নবজাতকের সাথে প্রথম কয়েক সপ্তাহ অনেকটা টাইম ট্রাভেলের মতো লাগে। দিন রাত গুলিয়ে যায়, কখন খাওয়ালেন, কখন কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ালেন সব মিলেমিশে এক হয়ে যায়। মাঝরাতে ৩টায় মোবাইল হাতে নিয়ে গুগল করতে ইচ্ছে করে - „নবজাতকের ঘুম কেমন হওয়া উচিত“ বা „কেন নবজাতক এত বার ঘুম ভাঙে“। একটু ধীরজ নিন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেটা দেখছেন সেটাই একদম স্বাভাবিক নবজাতকের ঘুম। ধীরে ধীরে পুরোটা বুঝে নিন - কী আশা করবেন, কেন এমন হয়, আর কোমল উপায়ে কীভাবে সবাইকে একটু বেশি বিশ্রাম দিতে পারেন।
সাধারণত নবজাতকের ঘুম অনেক বেশি হয়। গড় হিসেবে বেশির ভাগ বাচ্চা দিনে মোট ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমায়। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগে, কারণ এই ঘুম কখনোই টানা হয় না। সারাদিন আর রাত জুড়েই ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে থাকে।
তাহলে একটানা কতক্ষণ ঘুমায়? প্রথম মাসে বেশির ভাগ শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, খাওয়ানোর মাঝখানে ২ থেকে ৪ ঘণ্টার ছোট ছোট ঘুম। অনেক সময় আবার এর চেয়েও কম। এই ঘুমের দৈর্ঘ্য প্রতিদিন একরকম থাকে না। কখনো হঠাৎ গ্রোথ স্পার্ট, কখনো ঘন ঘন বুক চাওয়া, কখনো গ্যাস, কখনো আবার হালকা স্লিপ সাইকেল বদল - হুট করেই সব প্যাটার্ন পাল্টে যায়। বিরক্তিকর বটে, কিন্তু স্বাভাবিক।
নবজাতক এত ঘুমায় কেন? এর মস্তিষ্ক তখন অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে উঠছে। সেই মস্তিষ্কের বিকাশের জ্বালানিই হল ঘুম। সঙ্গে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত হওয়া আর ওজন বাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নবজাতক ১৬-১৭ ঘণ্টা ঘুম করলেও তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু থাকে না, বরং এটা বেশ ভালই লক্ষণ।
বড়দের ঘুমের সাইকেল সাধারণত ৯০ মিনিটের মতো, যেখানে হালকা ও গভীর ঘুমের পালা বদল হয়। কিন্তু নবজাতকের গতি অনেক দ্রুত। নবজাতকের স্লিপ সাইকেল ৪৫-৬০ মিনিটের মতো হয়। এই ছোট চক্রই অনেক স্টার্টল, কাঁপুনি আর হুট করে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ।
নবজাতক অনেক বেশি সময় থাকে অ্যাকটিভ স্লিপ বা হালকা ঘুমের স্তরে, যা বড়দের REM স্লিপের মতো। এই সময় আপনি দেখতে পারেন:
এরপর আসে শান্ত বা কুইয়েট স্লিপ, যেখানে শিশু অনেক স্থির ও গভীর ঘুমে থাকে। যেহেতু বাচ্চা খুব দ্রুত এই দুই স্তরের মধ্যে ঘোরে, তাই বদলাতে গিয়েই ওদের আংশিক জেগে যাওয়া বা একদম উঠে পড়া খুব স্বাভাবিক। তার উপর ছোট পেট খুব তাড়াতাড়ি খালি হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এটাই হয় আমাদের পরিচিত নবজাতকের ঘুমের চক্র - টুকরো টুকরো, বারবার ভাঙা, তবে প্রায় সব শিশুরই এমনটা হয়।
অনেকেই ভাবেন, নবজাতক ঘুমাতে পারছে না কেন, বা „নবজাতক ঘুম না হলে কি সমস্যা“ হচ্ছে কি না। কয়েকটা সহজ সত্য বোঝা দরকার:
তাই „শিশু কত ঘুমায়“ বা „নবজাতক দিনে কত ঘুমায়“ হিসাব করতে গিয়ে যদি দেখেন সারারাত টানা ঘুম একেবারেই হচ্ছে না, তাহলে মনে রাখুন, এই বয়সে রাতভর না জাগে এমন নিখুঁত ঘুম আশা করাই অবাস্তব।
নবজাতক নিয়ে জন্মানোর সময় তার শরীরে ঠিকঠাক „ঘড়ি“ বসানো থাকে না। সার্কাডিয়ান রিদম, মানে দিন-রাত চেনার ক্ষমতা, ধীরে ধীরে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে তৈরি হয়। তাই নবজাতক দিন রাত পার্থক্য শেখানো প্রায় সব বাড়িতেই একটা বড় কাজ।
হালকা কিছু অভ্যেস দিয়ে আপনি ওর ঘড়িটা আস্তে আস্তে সেট করতে সাহায্য করতে পারেন:
এগুলো কিন্তু কোনো „স্লিপ ট্রেনিং“ না, বরং একধরনের নতুন মায়ের ঘুম টিপস আর নবজাতকের জন্য নরম ইঙ্গিত, যাতে শরীরটা বুঝতে শিখে কোনটা দিন, কোনটা রাত।
নবজাতকের ঘুম মোটেও শান্ত, নিঃশব্দ আর গোছানো হয় না। বেশির ভাগ নতুন মা-বাবা যেসব ব্যাপার দেখে ভয় পান, সেগুলোর অনেকটাই আসলে একদম স্বাভাবিক, বিশেষ করে অ্যাকটিভ স্লিপের সময়।
খুব সাধারণ এবং সাধারণত স্বাভাবিক কিছু আচরণ হল:
তবে কখন সতর্ক হতে হবে? যদি দেখেন শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, বুকে ভেতরে দম টেনে নিচ্ছে, নাকের পাশে ডানা ফুলে যাচ্ছে, ঠোঁট বা জিভের চারপাশে নীলচে ভাব আসছে, আর বাচ্চা স্পষ্ট কষ্ট পাচ্ছে, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের সাহায্য নিতে হবে।
বেশির ভাগ ঘুমের অদ্ভুত আচরণ ক্ষতিকর না, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে দেরি না করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নিজের মনের কথা শুনুন, সন্দেহ হলে কথা বলুন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞের সাথে বা নিকটস্থ হাসপাতালের ডাক্তারদের সাথে।
বিশেষ করে খেয়াল রাখবেন যদি:
বাংলাদেশে সাধারণ জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ - পরিস্থিতি গুরুতর মনে হলে দেরি না করে সাহায্য চান। শিশু সম্পর্কে আপনার ছোট ছোট উদ্বেগ নিয়েও সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগ, কমিউনিটি ক্লিনিক বা আপনার নিয়মিত শিশু বিশেষজ্ঞকে ফোন করতে দ্বিধা করবেন না। একটি ছোট ফোনকলও অনেক নিশ্চিন্তি দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটা অনেক সময় কেউ খোলাখুলি বলে না, সেটা হল: প্রথম কয়েক সপ্তাহে কোনো „পারফেক্ট নবজাতক স্লিপ শিডিউল“ থাকে না। এ সময় ঘুম মূলত শরীরের চাহিদা অনুযায়ী চলে, কোনো শাসন বা রুটিন দিয়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার মতো বয়স তখনো আসেনি।
কিছু বাস্তব প্রত্যাশা নিজের মাথায় রাখুন:
কঠিন কোনো নিয়মের বদলে একটা নরম ছন্দ ভাবুন। এমন কিছু সাধারণ প্যাটার্ন বানান, যেন আপনার শিশুর শরীর ধীরে ধীরে বুঝে যায়, কখন ঘুম আর কখন খাওয়ার সময়। আজ নয়, কয়েক সপ্তাহ-কাল পর থেকে তার ফল বোঝা যাবে।
অনেক দামি গ্যাজেট বা উচ্চ প্রযুক্তির বেবি মনিটরের দরকার নেই। বরং আরাম আর ধারাবাহিকতায় গুরুত্ব দিন।
কখনো কখনো দেখবেন „নবজাতক ঘুম না হলে কি“ হাজার কৌশলেই এক-দুদিন কাজ হচ্ছে না। অনেক সময় গ্রোথ স্পার্ট, সর্দি, টিকা নেওয়ার পর একটু অস্বস্তি, কিংবা অনেক অতিথি-আত্মীয় আসা-যাওয়ার কারণে এমন হয়। এক-দুদিন প্যাটার্ন এলোমেলো হলে নিজেকে দোষ দেবেন না। বেসিকগুলো করুন, আশেপাশের সাহায্য নিন, আর মনে রাখুন, কালকে আবার নতুন দিন।
নবজাতক দিনে কত ঘুমায় বা মোটে কতক্ষণ ঘুমায়?
প্রথম কয়েক সপ্তাহে সাধারণত দিনে-রাতে মিলিয়ে মোট ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুম স্বাভাবিক। কেউ কেউ একটু বেশি, কেউ কিছুটা কম ঘুমায়।
কেন নবজাতক এত বার জেগে ওঠে, ছোট ছোট ঘুমায়?
কারণ তার নবজাতকের ঘুমের চক্র খুব ছোট, সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট। সেই সঙ্গে পেট ছোট, দ্রুত খালি হয়ে যায়, আর শরীরের ভেতরের দিন-রাতের ঘড়িটা এখনও পুরো গড়ে ওঠেনি। সব মিলিয়ে ঘন ঘন জেগে ওঠা এই বয়সের নরমাল নিয়ম।
আমার বাচ্চা কবে থেকে রাতভর টানা ঘুমাবে?
বেশির ভাগ নবজাতকই প্রথম কয়েক মাসে রাতভর ঘুমায় না। ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে কেউ কেউ একটু লম্বা ঘুমের স্ট্রেচ দিতে শুরু করে, আবার কারও ক্ষেত্রে সময়টা আরও বাড়তে পারে। একেক বাচ্চার ঘুম একেক রকম, কোনো „একটাই সঠিক“ টাইমলাইন নেই।
এই বয়সে কি কোনো নির্দিষ্ট ঘুমের শিডিউল করে ফেলা উচিত?
কড়া সময় ধরে বেঁধে দেওয়া শিডিউলের দরকার নেই, আর অনেক সময় সেটা উল্টো চাপ তৈরি করে। বরং প্রতিদিন একইরকম ঘুমের সিগন্যাল, হালকা রুটিন আর জাগ্রত থাকার সময় বুঝে নেওয়াই বেশি উপকারী।
ঘুমের সময় নাক ডাকা, গোঁ গোঁ, বা হাত-পা কাঁপা কি স্বাভাবিক?
অনেক সময় হ্যাঁ। „নবজাতকের ঘুমে কাঁপুনি স্বাভাবিক“ কিনা, „শিশু ঘুমের সময় শব্দ করলে কি হয়“ - এসব প্রশ্নের উত্তর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই যে, যদি ও আরামেই থাকে, ত্বকের রঙ স্বাভাবিক থাকে, শ্বাসপ্রশ্বাস চলতে থাকে, তাহলে এগুলো সাধারণ নবজাতকের ঘুমের প্যাটার্ন এর অংশ। তবে নিজের মনে কুছকুচ করলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
নিজেকে দোষারোপ করবেন না। এই সময়টা খুব ঘন, ক্লান্তিকর আর আবেগে ভরা, কিন্তু একই সঙ্গে অল্প দিনের। রাতে ঘরটা একটু অন্ধকার রাখুন, দিনে আলো আর মানুষের উপস্থিতিতে ভরিয়ে তুলুন, চাহিদামতো দুধ দিন, আর ঢেউয়ের মতো আসা-যাওয়া করা এই সময়টাকে যতটা সম্ভব নরমভাবে গ্রহণ করুন। একদিন সকালবেলা হঠাৎ খেয়াল করবেন, ওর ঘুম বদলে গেছে - নিখুঁত না, কিন্তু আগের চেয়ে সহজ। তখন „নবজাতকের ঘুম“ গুগল সার্চের জায়গা দখল করে নেবে „প্রথম খাবার কী দেব“ বা „বাচ্চা কখন গড়াগড়ি খায়“ ধরনের নতুন প্রশ্ন। ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে সব সামনে আসবে।