নবজাতকের চোখে পুঁজ হলে কি করবেন: কারণ, ঘরোয়া চিকিৎসা ও কখন ডাক্তারের কাছে নেয়ার নির্দেশনা
নতুন বাচ্চার ডায়াপার বদলে কোলে নিতেই হঠাৎ দেখলেন, চোখের পাতার সঙ্গে লেগে আছে হলুদ রঙের চিপচিপে একটা স্তর। মনে ধাক্কা খেলেন। এটা কি সংক্রমণ? কি গোলাপি চোখ? এখনই কি হাসপাতালে ছুটতে হবে?
একটু থামুন, গভীর শ্বাস নিন। নবজাতকের চোখে পুঁজ বা হলুদ নির্গমন প্রথম কয়েক মাসে খুবই সাধারণ। দেখতে যতটা ভয়ের লাগে, বেশিরভাগ সময় আসলে ততটা ভয়ংকর নয়। কৌশলটা হল বোঝা - কোনটা স্বাভাবিক, কোনটা বাড়িতেই সামলানো যায়, আর কখন সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখাতে হবে।
এই গাইডে থাকছে: নবজাতকের চোখে পুঁজ হওয়ার কারণ, চোখের নলির ব্লক বা ড্যাক্রিওস্টেনোসিস, নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস কেমন দেখতে হয়, ঘরে বসে ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ম্যাসাজ কিভাবে করবেন, আর কোন কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে - দক্ষিণ এশিয়ার (বাংলাদেশ/ভারত) প্রেক্ষাপটে ধরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কেন নবজাতকের চোখে এমন স্টিকি নির্গমন হয়
নবজাতকের চোখে পুঁজ বা চিপচিপে নির্গমন হওয়ার কয়েকটা সাধারণ কারণ আছে। মোটামুটি তিন ভাগে ধরতে পারেন:
- চোখের নলির ব্লক (ড্যাক্রিওস্টেনোসিস) - সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
- নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস - বিভিন্ন ধরনের „পিঙ্ক আই“, মানে চোখের পাতা আর সাদা অংশের ঝিল্লির প্রদাহ।
- গভীরতর চোখের সংক্রমণ - যেখানে চোখের পাতা খুব ফুলে লাল হয়ে যায়, বাচ্চাও বেশ অস্বস্তিতে থাকে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আগে মনে রাখুন: যদি চোখের সাদা অংশ লাল না হয় এবং বাচ্চা স্বাভাবিক থাকে, বেশিরভাগ সময় এটা চোখের নলির ব্লক, গুরুতর সংক্রমণ নয়।
1. চোখের নলির ব্লক (ড্যাক্রিওস্টেনোসিস): সবচেয়ে সাধারণ কারণ
নবজাতকের চোখের নলির ব্লক কী?
বাচ্চার চোখ থেকে যে জল নাকের ভিতর দিয়ে নেমে যায়, সেই সরু পথটাকেই বলে ল্যাক্রিমাল ডাক্ট বা চোখের নলি। অনেক নবজাতকের ক্ষেত্রে এই নলিটা জন্মের পরপরই পুরোপুরি খোলে না, একটু সরু বা আটকে থাকে। চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলে ড্যাক্রিওস্টেনোসিস।
গবেষণায় দেখা যায়, মোটামুটি প্রতি ৫ জনে ১ জন নবজাতকের জীবনের প্রথম দিকে কোনো না কোনো সময়ে এমন ব্লক থাকে। আমাদের আশেপাশের অনেক বাবা-মা বলেন, „চোখের নলির ম্যাসাজ করে খুলে গেছে“ - আপনি এখানেই শিখবেন, চোখের নলির ম্যাসাজ কিভাবে করবেন।
চোখের নলির ব্লকের সাধারণ লক্ষণ
নবজাতকের চোখে পুঁজ যদি চোখের নলির ব্লক থেকে হয়, সাধারণত এই লক্ষণগুলো থাকে:
- এক চোখে হতে পারে, আবার একসঙ্গে দুটো চোখেও হতে পারে।
- হলুদ, ঘন, চিপচিপে নির্গমন বা ক্রাস্ট থাকে, যা বেশি দেখা যায়:
- ঘুম থেকে ওঠার পর,
- বিশেষ করে ভোরবেলায়।
- চোখের সাদা অংশ পরিষ্কার থাকে, লাল হয় না।
- চোখের পাতা সাধারণত খুব বেশি ফুলে যায় না, খুব রাগী বা লাল দেখায় না।
- বাচ্চা দেখতে খুশি, স্বস্তিতে থাকে, টিপলে কান্নাকাটি বাড়ে না।
- চোখের ভেতরের কোণা, নাকের দিকটা আলতো চাপে ধরলে আবারও জল বা মিউকাস বেরিয়ে আসতে পারে।
অনেকেই চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করেন, „নবজাতকের চোখে পুঁজ হওয়া কি স্বাভাবিক?“
উপরের বর্ণনা যদি মিলে যায়, আর চোখের সাদা অংশ একেবারেই লাল না থাকে, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা স্বাভাবিক চোখের নলির ব্লক - মারাত্মক নবজাতকের চোখে সংক্রমণ নয়।
কতদিন থাকে?
চোখের নলির ব্লক বা ড্যাক্রিওস্টেনোসিস সাধারণত:
- জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই ধরা পড়ে,
- বাচ্চার বৃদ্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে আসে,
- অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই নিজে নিজে ঠিক হয়ে যায়।
খুবই কম সংখ্যক বাচ্চার ক্ষেত্রে, যদি এক বছর পার হয়ে যায় তবু না সারে, তাহলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ নাক দিয়ে সরু তার বা প্রোব দিয়ে হালকা একটি প্রোবিং প্রক্রিয়া করার কথা বলতে পারেন। সেটা সাধারণত এক বছরের পরের কথা।
2. চোখের নলির ব্লক ঘরে বসে কীভাবে সামলাবেন
যদি চোখের সাদা অংশ লাল না হয় আর বাচ্চা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে নবজাতকের চোখে পুঁজ থাকলেও, বেশিরভাগ সময় ঘরে বসেই যত্ন নেওয়া যায়।
দুইটা মূল ধাপ আছে:
- ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ম্যাসাজ - যাতে ব্লক হওয়া নলি আস্তে আস্তে খুলে যায়।
- চোখ পরিষ্কার করা - যাতে পুঁজ, মিউকাস জমে থেকে সংক্রমণ না বাড়ায়।
ধাপে ধাপে: ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ম্যাসাজ বা চোখের নলির ম্যাসাজ
এই ম্যাসাজের মাধ্যমে চোখের নলির ভেতরে জমে থাকা তরল একটু চাপ পেয়ে নিচের দিকে নেমে যেতে পারে, ফলে ব্লক দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন ২ থেকে ৩ বার করতে পারেন।
-
হাত খুব ভালো করে ধুয়ে নিন
সাবান আর পরিষ্কার পানি দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধুয়ে নিয়ে শুকনো তোয়ালেতে মুছে নিন। নতুন জীবাণু যেন চোখে না ঢোকে, সেটা খুব জরুরি। -
সঠিক জায়গাটা চিনে নিন
- বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বা বিছানায় হালকা উঁচু করে আধশোয়া অবস্থায় রাখুন।
- চোখের ভেতরের কোণা, নাকের হাড়ের দিকের পাশটা ভালো করে দেখুন।
- যেখানে চোখের দুই পাতা এসে নাকের গায়ে লেগে গেছে, সেখানেই চোখের নলির থলি থাকে।
-
আঙুলের অবস্থান ঠিক করুন
- পরিষ্কার তর্জনী আঙুল ব্যবহার করুন।
- চোখের ভেতরের কোণার ঠিক পাশে, নাকের হাড়ের দিকের অংশে আঙুল রাখুন। যেনো চোখের বলের উপর না পড়ে, একটু নাকের গায়ে সরে।
- আপনি মূলত টিয়ার স্যাক বা চোখের নলির থলিটায় চাপ দিচ্ছেন, চোখের ওপর না।
-
আলতো কিন্তু দৃঢ় চাপ দিয়ে নিচের দিকে ম্যাসাজ করুন
- চাপ হবে নরম কিন্তু টের পাওয়ার মতো। এমন হবে না যে বাচ্চা ব্যথায় কেঁদে উঠবে, আবার এতটাও হালকা না যে কোনো কাজই হবে না। ভাবুন, „দৃঢ় জড়িয়ে ধরা“ ধরনের চাপ।
- আঙুলটা উপরের দিক থেকে নাকের পাশ দিয়ে সোজা নিচের দিকে নামিয়ে আনুন।
- একবারে ৫ থেকে ১০ বার এভাবে টেনে নামান।
-
নিয়মিত করুন
- দিন에 ২ থেকে ৩ বার এই ভাবে ম্যাসাজ করতে থাকুন।
- সুবিধাজনক সময়:
- গোসলের পরে,
- ডায়াপার পরিবর্তনের সময়,
- বাচ্চা খেয়ে ঘুম ঘুম বা আরামদায়ক মুডে থাকলে।
চাপটা ঠিকমতো হয়েছে কি না বুঝতে অসুবিধা হলে, শিশু বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ বা পরিবার পরিকল্পনা/মাতৃসদন হাসপাতালের নার্সকে একবার দেখিয়ে শেখে নিতে পারেন।
নবজাতকের চোখ পরিষ্কার করার উপায়
চোখের নলি ব্লক থাকলেও চোখ পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি। এতে উপরতলার নবজাতকের চোখে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি কমে।
ঘরে বসে নবজাতকের চোখ পরিষ্কার করার উপায়:
-
যা যা লাগবে আগে থেকে জোগাড় করুন
- ফার্মেসিতে পাওয়া স্টেরাইল স্যালাইন (নোনা পানি),
না পেলে ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করা সিদ্ধ নলকূপ বা ট্যাপের পানি। - কটন প্যাড বা তুলোর বল।
- পরিষ্কার মুখ-মোছার তোয়ালে।
- ফার্মেসিতে পাওয়া স্টেরাইল স্যালাইন (নোনা পানি),
-
হাত ধুয়ে নিন
চোখে হাত দেওয়ার আগে আর শেষ করার পর, দুই সময়েই সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। -
স্যালাইনে কটন ভিজিয়ে নিন
কটন প্যাড বা তুলোর বল হালকা ভেজা থাকবে, যেন পানি চুঁইয়ে না পড়ে। -
ভেতরের কোণা থেকে বাইরের দিকে মুছুন
- নাকের দিকে থাকা ভেতরের কোণা থেকে শুরু করুন।
- আস্তে করে কানের দিকের বাইরের কোণা পর্যন্ত এক টানে মুছুন।
- এভাবে একবারেই এক দিকে টেনে মুছবেন, সামনে পেছনে ঘষাঘষি করবেন না।
-
প্রতিটা মুছার জন্য নতুন কটন নিন
- এখনো নির্গমন থাকলে আরেকটা নতুন কটন প্যাড নিন।
- সর্বদা প্রতিটি চোখের জন্য আলাদা কটন ব্যবহার করুন, যাতে এক চোখে সংক্রমণ থাকলে আরেক চোখে না ছড়ায়।
-
শেষে শুকনো করে নিন
- পরিষ্কার তোয়ালের শুকনো কোণা দিয়ে খুব আলতো করে চেপে চেপে পানি শুকিয়ে নিন, ঘষবেন না।
দিনে যতবার চোখে হলুদ চিপচিপে নির্গমন জমে থাকে, বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পর, ততবারই এই পদ্ধতিতে পরিষ্কার করতে পারেন।
3. নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস: সব পুঁজই নলি ব্লক নয়
সব নবজাতকের চোখে পুঁজ শুধুই নলির ব্লক থেকে হয় না। কখনও কখনও সেটা হয় কনজাংকটিভাইটিস থেকে, যাকে অনেকে পরিচিত নাম „পিঙ্ক আই“ বলে।
কনজাংকটিভা হল চোখের সাদা অংশ আর চোখের পাতার ভেতরের দিকের স্বচ্ছ ঝিল্লি। এই ঝিল্লি যখন সংক্রমণ বা অন্য কোনো কারণে প্রদাহগ্রস্ত হয়, তখনই হয় কনজাংকটিভাইটিস। জন্মের প্রথম এক মাসের মধ্যে হলে তাকে বলা হয় নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস।
এটা হতে পারে:
- কেমিক্যাল কনজাংকটিভাইটিস - চোখে ওষুধ বা অন্য রাসায়নিকের জ্বালাপোড়া থেকে।
- ব্যাকটেরিয়াল কনজাংকটিভাইটিস - বিভিন্ন জীবাণু থেকে, যা জন্মের সময় বা পরে লাগতে পারে।
- ভাইরাল কনজাংকটিভাইটিস - সাধারণত সর্দি-কাশির ভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কেমিক্যাল বা ওষুধের কারণে কনজাংকটিভাইটিস
অনেক দেশে এখন আর রুটিনভাবে সব নবজাতকের চোখে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দেয়া হয় না, তবে কোনো কোনো সরকারি হাসপাতাল বা নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকলে দেয়া হতে পারে।
ওই ড্রপের ওষুধ থেকে অল্প কিছু বাচ্চার চোখে ঝাল ভাব বা অ্যালার্জি তৈরি হয়ে:
- চোখের সাদা অংশে হালকা লালচেভাব,
- পাতায় সামান্য ফুলে যাওয়া বা ফোলাভাব,
- হালকা জল পড়া বা পানি ঝরা দেখা যায়।
এই ধরনের কেমিক্যাল কনজাংকটিভাইটিস সাধারণত:
- জন্মের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টার ভিতরে দেখা দিতে পারে,
- ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় নিজের থেকেই কমে যায়,
- খুব ঘন পুঁজ বা ভারী সংক্রমণের মতো দেখায় না,
বাচ্চাও খুব অস্থির থাকে না।
নবজাতকের ব্যাকটেরিয়াল কনজাংকটিভাইটিস
বাচ্চার চোখে পুঁজ যদি ঘন, হলুদ বা সবুজ হয়ে বারবার ফিরে আসে, সঙ্গে চোখ লাল থাকে, তখন উদ্বেগের বিষয়। এটাকে অনেক সময় নবজাতকের চোখে সংক্রমণ বলে ধরা হয়।
সম্ভাব্য লক্ষণগুলো:
- চোখের সাদা অংশ লাল বা গোলাপি হয়ে যায়, রক্তনালিগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।
- চোখের পাতা ফুলে ওঠে, লালচে বা গরম গরম লাগে।
- অনবরত ঘন পুঁজ - হলুদ/সবুজ, মুছার কিছু পরই ফের জমে যায়।
- ঘুম থেকে উঠলে চোখ পুরোপুরি লেগে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
- বাচ্চা অস্বস্তি বোধ করে, আলোতে তাকাতে চায় না, কান্না বেশি হয়।
এর কারণ হতে পারে:
- প্রসবের সময় মায়ের জন্মনালির জীবাণু চোখে চলে আসা,
- জন্মের পরে অপরিষ্কার হাত, তোয়ালে, কাপড় বা পরিবেশ থেকেও জীবাণু ঢুকে পড়া।
ভাইরাল কনজাংকটিভাইটিস
জন্মের একদম শুরুতে কম হলেও, একটু বড় বাচ্চাদের মধ্যে ভাইরাল সংক্রমণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন সর্দি-কাশি চলছে।
লক্ষণগুলো সাধারণত:
- প্রথমে পানি পানি নির্গমন, পরে সামান্য চিপচিপে হতে পারে।
- চোখ কিছুটা লাল, জ্বালা করা বা রুক্ষ দেখাতে পারে।
- একই সঙ্গে সর্দি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি থাকে।
নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিসের চিকিৎসা
নবজাতক শিশুর চোখের সাদা অংশ যদি লাল হয়, সঙ্গে পুঁজ বা নির্গমন থাকে, তাহলে নিজে নিজে পুরনো ড্রপ বা ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার না করাই ভালো। এ বয়সে চোখ খুবই সংবেদনশীল।
ব্যাকটেরিয়াল কনজাংকটিভাইটিস হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞ সাধারণত:
- ভালো করে চোখ পরীক্ষা করবেন,
- প্রয়োজন হলে পুঁজ থেকে স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করতে পারেন,
- বয়স অনুযায়ী নিরাপদ নবজাতকের চোখের অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট দেবেন।
ভাইরাল কনজাংকটিভাইটিস বেশিরভাগ সময় কিছুদিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবু নবজাতক হলে অনেক ডাক্তারই অন্তত একবার দেখে নিতে চান, কারণ অন্য কোনো গুরুতর সমস্যা আছে কি না সেটাও নিশ্চিত হতে হয়।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত:
- আগের অংশে বলা মতো পরিষ্কার স্যালাইন দিয়ে চোখ পরিষ্কার রাখুন।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়মগুলো কড়া করে মানুন, যাতে সংক্রমণ অন্য চোখে বা বাড়ির অন্য কারও চোখে না ছড়ায়।
4. কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা দরকার
বেশিরভাগ স্টিকি চোখ বা চোখে হালকা পুঁজ খুবই সাধারণ ও নিরীহ। তবে সবকিছুই যে হালকা, এমন ধরে নিলে চলবে না।
নিচের যেকোনো একটা বা একাধিক লক্ষণ দেখলে একই দিনে শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, সম্ভব না হলে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:
- চোখের পাতা বেশি ফুলে লাল হয়ে গেছে, সাধারণ ফোলাভাবের চেয়েও বেশি মনে হচ্ছে।
- ঘন সবুজ বা গাঢ় হলুদ পুঁজ, যা মুছার অল্প পরেই আবার ভরে যাচ্ছে।
- বাচ্চা চোখ ভালো করে খুলতে পারছে না, চোখের কাছে হাত দিলে খুব কান্না করছে।
- চোখের সাদা অংশ লালচে, ঝাল ঝাল বা খুব উত্তেজিত লাগছে।
- বাচ্চা সামগ্রিকভাবে অসুস্থ মনে হচ্ছে:
- জ্বর (বাংলাদেশ/ভারতে ৩ মাসের কম বয়সী বাচ্চার জ্বর ৩৮° সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে একে চিকিৎসা জরুরি হিসেবে ধরতে হয় - দেরি না করে নিকটস্থ ভালো হাসপাতালে যান),
- খুব ঘুমিয়ে পড়ে, ডেকে তুলতেও কষ্ট হয়,
- ঠিকমতো বুকের দুধ বা খাবার নিচ্ছে না।
এই লক্ষণগুলো থাকলে সেটা শুধু সাধারণ নবজাতকের চোখে পুঁজ না, বরং আশেপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়া গুরুতর চোখের সংক্রমণ বা সেলুলাইটিস হতে পারে, যেখানে দ্রুত ইনজেকশন বা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হতে পারে।
নিজের মনের অনুভূতিটাও গুরুত্ব দিন। অনেক সময় বাবা-মা প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারেন, „এটা ভালো কিছু মনে হচ্ছে না“ - তখন দেরি করা ঠিক নয়।
5. ঘরে বসে যত্নের নিয়ম: নবজাতকের চোখ নিরাপদ রাখুন
চোখের নলির ব্লক হোক বা হালকা কনজাংকটিভাইটিস, দু’ক্ষেত্রেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে বড় সহায়ক।
কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলুন:
-
সবসময় ভেতর থেকে বাইরে মুছুন
নাকের দিকের ভেতরের কোণা থেকে কানের দিকের বাইরের কোণায়, কখনোই বাইরের দিক থেকে ভেতরের দিকে নয়। -
প্রতিটি স্ট্রোকের জন্য নতুন কটন প্যাড ব্যবহার করুন
একই কটন বারবার স্যালাইনে ভিজিয়ে ব্যবহার করবেন না। একবার ব্যবহার করে ফেলেই দিন। -
প্রতিটি চোখের জন্য আলাদা কটন ব্যবহার করুন
ধরুন ডান চোখে সংক্রমণ আছে, আপনি যদি একই কটন বাম চোখে ব্যবহার করেন, তাহলে সংক্রমণ সেদিকে গিয়ে বসতে পারে। -
চোখ ছোঁয়ার আগে আর পরে হাত ধুয়ে নিন
বাড়িতে থাকলে সাবান-পানি, বাইরে থাকলে অ্যালকোহল বেজড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন। -
ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট দিলে টিপ যেন চোখে না লাগে
যদি ডাক্তার নবজাতকের চোখের অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট দিয়ে থাকেন:- বোতল একটু চোখের উপর ধরে রাখুন, সরাসরি চোখে ঠেকাবেন না।
- নিচের পাতা আস্তে টেনে ওপরে তাকিয়ে ড্রপ ফেলে দিন।
- ভুল করে টিপ যদি চোখের পাতা বা ত্বকে লেগে যায়, পরিষ্কার টিস্যু দিয়ে মুছে ক্যাপ লাগিয়ে দিন।
-
তোয়ালে, রুমাল, মুখ-মোছার কাপড় শেয়ার করবেন না
বাচ্চার মুখ আর চোখের জন্য আলাদা পরিষ্কার তোয়ালে রাখুন। পরিবারের অন্য কেউ সেটা ব্যবহার করবে না।
6. নবজাতকের চোখে পুঁজ হলে কখন ডাক্তার দেখাবেন
দ্রুত বোঝার জন্য একটা ছোট চেকলিস্ট ধরে রাখতে পারেন।
নিচেরগুলোর যেকোনোটা হলে ১-২ দিনের মধ্যে ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান:
- চোখের সাদা অংশে সামান্য হলেও লালভাব এসেছে, শুধু চোখের পাতায় নয়।
- এক বা দুটো চোখের পাতা ফোলা, বিশেষ করে একপাশ বেশি ফুলে থাকলে।
- নিয়মিত ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ম্যাসাজ আর পরিষ্কার রাখার পরও ২ সপ্তাহে উন্নতি নেই।
- চোখের আশপাশে হাত দিলে বা আলোতে তাকালে বাচ্চা কষ্ট পাচ্ছে বা জোরে কান্না করছে।
- হলুদ বা সবুজ পুঁজ বারবার ফিরে আসছে, পরিষ্কার করেও ফের জমে যাচ্ছে।
নিচের কোনোটা থাকলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন:
- বাচ্চার জ্বর এসেছে বা সামগ্রিকভাবে খুব দুর্বল, অসুস্থ দেখাচ্ছে।
- খুব ঘন সবুজ পুঁজ, চোখ বারবার লেগে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
- চোখের পাতা খুব লাল, ফুলে, গরম, ফোলাভাব আশপাশের গাল বা কপালে ছড়িয়ে পড়ছে।
- বাচ্চা একদম চোখ খুলতেই পারছে না, ঠিকমতো চোখের বল দেখা যাচ্ছে না।
- আপনি নিজে মন থেকে অস্থির বোধ করছেন, মনে হচ্ছে সমস্যাটা সাধারণ নয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কাছের ভালো হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, শিশু বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে দেরি করবেন না।
ক্লান্ত বাবা-মায়ের জন্য সারসংক্ষেপ
নবজাতকের চোখে পুঁজ বা স্টিকি নির্গমন দেখেই মাথায় হাজারটা চিন্তা চলে আসে, স্বাভাবিক। হাতের কাছে ঝটপট মনে রাখার জন্য একটু সহজ করে নিন:
-
চোখের সাদা অংশ একেবারে সাদা, বাচ্চা স্বাভাবিক, হলুদ চিপচিপে নির্গমন, ঘুমের পর বেশি?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা চোখের নলির ব্লক (ড্যাক্রিওস্টেনোসিস)। আপনার করণীয়:- নিয়মিত ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ম্যাসাজ,
- ঠাণ্ডা স্যালাইন ও কটন প্যাড দিয়ে আলতো চোখ পরিষ্কার,
- ধৈর্য ধরে অপেক্ষা - সাধারণত ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।
-
চোখ লাল, পাতা ফুলে গেছে, প্রচুর পুঁজ?
এটা নবজাতকের কনজাংকটিভাইটিস বা আরও গুরুতর নবজাতকের চোখে সংক্রমণ হতে পারে। তখন:- দ্রুত ডাক্তার দেখানো জরুরি,
- প্রয়োজনে নবজাতকের জন্য নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট লাগতে পারে।
-
চোখের চারপাশ খুব ফুলে লাল, বাচ্চার জ্বর, খাওয়া কম, খুব অস্থির বা খুব ঘুমিয়ে পড়ে আছে?
এটাকে ধরুন জরুরি অবস্থা।- দেরি না করে নিকটস্থ ভালো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান,
- প্রয়োজনে ইনজেকশন বা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা লাগতে পারে।
শুরুর দিকে সত্যিই মনে হবে, „দিনের অর্ধেকটাই বুঝি শুধু চোখ আর ডায়াপার নিয়েই গেল!“
আসলে এটাই স্বাভাবিক। সঠিক পদ্ধতিতে নবজাতকের চোখ পরিষ্কার করার উপায় জানলে আর কোন লক্ষণে সতর্ক হতে হবে সেটা বুঝলে, বেশিরভাগ নবজাতকের চোখে পুঁজ ঘরে থেকেই নিরাপদে সামলানো যায়, আর জটিল কিছু শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সাহায্যও নেওয়া যায়।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।