নতুন বাচ্চার ডায়াপার বদলে কোলে নিতেই হঠাৎ দেখলেন, চোখের পাতার সঙ্গে লেগে আছে হলুদ রঙের চিপচিপে একটা স্তর। মনে ধাক্কা খেলেন। এটা কি সংক্রমণ? কি গোলাপি চোখ? এখনই কি হাসপাতালে ছুটতে হবে?
একটু থামুন, গভীর শ্বাস নিন। নবজাতকের চোখে পুঁজ বা হলুদ নির্গমন প্রথম কয়েক মাসে খুবই সাধারণ। দেখতে যতটা ভয়ের লাগে, বেশিরভাগ সময় আসলে ততটা ভয়ংকর নয়। কৌশলটা হল বোঝা - কোনটা স্বাভাবিক, কোনটা বাড়িতেই সামলানো যায়, আর কখন সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখাতে হবে।
এই গাইডে থাকছে: নবজাতকের চোখে পুঁজ হওয়ার কারণ, চোখের নলির ব্লক বা ড্যাক্রিওস্টেনোসিস, নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস কেমন দেখতে হয়, ঘরে বসে ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ম্যাসাজ কিভাবে করবেন, আর কোন কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে - দক্ষিণ এশিয়ার (বাংলাদেশ/ভারত) প্রেক্ষাপটে ধরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
নবজাতকের চোখে পুঁজ বা চিপচিপে নির্গমন হওয়ার কয়েকটা সাধারণ কারণ আছে। মোটামুটি তিন ভাগে ধরতে পারেন:
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আগে মনে রাখুন: যদি চোখের সাদা অংশ লাল না হয় এবং বাচ্চা স্বাভাবিক থাকে, বেশিরভাগ সময় এটা চোখের নলির ব্লক, গুরুতর সংক্রমণ নয়।
বাচ্চার চোখ থেকে যে জল নাকের ভিতর দিয়ে নেমে যায়, সেই সরু পথটাকেই বলে ল্যাক্রিমাল ডাক্ট বা চোখের নলি। অনেক নবজাতকের ক্ষেত্রে এই নলিটা জন্মের পরপরই পুরোপুরি খোলে না, একটু সরু বা আটকে থাকে। চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলে ড্যাক্রিওস্টেনোসিস।
গবেষণায় দেখা যায়, মোটামুটি প্রতি ৫ জনে ১ জন নবজাতকের জীবনের প্রথম দিকে কোনো না কোনো সময়ে এমন ব্লক থাকে। আমাদের আশেপাশের অনেক বাবা-মা বলেন, „চোখের নলির ম্যাসাজ করে খুলে গেছে“ - আপনি এখানেই শিখবেন, চোখের নলির ম্যাসাজ কিভাবে করবেন।
নবজাতকের চোখে পুঁজ যদি চোখের নলির ব্লক থেকে হয়, সাধারণত এই লক্ষণগুলো থাকে:
অনেকেই চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করেন, „নবজাতকের চোখে পুঁজ হওয়া কি স্বাভাবিক?“
উপরের বর্ণনা যদি মিলে যায়, আর চোখের সাদা অংশ একেবারেই লাল না থাকে, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা স্বাভাবিক চোখের নলির ব্লক - মারাত্মক নবজাতকের চোখে সংক্রমণ নয়।
চোখের নলির ব্লক বা ড্যাক্রিওস্টেনোসিস সাধারণত:
খুবই কম সংখ্যক বাচ্চার ক্ষেত্রে, যদি এক বছর পার হয়ে যায় তবু না সারে, তাহলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নাক দিয়ে সরু তার বা প্রোব দিয়ে হালকা একটি প্রোবিং প্রক্রিয়া করার কথা বলতে পারেন। সেটা সাধারণত এক বছরের পরের কথা।
যদি চোখের সাদা অংশ লাল না হয় আর বাচ্চা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে নবজাতকের চোখে পুঁজ থাকলেও, বেশিরভাগ সময় ঘরে বসেই যত্ন নেওয়া যায়।
দুইটা মূল ধাপ আছে:
এই ম্যাসাজের মাধ্যমে চোখের নলির ভেতরে জমে থাকা তরল একটু চাপ পেয়ে নিচের দিকে নেমে যেতে পারে, ফলে ব্লক দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন ২ থেকে ৩ বার করতে পারেন।
হাত খুব ভালো করে ধুয়ে নিন
সাবান আর পরিষ্কার পানি দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধুয়ে নিয়ে শুকনো তোয়ালেতে মুছে নিন। নতুন জীবাণু যেন চোখে না ঢোকে, সেটা খুব জরুরি।
সঠিক জায়গাটা চিনে নিন
আঙুলের অবস্থান ঠিক করুন
আলতো কিন্তু দৃঢ় চাপ দিয়ে নিচের দিকে ম্যাসাজ করুন
নিয়মিত করুন
চাপটা ঠিকমতো হয়েছে কি না বুঝতে অসুবিধা হলে, শিশু বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা পরিবার পরিকল্পনা/মাতৃসদন হাসপাতালের নার্সকে একবার দেখিয়ে শেখে নিতে পারেন।
চোখের নলি ব্লক থাকলেও চোখ পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি। এতে উপরতলার নবজাতকের চোখে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি কমে।
ঘরে বসে নবজাতকের চোখ পরিষ্কার করার উপায়:
যা যা লাগবে আগে থেকে জোগাড় করুন
হাত ধুয়ে নিন
চোখে হাত দেওয়ার আগে আর শেষ করার পর, দুই সময়েই সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
স্যালাইনে কটন ভিজিয়ে নিন
কটন প্যাড বা তুলোর বল হালকা ভেজা থাকবে, যেন পানি চুঁইয়ে না পড়ে।
ভেতরের কোণা থেকে বাইরের দিকে মুছুন
প্রতিটা মুছার জন্য নতুন কটন নিন
শেষে শুকনো করে নিন
দিনে যতবার চোখে হলুদ চিপচিপে নির্গমন জমে থাকে, বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পর, ততবারই এই পদ্ধতিতে পরিষ্কার করতে পারেন।
সব নবজাতকের চোখে পুঁজ শুধুই নলির ব্লক থেকে হয় না। কখনও কখনও সেটা হয় কনজাংকটিভাইটিস থেকে, যাকে অনেকে পরিচিত নাম „পিঙ্ক আই“ বলে।
কনজাংকটিভা হল চোখের সাদা অংশ আর চোখের পাতার ভেতরের দিকের স্বচ্ছ ঝিল্লি। এই ঝিল্লি যখন সংক্রমণ বা অন্য কোনো কারণে প্রদাহগ্রস্ত হয়, তখনই হয় কনজাংকটিভাইটিস। জন্মের প্রথম এক মাসের মধ্যে হলে তাকে বলা হয় নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস।
এটা হতে পারে:
অনেক দেশে এখন আর রুটিনভাবে সব নবজাতকের চোখে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দেয়া হয় না, তবে কোনো কোনো সরকারি হাসপাতাল বা নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকলে দেয়া হতে পারে।
ওই ড্রপের ওষুধ থেকে অল্প কিছু বাচ্চার চোখে ঝাল ভাব বা অ্যালার্জি তৈরি হয়ে:
এই ধরনের কেমিক্যাল কনজাংকটিভাইটিস সাধারণত:
বাচ্চার চোখে পুঁজ যদি ঘন, হলুদ বা সবুজ হয়ে বারবার ফিরে আসে, সঙ্গে চোখ লাল থাকে, তখন উদ্বেগের বিষয়। এটাকে অনেক সময় নবজাতকের চোখে সংক্রমণ বলে ধরা হয়।
সম্ভাব্য লক্ষণগুলো:
এর কারণ হতে পারে:
জন্মের একদম শুরুতে কম হলেও, একটু বড় বাচ্চাদের মধ্যে ভাইরাল সংক্রমণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন সর্দি-কাশি চলছে।
লক্ষণগুলো সাধারণত:
নবজাতক শিশুর চোখের সাদা অংশ যদি লাল হয়, সঙ্গে পুঁজ বা নির্গমন থাকে, তাহলে নিজে নিজে পুরনো ড্রপ বা ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার না করাই ভালো। এ বয়সে চোখ খুবই সংবেদনশীল।
ব্যাকটেরিয়াল কনজাংকটিভাইটিস হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞ সাধারণত:
ভাইরাল কনজাংকটিভাইটিস বেশিরভাগ সময় কিছুদিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবু নবজাতক হলে অনেক ডাক্তারই অন্তত একবার দেখে নিতে চান, কারণ অন্য কোনো গুরুতর সমস্যা আছে কি না সেটাও নিশ্চিত হতে হয়।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত:
বেশিরভাগ স্টিকি চোখ বা চোখে হালকা পুঁজ খুবই সাধারণ ও নিরীহ। তবে সবকিছুই যে হালকা, এমন ধরে নিলে চলবে না।
নিচের যেকোনো একটা বা একাধিক লক্ষণ দেখলে একই দিনে শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, সম্ভব না হলে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:
এই লক্ষণগুলো থাকলে সেটা শুধু সাধারণ নবজাতকের চোখে পুঁজ না, বরং আশেপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়া গুরুতর চোখের সংক্রমণ বা সেলুলাইটিস হতে পারে, যেখানে দ্রুত ইনজেকশন বা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হতে পারে।
নিজের মনের অনুভূতিটাও গুরুত্ব দিন। অনেক সময় বাবা-মা প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারেন, „এটা ভালো কিছু মনে হচ্ছে না“ - তখন দেরি করা ঠিক নয়।
চোখের নলির ব্লক হোক বা হালকা কনজাংকটিভাইটিস, দু’ক্ষেত্রেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে বড় সহায়ক।
কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলুন:
সবসময় ভেতর থেকে বাইরে মুছুন
নাকের দিকের ভেতরের কোণা থেকে কানের দিকের বাইরের কোণায়, কখনোই বাইরের দিক থেকে ভেতরের দিকে নয়।
প্রতিটি স্ট্রোকের জন্য নতুন কটন প্যাড ব্যবহার করুন
একই কটন বারবার স্যালাইনে ভিজিয়ে ব্যবহার করবেন না। একবার ব্যবহার করে ফেলেই দিন।
প্রতিটি চোখের জন্য আলাদা কটন ব্যবহার করুন
ধরুন ডান চোখে সংক্রমণ আছে, আপনি যদি একই কটন বাম চোখে ব্যবহার করেন, তাহলে সংক্রমণ সেদিকে গিয়ে বসতে পারে।
চোখ ছোঁয়ার আগে আর পরে হাত ধুয়ে নিন
বাড়িতে থাকলে সাবান-পানি, বাইরে থাকলে অ্যালকোহল বেজড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন।
ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট দিলে টিপ যেন চোখে না লাগে
যদি ডাক্তার নবজাতকের চোখের অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট দিয়ে থাকেন:
তোয়ালে, রুমাল, মুখ-মোছার কাপড় শেয়ার করবেন না
বাচ্চার মুখ আর চোখের জন্য আলাদা পরিষ্কার তোয়ালে রাখুন। পরিবারের অন্য কেউ সেটা ব্যবহার করবে না।
দ্রুত বোঝার জন্য একটা ছোট চেকলিস্ট ধরে রাখতে পারেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কাছের ভালো হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে দেরি করবেন না।
নবজাতকের চোখে পুঁজ বা স্টিকি নির্গমন দেখেই মাথায় হাজারটা চিন্তা চলে আসে, স্বাভাবিক। হাতের কাছে ঝটপট মনে রাখার জন্য একটু সহজ করে নিন:
চোখের সাদা অংশ একেবারে সাদা, বাচ্চা স্বাভাবিক, হলুদ চিপচিপে নির্গমন, ঘুমের পর বেশি?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা চোখের নলির ব্লক (ড্যাক্রিওস্টেনোসিস)। আপনার করণীয়:
চোখ লাল, পাতা ফুলে গেছে, প্রচুর পুঁজ?
এটা নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস বা আরও গুরুতর নবজাতকের চোখে সংক্রমণ হতে পারে। তখন:
চোখের চারপাশ খুব ফুলে লাল, বাচ্চার জ্বর, খাওয়া কম, খুব অস্থির বা খুব ঘুমিয়ে পড়ে আছে?
এটাকে ধরুন জরুরি অবস্থা।
শুরুর দিকে সত্যিই মনে হবে, „দিনের অর্ধেকটাই বুঝি শুধু চোখ আর ডায়াপার নিয়েই গেল!“
আসলে এটাই স্বাভাবিক। সঠিক পদ্ধতিতে নবজাতকের চোখ পরিষ্কার করার উপায় জানলে আর কোন লক্ষণে সতর্ক হতে হবে সেটা বুঝলে, বেশিরভাগ নবজাতকের চোখে পুঁজ ঘরে থেকেই নিরাপদে সামলানো যায়, আর জটিল কিছু শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সাহায্যও নেওয়া যায়।