আপনার ২ সপ্তাহ বয়সী নবজাতকের সঙ্গে কীভাবে খেলবেন - নিরাপদ, নরম ও সহজ কার্যক্রম

মায়ের সামনে তাকিয়ে থাকা ২ সপ্তাহের নবজাতক

আপনার বাচ্চার এখন ২ সপ্তাহ বয়স। মাথায় ঘুরতে পারে একটা প্রশ্ন: এত ছোট্ট শিশুর সঙ্গে সত্যি কি এখনই খেলা যায়? যায়, একদমই যায়। শুধু খেলার ধরনটা আমাদের পরিচিত খেলা থেকে অনেক আলাদা। খুব নরম, খুব শান্ত, ধীর গতির। বেশি ভাগ সময়ই থাকবে আপনার আর আপনার নবজাতকের চোখাচোখি, ছোঁয়া আর শব্দ ভাগ করে নেওয়া।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো শুধু মিষ্টি মনে হওয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ না। এগুলো আসলেই কাজে লাগে শিশুর বিকাশে, বিশেষ করে ২ সপ্তাহ বয়সী নবজাতকের ক্ষেত্রে, আর একই সঙ্গে গড়ে তোলে গভীর বন্ধন।

চলুন আগে দেখি ২ সপ্তাহে সাধারণত কী কী নতুন পরিবর্তন দেখা যায়, তারপর ধীরে ধীরে দেখে নেব ২ সপ্তাহের শিশুর জন্য কী কী সহজ, বয়স উপযোগী খেলা আর কার্যক্রম করতে পারেন।


আপনার ২ সপ্তাহ বয়সী শিশুর নতুন কী কী হচ্ছে?

প্রায় ২ সপ্তাহের মাথায় অনেক বাবা–মা কিছু ছোট কিন্তু চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন টের পান।

  • কিছুটা বেশি সময় জেগে থাকা। আপনার নবজাতক এখন মাঝে মাঝে অল্প কিছুক্ষণ জেগে থাকবে, শান্ত থাকবে, আর চারপাশ তাকিয়ে দেখবে। বেশির ভাগ সময়ই ঘুম, তবে দিনের মধ্যে ১০–২০ মিনিটের মতো কয়েকটা ছোট সময় আপনি খেয়াল করতে পারেন, যখন ওর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে।
  • চোখ দিয়ে ধীরে ধীরে অনুসরণ করা শুরু। এই বয়সে নবজাতকের চোখ এখনো ঝাপসা দেখে, কিন্তু ধীরে নড়তে থাকা কোনো বস্তু বা মুখ কখনও কখনও কয়েক সেকেন্ডের জন্য অনুসরণ করতে পারে। সবচেয়ে ভালো দূরত্ব হল আপনার মুখ থেকে বাচ্চার মুখের দূরত্বের মতো, প্রায় ২০–৩০ সেন্টিমিটার।
  • আপনার মুখ আর গলার স্বরের প্রতি বেশি আগ্রহ। আপনার শিশুর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় “খেলনা” হল আপনার মুখ। ও হয়তো একদম সিরিয়াস হয়ে আপনাকে তাকিয়ে দেখবে, যেন মন দিয়ে আপনাকে পরীক্ষা করছে।
  • মুখভঙ্গি নকল করার প্রথম চেষ্টা। কিছু নবজাতক খুব সাধারণ কিছু মুখভঙ্গি নকল করার চেষ্টা করে, যেমন জিহ্বা একটু বের করা, বা খুব হা করে মুখ খোলা। সব সময় হবে না, খুব নিখুঁতও হবে না, কিন্তু যখন মিলে যায় তখন একেবারে জাদুর মতো লাগে।

এই পরিবর্তনগুলো মানে এখন থেকেই আপনি খুব সাধারণ কিছু নবজাতকের সঙ্গে খেলাধুলা শুরু করতে পারেন - ধীরে, নরমভাবে, আর একেবারে অল্প সময় ধরে। ধরুন একবারে ২–৫ মিনিটের মতো। এই বয়সে নবজাতক খুব সহজেই অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে যায়, তাই সব সময় ওকেই “লিড” করতে দিন।

দেখবেন যদি ও হঠাৎ মুখ ফেরায়, কুঁকড়ে যায়, আঙুলগুলো ছড়িয়ে দেয়, খুব অস্থির হয় বা কাঁদতে শুরু করে, তাহলে ও আসলে বলছে, „এখন একটু বিরতি চাই।” এটা একদম স্বাভাবিক। তখনই থেমে যান, পরে আবার চেষ্টা করলেই হয়।


নবজাতকের সঙ্গে খেলাধুলা করার সাধারণ কিছু টিপস

২ সপ্তাহের শিশুর জন্য নির্দিষ্ট খেলাগুলোয় যাওয়ার আগে কিছু বেসিক কথা মনে রাখলে খেলাধুলা হবে নিরাপদ আর আনন্দদায়ক।

  • সময় ছোট রাখুন: ২–৫ মিনিট যথেষ্ট, তার বেশি চাপ হয়ে যেতে পারে।
  • শিশুর সংকেত লক্ষ করুন: শুরু করবেন তখনই, যখন ও -
    • জেগে আছে
    • শান্ত আছে
    • খুব বেশি ক্ষুধার্ত না
    • একেবারে নতুন করে অনেকটা খাইয়ে দেওয়া হয়নি (এ অবস্থায় বেশি নড়াচড়া করলে দুধ উঠে আসতে পারে)
  • নরম আলো ব্যবহার করুন: খুব উজ্জ্বল টিউবলাইট বা সরাসরি লাইট অনেক সময় নবজাতকের জন্য বেশি কড়া হয়ে যায়। জানালার পাশে নরম দিনের আলো সাধারণত সবচেয়ে আরামদায়ক।
  • এক সময়ে একটাই উদ্দীপনা: নবজাতককে স্টিমুলেট করার সময় এক সঙ্গে অনেক কিছু না। এক খেলনা, এক গান, একটাই গলার স্বর যথেষ্ট।
  • কোনো চাপ নয়: কোনো দিন বাচ্চা অনেক বেশি সজাগ থাকবে, কোনো দিন আবার সারাদিন ঘুমকাতুরে। এগুলো কখনোই পরীক্ষার মতো কিছু না, প্রতিযোগিতাও না। নতুন মায়ের জন্য কার্যক্রম বললেও, আসলে এগুলো মা–বাবা আর শিশুর সম্পর্ক গড়ার মুহূর্ত, পারফরম্যান্স দেখানোর জায়গা না।

এখন চলুন দেখে নিই ২ সপ্তাহের নবজাতকের জন্য কী কী করা যেতে পারে।


১. স্লো ট্র্যাকিং গেম: নবজাতকের চোখের ট্র্যাকিং গড়ে তোলার নরম খেলা

এটা নবজাতকের জন্য সবচেয়ে নরম আর মজার গেমগুলোর একটা। এখানে আপনি নিজের চোখেই দেখতে পাবেন, আপনার শিশু কীভাবে মন দিয়ে তাকানোর আর অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। অনেকেই একে বলেন স্লো ট্র্যাকিং গেম নবজাতক

কীভাবে খেলবেন

  1. প্রথমে একটা শান্ত, সজাগ সময় বেছে নিন। ডায়াপার বদলানোর পরে বা ছোট একটা জেগে থাকার সময় ভালো কাজ করে।
  2. শিশুকে আরাম করে চিত করে রাখুন:
    • আপনার কোলে, একটু হেলানো অবস্থায়
    • অথবা শক্ত, সমতল জায়গায় শুইয়ে, আর আপনি সামনে বা উপরে ঝুঁকে থাকুন
  3. আপনার মুখ বা একটা হাই-কনট্রাস্ট খেলনা বাচ্চার মুখ থেকে প্রায় ২০–৩০ সেন্টিমিটার দূরে ধরুন।
    এটা প্রায় সেই দূরত্ব, যেটা ব্রেস্টফিডিং বা বোতল খাওয়ানোর সময় আপনার মুখ আর শিশুর মুখের মধ্যে থাকে।
  4. নাম ধরে ডাকুন, নরম গলায় কথা বলুন, যেন ও আপনার দিকে তাকায়।
  5. একবার দেখলেন সে তাকিয়ে আছে, তখন খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করুন:
    • আপনার মুখ
    • অথবা খেলনাটা
      ধীরে একপাশ থেকে আরেক পাশে, ছোট অর্ধবৃত্তের মতো।
  6. নড়াচড়া খুব ধীরগতির হবে, আর খুব বেশি দূরত্বে না। মাঝেমধ্যে একদম থেমে যান, যেন ওর চোখের সময় থাকে “ধরার”।

আপনার শিশু হয়তো:

  • একটু তাকিয়ে অনুসরণ করবে
  • এক সেকেন্ড দেখবে, তারপরই অন্য দিকে তাকাবে
  • কোনো দিন একেবারেই অনুসরণ করবে না

সবই একদম স্বাভাবিক। নবজাতকের চোখ ট্র্যাকিং তো সবে শুরু। এই মুহূর্তে লক্ষ্য কোনো আদর্শ ফলো করানো না, শুধু দুজনের শান্ত, মনোযোগী সময় কাটানো।

কী ব্যবহার করবেন

  • আপনার নিজের মুখ (সবচেয়ে ভালো)
  • বা একটা খুব সহজ, হাই-কনট্রাস্ট বস্তু:
    • সাদা–কালো কার্ড
    • গাঢ় কনট্রাস্ট আছে এমন ঝুনঝুনি
    • পরিষ্কার, বড় নকশার কোনো খেলনা, খুব জটিল ডিজাইন যেন না হয়

এই খেলা ১–২ মিনিট করলেই যথেষ্ট। দেখবেন যদি বাচ্চা বারবার মুখ ফেরায়, অস্থির হয় বা কেঁদে ফেলে, সেটাই আপনার থেমে যাওয়ার সিগনাল।


২. খাটের ওপরে মোবাইল: সহজ ভিজুয়াল স্টিমুলেশন

ক্রিব বা খাটে ঝোলানো একটা মোবাইল বা ঝুলন্ত খেলনা নবজাতকের জন্য নরম ধরনের ভিজুয়াল উদ্দীপনা দিতে পারে, যখন ও জেগে থাকে আর শান্ত থাকে। অনেক বাবা–মা প্রশ্ন করেন, ক্রিব মোবাইল ব্যবহার কবে করা যায়? ২ সপ্তাহ বয়স থেকেই অল্প অল্প করে শুরু করা যায়, যদি নিরাপত্তা মেনে চলেন।

কী ধরনের মোবাইল বেছে নেবেন

২ সপ্তাহের শিশুর জন্য খেয়াল রাখুন:

  • হাই কনট্রাস্ট: সাদা–কালো, বা খুব গাঢ় আর ফ্যাকাশে রঙের জোড়া (যেমন সাদা–কালো, হলুদ–কালো) ওদের ঝাপসা চোখে বেশি পরিষ্কার ধরা পড়ে, হালকা প্যাস্টেল রঙগুলো তুলনায় কম টানে।
  • সাধারণ আকৃতি: অতিরিক্ত ছোট ছোট ডিটেইল বা ঝুলে থাকা খুব বেশি জিনিস চোখের জন্য বিশৃঙ্খল লাগতে পারে।
  • ধীরে ঘোরা: খুব হালকা মেকানিকাল মুভমেন্ট, বা যেটা পাখা বা জানালা দিয়ে আসা হাওয়ায় একটু নড়ে - এ ধরনের গতি সবচেয়ে ভালো।

কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করবেন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা আগে: মোবাইল রাখবেন শুধু জেগে থাকার সময়, আপনার নজরদারিতে, কখনই ঘুমের সময় না

  • বাচ্চাকে খাটে বা পালঙ্কে চিত করে শুইয়ে দিন, যখন ও শান্ত আর জেগে আছে।
  • মোবাইলটা আলতোভাবে ঘুরিয়ে দিন বা সুইচ অন করুন যেন খুব ধীরে ধীরে ঘোরে।
  • আপনি কাছেই থাকুন, চাইলে নরম গলায় কথা বলুন বা গুনগুন করে গান ধরুন।
  • আপনার শিশুর প্রতিক্রিয়া দেখুন:
    • স্থির হয়ে চুপচাপ তাকিয়ে আছে?
    • বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বা অস্থির হচ্ছে?
    • হাত–পা হঠাৎ হঠাৎ কাঁপছে, খুব টান টান হয়ে যাচ্ছে কি?

বাচ্চা যদি বেশি বিরক্ত বা অস্বস্তিতে লাগে, মোবাইল বন্ধ করে দিন বা ওর চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলুন।

এই বয়সে মোবাইলের সময় কয়েক মিনিটের বেশি না রাখাই ভালো। ঘুমের সময় খাটের চারপাশটা যতটা সম্ভব নিরিবিলি আর অন্ধকার রাখুন, কোনো নড়া–চড়া করা খেলনা সাধারণত রাখা হয় না।


৩. সঙ্গীত আর শব্দ: নবজাতকের জন্য সহজ অডিও গেম

আপনার বাচ্চা আসলে মায়ের গলার স্বর আর ঘরের নিত্যদিনের শব্দ গর্ভাবস্থার বেশ কিছু মাস ধরেই শুনে এসেছে। এখন, ২ সপ্তাহ বয়সে, সেগুলোকে ব্যবহার করে হালকা ধরনের খেলা করা যায়।

নবজাতকের জন্য কেমন সঙ্গীত ভালো?

আলাদা দামী কিছু লাগবে না। যা নরম আর আপনাকেও শান্ত রাখে, তাই সেরা:

  • আস্তে গাওয়া লোরি বা ঘুমপাড়ানি গান
  • শান্ত, অ্যাকুস্টিক সঙ্গীত
  • মোলায়েম ধরণের ক্লাসিক্যাল টুকরো
  • নরম হোয়াইট নoise, বৃষ্টি, সাগরের ঢেউ, পাতা ঝরঝর করার মতো প্রাকৃতিক শব্দ

ভলিউম এমন রাখুন, যাতে আপনি স্বাভাবিক গলায় কথা বললেই শোনা যায়। যদি কথা বলতে গেলে গলা উঁচু করতে হয়, বুঝবেন শব্দটা বাচ্চার জন্যও বেশি জোরে।

সহজ শব্দের কার্যক্রম

কিছু ছোট ছোট নবজাতকের খেলাধুলার আইডিয়া:

  • আপনার গাওয়া গান। গলা ভালো কি খারাপ, একেবারেই গুরুত্ব নেই। আপনার শিশুর কাছে আপনার গলার স্বরই সবচেয়ে প্রিয়। সম্ভব হলে একই ঘুমপাড়ানি গান বারবার গাইবেন - শিশুরা পরিচিত সুর পছন্দ করে, এতে ওদের নিরাপদ লাগে।
  • নরম ঝুনঝুনি খেলা। খুব সoft ঝুনঝুনি নিন:
    • বাচ্চার মুখ থেকে প্রায় ২০–৩০ সেন্টিমিটার দূরে ধরে রাখুন
    • খুব আস্তে, এক–দু বার নেড়ে হালকা শব্দ করুন
    • তারপর থেমে দেখুন কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি না (চোখের পলক ফেলা, হালকা চমকে উঠা, মাথা একটু ঘোরানো)
  • ঘরের ভেতর ‘শব্দ ভ্রমণ’। শিশুকে বুকের কাছে নিয়ে নিরাপদে ধরে ঘরের ভেতর হাঁটুন, আর চারপাশের শব্দ নিয়ে গল্প করুন:
    • „এটা হচ্ছে কেতলি ফুটছে।”
    • „শুনলে, বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে।”
    • „এটা আবার পাশের বাসার বাচ্চার হাসি।”

এখানে কোনো কিছু শেখানোর চাপ নেই। শুধু শব্দের সঙ্গে পরিচয় আর সেই শব্দের পেছনে থাকছে আপনার নিরাপদ উপস্থিতি।

সব সময় শিশুর দিকে তাকিয়ে থাকুন। যদি বারবার চমকে ওঠে, মুখ বিকৃত করে বা খুব অস্থির হয়, শব্দ কমিয়ে দিন বা একেবারে বন্ধ করুন।


৪. বেবি ম্যাসাজ: ছোঁয়ার মাধ্যমে আরাম

শিশু যত্নের অংশ হিসেবে বেবি ম্যাসাজ অনেক মা–বাবা ব্যবহার করেন, বিশেষ করে যখন বাচ্চা গ্যাসের জন্য অস্থির থাকে বা ঘুম আসতে চায় না। ২ সপ্তাহ বয়সে ম্যাসাজ অবশ্যই খুব ছোট সময়ের জন্য আর খুব নরমভাবে করবেন, বেশি হলে ৫ মিনিটের মতো।

কখন বেবি ম্যাসাজ করতে ভাল

ভালো সময়গুলো হতে পারে:

  • গরম পানিতে গোসলের পর, যখন বাচ্চা শান্ত আর শরীর গরম আছে
  • ডায়াপার বদলানোর পর
  • ঘর যখন যথেষ্ট গরম, হাওয়া লাগছে না, ড্রাফ্ট নেই

যেসব সময় ভালো না:

  • যখন শিশুর খুব পেট খালি, খুব ক্ষুধার্ত
  • একেবারে বড় ফিড দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
  • যখন ও খুব কান্নাকাটি করছে বা অনেক বেশি ক্লান্ত

কিছু সহজ ম্যাসাজ স্ট্রোক

সব সময় খুব নরম চাপ আর ধীরে চলা হাত ব্যবহার করবেন। যদি তেল ব্যবহার করতে চান, নবজাতকের উপযোগী (যেমন খাঁটি নারকেল তেল বা সরিষা–তেল নয়, বরং শিশুর ত্বকের জন্য পরীক্ষিত বেবি অয়েল) বেছে নিন আর আগে সামান্য জায়গায় ব্যবহার করে দেখে নিন অ্যালার্জি হয় কি না।

১. গ্যাসের জন্য টামি ম্যাসাজ

  • শিশুকে চিত করে শুইয়ে নিন।
  • দুই হাত একসঙ্গে ঘষে একটু গরম করে নিন।
  • ২–৩টা আঙুল দিয়ে বাচ্চার নাভির চারপাশে খুব হালকা করে গোল গোল ঘুরিয়ে ম্যাসাজ করুন, ঘড়ির কাঁটার দিকে
  • খুব আস্তে, ছোট পরিসরে গোল টানুন, যেন মসৃণ হয়ে চলে।

ঘড়ির কাঁটার দিকেই আমাদের অন্ত্রের গতিপথ, তাই এই দিকের টামি ম্যাসাজ অনেক সময় আটকানো গ্যাস বের হতে সাহায্য করতে পারে।

২. হাত–পায়ে লম্বা স্ট্রোক

  • এক হাতে বাচ্চার উপরের বাহু ধরে রাখুন, অন্য হাত দিয়ে কাঁধ থেকে কবজি পর্যন্ত আস্তে আস্তে নামুন।
  • বারবার করুন, যেন ধীরে ধীরে হাতদুটোকে „দুধের মতো নামিয়ে” দিচ্ছেন।
  • একইভাবে পা–তে করুন, গোড়া জাঙ্গা থেকে শুরু করে পায়ের গোঁড়া পর্যন্ত।

দেখবেন যদি বাচ্চা কুঁকড়ে যায়, শরীর শক্ত করে ফেলে বা কেঁদে ওঠে, একটু থেমে নরম গলায় কথা বলুন। কোনো কোনো দিন ও হাতের ম্যাসাজ পছন্দ করবে, পেটেরটা ভালো লাগবে না, আবার কোনো দিন উল্টোটা। সব সময় ওর ইঙ্গিত ফলো করুন।

প্রায় ৫ মিনিটের মাথায় বা তার আগেই, যদি মনে হয় বাচ্চা বিরক্ত হচ্ছে, ম্যাসাজ থামিয়ে দিন।


৫. নকল করার খেলা: প্রথম ছোট্ট „কথা বলা”

২ সপ্তাহের শিশুর সঙ্গে খেলা বলতেই অনেকেই অবাক হন, যখন দেখেন নবজাতক নাকি মুখভঙ্গি নকলও করতে পারে! সত্যি কথা হল, মানুষ জন্মগতভাবেই মুখের দিকে তাকিয়ে শেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসে, তাই অনেক সময় খুব সোজা কিছু মুখভঙ্গি কয়েক সেকেন্ডের জন্য কপি করতে পারে।

কীভাবে খেলবেন

  1. প্রথমে এমন সময় বেছে নিন, যখন ও শান্ত আর আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে।
  2. শিশুকে এমনভাবে কোলে নিন, যাতে আপনার মুখ ওর মুখ থেকে প্রায় ২০–৩০ সেন্টিমিটার দূরে থাকে।
  3. একটা সোজা মুভমেন্ট বেছে নিন:
    • খুব ধীরে মুখ বড় করে হা করে খুলে কিছুক্ষণ ধরে রাখুন
    • অথবা জিহ্বা সামান্য বের করে স্থির হয়ে থাকুন
  4. কয়েক সেকেন্ড আপনি একদম স্থির থাকুন, যেন ওর মস্তিষ্ক ছবিটা ঠিক মতো ধরতে পারে।
  5. দেখুন ও কী করে:
    • ছোট্ট জিহ্বা একটু বের হয় কি না
    • মুখটা হা করে খোলে কি না
    • ভ্রু ওঠানো বা অন্য কোনো ছোট্ট নড়াচড়া হয় কি না

প্রতি বার এমন হবে না, কোনো কোনো সময় কাকতালীয়ও হতে পারে। তাতে কিছু যায় আসে না। আসল মজা হচ্ছে এই খেলা নিজেই - আপনি কিছু করছেন, আর অপেক্ষা করছেন, আপনার ২ সপ্তাহের শিশুর „উত্তর” পাবেন কি না। একরকম ছোট্ট মুখের „আড্ডা” শুরু হল যেন।

গলায় নরম সুর রাখুন, বলতে পারেন,
„এইভাবে করতে পারো?”
„তুমি আমাকে খুব মন দিয়ে দেখছো, তাই না?”

ও যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, চোখ বুঁজে ফেলে বা ক্লান্ত লাগে, সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান। ১–২ মিনিট এমন নকল–নকল খেলা করলেই এই বয়সে দারুণ বন্ডিং হয়ে যায়।


৬. জোরে পড়ে শোনানো: শুরু করার জন্য এখনই ভালো সময়

আপনি যদি বই পড়তে ভালোবাসেন, তাহলে শিশুর জন্মের প্রথম দিক থেকেই এটা কাজে লাগাতে পারেন। ২ সপ্তাহের নবজাতক কোনো গল্পের মানে বুঝবে না, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ওর ভালো লাগে যে জিনিসগুলো:

  • আপনার গলার স্বর
  • আপনার বাক্যের তালের ওঠা–নামা
  • বুকের কাছে গা লাগিয়ে থাকার আরাম

কী পড়বেন

যে জিনিস আপনি পছন্দ করেন আর শান্ত গলায় পড়তে পারেন:

  • ছোটদের ছড়ার বই
  • সাদামাটা ছবি–সহ বই
  • আপনার পছন্দের কোনো কবিতা
  • এমনকি আপনার নিজের বই বা ম্যাগাজিনের একটা পাতা, যতক্ষণ আপনার টোন নরম আর আরামদায়ক থাকে

কীভাবে করবেন

  • শিশুকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরুন, বা কনুইয়ের গর্তে শুইয়ে রাখুন।
  • খেয়াল রাখুন যেন মাথা ও ঘাড় ভালোভাবে সাপোর্ট পায়।
  • ধীরে, নরম গলায় পড়ুন, মাঝে মাঝে একটু বিরতি দিন।
  • ও যদি কেঁদে ফেলে বা অস্থির হয়, সঙ্গে সঙ্গেই পড়া থামিয়ে তাকে আগে সামলে নিন।

এই বয়সে কোনো বিশেষ „শিক্ষামূলক” বইয়ের দরকার নেই। শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় শেখা হচ্ছে আপনার শান্ত গলার স্বর, গায়ের গন্ধ আর জড়িয়ে থাকা - এগুলোই সবচেয়ে সান্ত্বনাদায়ক শিশু যত্ন কার্যক্রমের মধ্যে একটা।


২ সপ্তাহ বয়সী নবজাতকের টামি টাইম কেমন হবে?

টামি টাইম শব্দটা এখন প্রায় সব নতুন মা–বাবাই শোনেন। পেডিয়াট্রিশিয়ান, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সচেতনতামূলক লেখা, এমনকি ডব্লিউএইচও–র গাইডলাইনেও পেটের ওপর অল্প সময় শোয়ানো নিয়ে পরামর্শ থাকে। ২ সপ্তাহ বয়সে টামি টাইম খুব ছোট আর খুব নরম হবে।

আপনি করতে পারেন:

  • নিজে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকুন, আর বাচ্চাকে আপনার বুকের ওপর পেটের দিকে দিয়ে শুইয়ে রাখুন। এতে ও আপনার গায়ের গন্ধ, হৃদয়ের শব্দ পায়, আর অল্প অল্প করে ঘাড় তুলতে শিখে।
  • অথবা শক্ত সমতল জায়গায় (চাদর বিছিয়ে) খুব কম সময়ের জন্য শুইয়ে রাখুন, প্রায় ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিটের মতো, সব সময় চোখ রেখে।

এতে ধীরে ধীরে ঘাড় আর ওপরের অংশের পেশি মজবুত হতে শুরু করে। যদি খুব কান্না করে বা বিরক্ত হয়, তুলে কোলে নিন, পরে আবার অন্য সময়ে ছোট্ট করে চেষ্টা করুন। সারাদিনে কয়েকটা একেবারে ছোট ছোট চেষ্টাই এখন যথেষ্ট।


শিশুকে যেন ও-ই পথ দেখায়

নবজাতকের সঙ্গে কীভাবে খেলাধুলা করবেন ভাবতে গিয়ে অনেক সময় মনে হয়, ‘আরো কিছু করা উচিত’, ‘বেশি খেলনা লাগবে’, ‘দিনভর প্ল্যান করা প্রয়োজন’। আসলে একদমই না।

২ সপ্তাহ বয়সে:

  • এক একটি সেশন ২–৫ মিনিট
  • দিনে কয়েক বার, যখন সুযোগ মেলে
  • সব সময় শিশুর মুড আর ইশারার ওপর ভিত্তি করে

এটুকুই অনেক।

কোনো দিন যদি মনে হয় বাচ্চা সারাদিন শুধু ঘুমাচ্ছে, মাঝেমধ্যে কোলে নিয়ে ঘুমাচ্ছে, আপনি কিছুই করতে পারছেন না - তবুও সেটাই অসাধারণ নবজাতকের সঙ্গে খেলাধুলা। আপনার গায়ের উষ্ণতা, গন্ধ, স্পর্শ আর গলার স্বর - এটাই ওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ „খেলনা” আর নিরাপত্তার জায়গা।

নিজেকে খুব চাপ না দিয়ে, বরং যেগুলো আপনার কাছে স্বাভাবিক আর সহজ মনে হয়, সেগুলো বেছে নিন:

  • মুখ বা খেলনা দিয়ে স্লো ট্র্যাকিং গেম নবজাতক
  • জেগে থাকা ছোট্ট সময়ের জন্য ক্রিব মোবাইল ব্যবহার কবে করবেন সেটা বুঝে নিয়ে কয়েক মিনিট মোবাইলের নিচে শোয়ানো
  • নরম শিশুর জন্য সঙ্গীত ও শব্দ দিয়ে শান্ত সময় কাটানো
  • গোসল বা ডায়াপার বদলের পর অল্প সময়ের বেবি ম্যাসাজ
  • ছোট্ট নকল করার খেলা বা মুখভঙ্গির „কথোপকথন”
  • নিজের বা বাচ্চার বই থেকে দু–এক পাতা জোরে পড়ে শোনানো

এগুলো করতে করতে সব সময় খেয়াল রাখুন, বাচ্চা যেন যেন কোনো সময়ই অতিরিক্ত চাপ না পায়। একটু অস্থির লাগলেই সবকিছু রেখে তাকে কোলে নিন, দুধ দিন, ঘুম পাড়ান।

আপনি শুধু ওকে ব্যস্ত রাখছেন না। আপনি আস্তে আস্তে তার ভেতরে একটা বোধ গড়ে তুলছেন - „আমি নিরাপদ, আমার মানুষজন আমার পাশে আছে।” ২ সপ্তাহ বয়সী শিশুর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় শিশু যত্ন আর শিশুর বিকাশের ভিত্তি, আর এই ছোট ছোট খেলা আর সময় ভাগ করে নেওয়াই সেই ভিত্তি বানানোর সহজ উপায়।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই প্রবন্ধগুলি আপনার জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।