এক মাস আগে যে বেবি ফর্মুলা শিশুর জন্য একদম ঠিকঠাক ছিল, হঠাৎ সেটিই তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। পেট ফাঁপা, কান্নাকাটি বা বোতল মুখে না নেওয়া দেখে রাতের ঘুম ভাঙা অবস্থায় নতুন ফর্মুলা কিনে ফেলার ইচ্ছা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু নবজাতকের অনেক আচরণই বয়সের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ঘটে, আর ঘন ঘন ফর্মুলা বদল করলে আসল সমস্যাটি বোঝা আরও কঠিন হয়।
সবচেয়ে ভালো পথ হলো, সাধারণ শিশুর ফর্মুলাকে কাজ করার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া, সতর্কতার লক্ষণগুলো খেয়াল করা এবং বিশেষ ধরনের ফর্মুলায় যাওয়ার আগে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা। কোনটি সাময়িক অস্বস্তি আর কোনটি ফর্মুলা পরিবর্তনের কারণ, তা বুঝে নেওয়া যাক।
নতুন বেবি মিল্ক বা ফর্মুলার সঙ্গে মানিয়ে নিতে অধিকাংশ শিশুর কিছু সময় লাগে। তাদের হজমতন্ত্র তখনও পুরোপুরি পরিণত হয় না। তাই প্রথম কয়েক মাসে গ্যাস, পেট চেপে ধরা, ঘুমের মধ্যে গোঙানো বা পায়খানার ধরন বদলে যাওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়।
সাধারণভাবে, গুরুতর কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলে নতুন শিশুর ফর্মুলা অন্তত দুই সপ্তাহ ব্যবহার করে তারপর বিচার করা ভালো। অর্থাৎ, ফর্মুলা বদল কতদিন অপেক্ষা করবেন, এ প্রশ্নের উত্তরে হালকা সমস্যার ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ দিন একটি বাস্তবসম্মত সময়।
এই সময়টায় ছোট একটি নোট রাখুন। কখন কতটা খাওয়ালেন, ভেজা ডায়াপার কতটি হলো, বমি হয়েছে কি না, ত্বকে কোনো পরিবর্তন আছে কি না এবং কখন বেশি কাঁদছে - এসব লিখে রাখলে চিকিৎসকও লক্ষণগুলোর ধারা বুঝতে সুবিধা পাবেন।
তবে নিচের সমস্যাগুলো থাকলে দুই সপ্তাহ অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার হতে পারে:
এসবই ফর্মুলা বদলের লক্ষণ হতে পারে, তবে এগুলো নিজে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট রোগের প্রমাণ নয়। রিফ্লাক্স, ভাইরাল সংক্রমণ, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাওয়ানো বা বোতল খাওয়ানোর ভুল কৌশলও একই ধরনের উপসর্গ তৈরি করতে পারে।
শিশুর প্রতিটি খারাপ দিনের সমাধান নতুন ফর্মুলার কৌটা নয়। একদিন সে বোতলের সবটা শেষ করবে, পরদিন কম খাবে বা খাওয়ার সময় বিরক্ত করবে - এ ধরনের ওঠানামা খুবই পরিচিত।
শুধু নিচের কারণগুলোতে তাড়াহুড়ো করে ফর্মুলা পরিবর্তন না করাই ভালো:
জরুরি সতর্কতার লক্ষণ না থাকলে বারবার ফর্মুলা বদল এড়িয়ে চলুন। প্রতিটি নতুন ফর্মুলাই সাময়িকভাবে গ্যাস বা পায়খানার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ফলে কোন ফর্মুলাটি আসলে শিশুর জন্য মানানসই, সেটিই বোঝা যায় না।
বিশেষ করে মেডিকেল বা প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ফর্মুলা ব্যবহারের আগে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। ফর্মুলা পরিবর্তনের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তালিকা দেখে নিজে নিজে গরুর দুধের প্রোটিন অ্যালার্জি, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা রিফ্লাক্স নির্ণয় করার চেষ্টা করবেন না।
বাংলাদেশে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগ বা নিবন্ধিত চিকিৎসক খাওয়ানো ও হজমসংক্রান্ত সমস্যার প্রাথমিক মূল্যায়ন করতে পারেন। প্রয়োজন হলে তারা পুষ্টিবিদ বা বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবেন। শিশুর বয়স ৩ মাসের কম হলে, তাকে অসুস্থ দেখালে, ঠিকমতো না খেলে বা ভেজা ডায়াপারের সংখ্যা কমে গেলে দেরি না করে পরামর্শ নিন।
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন:
বাংলাদেশে জরুরি অবস্থায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করা যায়। শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, ঠোঁট নীলচে হলে, অজ্ঞান হয়ে গেলে বা সাড়া না দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
বেশির ভাগ শিশুর জন্য সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড ইনফ্যান্ট ফর্মুলাই যথেষ্ট। তবে চিকিৎসক যদি ফর্মুলা বদলের পরামর্শ দেন, তাহলে কোন ধরনের ফর্মুলা প্রয়োজন তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। প্যাকেটের গায়ে “সেনসিটিভ” বা “জেন্টল” লেখা থাকলেই সেটি অ্যালার্জির জন্য চিকিৎসাগতভাবে উপযুক্ত, এমন নয়।
কমফোর্ট ফর্মুলায় সাধারণত আংশিক ভাঙা প্রোটিন থাকে, যাকে পার্শিয়ালি হাইড্রোলাইজড প্রোটিন বলা হয়। হালকা গ্যাস, পেটের অস্বস্তি, কোলিকের মতো কান্না বা কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে কখনও কখনও এটি বিবেচনা করা হয়।
তবে নিশ্চিত গরুর দুধের প্রোটিন অ্যালার্জি থাকলে এটি উপযুক্ত নয়। এতে প্রোটিন থাকে, শুধু আংশিকভাবে ছোট অংশে ভাঙা থাকে।
শিশুর গরুর দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি নিশ্চিত হলে বা জোরালো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক এক্সটেনসিভলি হাইড্রোলাইজড ফর্মুলা দিতে পারেন। এতে প্রোটিন আরও অনেক বেশি ভাঙা থাকে, তাই অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
কিছু শিশুর অ্যামাইনো অ্যাসিডভিত্তিক ফর্মুলা লাগতে পারে। এ সিদ্ধান্ত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নেওয়া উচিত। এ ধরনের ফর্মুলা চিকিৎসাগত প্রয়োজনে দেওয়া হয়, ইচ্ছামতো শুরু বা বন্ধ করা ঠিক নয়।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা নির্দিষ্ট খাদ্যগত প্রয়োজনে সয়া-ভিত্তিক শিশুর ফর্মুলা কখনও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। গরুর দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি থাকা কিছু শিশুর সয়ার প্রতিও প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
খুব ছোট শিশুর প্রকৃত ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বিরল। পেটের সংক্রমণের পর সাময়িকভাবে ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা হতে পারে, কিন্তু অনুমান করে ফর্মুলা বদল না করে সঠিক মূল্যায়ন করানো ভালো।
অ্যান্টি-রিফ্লাক্স ফর্মুলা কিছুটা ঘন হয়, যাতে দুধ সহজে উপরে উঠে না আসে। ঘন ঘন বমির কারণে শিশুর অস্বস্তি, খাওয়ার সমস্যা বা ওজন বৃদ্ধিতে বাধা হলে চিকিৎসক এ ধরনের ফর্মুলার কথা বলতে পারেন।
এগুলো প্রস্তুত করার নিয়ম আলাদা হতে পারে এবং কখনও একটু বড় ছিদ্রের নিপল লাগতে পারে। ঘন ফিডে কিছু শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে। চিকিৎসকের নির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া বোতলে সুজি, সিরিয়াল বা অতিরিক্ত ঘন করার কোনো উপকরণ মেশাবেন না।
নতুন ফর্মুলা ব্যবহারে সম্মতি পাওয়ার পর ধাপে ধাপে বদলালে শিশুর পেটের জন্য পরিবর্তনটি সহজ হতে পারে। সাধারণ ফর্মুলা থেকে অন্য সাধারণ ফর্মুলায়, অথবা চিকিৎসক অনুমোদিত কমফোর্ট ফর্মুলায় যাওয়ার সময় এটি বেশি কাজে আসে।
ফর্মুলা কিভাবে বদলাবেন, তার একটি সাত দিনের সহজ পরিকল্পনা নিচে দেওয়া হলো:
প্রতিটি ফর্মুলা তার প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী আলাদা করে তৈরি করুন। প্রয়োজন হলে তৈরি করা দুধ পরিষ্কার বোতলে নির্ধারিত অনুপাতে একসঙ্গে মেশানো যায়। দুই ধরনের ফর্মুলার গুঁড়া এক বোতলে একসঙ্গে মিশিয়ে তারপর পানি দেবেন না, বা স্কুপ ও পানির অনুপাত বদলাবেন না। ব্র্যান্ডভেদে গুঁড়া ও পানির অনুপাত আলাদা হতে পারে। ভুল অনুপাতে ফিড খুব ঘন বা খুব পাতলা হয়ে যেতে পারে।
কিছু শিশু একদিনেই নতুন ফর্মুলায় মানিয়ে নেয়। তবে প্রেসক্রিপশন ফর্মুলা, অ্যালার্জি, গুরুতর রিফ্লাক্স বা বেশি বমির ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনাই অনুসরণ করুন।
নতুন ফর্মুলায় শিশুর পায়খানার রং, গন্ধ ও ঘনত্ব বদলাতে পারে। কয়েক দিন সবুজাভ পায়খানা, একটু শক্ত পায়খানা বা বেশি গ্যাস হওয়া দেখা দিতে পারে। শুধু এই পরিবর্তন দেখেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে নতুন ফর্মুলাটি শিশুর সহ্য হচ্ছে না।
শিশুর সামগ্রিক অবস্থা দেখুন। সে কি স্বাচ্ছন্দ্যে খাচ্ছে? নিয়মিত প্রস্রাব হচ্ছে? খাওয়ার মাঝের সময়টায় কি তুলনামূলক শান্ত থাকছে? এগুলো ইতিবাচক লক্ষণ।
তবে নিচের সমস্যা দেখা দিলে ফর্মুলা দেওয়া বন্ধ করে দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ নিন:
ফর্মুলা অ্যালার্জির উপসর্গ কখনও ত্বক, পেট ও শ্বাসতন্ত্রে একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। এমন হলে বাড়িতে একের পর এক ফর্মুলা বদলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
সবচেয়ে বড় ভুল হলো খুব ঘন ঘন ফর্মুলা বদল। শিশুর কোনো উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া না থাকলে উপযুক্ত ফর্মুলাকে কিছুটা সময় দিন। বারবার পরিবর্তনে হজমের স্বাভাবিক ছন্দও বিঘ্নিত হয়, আবার সমস্যার কারণও ধরা যায় না।
আরেকটি ভুল হলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সয়া, অ্যান্টি-রিফ্লাক্স বা অ্যালার্জির ফর্মুলা শুরু করা। বিশেষ ফর্মুলাগুলো নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য তৈরি, এগুলো সাধারণ ফর্মুলার উন্নত সংস্করণ নয়।
শিশুর স্বাভাবিক আচরণের জন্য সব সময় ফর্মুলাকে দায়ী করবেন না। ঘন ঘন খেতে চাওয়া, সন্ধ্যার দিকে বেশি কান্না, গোঙানো, হেঁচকি বা মাঝে মাঝে দুধ উঠে আসা ক্লান্তিকর হলেও শৈশবের প্রথম দিকের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে।
তবু আপনার উদ্বেগকে ছোট করে দেখবেন না। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে খাওয়ানোর ধরন নিয়ে একবার কথা বললে মাঝরাতে তৃতীয় কৌটা বেবি ফর্মুলা কেনার চেয়ে অনেক বেশি কাজে লাগতে পারে।