প্রথম কিছু ডায়পার বদলানো মনে হতে পারে যেন কোনো রিয়েলিটি শো’র চ্যালেঞ্জ চলছে। এত ছোট ছোট পা, অদ্ভুত দেখতে নবজাতকের পায়খানা, আর একের পর এক ওয়াইপ ব্যবহার করেও মনে হয় ঠিকমতো পরিষ্কার হল তো? একবার গভীর শ্বাস নিন। এটা আপনি দিনে অনেকবারই করবেন, তাই খুব দ্রুতই কাজটা একেবারে অভ্যাসে চলে যাবে।
এই গাইডে ধাপে ধাপে থাকছে ডায়পার বদলানো কিভাবে করবেন, কত ঘন ঘন ডায়পার বদলাতে হয়, নবজাতকের মল কেমন হওয়া উচিত, আর কীভাবে শিশুর কোমল ত্বককে আরামদায়ক রাখবেন ও ডায়পার র্যাশ প্রতিরোধ ও প্রতিকার করবেন।
আলাদা আলাদা লোক আলাদা নিয়ম বলবে, তাই কনফিউশন হওয়াই স্বাভাবিক। সহজভাবে বলতে গেলে, নবজাতকের বেবি ডায়পার বদলানোর জন্য একটা সুবিধাজনক রুটিন হতে পারে এ রকম:
বাংলাদেশে অনেক বাবা-মা প্রথম কয়েক সপ্তাহে ফিডের সঙ্গে ডায়পার বদলানোকে লিঙ্ক করে নেন। মানে, বাচ্চা খায়, ডেকুর তোলে, তার পরই দ্রুত একটা ডায়পার বদলানো। এতে বারবার ডায়পার খুলে দেখা লাগে না, আবার খুব বেশি ভিজে গিয়ে ত্বক নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে না।
কিছু বাড়তি টিপস:
বিশেষ করে জীবনের প্রথম সপ্তাহে কত ঘন ঘন ডায়পার বদলাতে হয় ভাবলে, আপনি পুরো ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮–১২ বার ডায়পার বদলাবেন - এটাকে অনেক মনে হলেও, নবজাতকের জন্য এটা একেবারেই স্বাভাবিক।
সব বাবা-মার টেকনিক এক না, তবে নিচের ডায়পার বদলানোর ধাপে ধাপে নির্দেশনা সহজ, নিরাপদ আর আমাদের দেশের শিশু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের সঙ্গেও যায়।
ডায়পার খুলতে যাওয়ার আগে হাতের নাগালে রাখুন:
শিশুকে পিঠের ওপর শুইয়ে দিন নিরাপদ, সমতল জায়গায়। যদি উঁচু চেঞ্জিং টেবিল ব্যবহার করেন, এক হাত সব সময় বাচ্চার গায়ে রাখুন। ছোট বাচ্চারাও হঠাৎ করে বেশ জোরে লাফাতে বা গড়াতে পারে।
১. নোংরা ডায়পারের স্টিকার ট্যাবগুলো খুলুন।
২. দুই পায়ের গোড়ালি একসঙ্গে আলতো করে ধরে সামান্য উঁচু করুন, যেন শুধু নিতম্বটা একটু ওপরে ওঠে। খুব বেশি উঁচু করে টেনে তুলবেন না, এতে কোমর ও নিতম্বে চাপ পড়ে।
৩. যদি অনেক পায়খানা থাকে, ডায়পারের সামনের অংশ দিয়ে আস্তে করে বড় অংশটা মুছে নিয়ে, সেই অংশটা ভাঁজ করে ভেতরের দিকে গুটিয়ে দিন।
ডায়পার ধীরে ধীরে শরীরের নিচ থেকে বের করে নিন। চাইলে কিছুক্ষণের জন্য ভাঁজ করে নিতম্বের নিচে রেখে দিতে পারেন, যদি আবার সামান্য পায়খানা বা প্রস্রাব হয়ে যায়।
পরিষ্কার করা যত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ সেটা কীভাবে করছেন।
সবার জন্য কয়েকটা সাধারণ নিয়ম:
যেসব বাচ্চার ত্বক খুব সেনসিটিভ, বা একদম ছোট নবজাতক, তাদের জন্য সুগন্ধি ওয়াইপের বদলে কুসুম গরম পানি ও তুলা/গজ ব্যবহার করাই ত্বকের জন্য নরমাল থাকে।
সবকিছু চোখে পরিষ্কার লাগলে:
সম্ভব হলে রোজ একটু করে ডায়পার খুলে জলরোধী ম্যাটের ওপর ৫–১০ মিনিট শুইয়ে রাখুন, এক ধরনের ছোট্ট এয়ার টাইম। হঠাৎ প্রস্রাব বা পায়খানা আসতে পারে, তাই নিচে প্লাস্টিক ম্যাট বা পুরনো তোয়ালে রাখলেই হয়।
প্রতিবার ডায়পার বদলানো মানেই ক্রিম লাগাতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক বাবা-মা পাতলা করে ব্যারিয়ার ক্রিম লাগান যখন:
সাধারণত মটরশুঁটির দানার মতো অল্প পরিমাণেই যথেষ্ট। বেশি পুরু করে লাগালে উল্টো ত্বক ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারে না। ডায়পারের যেখানে বেশি ঘর্ষণ হয়, বিশেষ করে নিতম্ব ও কুঁচকির আশপাশে সাবধানে ছড়িয়ে দিন।
১. পরিষ্কার ডায়পারটা শিশুর নিতম্বের নিচে দিন, যেন স্টিকার ট্যাব দুটো পেছনের দিকে থাকে।
২. সামনের অংশটা পায়ের ফাঁক দিয়ে তুলে আনুন।
৩. দুই পাশের ট্যাব লাগিয়ে দিন, এমনভাবে যেন ডায়পার চেপে ধরে কিন্তু পেট বা কোমরে যেন দাগ কেটে না যায়। দুই আঙুল আরাম করে ঢুকিয়ে দেখতে পারেন, খুব টাইট হলে একটু ঢিলা করুন।
৪. একদম ছোট নবজাতকের ক্ষেত্রে ডায়পারের সামনের অংশটা নাভির কাটা দাগের নিচে ভাঁজ করে রাখুন, যেন ওটা ভিজে না যায় আর শুকনো থাকে।
অনেকেই প্রথম দিকে বোঝেন না ডায়পার বদলানো ঠিক সাইজে হচ্ছে কি না। ডায়পার খুব লিক করলে, পায়ের গোড়ায় দাগ পড়লে, বা বারবার পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেলে, অন্য সাইজ বা অন্য ব্র্যান্ড ট্রাই করে দেখতে পারেন।
নতুন বাবা-মায়ের আলাপের বড় অংশ জুড়ে থাকে নবজাতকের মল কেমন হওয়া উচিত আর সেটা কতবার হচ্ছে। রঙ, গঠন, গন্ধ - সবই প্রথম কিছুদিনে দ্রুত বদলায়, তাই প্রথম দিকে অদ্ভুত লাগতেই পারে।
জন্মের পর প্রথম দুই দিন যেটা দেখবেন, সেটা হচ্ছে মেকোনিয়াম:
এটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। গর্ভে থাকাকালীন বাচ্চা যে সব পদার্থ গিলে ফেলেছে, তার সব মেকোনিয়াম হয়ে বের হয়। পরিষ্কার করা একটু কষ্টকর লাগতে পারে, তাই কুসুম গরম পানিতে ভেজা তুলা বা গজ ব্যবহার করলে সুবিধা হয়।
প্রায় তৃতীয় দিন থেকে ধীরে ধীরে রঙ ও গঠনে পরিবর্তন আসে:
এটাই ট্রানজিশনাল স্টুল, মানে বাচ্চা এখন ঠিকঠাক দুধ হজম করতে শুরু করেছে।
প্রায় পঞ্চম দিন থেকে, বিশেষ করে মায়ের দুধ খাওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, সাধারণত দেখা যায়:
এটা ব্রেস্টফিডিং বাচ্চার জন্য একদম স্বাভাবিক নবজাতকের মল কেমন হওয়া উচিত। আর ফর্মুলা খাওয়া বাচ্চাদের পায়খানা সাধারণত:
যদি কখনো পায়খানা খুব ফ্যাকাশে সাদা, ছাইয়ের মতো ধূসর, বা বারবার একেবারে উজ্জ্বল লালচে/রক্তমিশ্রিত দেখেন, দেরি না করে নিকটস্থ শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড, বা ১৬২৬৩ (স্বাস্থ্য বাতায়ন) নম্বরে ফোন করে পরামর্শ নিন। এই রঙগুলো নবজাতকের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ধরা হয় না।
দিনে কতবার ওয়েট ডায়পার হচ্ছে, তা থেকে সহজেই আন্দাজ করা যায় বাচ্চা ঠিকমতো দুধ পাচ্ছে কি না।
তাহলে, ওয়েট ডায়পার গণনা নির্দেশিকা কেমন হতে পারে?
বাংলাদেশে ব্যবহৃত অনেক গাইডলাইনের হিসেবে, মোটামুটি এভাবে ধরতে পারেন:
যখন আমরা বলি ওয়েট ডায়পার, তখন সাধারণত এমন ডায়পার বোঝায় যেটা হাতে নিলে বেশ ঠান্ডা আর ভারী লাগে, অথবা যেসব ডিসপোজেবল ডায়পারে নীল/সবুজ ভিজে যাওয়ার ইন্ডিকেটর থাকে, সেগুলো স্পষ্টভাবে রং বদলে গেছে।
যদি একটানা দু–তিন দিন ধরে প্রত্যাশার তুলনায় কম ভেজা ডায়পার দেখেন, বা প্রস্রাবের রঙ খুব গাঢ়, গন্ধ অনেক তীব্র হয়, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, পারিবারিক ডাক্তার বা নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিকে কথা বলুন। এতে বোঝা যেতে পারে, বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে না।
দুটোই ব্যবহার করা যায়, আর চাইলে মিশিয়েও ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের দেশে অনেক পরিবার বাসায় কাপড়ের ডায়পার, বাইরে যাওয়ার সময় বা রাতে ডিসপোজেবল বেবি ডায়পার ব্যবহার করে স্বস্তি বোধ করেন।
সুবিধা:
অসুবিধা:
সুবিধা:
অসুবিধা:
আপনি যদি ঠিক বুঝে উঠতে না পারেন, সরাসরি অনেক কিছু না কিনে প্রথমে দু–তিন রকমের কাপড়ের ডায়পার ট্রাই করে দেখতে পারেন, বা পরিচিত কারও অভিজ্ঞতা শুনতে পারেন। কিছু পৌরসভা, মায়েদের সাপোর্ট গ্রুপ বা অনলাইন কমিউনিটিতে কাপড়ের ডায়পার ভাড়ায় বা এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাও থাকে, সেগুলো খোঁজ নিতে পারেন।
সব যত্ন নিয়েও মাঝে মাঝে ডায়পার র্যাশ হতেই পারে। নবজাতকের ত্বক আমাদের ত্বকের চেয়ে অনেক পাতলা, তাই সহজেই লাল হয়ে যায়। তবে কিছু সহজ অভ্যাস মানলেই ঝুঁকি অনেকটা কমে।
নিচের যে কোনো একটা লক্ষণ দেখলে শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগ, বা অভিজ্ঞ ডাক্তারকে দেখান:
অনেক সময় সাধারণ ডায়পার র্যাশ–এর ওপর ভেজার মতো পরিবেশের কারণে ফাঙ্গাল বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন চলে আসে। তখন বিশেষ ধরনের মেডিকেটেড ক্রিম কয়েকদিন ব্যবহার করলেই ভালো হয়ে যায়, তাই নিজে নিজে ওষুধ না নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
প্রথম কদিন ডায়পার টাইমকে সত্যি বলতে একটা পরীক্ষা মনে হতে পারে - এত দ্রুত বদলাতে পারছি তো, ঠিকমতো পরিষ্কার হল তো, ডায়পার ঠিকভাবে লাগল তো? কিন্তু এটা কোনো নম্বরের পরীক্ষা না। আপনি শিখছেন, আপনার বাচ্চাও আপনার ছোঁয়া আর রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।
স্টিকার উল্টো দিকে লেগে যাবে, একদিন না একদিন ডায়পার উল্টো দিক থেকে পরিয়ে দেবেন, মাঝে মাঝে ভালো করে আটকে না থাকায় জামা পর্যন্ত নোংরা হবে - এসব সবারই হয়। আসল যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ:
বাকি সব প্র্যাকটিসের সঙ্গে সঙ্গে একদম অটো হয়ে যাবে। কিছুদিন পর দেখবেন, আপনি আধা ঘুমের মধ্যে, অন্ধকার ঘরে, এক চোখে মোবাইলের আলো আর পাশে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ রেখে, খুবই সাবলীলভাবে ডায়পার বদলানো শেষ করে ফেলতে পারছেন।
ওটাই সত্যিকারের এক্সপার্ট লেভেল।