আপনি অনেক কষ্টে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ালেন। শরীরটা একটু ঢিলে হল, হালকা শ্বাস ফেললেন। ঠিক তখনই মাথায় প্রশ্নটা ঘুরে এল: «এখন কি ওকে ঘুম থেকে তুলব খাওয়ানোর জন্য, নাকি চুপচাপ একটু শান্তি উপভোগ করব?»
এই দ্বন্দ্বটা একা আপনার না। প্রায় সব নতুন মা–বাবাই প্রথম কিছু সপ্তাহে এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন, বিশেষ করে যখন সবার পরামর্শ আলাদা আলাদা হয়।
এই গাইডে একে একে বোঝানো হয়েছে, কখন বাচ্চাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে খাওয়ানো জরুরি, কখন ওকে নির্ভয়ে ঘুমোতে দিতে পারেন, আর প্রথম দিকের সপ্তাহগুলোতে নবজাতক খাওয়ানোর সময়সূচী কেমন হওয়া ভাল।
জন্মের পর প্রথম ১–২ সপ্তাহ অনেক নবজাতকই অতিরিক্ত ঘুমকাতুরে থাকে। বিশেষ করে যদি:
এমন বাচ্চারা নিজের থেকে এত ঘন ঘন জাগে না, ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণে দুধ পায় না। সেখানে আপনাকেই একটু বাড়তি খেয়াল রাখতে হয়।
বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল, বিএসএমএমইউ, ইন্সটিটিউট অব চাইল্ড হেলথ বা শিশু বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মিলিয়ে একটাই কথা বলেন: প্রথম দিকের সপ্তাহগুলোতে নবজাতককে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮–১২ বার খাওয়ানো দরকার। মানে গড়ে প্রতি ২–৩ ঘণ্টা পর পর।
নিয়মিত নবজাতক খাওয়ানো করলে:
যদি আপনি স্তনপান করান, তাহলে ঘন ঘন নবজাতক খাওয়ানো আপনার শরীরকেও বুঝিয়ে দেয় কতটুকু দুধ তৈরি করতে হবে।
প্রথম দু–এক সপ্তাহে স্তনে দুধ তৈরি হওয়া খুব সেনসিটিভ থাকে - যত বেশি বার দুধ বের হয়, শরীর তত বেশি সিগনাল পায় বেশি দুধ বানানোর জন্য।
ফলে খুব ঘুমকাতুরে নবজাতককে জাগিয়ে খাওয়ানো অনেকভাবে সাহায্য করে:
তাই যখন আপনার মনে প্রশ্ন ওঠে, «শিশুকে জাগিয়ে খাওয়ানো উচিত কি?», তখন উত্তরটা শুধু বাচ্চার ওজনের কথা না, আপনার দুধের যোগান ঠিক রাখার কথাও।
এবার একটু নির্দিষ্ট কথায় আসি, কারণ বেশির ভাগ নতুন মা–বাবার এখানেই দ্বিধা থাকে।
প্রথম ২ সপ্তাহে সাধারণ পরামর্শ হল, আপনি যেন বাচ্চাকে:
মানে, যদি দুপুর ১টায় বাচ্চা খাওয়া শুরু করে, তাহলে বিকেল ৪টার মধ্যে আবার খাওয়ানো লক্ষ্য রাখবেন, ও যদি তখনও ঘুমিয়ে থাকে তবে বাচ্চাকে কখন জাগাবেন ভাবলেও, শেষ পর্যন্ত তুলেই খাওয়াবেন।
এই ব্যাপারটা একদম জরুরি, যদি:
এমন অবস্থায় অনেক সময় আরও ঘন ঘন বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলতে হয়। কিছু সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এসব বাচ্চার জন্য ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ২–৩ ঘণ্টা পর পর খাওয়ানোর পরামর্শ দেন, অন্তত ওজন বাড়া নিয়মমাফিক না হওয়া পর্যন্ত।
প্রায় সব বাচ্চাই জন্মের পর প্রথম ২–৩ দিনে কিছুটা ওজন কমায়। এটা স্বাভাবিক। মূল বিষয় হল, বেশির ভাগ সুস্থ নবজাতকের ক্ষেত্রে দেখা যায়:
যদি ২ সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও বাচ্চা জন্ম ওজন ফিরে না পায়, তখন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু ওয়ার্ডের ডাক্তার বা পরিবার পরিকল্পনা/ইউএইচসি–র কর্মীরা সাধারণত খুব খুঁটিয়ে দেখেন:
তাই জন্মের পর প্রথম ১০–১৪ দিন যদি আপনার মনে বারবার আসে, «নবজাতক ৩ ঘণ্টা না খেলে কি করব?», নিরাপদ গড় উত্তর হবে: দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি আর রাতে ৪ ঘণ্টার বেশি একটানা না রেখে খাওয়ানো, বেশির ভাগ সময় তার থেকেও ঘন ঘন।
যখনই বাচ্চা নিজের জন্ম ওজন ফিরে পায় আর ধারাবাহিকভাবে ওজন বাড়তে থাকে, তখন নিয়মগুলো একটু নরম হয়। বেশির ভাগ সময় এটা ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে হয়, যদিও কারও ক্ষেত্রে একটু আগে–পরে হতে পারে।
এই সময় থেকে, যদি বাচ্চা পূর্ণমেয়াদি হয় আর অন্য কোনো জটিলতা না থাকে, অনেক ক্ষেত্রে:
মানে, আপনি হয়তো এখনও দিনে বাচ্চাকে ঘুম থেকে উঠানো লাগছে, যেন দিনের ফাঁকটা বেশি বড় না হয়, কিন্তু রাতে একটু নমনীয় হতে পারবেন।
অনেক মা–বাবা এখানে এসে একটা হালকা নবজাতক খাওয়ার সময়সূচী কল্পনা করেন, যেমন:
ঘড়ি ধরে মিনিট–সেকেন্ড মেলাতে হবে না, বাচ্চা তো রোবট না। উদ্দেশ্য একটাই - দিনের বেলা দুধ, খেলা–আলাপ আর একটু আলো–আওয়াজ বেশি থাকবে, আর রাত হবে একটু শান্ত, কম আলো–কম কথা।
যদি আপনার বাচ্চা সময় হওয়ার আগে জন্ম নেয় বা জন্মের সময় ওজন খুব কম হয়, তাহলে ওর শরীরে শক্তির মজুতও কম থাকে। এমন বাচ্চারা স্তন বা বোতলে খেতে খেতে তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, ফলে পেট ভরে না।
এসব ক্ষেত্রে ডাক্তার আর নার্সরা সাধারণত পরামর্শ দেন:
এই সময় আপনি হয়তো প্রতিদিনই ভাবছেন, কত বার নবজাতককে জাগিয়ে খাওয়াব, „কখন থেকে আর তুলব না“ তার থেকে বেশি। প্রিম্যাচিউর বা কম ওজনের বাচ্চার ক্ষেত্রে এটা পুরোপুরি স্বাভাবিক, আর ও একটু শক্ত–সমর্থ হলেই কাজ অনেক সহজ লাগে।
আপনার বাচ্চার যদি এনআইসিইউ বা শিশু ওয়ার্ডের ফলো–আপ থাকে, সবসময়ই তাদের দেওয়া নির্দিষ্ট প্ল্যান অনুসরণ করুন, কারণ তারা আপনার শিশুর সব রিপোর্ট আর ইতিহাস জানেন।
অনেক সময় আপনি সব নিয়ম মেনে চলছেন, তারপরও বাচ্চা পাথরের মত ঘুমোয়। ডেকে লাভ নেই, কোলে তুলতে গেলেও ঘুমিয়েই থাকে। তখন কী করবেন?
এখন কয়েকটা নরম, ব্যবহারিক উপায় দেওয়া হল যাতে বাচ্চাকে ঘুম থেকে উঠানো কিছুটা সহজ হয়:
শুধু ডায়াপার রেখে জামা খুলে দিন
ভালভাবে মোড়া, গরম আর আরামদায়ক বাচ্চা বেশি ঘুমিয়ে থাকে। জামা–কাপড় একটু খুলে শুধু ডায়াপার রেখে দিলে সে একটু হলেও সজাগ হয়।
স্কিন–টু–স্কিন কন্ট্যাক্ট
বাচ্চাকে শুধু ডায়াপার পরিয়ে আপনাদের কারও উলঙ্গ বুকে সোজা করে শুইয়ে নিন। ত্বকের সংস্পর্শে বাচ্চার তাপমাত্রা, শ্বাস, হৃদস্পন্দন সব নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর স্তনপানের প্রাকৃতিক সিগনাল, যেমন মুখ ঘোরানো, হাত মুখে নেওয়া এগুলো দেখা যায়।
ডায়াপার পরিবর্তন
ডায়াপার বদলানোর সময়টা সাধারণত বাচ্চার গভীর ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট। খুব ঘুমকাতুরে থাকলে খাওয়ানো শুরুর আগেই একবার ডায়াপার পাল্টে নিন।
হালকা গুঁতো–গুঁতো বা গায়ে হাত বুলানো
পায়ের তলায় আলতো টোকা, পিঠে আলতো মালিশ, বা আঙুল দিয়ে নিচের দিক থেকে ঘাড়ের দিকে আস্তে টানুন। ছোট ছোট এই স্পর্শগুলো ঘুম ভাঙাতে সাহায্য করে।
হালকা ঠান্ডা ভেজা কাপড়
সামান্য ঠান্ডা, ভেজা কাপড় কপালে বা ঘাড়ের পেছনে আলতোভাবে লাগিয়ে রাখতে পারেন। বরফের মত ঠান্ডা না, শুধু হালকা ঠান্ডা হলেই বেশির ভাগ সময় যথেষ্ট হয়।
বাচ্চার সঙ্গে কথা বলা
আপনার কণ্ঠস্বর ওর কাছে খুব পরিচিত। নাম ধরে ডেকে, আস্তে আস্তে কথা বলুন, গান ধরুন। অনেক বাচ্চা স্পর্শের থেকেও কণ্ঠে বেশি সাড়া দেয়।
বাচ্চা একটু সচেতন হলেই দ্রুত স্তন বা বোতল কাছে নিয়ে আসুন, যাতে আবার ঘুমিয়ে না পড়ে, খাওয়াটা শুরু করতে পারে।
আপনি যদি রাতে স্তনপান করান, আর একই সঙ্গে ভাবছেন, „আবার আলো জ্বালি, নাকি অন্ধকারেই জাগাই?“, চেষ্টা করুন:
এতে খাওয়ানো শেষ হওয়ার পর আপনিও, বাচ্চাও দ্রুত আবার ঘুমিয়ে যেতে পারবেন।
অনেক মা–বাবা পরিষ্কার একটা „ডেডলাইন“ চান: «অমুক দিন থেকে আর রাতে বাচ্চাকে তুলতে হবে না»। বাস্তবে তা একেক বাচ্চার জন্য একেক রকম, কিন্তু কিছু পরিষ্কার সাইন আছে, যেগুলো একসঙ্গে মিললে সাধারণত বাচ্চাকে বেশি নিজের মতো চলতে দেওয়া যায়।
খেয়াল রাখুন:
ওজন নিয়মমাফিক বাড়ছে
ভিজিটে গিয়ে দেখছেন বাচ্চার ওজন শুধু „টেনে–টুনে যাচ্ছে“ না, বরং সুন্দরভাবে বাড়ছে, আর জন্ম ওজনও ফিরে পেয়েছে, সাধারণত ১০–১৪ দিনের মধ্যে।
প্রচুর ভেজা ডায়াপার
জন্মের প্রায় ৫ দিন পর থেকে দিনে অন্তত ৬ বা তার বেশি ভেজা ডায়াপার থাকলে ধরা যায় বাচ্চা মোটামুটি ঠিকঠাক দুধ পাচ্ছে। পায়খানাও নরম আর নিয়মিত হওয়া ভাল লক্ষণ।
জেগে থাকলে কিছুটা সজাগ থাকে
ঘুম থেকে উঠলে ও আশপাশে তাকাচ্ছে, হাত–পা নড়ছে, কিছুটা সময় শান্ত থাকে, খুব ঢিলেঢালা বা সব সময় কাঁদছে না।
নিজে থেকেই খাওয়ার জন্য জেগে ওঠে
মুখ ঘষতে থাকে, বুক বা বোতলের জন্য খুঁজে বেড়ায়, হাত চুষতে থাকে, বা এগুলো বুঝতে না পারলে শেষ পর্যন্ত কান্না করে - এসব স্পষ্ট খাই খাই সিগনাল।
এইগুলোর সবই যদি মোটামুটি ঠিক থাকে, আর কখনও–সখনও হঠাৎ বাচ্চা একটু বেশি সময় ঘুমিয়ে ফেললে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আপনি ওকে ঘুমোতে দিতে পারেন, আর যখন জাগবে তখনই খাওয়াবেন, আলাদা করে ঘড়ি ধরে তোলার দরকার হয় না।
তবে নজর রাখতে হবে ওজন আর ডায়াপারের উপর। ওজন বাড়া কমে গেলে বা হঠাৎ ভেজা ডায়াপার কমে এলে স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু বিশেষজ্ঞ বা পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। তখন হয়তো আবার কিছুদিনের জন্য সময় দেখে জাগিয়ে খাওয়ানো লাগতে পারে।
অনেক সুস্থ, পূর্ণমেয়াদি বাচ্চার ক্ষেত্রে, যদি ৪–৬ সপ্তাহ বয়সে ওজন ঠিকমতো বাড়ে, তখন সাধারণত আর রাতের জন্য আলাদা করে নবজাতক ঘুম থেকে জাগানো লাগে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তখন আপনি পারবেন:
দিনের বেলা কিন্তু তখনও বেশ ব্যস্ত যায়। বিশেষ করে স্তনপান করালে, ৪–৬ সপ্তাহ বয়সেও বেশির ভাগ নবজাতক ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮–১২ বার খায়। কখনও সন্ধ্যার দিকে বার বার খেতে চায়, তাকে আমরা অনেক সময় „ক্লাস্টার ফিডিং“ বলি।
রাতের ক্ষেত্রে একটু স্বস্তি আসে। অনেক মা–দের মনে প্রশ্ন থাকে, „আমি যদি রাতে বাচ্চাকে জাগিয়ে খাওয়াই, তবেই কি দুধ ঠিক থাকবে? দুধ বাড়ানোর উপায় কি এটা?“ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আলাদা করে রাতেই জাগিয়ে খাওয়ানো লাগেনা, যদি:
এতে আপনার দুধের যোগান সাধারণত ভাল থাকে।
এই বয়সে কিছু বাচ্চা এখনও রাত জুড়ে প্রতি ২–৩ ঘণ্টা পর পর জেগে খায়, এটাও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আবার কেউ কেউ একটানা ৫–৬ ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয়। দুইটাই স্বাস্থ্যকর প্যাটার্ন হতে পারে, যতক্ষণ না:
এই অংশটা চাইলে স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে পারেন, ফ্রিজে লাগিয়েও দিতে পারেন।
প্রথম ২ সপ্তাহ
বাচ্চা জন্ম ওজন ফিরে পাওয়ার পর (সাধারণত ১০–১৪ দিন)
৪–৬ সপ্তাহের পর, ওজন ঠিক থাকলে
ভবিষ্যতে যখনই আবার মনে প্রশ্ন আসবে: «বাচ্চাকে কখন খাওয়াবেন, ঘুম ভাঙাব নাকি ছেড়ে দেব?» তখন নিজের কাছে শুধু তিনটা জিনিস জিজ্ঞেস করুন:
তিনটারই উত্তর যদি „হ্যাঁ“ হয়, অনেক ক্ষেত্রেই আপনি একটু আরাম করে নবজাতক খাওয়ানোর সময়সূচীতে বাচ্চার সিগনালকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন, ঘড়িকে কম।
কোনো কিছুতে যদি „না“ হয়, বা আপনার নিজের মনে যদি অস্বস্তি থাকে - „কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না“ – তাহলে একা আন্দাজ না করে কথা বলুন। কাছের কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, শিশু বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল কল্যাণ সেন্টার, অথবা স্থানীয় নতুন মা খাওয়ানোর পরামর্শ গ্রুপ (ব্রেস্টফিডিং সাপোর্ট গ্রুপ) থেকে সাহায্য নিন, ওরা আপনার অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে নির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে পারবে।
রাত ৩টার অন্ধকারে একা বসে এসব বোঝার কথা না, সাহায্য চাওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনতার লক্ষণ না, বরং ভাল মা–বাবা হওয়ারই অংশ।