শুধু বন্ধনকে মজবুতই করে না, ধীরে ধীরে শরীর–মন দুটোকেই সাজিয়ে তোলে, যা পরে মোটর স্কিল, ভঙ্গি ইত্যাদি শেখার জন্যও সহায়ক।
একদম কঠিন সময়সূচি বানানোর দরকার নেই। ৫ সপ্তাহের নবজাতকের সঙ্গে বাস্তব জীবন মানেই গুলিয়ে যাওয়া ঘুম, বারবার দুধ খাওয়ানো, ডায়াপার পরিবর্তন, হঠাৎ কান্না… এগুলোর ফাঁকেই খেলার সময় বের হয়।
এই ৫ সপ্তাহের বেবি কার্যক্রমগুলো একদিনে এমনভাবে মিলিয়ে নিতে পারেন, একেবারে চাপ ছাড়া:
সকাল:
মধ্যসকাল:
বিকেল:
সন্ধ্যা:
কখনো কখনো দেখবেন, সারাদিনে এসবের মধ্যে থেকে একটা–দুটোই ঠিকমতো করতে পেরেছেন। অন্য দিন আবার অনেকগুলোই ছোট ছোট অংশে হয়ে গেছে। দুইটাই ঠিক আছে।
প্রতিটা ছোট্ট ইন্টারঅ্যাকশনই আসলে আপনার সেই বড় প্রশ্নের উত্তর - বাচ্চার সঙ্গে কীভাবে খেলব আর এই বয়সে ৫ সপ্তাহের শিশুর বিকাশ লক্ষণগুলোকে ধীরে ধীরে কীভাবে সাপোর্ট করব। আপনি ইতিমধ্যেই অনেক কিছু করছেন - কথা বলছেন, কোলে নিচ্ছেন, কান্নার সাড়া দিচ্ছেন - এগুলোই সবচেয়ে বড় বাচ্চার যত্ন।
৫ সপ্তাহ বয়সী নবজাতকের জন্য জটিল খেলনা, দামি গ্যাজেট বা একদম টাইট রুটিনের দরকার নেই। তার সবচেয়ে বেশি দরকার আপনাকে - আপনার মুখ, আপনার কথা, আপনার স্পর্শ, আর দিনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি সহজ ৫ সপ্তাহের শিশুর খেলা।
ছোট, নরম, আর বাচ্চার ইশারা অনুযায়ী থেমে থেমে করা এক্টিভিটি - আপাতত খেলাধুলার পুরো কাহিনি এটাই।