বাচ্চার গাল ভরা ছোট ছোট লাল ফোটা হঠাৎ চোখে পড়লে, মায়ের বা বাবার মনে সেটা কিন্তু একদমই ছোট লাগে না। ডায়াপার বদলাতে গিয়ে দেখলেন, একদিন তো গালটা একদম পরিষ্কার, পরের দিনই পুরো মুখ জুড়ে দানা! অনেকের মাথাতেই তখন ঘুরে একগুচ্ছ প্রশ্ন -
“আমি কি কিছু ভুল করলাম?”, “এটা কি অ্যালার্জি?”, “কারও থেকে সংক্রমণ হল নাকি?”
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হয় - না।
সাধারণত এটা হয় নবজাতক একনে, যা প্রায় সব সময়ই নিরীহ আর অস্থায়ী।
এখন দেখা যাক আসলে আপনার শিশুর ত্বকে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কী করবেন আর কী একদমই করবেন না, আর কখন ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যাওয়া দরকার।
নবজাতক একনে, অনেকেই বলেন শিশুর একনে বা ইনফ্যান্ট একনে, এটা খুব সাধারণ এক ধরনের শিশুর ফুসকুড়ি। দেখতে সাধারণত এমন হয় -
সবচেয়ে বেশি দেখা যায় -
কখনও কখনও একটু দেখা যেতে পারে -
মনে যদি প্রশ্ন আসে, “শিশুর একনে আসলে কী?” তাহলে একে ভাবতে পারেন টিনএজারদের একনের খুব হালকা আর অস্থায়ী ভার্সন, তবে ত্বকটা এখানে খুব নরম, একদম নতুন জন্মানো শিশুর।
নবজাতক একনে কিন্তু -
এটা আপনার কোনো ভুলের কারণে হয় না, আর সাধারণত শিশুর এতে কোনও অস্বস্তিও হয় না।
অনেক বাবা-মা অবাক হন, কারণ জন্মের পর কয়েকদিন বা এক-দুই সপ্তাহ বাচ্চার ত্বক একদম ঝকঝকে থাকে, হঠাৎ কিছুদিন পর মুখে দানা দানা ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
সাধারণ সময়সূচি একটু এরকম -
অনেক সময় প্রথমে গালে দু-একটা ছোট দানা দেখা যায়, তারপর কয়েক দিনের মধ্যে একটু বেশি হতে পারে। মাঝে মাঝে দেখলে মনে হয় যেন হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল, তাই না জেনে দেখলে একটু দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক।
যদি আপনার মনে প্রশ্ন থাকে “নবজাতক একনে কখন শুরু হয় আর নবজাতক একনে কখন যায়?”, তাহলে সহজ করে বললে -
প্রথম মাসে শুরু হয়, দ্বিতীয় মাসে বেশি চোখে পড়ে, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তৃতীয় বা চতুর্থ মাসের মধ্যে প্রায় পুরোটা মিলিয়ে যায়।
এই জায়গাটাতেই সাধারণত বাবা-মা বেশি চিন্তা করেন।
“আমি কি ভুল খাবার খেলাম?”, “নতুন সাবান ব্যবহার করার জন্য?”, “কাপড় ধোয়ার পাউডারের জন্য?” - এমন অনেক ভাবনা ঘোরে মাথায়।
সাধারণ নবজাতক একনে-র ক্ষেত্রে উত্তরে প্রায় সব সময়ই - না।
নবজাতক একনে কারণ মূলত দুটো:
গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরের হরমোন প্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশুর শরীরে যায়, এই হরমোন শিশুর বেড়ে উঠায় সাহায্য করে। জন্মের পরও কিছুদিন এ হরমোনগুলোর প্রভাব শিশুর শরীরে থাকে।
এই হরমোন শিশুর ত্বকের তেল গ্রন্থি বা সেবেসিয়াস গ্ল্যান্ডকে একটু বেশি সক্রিয় করে দিতে পারে। ত্বকে তেলের আধিক্য থেকে ছোট ছোট পিম্পলের মত দানা, মানে এই শিশুর মুখের ত্বকে দানা দেখা দেয়।
এটা কোনোভাবেই আপনি থামাতে পারবেন না, আবার এটা স্তনপান করানোর জন্য অথবা আপনি কী খাচ্ছেন তার জন্যও হয় না। একে ভাবুন জন্মের পর শিশুর শরীরের নিজেকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অংশ হিসেবে।
গর্ভের ভেতর থেকে বেরিয়ে বাইরের হাওয়ায় আসার পর শিশুর ত্বক একদম নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। এই সময় শিশুর সেবেসিয়াস গ্ল্যান্ড গুলো -
মায়ের হরমোনের প্রভাব আর এই অপরিণত তেল গ্রন্থি, দুই মিলেই শিশুর একনে হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।
যা থেকে নবজাতক একনে হয় না:
এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, এটা আপনার দোষ না। নিজেকে দোষারোপ না করে বরং কীভাবে নরমভাবে শিশুর ত্বকের যত্ন নেয়া যায়, সেটাই ভাবা ভালো।
অনেক মা বলেন - “সকালবেলা খুব হালকা ছিল, বিকেলে দুধ খাওয়ানোর পর দেখি অনেক বেশি লাল!”
এটা খুবই স্বাভাবিক।
নবজাতক একনে কেমন দেখায় সাধারণত:
আপনি লক্ষ্য করতে পারেন কিছু অবস্থায় ফুসকুড়ি বেশি চোখে পড়ে:
এই ফুসকুড়ি অনেক সময় হঠাৎ খুব লাল হয়ে ওঠে, আবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কিছুটা নরমাল হয়ে যায়। এই ওঠানামা খুব স্বাভাবিক, মানে এই না যে ভেতরে সংক্রমণ হয়েছে বা খুব বড় কোনো সমস্যা হচ্ছে।
শিশুর ত্বকে সামান্য কিছু দানা দেখলেও আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই “এটা ঠিক করে দিই” - এমন প্রবল ইচ্ছে অনুভব করি। কিন্তু নবজাতক একনে-র ক্ষেত্রে বেশি কিছু করতে গেলেই বেশি খারাপ হয়।
যেগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি:
কোনো দানা বা ফোসকা চেপে ধরা, ফাটানোর চেষ্টা করবেন না
প্রাপ্তবয়স্কদের একনে নিয়ন্ত্রণের কোন কেমিক্যাল ব্যবহার করবেন না
ত্বক ঘষাঘষি করবেন না
মুখে ভারী বা তেলতেলে ক্রিম, তেল বা বাম লাগানো এড়িয়ে চলুন
এলোমেলো সব “প্রাকৃতিক” ঘরোয়া রেসিপি ব্যবহার করবেন না
মনে রাখবেন, কোনো পণ্যের ব্যাপারে সন্দেহ হলে সহজ নিয়ম -
যদি সেটা বড়দের একনের জন্য বানানো হয়, শিশুর মুখের কাছে আনবেন না।
ভালো খবর হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নবজাতক একনে প্রতিকার কী - এর উত্তর খুবই সহজ। বেশির ভাগ সময় কোনো ওষুধ, বিশেষ ক্রিম, প্রেসক্রিপশন কিছুই লাগে না।
করতে পারেন যা যা:
মুখের চারপাশে বারবার দুধ গড়ালে বা লালা লেগে থাকলে শিশুর মুখে ফুসকুড়ি আরও লালচে আর জ্বালাযুক্ত দেখাতে পারে।
এটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ।
“এক রাতেই কীভাবে শিশুর একনে দূর করব?” - এর আসলে তেমন কোনো শর্টকাট নেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে:
নিজেকে ভাবতে পারেন, আপনি কেবল শিশুর ত্বককে বাড়তি জ্বালা আর ঘষা থেকে বাঁচাচ্ছেন, বাকি কাজ শিশুর শরীর নিজেই করছে।
অনেকেরই জানতে ইচ্ছে করে, শিশুর একনে কতদিন থাকে বা “কবে পুরোপুরি যাবে”?
সাধারণভাবে যা দেখা যায়:
কিছু শিশুর আবার ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় পরিষ্কার হয়ে যায়। আবার কারও কারও হালকা দানা একটু বেশি দিন থাকতে পারে।
যতক্ষণ পর্যন্ত:
ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণত নরম যত্ন আর অপেক্ষা - এইটুকুই যথেষ্ট।
যদিও বেশির ভাগ শিশুর ত্বক সমস্যা হিসেবে এই ইনফ্যান্ট একনে একদম নিরীহ, তারপরও কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া দরকার।
বাংলাদেশে হলে নিকটস্থ শিশু বিশেষজ্ঞ, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, বা সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগে যেতে পারেন। জরুরি না হলেও প্রশ্ন থাকলে ১৬২৬৩ (সরকারি স্বাস্থ্য হটলাইন) এ ফোন করে দিকনির্দেশনাও নিতে পারেন।
যে সব পরিস্থিতিতে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করাই ভালো:
এসব ক্ষেত্রে হতে পারে:
ডাক্তার দেখে সহজেই বুঝে নিতে পারবেন এটা এখনো সাধারণ নবজাতক একনে, নাকি আলাদা কেয়ার দরকার। কোনো প্রশ্ন নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, শিশুর ত্বকের ফুসকুড়ি নিয়ে ডাক্তাররা প্রতিদিনই অসংখ্য বাবা-মায়ের প্রশ্ন শোনেন।
নতুন বাবা-মা অনেক সময় নবজাতক মিলিয়া আর একনে গুলিয়ে ফেলেন, কারণ দুটোতেই ছোট সাদা ফোঁটা দেখা যায়।
দুটোকে আলাদা করার কিছু সহজ দিকনির্দেশনা:
দুটোর ক্ষেত্রেই মিল একটাই -
দুটোই নিরীহ, তেমন কোনো শক্ত চিকিৎসা লাগে না, আর সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই সেরে যায়।
যত্নের মূল কথা একই - নরমভাবে ধোয়া, কোনো দানা চেপে না ধরা, আর একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা।
আপনি যদি বসে বসে বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে এই সব শিশুর মুখে লাল ফোটা নিয়ে মন খারাপ করেন, আপনি একা নন। প্রায় সব বাবা-মাই একবার না একবার শিশুর একনে দেখে ভয় পেয়ে যান, তারপর ডাক্তার বা নার্স থেকে শুনে স্বস্তি পান যে এটা খুবই সাধারণ।
সংক্ষেপে মনে রাখার জন্য:
শিশুর প্রথম বছর জুড়েই তার ত্বকে নানা রকম পরিবর্তন হতে থাকবে। শিশুর ত্বকে সাদা ফোটা, লাল ফুসকুড়ি - সব মিলিয়ে এটা কেবল একটা ছোট্ট পর্ব। এখন যতই চোখে বড় মনে হোক না কেন, কয়েক মাস পর পেছনে তাকিয়ে দেখবেন, এই একনেগুলো নিজেরাই চলে গেছে, আর বাচ্চা তখনও ঠিক ততটাই সুন্দর, যেমনটা সে এখন আছে।