নবজাতক জন্ডিস: কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা ও কখন ডাক্তার দেখাবেন

নবজাতক শিশুর ত্বকে হলুদ রঙ দেখা

আপনি নতুন বাচ্চাকে ঘরে এনেছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ খেয়াল করেন, গায়ের রং কেমন যেন হলদেটে। চোখের সাদাটাও একটু হলুদ। বুকটা ধক করে ওঠে।

এটা কি স্বাভাবিক? নাকি কোনো গুরুতর সমস্যা?

প্রায় সব নতুন বাবা-মা-ই ‘নবজাতক জন্ডিস’ সম্পর্কে নাম শুনে রাখেন, কিন্তু নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে না পড়লে বিষয়টা ঠিক বোঝা যায় না। ভালো দিক হল, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নবজাতক জন্ডিস একেবারে স্বাভাবিক এবং কিছু দিনের জন্যই থাকে। তবে কিছু পরিস্থিতিতে এটা দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

এই গাইডে দুটো দিকই থাকবে - কখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, আর কখন দেরি না করে শিশুর ডাক্তার বা নিকটস্থ হাসপাতাল / ১৬২৬৩, ৩৩৩, ৯৯৯ নম্বরে ফোন করবেন।


নবজাতক জন্ডিস কী?

জন্ডিস মানে বাচ্চার ত্বক আর চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া। এর মূল কারণ রক্তে বিলিরুবিন নামের পদার্থের মাত্রা বেশি হওয়া।

বিলিরুবিন কী?
আমাদের শরীরে পুরোনো লাল রক্তকণিকা ভেঙে গেলে যে হলদেটে বর্জ্য তৈরি হয়, সেটাই বিলিরুবিন। বড়দের ক্ষেত্রে লিভার এই বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করে মল দিয়ে বের করে দেয়।

নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় আলাদা:

  • জন্মের সময় তাদের রক্তে লাল কণিকার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি
  • এই লাল কণিকা দ্রুত ভেঙে যায়
  • বাচ্চার লিভার এখনও পুরোপুরি পরিপক্ব হয় না, তাই বিলিরুবিন প্রসেস করতে সময় নেয়

ফলে যেটা হয়, রক্তে বিলিরুবিন জমা হওয়ার গতি যদি লিভারের পরিষ্কার করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়, তখন সেটা ত্বকে আর চোখে দেখা দিতে শুরু করে। এটাই নবজাতক জন্ডিস বা শিশুর জন্ডিস

যা যা দেখাতে পারে:

  • গায়ের রং হলুদ, বিশেষ করে মুখ, বুক, পরে মাঝে মাঝে হাত-পা পর্যন্ত
  • চোখের সাদা অংশে হালকা হলুদ রং
  • আঙুল দিয়ে ত্বক হালকা চেপে ছেড়ে দিলে সেই জায়গাটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য বেশি হলুদ দেখায়

এই হল ক্ল্যাসিক নবজাতক জন্ডিস লক্ষণ যা শিশু বিশেষজ্ঞ, গাইনী ডাক্তার বা কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা খেয়াল করেন।


নবজাতক জন্ডিস কতটা সাধারণ?

খুবই সাধারণ।

বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার তথ্য অনুযায়ী আনুমানিক:

  • সময়ে জন্মানো সুস্থ বাচ্চাদের প্রায় ৬০ শতাংশের প্রথম সপ্তাহে কিছুটা জন্ডিস হয়
  • অপরিণত (৩৭ সপ্তাহের আগে জন্মানো) বাচ্চাদের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্ডিস দেখা যায়

তাই আপনার বাচ্চার গায়ের রং যদি একটু হলুদ দেখায়, আপনি একা নন। আমাদের সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ক্লিনিক - সব জায়গাতেই প্রায় প্রতিদিনই শিশুর জন্ডিস ধরা পড়ে।

প্রশ্নটা সাধারণত হয় না, „আমার বাচ্চার জন্ডিস হয়েছে কি না?“ বরং হয়, „কেমন ধরনের জন্ডিস, আর এটা কি নিরাপদ পর্যায়ে আছে?“


ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস: যেটা সাধারণত স্বাভাবিক

সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে ধরনের জন্ডিস, তাকে বলা হয় ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস নবজাতক। নামটা বড় হলেও অর্থটা সহজ - জন্মের পর বাচ্চার নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস কখন দেখা দেয়?

সময়ে জন্মানো সুস্থ বাচ্চার ক্ষেত্রে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস সাধারণত:

  • জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে শুরু হয়, অনেক সময় ২য় বা ৩য় দিনে
  • সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়
  • তার পর ধীরে ধীরে কমে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ২ সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি সেরে যায়

অপরিণত বাচ্চাদের (প্রি-টার্ম) ক্ষেত্রে লিভার আরও অপরিপক্ব থাকে, তাই তাদের জন্ডিস কিছুটা বেশি দিন, কখনও কখনও ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।

এই সময়ের হিসাবটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডাক্তাররা জিজ্ঞেস করেন, জন্ডিস কখন থেকে শুরু হয়েছে, আর ক’দিন ধরে আছে

যদি আপনার বাচ্চা অন্য সব দিক দিয়ে ভালো থাকে, ঠিক মতো খায়, প্রস্রাব-পায়খানা ঠিক থাকে, আর জন্ডিস ২য় বা ৩য় দিন থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে কমতে থাকে, তবে সেটা সাধারণত ফিজিওলজিক্যাল বা স্বাভাবিক নবজাতক জন্ডিস।


স্তন্যপান জন্ডিস আর ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস

এখানেই বেশির ভাগ বাবা-মায়ের কনফিউশন শুরু হয়। শুনতে প্রায় একরকম, কিন্তু অর্থে একটু পার্থক্য আছে:

  • স্তন্যপান জন্ডিস (Breastfeeding jaundice)
  • ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস (Breast milk jaundice)

চলুন আলাদা করে দেখি।

স্তন্যপান জন্ডিস

এই ধরনের স্তন্যপান জন্ডিস সাধারণত জন্মের প্রথম সপ্তাহে দেখা যায়, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর পেছনে থাকে পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়া

যে সব কারণে এমন হতে পারে:

  • বাচ্চা খুব ঘুমিয়ে যায়, নিজে থেকে দুধ খেতে কম জাগে
  • বাচ্চা ঠিকমতো বুক ধরতে পারছে না, ফলে দুধ টানতে পারছে না
  • মায়ের দুধ এখনও পুরোপুরি নামেনি, শুরুতে শুধু অল্প অল্প কলোস্ট্রাম পাচ্ছে
  • খাওয়ানো খুব কম হচ্ছে, বা খুব অল্প সময়ের জন্য হচ্ছে, আবার কখনও খুব দ্রুত ফর্মুলা বা পানি দিয়ে „টোপ-আপ“ দেওয়ায় বুকের দুধ কম খাচ্ছে

যখন বাচ্চা কম দুধ পায়:

  • পায়খানা কম হয়
  • ফলে শরীর থেকে বিলিরুবিন কম বের হয়
  • বিলিরুবিন স্তর ধীরে ধীরে জমে গিয়ে জন্ডিস বেশি দেখা দেয়

এটাই ডাক্তারদের ভাষায় স্তন্যপান জন্ডিস

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এখানে দোষটা স্তন্যপানের নয়। মূল সমস্যা দুধের পরিমাণ কম হওয়া বা সঠিকভাবে না খাওয়ানো, যার ফলে বিলিরুবিন বের হতে দেরি হয়।

কি করলে উপকার হবে:

  • ঘন ঘন দুধ খাওয়ান, দিনে-রাতে মিলিয়ে অন্তত ৮ থেকে ১২ বার
  • বাচ্চা যেন গভীরভাবে বুক ধরে, আর আপনি ব্যথা না পান, এটা দেখুন
  • বাচ্চা খুব ঘুমিয়ে থাকলে প্রয়োজন হলে সময় মতো জাগিয়ে দুধ দিন
  • মা ও শিশুর ওয়ার্ডের নার্স, ল্যাকটেশন কাউন্সিলর, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে থাকা পরামর্শদাতাদের দিয়ে একবার পুরো খাওয়াটা দেখে নিতে বলুন
  • দরকার হলে ডাক্তার/নার্সের পরামর্শে কিছুদিন হাত দিয়ে বা পাম্প দিয়ে দুধ বের করে চামচ/কাপে খাওয়ানো যেতে পারে, খুব প্রয়োজন হলে অল্প সময়ের জন্য ফর্মুলা দেওয়া হতে পারে, তবে মায়ের দুধের যোগান যেন কমে না যায়, সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে

সাধারণত একবার খাওয়ানো ঠিকঠাক হলে, বাচ্চার বিলিরুবিন স্তর ধীরে ধীরে কমে এবং হলদেটে রং ফিকে হয়ে যায়।

ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস

ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস কিন্তু আলাদা বিষয়।

এর বৈশিষ্ট্য:

  • সাধারণত প্রথম সপ্তাহ পার হয়ে, ৫ থেকে ৭ দিনের দিকে বেশি স্পষ্ট হয়
  • বাচ্চা অন্য সব দিক দিয়ে একদম স্বাভাবিক - ভালো খায়, জেগে থাকে, ওজন বাড়ে
  • জন্ডিস অনেক সময় কয়েক সপ্তাহ থাকে, কখনও ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত হালকা হলদেটে ভাব দেখা যেতে পারে

মায়ের দুধে থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান অল্প কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে লিভারের বিলিরুবিন প্রসেস করার গতি একটু কমিয়ে দেয়। ফলে বিলিরুবিন স্তর কিছুটা বেশি থেকে যায়, যদিও বাচ্চা পুরোপুরি সুস্থ থাকে।

ডাক্তাররা সাধারণত ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস বলেন যখন:

  • শুরুতে স্বাভাবিক ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস ছিল, যা কিছুটা বেশি দিন ধরে চলছে
  • বাচ্চা ভালো খাচ্ছে, ওজন ঠিকমতো বাড়ছে
  • পরীক্ষা করে অন্য গুরুতর কারণ বাদ দেওয়া হয়েছে

বাংলাদেশে শিশু বিশেষজ্ঞরা সাধারণত শুধু ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস থাকার কারণে মায়ের দুধ বন্ধ করতে বলেন না। কারণ এই ধরনের জন্ডিস সাধারণত ক্ষতিকর নয়, আর দীর্ঘমেয়াদে বুকের দুধের উপকারিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য ডাক্তার প্রয়োজন মনে করলে বিলিরুবিন পরীক্ষা সহ কিছু রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন, যেন নিশ্চিত হওয়া যায় অন্য কোনো সমস্যা নেই।


নবজাতক জন্ডিস কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?

শুধু চোখে দেখে আন্দাজ করে ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নেন না।

নবজাতক জন্ডিস মূল্যায়নের জন্য কিছু ধাপ অনুসরণ করা হয়।

১. চোখে দেখে মূল্যায়ন

সবার আগে যা করা হয়:

  • প্রাকৃতিক আলো বা ভালো সাদা আলোতে বাচ্চাকে ভালো করে দেখা
  • মুখ, বুক, পেট, হাত-পায়ের ত্বকের রং লক্ষ করা
  • চোখের সাদা অংশ দেখা
  • কখনও হালকা আঙুলের চাপ দিয়ে ত্বক ছেড়ে দেখে ভেতরের অংশ কেমন হলুদ হয়

চোখে দেখে ধারণা নেওয়া হয়, কিন্তু এটা সবসময় নির্ভুল নয়, বিশেষ করে গায়ের রং গাঢ় হলে। তাই যদি জন্ডিস একটু বেশি মনে হয়, বা বাচ্চা খুব ছোট হয়, তাহলে একধরনের যন্ত্র বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

২. ট্রান্সকিউটেনিয়াস বিলিরুবিনোমিটার

অনেক হাসপাতাল বা বড় ক্লিনিকে আপনি দেখতে পারেন, ছোট একটা হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস বাচ্চার কপাল বা বুকে লাগিয়ে রাখা হচ্ছে। এটাকে বলে ট্রান্সকিউটেনিয়াস বিলিরুবিনোমিটার

এটা কীভাবে কাজ করে:

  • ত্বকের ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট তরঙ্গের আলো পাঠায়
  • ত্বক কতটা আলো শোষণ করছে সেটা মেপে
  • শিশুর বিলিরুবিন স্তর অনুমান করে

এটা দ্রুত, ব্যথাহীন, আর কোলে নিয়েই করা যায়।

যদি এই মেশিনে পাওয়া মান বেশি আসে, বা বাচ্চা খুব অল্প বয়সী / প্রি-টার্ম হয়, তাহলে সাধারণত পরের ধাপে একটি বিলিরুবিন ব্লাড টেস্ট করা হয়, যেন সঠিক মাত্রা জানা যায়।

৩. রক্ত পরীক্ষা (সিরাম বিলিরুবিন)

এই পরীক্ষায় বাচ্চার গোড়ালিতে ছোট সূচ ফুটিয়ে বা শিরা থেকে সামান্য রক্ত নেওয়া হয়। ল্যাবরেটরি সাধারণত দেখে:

  • টোটাল সিরাম বিলিরুবিন কত
  • অনেক সময় আলাদা করে সরাসরি (conjugated) আর পরোক্ষ (unconjugated) বিলিরুবিনও দেখা হয়

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে হাসপাতালগুলোতে বিলিরুবিনের ফলাফল একটা নির্দিষ্ট চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, যেখানে লেখা থাকে:

  • বাচ্চার বয়স (ঘণ্টা ধরে) অনুযায়ী কোন বিলিরুবিন স্তর গ্রহণযোগ্য
  • কোন পর্যায়ে জন্ডিসে ফটোথেরাপি দিতে হবে
  • কখন নিবিড় পর্যবেক্ষণ বা উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা প্রয়োজন

স্টাফরা অনেক সময় বলতে পারেন, „চার্টের লাইনের উপরে/নিচে আছে“ - তারা আসলে সেই গাইডলাইন অনুসারেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।


শিশুর জন্ডিস চিকিৎসা: সাধারণত কী করা হয়?

চিকিৎসা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর:

  • বিলিরুবিন স্তর কত
  • এই মাত্রা কত দ্রুত বাড়ছে
  • বাচ্চার জন্মের পর এখন কত ঘণ্টা / কত দিন হয়েছে
  • বাচ্চা সময়ে জন্মানো নাকি প্রি-টার্ম
  • অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি না

ঘন ঘন খাওয়ানো

হালকা নবজাতক জন্ডিস থাকলে সবচেয়ে আগে যেটা গুরুত্ব পায়, সেটাই সবচেয়ে সহজ শিশুর জন্ডিস চিকিৎসা:

  • বাচ্চাকে ঘন ঘন দুধ খাওয়ানো - ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮ থেকে ১২ বার
  • খাওয়ানোর সময় গিলে খাচ্ছে কি না, তৃপ্ত থাকছে কি না, খেয়াল রাখা
  • প্রথম দিকের দিনগুলোতে অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা যেন না হয়, সেটা দেখুন

ভালো খাওয়ালে পায়খানা বেশি হয়। পায়খানা বেশি মানে শরীর থেকে বিলিরুবিনও বেশি বের হয়।

আপনি যদি বুকের দুধ খাওয়ান, তাহলে সঠিক পজিশন আর ল্যাচ নিয়ে সহায়তা দেওয়া হয়। ফর্মুলা দিলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর, প্রয়োজন মতো পরিমাণে দিচ্ছেন কি না, সেটা দেখে নেবেন ডাক্তার বা নার্সরা।

ফটোথেরাপি

যদি বিলিরুবিন স্তর বেশি হয়, তখন বাচ্চাকে জন্ডিসে ফটোথেরাপি দিতে হতে পারে।

ফটোথেরাপিতে বিশেষ নীল রঙের আলো ব্যবহার করা হয়, যেটা ত্বকে জমে থাকা বিলিরুবিনকে এমন রূপে বদলে দেয়, যা শরীর দ্রুত বের করে দিতে পারে।

হাসপাতালে ফটোথেরাপি কেমন হয়:

  • বাচ্চাকে নীল আলোর নিচে রাখা হয়, কখনও বিশেষ ফটোথেরাপি বেড বা ব্ল্যাঙ্কেটের উপর
  • গায়ে সাধারণত শুধু ডায়াপার থাকে, যেন যতটা সম্ভব ত্বক আলোতে আসে
  • চোখ দুটো ছোট চশমার মতো আই-শিল্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়
  • বুকের দুধ বা ফর্মুলা আগের মতোই দেওয়া হয়, অনেক সময় আরও ঘন ঘন
  • নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্ত পরীক্ষা করে দেখা হয় বাচ্চার বিলিরুবিন স্তর নামছে কি না

সাধারণত ফটোথেরাপি নিরাপদ আর বেশ কার্যকর। অনেক বাচ্চারই ১ থেকে ২ দিন ফটোথেরাপি দিলেই কাজ হয়ে যায়।

যখন দেখা যায় বিলিরুবিন নিরাপদ স্তরের নিচে নেমে এসেছে, তখন আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কখনও কখনও কয়েক ঘণ্টা/একদিন পর আবার একবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়, কারণ সামান্য ‘রিবাউন্ড’ হয়ে মান একটু বাড়তে পারে কি না, সেটা দেখার জন্য।

খুব গুরুতর জন্ডিস

খুব কম ক্ষেত্রে, যদি বিলিরুবিন স্তর খুব বেশি হয়ে যায় বা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন নবজাতক ইনটেনসিভ কেয়ারে নিবিড় চিকিৎসা লাগতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে:

  • একসঙ্গে একাধিক লাইট দিয়ে ইনটেনসিভ ফটোথেরাপি
  • খুব বিরল ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন, যেখানে ধীরে ধীরে বাচ্চার কিছু রক্ত বের করে তার জায়গায় দাতার রক্ত দেওয়া হয়

এগুলো খুবই বিরল, বিশেষ করে এখনকার মতো সময়ে যখন বিলিরুবিন পরীক্ষা নিয়মিত করা হয় এবং জন্ডিস দ্রুত ধরা পড়ে। তবু ডাক্তারদের এত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টা দেখা লাগে, কারণ অতিরিক্ত বেশি বিলিরুবিন মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে, একে বলে kernicterus। আমাদের দেশে এখন এই জটিলতা খুব বিরল, তাড়াতাড়ি ধরা পড়া আর সঠিক চিকিৎসার কারণে।


যখন জন্ডিস স্বাভাবিক নয়: কোন লক্ষণগুলো খেয়াল রাখবেন?

বেশির ভাগ নবজাতক জন্ডিস ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু „রেড ফ্ল্যাগ“ আছে, যেগুলো থাকলে ধরে নেওয়া হয় প্যাথলজিক্যাল জন্ডিস হতে পারে, মানে শরীরের ভেতরে অন্য কোনো সমস্যা আছে।

মুখ্য সতর্ক সংকেতগুলো নিচে দেওয়া হল।

১. জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস

যদি বাচ্চা জন্মের প্রথম দিনেই চোখে পড়ার মতো হলুদ হয়ে যায়, সেটা আর স্বাভাবিক ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের মধ্যে পড়ে না।

সম্ভাব্য কারণগুলো হতে পারে:

  • মায়ের আর বাচ্চার রক্তের গ্রুপের অসঙ্গতি (যেমন Rh incompatibility, ABO incompatibility)
  • ইনফেকশন
  • দুর্লভ কিছু রক্তের রোগ

এ ধরনের জন্ডিস হলে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে দেখাতে হবে। ওয়ার্ডের ডাক্তার, নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল, বা প্রয়োজনে ৯৯৯, ১৬২৬৩, ৩৩৩ ইত্যাদি নম্বরে যোগাযোগ করতে দ্বিধা করবেন না।

২. খুব বেশি বা দ্রুত বাড়তে থাকা বিলিরুবিন স্তর

রক্ত পরীক্ষায় যদি দেখা যায় বাচ্চার বিলিরুবিন স্তর:

  • তার বয়স অনুযায়ী অনেক বেশি
  • বা কয়েক ঘণ্টা/দিনের ব্যবধানে দ্রুত উপরে উঠছে

তাহলে ডাক্তাররা তাড়াতাড়ি ফটোথেরাপি বা অন্য চিকিৎসা শুরু করেন এবং কারণ খুঁজতে থাকেন, যেমন:

  • হিমোলাইটিক ডিজিজ (বাচ্চার লাল রক্তকণিকা বেশি হারে ভেঙে যাচ্ছে)
  • জন্মের সময় মাথা বা শরীরে অনেক ফোলাভাব/ব্রুজিং হওয়া
  • G6PD ডেফিসিয়েন্সি
  • ইনফেকশন

এগুলো আপনি ঘরে বসে চোখে দেখে বুঝতে পারবেন না। তবে ডাক্তার আপনাকে বলবেন কেন দ্রুত চিকিৎসা দরকার।

৩. জন্ডিস ২ সপ্তাহের পরও থাকে

সময়ে জন্মানো বেশির ভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস:

  • ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে বেশি থাকে
  • ১০ দিনের দিকে বেশ কমে আসে
  • সাধারণত ২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়

তাই যদি নবজাতক জন্ডিস ২ সপ্তাহের পরও বেশ স্পষ্ট থাকে, বিশেষত তেমন কমার লক্ষণ না দেখা যায়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশুরোগ Outpatient-এ দেখানো জরুরি।

তারা খতিয়ে দেখবেন:

  • ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস কি না
  • ইনফেকশন আছে কি না
  • লিভার বা পিত্তনালির কোনো সমস্যা আছে কি না, যেমন biliary atresia
  • হরমোন বা মেটাবলিক সমস্যা (যেমন জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম)

প্রি-টার্ম বাচ্চার ক্ষেত্রে জন্ডিস একটু বেশি দিন থাকতে পারে, তবু যদি অনবরত থেকে যায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।

৪. গাঢ় প্রস্রাব আর খুব ফ্যাকাশে পায়খানা

এটা বাবা-মার জন্য খুব সহজে নজর করার মতো একটা বিষয়।

স্বাভাবিক নবজাতকের পায়খানা:

  • শুধু বুকের দুধ পেলে - সরষে হলুদের মতো, দানাদার, একটু পাতলা
  • ফর্মুলা নিলে - হালকা হলুদ থেকে বাদামি, তুলনামূলক ঘন

স্বাভাবিক প্রস্রাব:

  • হালকা হলুদ
  • প্রথম কয়েক দিনে কখনও কখনও অল্প „ইটের গুঁড়া“ রংয়ের দাগ (urate) দেখা যেতে পারে, সাধারণত দ্রুত চলে যায়

যে লক্ষণগুলো উদ্বেগের:

  • খুব গাঢ় প্রস্রাব, দেখতে গাঢ় হলুদ বা প্রায় চায়ের মতো
  • খুব ফ্যাকাশে, ধুসর, মাটি বা চকের মতো সাদা পায়খানা

এগুলো লিভার থেকে পিত্ত বের হওয়ার পথে সমস্যা (যেমন biliary atresia) ইত্যাদির লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ থাকলে তাড়াতাড়ি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, কারণ যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে, তত বেশি ভালোভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।

৫. বাচ্চা অস্বাভাবিক ঘুমকাতুরে বা দুধ কম খাচ্ছে

যদি জন্ডিসের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়:

  • বাচ্চা খুব ঘুমিয়ে যাচ্ছে, জাগাতে কষ্ট হচ্ছে
  • বুক বা বোতল ধরলেও আসলে ভালো করে টানছে না
  • ৪র্থ দিনের পর থেকেও ২৪ ঘণ্টায় ৬ বারের কম ভেজা ডায়াপার
  • পায়খানা স্বাভাবিকের চেয়ে কম
  • বাচ্চার শরীর আলগা, ঢিলেঢালা, „একটু অস্বাভাবিক“ মনে হচ্ছে

তাহলে দেরি না করে দ্রুত সাহায্য চাইতে হবে। গুরুতর জন্ডিস বা ইনফেকশন দুটোরই এ ধরনের লক্ষণ থাকতে পারে।


কোন অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনোটা হলে অপেক্ষা করবেন না:

  • বাচ্চা জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হলুদ দেখায়
  • হলুদ রংটা খুব দ্রুত বাড়ছে, মুখ থেকে শুরু হয়ে বুক-পেট হয়ে হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়ছে
  • বাচ্চা অস্বাভাবিক ঘুমকাতুরে, ঠিক মতো জাগছে না, দুধ খেতে চাইছে না
  • দুধ খেলেও গিলে খাচ্ছে না বা খুব কম খাচ্ছে, ডায়াপার ভেজা কমে গেছে
  • আপনি খুব গাঢ় প্রস্রাব আর খুব ফ্যাকাশে/সাদা মত পায়খানা দেখছেন
  • জ্বর, নিস্তেজ ভাব, শ্বাস নিতে কষ্ট, বা আপনার মনে হচ্ছে „কিছু একটা ঠিক নেই“

এসব হলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের শিশু বিভাগে যান, বা প্রয়োজনে জরুরি নম্বর ৯৯৯, স্বাস্থ্য নির্দেশিকা ১৬২৬৩ বা ৩৩৩-এ যোগাযোগ করুন।

যদি জন্ডিস হালকা হয়, বাচ্চা অন্যভাবে একদম ঠিক থাকে, কিন্তু ২ সপ্তাহ পেরিয়েও রং পুরোপুরি না সারে, তাহলে নিয়মিত আউটডোরে গিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান। তারা প্রয়োজন হলে বিলিরুবিন পরীক্ষা আর অন্য টেস্ট করবেন।


তাহলে, নবজাতক জন্ডিস কি স্বাভাবিক?

অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ, স্বাভাবিক

  • ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস নবজাতক সাধারণত লিভার পরিপক্ব হওয়ার আগের ছোট্ট একটা ধাপ
  • স্তন্যপান জন্ডিস বেশির ভাগ সময়েই ঠিক হয়ে যায়, একবার খাওয়ানো ঠিকভাবে শুরু হলে
  • ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস কিছুটা বেশি দিন থেকে যেতে পারে, কিন্তু বাচ্চা যদি অন্য সব দিক দিয়ে ভালো থাকে, সাধারণত এটা ক্ষতিকর নয়

স্বাভাবিক প্যাটার্নগুলো সাধারণত এমন হয়:

  • জন্মের ২৪ ঘণ্টা পর শুরু, প্রায়ই ২য় বা ৩য় দিনে
  • ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে বেশি, তারপর কমতে থাকে
  • সময়ে জন্মানো বাচ্চার ক্ষেত্রে ২ সপ্তাহের মধ্যে বেশির ভাগটাই সেরে যায়
  • বাচ্চা নিয়মিত জেগে ওঠে, ভালো খায়, ভেজা আর নোংরা ডায়াপার ঠিকমতো হয়

আবার কিছু প্যাটার্ন আছে, যেগুলো স্বাভাবিক নয়:

  • প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু
  • খুব গাঢ় হলুদ, বা খুব দ্রুত বাড়ছে
  • ২ সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, তবু একেবারেই কমছে না
  • সঙ্গে গাঢ় প্রস্রাব, ফ্যাকাশে পায়খানা, বা খুব ঘুমকাতুরে/কম খাওয়া

যদি কখনও সন্দেহ হয়, একা আন্দাজ না করে জিজ্ঞেস করুন। আলোর ভালো জায়গায় বাচ্চাকে দেখিয়ে দিন ডাক্তার/নার্সকে। ডায়াপারের রং, কতবার প্রস্রাব-পায়খানা হচ্ছে, সব বলুন। প্রয়োজন হলে বিলিরুবিন পরীক্ষা করে নেবে তারা।

আপনি অতিরিক্ত চিন্তা করছেন না, বরং যেটা একজন সচেতন বাবা-মার করার কথা, ঠিক সেটাই করছেন - বাচ্চার দিকে খেয়াল রাখা এবং প্রশ্ন করা

বেশির ভাগ বাচ্চার জন্ডিস কয়েক দিনের মধ্যেই কমে যায়, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রং ফিরে আসে। এই সময়টায় বারবার দুধ খাওয়ান, বাচ্চাকে কোলে নিন, আর হালকা হলুদ রঙে ভয় না পেয়ে তথ্যভিত্তিক থেকে সিদ্ধান্ত নিন।

যদি সত্যিই কোনো সমস্যা থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে ফল ভালো হয়। আর যদি স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই থাকে, তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারবেন।

যে দিকেই হোক, নবজাতক জন্ডিস নিয়ে আপনাকে একা লড়তে হবে না। আপনার পাশেই আছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিশু বিশেষজ্ঞ আর স্বাস্থ্যকর্মীদের দল - উদ্বেগ হলে সাহায্য চাইতে কুণ্ঠা করবেন না।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই প্রবন্ধগুলি আপনার জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।