জন্মের পর থেকেই শিশুর চোষার স্বাভাবিক তাগিদ থাকে। সব সময় এর মানে ক্ষুধা নয়। অনেক সময় শিশু শুধু শান্ত হতে, নিরাপত্তা অনুভব করতে বা ঘুমিয়ে পড়তে চোষে। দুধ না খেয়ে এভাবে চোষার অভ্যাসকে বলা হয় নন-নিউট্রিটিভ সাকিং।
শিশুর প্যাসিফায়ার এই চাহিদা মেটাতে পারে, যখন তার আসলে দুধের প্রয়োজন নেই। এতে ঘুম পাড়ানো, অস্থিরতা কমানো এবং কিছু ছোটখাটো চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার সময় শিশুকে শান্ত রাখতে সুবিধা হয়। আন্তর্জাতিক শিশুরোগবিষয়ক নিরাপদ-ঘুম নির্দেশিকায় স্তন্যপান ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দিনের ঘুম ও রাতের ঘুমের সময় প্যাসিফায়ার দেওয়ার কথা বলা হয়। এর সঙ্গে আকস্মিক শিশুমৃত্যু সিনড্রোম বা SIDS-এর ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে প্যাসিফায়ার SIDS প্রতিরোধের নিশ্চয়তা নয়। শিশুকে সব সময় চিৎ করে শোয়ানো, সমতল ও শক্ত বিছানা ব্যবহার করা এবং খাটে বালিশ, ভারী কাঁথা বা নরম খেলনা না রাখা - নিরাপদ ঘুমের এসব নিয়মও সমান জরুরি।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্যাসিফায়ার SIDS ঝুঁকি কমাতে পারে কি না। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময়ে প্যাসিফায়ার ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে SIDS-এর ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে।
কেন এমন হয়, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ মনে করেন, চুষনি শিশুকে খুব গভীর ঘুমে না যেতে সাহায্য করতে পারে বা শ্বাসনালির অবস্থান অনুকূলে রাখতে পারে। অভিভাবকদের জন্য ব্যবহারিক নিয়মগুলো হলো:
প্যাসিফায়ার কখনোই নিরাপদ ঘুমের বিকল্প নয়। শিশুর খাটে প্যাসিফায়ারের সঙ্গে খেলনা, কাপড়, ফিতা, দড়ি বা ক্লিপ রাখবেন না।
কিছু শিশুর চোষার তাগিদ খুব বেশি থাকে। পেট ভরে দুধ খাওয়ার পরও তারা হাত মুখে দেয়, ঠোঁট নড়ায়, খোঁজার ভঙ্গি করে বা অস্থির হয়ে পড়ে। এর অর্থ সব সময় এই নয় যে শিশুর আরও দুধ দরকার।
এ অবস্থায় শিশুকে চুষনি দেওয়া উপকারী হতে পারে। দুইবার খাওয়ানোর মাঝখানে, গাড়িতে যাতায়াতের সময়, কোলে নিয়েও শান্ত না হওয়া বিকেলের দিকে বা স্ট্রলারে বসে অস্থির হলে প্যাসিফায়ার কিছু শিশুকে আরাম দেয়। অনেকেই কোলিকের জন্য প্যাসিফায়ার নিয়ে জানতে চান। এটি কোলিক সারিয়ে দেবে না, তবে কান্নার সময় চোষার মাধ্যমে কিছু শিশু শান্ত হতে পারে।
এটিকে একমাত্র সমাধান ভাববেন না। কোলে নেওয়া, দোলানো, বয়স ও নিরাপত্তা অনুযায়ী কাপড়ে জড়িয়ে রাখা, একটু হাঁটতে বের হওয়া এবং ক্ষুধার লক্ষণ দেখলে দুধ খাওয়ানো - সবই দরকারি।
হিল-প্রিক, রক্ত নেওয়া বা টিকা দেওয়ার মতো ছোট চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার সময় প্যাসিফায়ার শিশুর দৃশ্যমান অস্বস্তি কমাতে পারে। চোষার কাজটি শিশুকে দ্রুত শান্ত হতেও সাহায্য করে।
হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসক কখনো ত্বক-থেকে-ত্বক স্পর্শ, বুকের দুধ খাওয়ানো বা চিকিৎসকের পরামর্শে অল্প ওরাল সুক্রোজের সঙ্গে প্যাসিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু ঘরে কখনো চুষনিতে চিনি, মধু, সিরাপ বা গুড় লাগাবেন না। ১২ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য মধু ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে শিশুবটুলিজমের জীবাণু থাকতে পারে।
প্যাসিফায়ার খারাপ কি না, এর উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না দিয়ে বলা যায় না। ঝুঁকি আছে, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নির্ভর করে কখন শুরু করা হচ্ছে এবং কত দিন ব্যবহার চলছে তার ওপর।
নতুন মায়েদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকে প্যাসিফায়ার এবং স্তন্যপান নিয়ে। কিছু শিশু সহজেই বুকের দুধ ও প্যাসিফায়ারের মধ্যে মানিয়ে নেয়। আবার কারও ক্ষেত্রে স্তন্যপান ঠিকমতো শুরু হওয়ার আগেই প্যাসিফায়ার দিলে সমস্যা হতে পারে।
শুরুর কয়েক সপ্তাহে শিশু স্তনে ঠিকভাবে মুখ লাগানো, দুধ টেনে নেওয়া এবং ক্ষুধার সংকেত দেওয়া শিখছে। এ সময় ঘন ঘন দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমেই মায়ের দুধের জোগান তৈরি হয়। প্যাসিফায়ার দিয়ে বারবার খাওয়ানোর সময় পিছিয়ে দিলে, বিশেষ করে প্রথম দিকে, দুধ খাওয়ার সংখ্যা কমে যেতে পারে।
এ কারণেই অনেক স্তন্যপান পরামর্শদাতা বুকের দুধ খাওয়ানো ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার কথা বলেন। সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পরে প্যাসিফায়ার দেওয়া তুলনামূলক সুবিধাজনক। সব ঠিকঠাক চলছে কি না, বোঝার কয়েকটি লক্ষণ হলো:
স্তনে ব্যথা, শিশুর ওজন না বাড়া, দুধ কম হওয়া বা ল্যাচের সমস্যা থাকলে প্যাসিফায়ার দেওয়ার আগে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত ল্যাকটেশন কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।
বিশেষ করে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে, দুইবার খাওয়ানোর ব্যবধান জোর করে বাড়াতে প্যাসিফায়ার ব্যবহার করা ঠিক নয়। নবজাতক সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় ৮ থেকে ১২ বার দুধ খায়। গ্রোথ স্পার্টের সময় এর চেয়েও বেশি খেতে চাইতে পারে।
ঘড়ি দেখে নয়, শিশুর আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নিন। ক্ষুধার প্রাথমিক সংকেতের মধ্যে আছে নড়েচড়ে ওঠা, স্পর্শের দিকে মুখ ফেরানো, মুখ খোলা, ঠোঁট চাটা বা হাত মুখে নেওয়া। কান্না সাধারণত দেরিতে দেখা দেওয়া সংকেত। শিশু যদি খুঁজতে থাকে বা স্তনের দিকে মুখ ঘোরায়, আগে দুধ দিন, তারপরও দরকার হলে প্যাসিফায়ার ভাবুন।
প্যাসিফায়ার এবং কানের সংক্রমণ নিয়ে গবেষণায় একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ৬ মাস বয়সের পর নিয়মিত প্যাসিফায়ার ব্যবহার করলে মধ্যকর্ণের সংক্রমণের হার কিছুটা বাড়তে পারে।
এর কারণ পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। চোষার ফলে মধ্যকর্ণের চাপের পরিবর্তন হতে পারে এবং তরল জমার সুযোগ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এর মানে এই নয় যে ৬ মাস পূর্ণ হওয়ার দিনই সব চুষনি ফেলে দিতে হবে। তবে ধীরে ধীরে দিনের বেলার ব্যবহার কমিয়ে শুধু ঘুমের সময় বা খুব অস্থির পরিস্থিতিতে রাখার অভ্যাস ভালো। শিশুর বারবার কানে ইনফেকশন হলে প্যাসিফায়ার কমালে উপকার হবে কি না, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।
শৈশবে অল্প সময় প্যাসিফায়ার ব্যবহার সাধারণত দাঁতের সমস্যা তৈরি করে না। উদ্বেগ বাড়ে যখন শিশু টডলার বয়সেও, বিশেষত ২ বছরের পর, দীর্ঘ সময় ধরে চুষনি ব্যবহার করে।
দীর্ঘদিন চোষার অভ্যাস দাঁত মেলার ধরন বদলাতে পারে এবং মুখের তালুর গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। কত ঘন ঘন ও কতক্ষণ ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ঘুমের আগে কিছুক্ষণ প্যাসিফায়ার নেওয়া আর সারাদিন মুখে চুষনি থাকা এক বিষয় নয়।
তাই শিশুর প্রি-স্কুল বয়স আসার অনেক আগেই ধীরে ধীরে প্যাসিফায়ার ছাড়ানোর পরিকল্পনা করা ভালো।
এটি ঠিক নয়। স্তন্যপান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই প্যাসিফায়ার দেওয়া হলে, বা প্রয়োজনীয় ফিডের বদলে বারবার চুষনি দেওয়া হলে বিভ্রান্তি বা খাওয়ানোর সমস্যা হতে পারে। কিন্তু স্তন্যপান ভালোভাবে চলতে শুরু করার পর প্যাসিফায়ার ব্যবহার মানেই যে বুকের দুধ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন প্রমাণ নেই।
সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ক্ষুধার সংকেতে দ্রুত সাড়া দেওয়াও জরুরি।
এটিও সত্য নয়। অভ্যাস ছাড়ানো কখনো কঠিন লাগতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী নয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশু ঘুমানো, নিজেকে শান্ত করা ও আবেগ সামলানোর নতুন উপায় শিখে ফেলে। ৬ থেকে ১২ মাস বয়সের মধ্যে ধীরে ধীরে ব্যবহার কমাতে শুরু করলে অনেক পরিবারের জন্য কাজটা সহজ হয়।
একেবারেই না। প্যাসিফায়ার একটি সহায়ক উপকরণ, আপনার অভিভাবকত্বের মানদণ্ড নয়। শিশুকে আদর করা, বুকের দুধ খাওয়ানো, কান্নায় সাড়া দেওয়া এবং প্রয়োজনমতো প্যাসিফায়ার দেওয়া - সবই একসঙ্গে করা যায়।
নবজাতক সামলানো ক্লান্তিকর। পরিষ্কার ও নিরাপদভাবে ব্যবহার করা একটি প্যাসিফায়ার যদি দীর্ঘ গাড়িযাত্রা বা দুপুরের ঘুমের সময় কিছুটা স্বস্তি দেয়, সেটি ব্যর্থতা নয়, বাস্তবসম্মত সমাধান।
ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলে কয়েকটি নিয়ম মানলে প্যাসিফায়ার সুবিধা পাওয়া যায় এবং ঝুঁকি কমে।
বুকের দুধ খাওয়া শিশুর ক্ষেত্রে স্তন্যপান ভালোভাবে শুরু হওয়ার পর, সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহে, প্যাসিফায়ার দিতে পারেন। ফর্মুলা খাওয়া শিশুকে কিছুটা আগেও দেওয়া যায়, তবে ক্ষুধার সংকেত সব সময় আগে গুরুত্ব পাবে।
শিশু চাইলে দিনের ঘুম ও রাতের ঘুমের সময় দিন। ঘুমিয়ে যাওয়ার পর মুখ থেকে পড়ে গেলে বারবার লাগিয়ে দেবেন না।
নবজাতককে প্যাসিফায়ার দেওয়ার নিয়ম মেনে চলতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:
প্যাসিফায়ার ছাড়ানোর জন্য একটিমাত্র নির্দিষ্ট বয়স সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। তবু ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানোর কথা ভাবা বাস্তবসম্মত। এ সময় অনেক শিশু শান্ত হওয়ার অন্য উপায় শিখতে শুরু করে।
প্রথমে শুধু দুপুরের ঘুম ও রাতের ঘুমের জন্য প্যাসিফায়ার রাখুন। পরে ঘুমের সময় গান, পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া, কোলে নেওয়া বা প্রিয় গল্পের বই দিয়ে নতুন অভ্যাস গড়ে তুলুন।
দাঁতের পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে এবং অভ্যাস ছাড়ানো সহজ রাখতে ২ বছরের মধ্যে প্যাসিফায়ার পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য রাখতে পারেন। হঠাৎ কেড়ে নেওয়ার বদলে ধাপে ধাপে কমানোই সাধারণত বেশি ফল দেয়।
প্যাসিফায়ার কোনো জাদুর সমাধান নয়, আবার নিজে থেকেই ক্ষতিকরও নয়। সঠিক সময়ে শুরু করা, প্যাসিফায়ার পরিষ্কার করার নিয়ম মানা এবং সময়মতো ছাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলে শিশুর প্রথম কয়েক মাসে এটি ছোট কিন্তু ভরসার সহায় হতে পারে।