শিশুর গ্যাস কেন হয়, লক্ষণ, গ্যাস বনাম কলিক এবং ঘরোয়া সহজ প্রতিকার
আপনি কষ্ট করে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ালেন, আস্তে করে বিছানায় রাখলেন, পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলেন… দশ মিনিটের মধ্যেই দেখলেন লাল মুখ, গোঁ গোঁ আওয়াজ, পা গুটিয়ে পেটে তুলছে, একেবারে কষ্টে আছে। মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে – «আমার শিশুর গ্যাস এত হয় কেন?»
শিশুর গ্যাস খুবই সাধারণ ব্যাপার, অনেক সময় বেশ আওয়াজও হয়, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একদম ক্ষতিকর না। ভাল খবর হলো, ঘরেই করার মতো কয়েকটা সহজ, ব্যবহারিক কৌশল আছে, যা দিয়ে বাচ্চার অস্বস্তি অনেকটা কমানো যায়।
এই গাইডে থাকছে শিশুর গ্যাস কেন হয়, কীভাবে বুঝবেন বাচ্চার গ্যাসের লক্ষণ, গ্যাস ও কলিক পার্থক্য, আর ঘরে বসেই করার মতো কিছু বাচ্চার গ্যাস মুক্ত করার উপায়।
কেন বাচ্চারা এত গ্যাসি হয়
আমরা বড়রা গ্যাস ছাড়ি, খুব একটা টেরও পাই না। কিন্তু নবজাতকের শরীর এখনও শেখার পর্যায়ে থাকে।
১. অপরিপক্ব হজমপ্রণালি
জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে শিশুর হজমের পুরো সিস্টেমটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। পেট থেকে অন্ত্রে খাবার (দুধ) নামানোর পেশিগুলো তখনও পুরো ছন্দে আসে না, আবার অন্ত্রের ভেতরের ব্যাকটেরিয়াগুলোর ভারসাম্যও বদলাতে থাকে।
এতে হয় কী, প্রায়শই দেখা যায়:
- স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গ্যাস তৈরি হয়
- গ্যাস আটকে যায়, পেটে চাপ ও ব্যথা লাগে
- গড়াগড়ি, গোঁ গোঁ করা, পা ছুড়ে মারা, কষ্ট করে গ্যাস বের করার চেষ্টা
নবজাতক গ্যাস জন্মের প্রথম ১২ সপ্তাহে বেশি দেখা যায়, আর এই সময়টাই সাধারণত কান্না আর অস্থিরতারও চুড়ান্ত সময়।
২. দুধ খাওয়ার সময় বা কান্নার সময় বাতাস চলে যাওয়া
প্রতিবার দুধ খাওয়ার সময়, আর জোরে দীর্ঘক্ষণ কাঁদলে, শিশুর পেটের ভেতর কিছুটা বাতাস ঢুকে যায়। পেটে বেশি বাতাস মানেই পরে বেশি গ্যাস।
বাচ্চা বেশি বাতাস গিলতে পারে যদি:
- বুকের দুধ বা বোতল ধরার ধরন (ল্যাচ) ঠিকমতো না হয়
- বোতলের নিপলের (টিটের) ফ্লো খুব বেশি দ্রুত বা খুব ধীরে হয়
- একেবারে চিৎ করে শুইয়ে দুধ খাওয়ানো হয়
- খুব বেশি কেঁদে উঠে, আর সেই কান্না অনেকক্ষণ চলে
এই কারণেই শিশুকে বেলচা করানো (ঢেঁকুর তোলানো) দুধের মাঝখানে ও শেষে এত কাজে লাগে। পেটের বাতাস অন্ত্রে নামার আগেই বেরিয়ে যায়।
৩. মায়ের ডায়েট এবং শিশুর গ্যাস (যতটা ভাবেন, ততটা না)
স্তন্যদানকারী অনেক মা ভাবেন, মায়ের ডায়েট এবং শিশুর গ্যাস এর কি সরাসরি সম্পর্ক আছে?
মনেই হয় - «কাল ডাল খেলাম, না কি ওটা থেকেই শিশুর গ্যাস? ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঝাল তরকারি – এগুলোর জন্য হচ্ছে নাকি?»
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুর গ্যাসের আসল কারণ মায়ের খাবার না। আমাদের পেটে যেসব খাবারে গ্যাস হয় যেমন পেঁয়াজ, বাঁধাকপি, শিম বা ডাল, সেগুলো খেলে বুকের দুধের মাধ্যমে ঠিক ওইভাবেই শিশুর গ্যাস হবে - এমনটা সবসময় না।
তবে ব্যতিক্রম আছে, বিশেষ করে যদি:
- পরিবারের কারও অ্যালার্জির ইতিহাস থাকে
- বাচ্চার মলে বারবার রক্ত বা অতিরিক্ত শ্লেষ্মা দেখা যায়, একজিমা হয়, অথবা ঠিকমতো ওজন না বাড়ে
আপনি যদি খেয়াল করেন, খুব নির্দিষ্ট কোনও খাবারের পরই প্রতি বার বাচ্চা অতিরিক্ত অস্থির হয়, যেমন - আপনি একসাথে অনেকটা গরুর দুধ খেলেই নিয়ম করে শিশুর পেট ফোলা ও গ্যাস হয়, তাহলে হুট করে নিজে নিজে বড় কিছু বাদ না দিয়ে আগে শিশু বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। অ্যালার্জি আছে কি না সেটা ঠিকমতো বোঝা দরকার, আবার অযথা বেশি খাবার বাদ দিলেও আপনার নিজের পুষ্টির ক্ষতি হয়।
ফর্মুলা দুধ খাওয়া বাচ্চাদেরও গ্যাস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কারণ হতে পারে:
- বোতল ঠিকমতো তৈরি না করা বা ধরার ভঙ্গি ঠিক না হওয়া
- নিপলের ফ্লো ঠিক না হওয়া
- খুব কম ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট কোনও ফর্মুলার প্রতি সেনসিটিভিটি
বারবার ফর্মুলা বদলানোর আগেও শিশুর ডাক্তার বা প্রশিক্ষিত নার্সের সাথে কথা বলা ভালো।
বাচ্চা গ্যাস কিভাবে বুঝবেন
শিশু তো কথা বলতে পারে না, তাই গ্যাসের কষ্ট কি কেবল কান্না দিয়ে বোঝা যায়? একটু খেয়াল করলে আলাদা কিছু লক্ষণ চোখে পড়ে।
সাধারণ বাচ্চার গ্যাসের লক্ষণ গুলো হলো:
-
পা গুটিয়ে পেটের দিকে টেনে আনা
একেবারে ক্লাসিক সাইন। বাচ্চা হঠাৎ পা দুটো গুটিয়ে পেটে তোলে, আবার সোজা করে। -
পিঠ বাঁকা করে টান টান হয়ে যাওয়া
অনেকে পিঠ সোজা করে পেছনের দিকে বাঁকিয়ে ফেলে, যেন কষ্ট থেকে বাঁচতে চাইছে। -
পেট শক্ত ও ফুলে থাকা
সাধারণ নরম পেটের তুলনায় তখন পেট একটু বেশি টাইট বা ফোলা দেখাতে পারে, হাত দিলেও একটু শক্ত লাগে। -
লাফাঝাঁপি, কুঁকড়ে থাকা, কাতরানো
বারবার এপাশ ওপাশ হওয়া, পা ছুড়ে মারা, গড়াগড়ি, সাথে গোঁ গোঁ আওয়াজ। -
গোঁ গোঁ, চাপ চাপ, জোর গ্যাস বের হওয়া
মুখ লাল করে দম আটকে থাকার মতো করে চাপ দেয়, তারপর জোরে ফার্ট করে। -
হঠাৎ কান্না শুরু হয়ে আবার হঠাৎ থেমে যাওয়া
এক মুহূর্তে শান্ত, পরের মুহূর্তে হাউমাউ কান্না, গ্যাস বা পায়খানা হয়ে গেলে আবার অনেকটা শান্ত।
আপনার বাচ্চা যদি বড় একটা ঢেঁকুর বা পাদ দেওয়ার পর হালকা হয়ে যায়, মুখে হাসি বা আরাম পাওয়াভাব আসে, তাহলে বুঝবেন অন্তত অংশত সমস্যাটা শিশুর গ্যাস থেকেই ছিল।
গ্যাস ও কলিক পার্থক্য কী?
অনেকেই শিশুর গ্যাস আর শিশুর কলিক কে এক করে ফেলে, আবার অনেক ক্ষেত্রে দুইটাই একসাথে থাকে। তবে দুটো এক জিনিস না।
কলিক কী?
সাধারণভাবে কলিক বলতে বোঝায়:
- প্রতিদিন ৩ ঘণ্টার বেশি দীর্ঘ কান্না
- সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন
- টানা ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে
- অথচ বাচ্চা মোটের ওপর সুস্থ, ঠিকমতো দুধ খাচ্ছে ও ওজন বাড়ছে
এই কান্না খুব জোরে হয়, থামানো কঠিন হয়, সাধারণত বিকেল থেকে রাতের দিকে বেশি বাড়ে। এককোনো নির্দিষ্ট কারণ সবসময় পাওয়া যায় না।
বাস্তবে গ্যাস বনাম কলিক
শিশুর গ্যাস থাকলে সাধারণত দেখা যায়:
- ব্যথার স্পষ্ট বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (পা পেটে তোলা, পিঠ বাঁকা, গোঁ গোঁ)
- পেট কিছুটা শক্ত, টান টান বা ফুলে থাকা
- কান্না হঠাৎ শুরু হয়, আবার গ্যাস বা পায়খানা হয়ে গেলে দ্রুত কমে যায়
- বড় ঢেঁকুর, পাদ বা পায়খানার পর স্পষ্ট আরাম দেখা যায়
শিশুর কলিক থাকলে:
- কান্না একটানা অনেকক্ষণ চলে, স্পষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন
- গ্যাস বের হলেও সাময়িক আরাম, আবার একটু পরই কান্না শুরু
- যতই কোলে নেয়া, দোলানো, কৌশল ব্যবহার করা হোক, সে সময়টা প্রায়ই সামলানো মুশকিল হয়
অনেক বাচ্চারই গ্যাস আর কলিক দুইটাই একসাথে থাকে, গ্যাস কলিকের একটা অংশ হতে পারে, কিন্তু পুরো কারণ না।
আপনি যদি নিশ্চিত নাহন যে এটা শুধুই শিশুর গ্যাস নাকি সাথে শিশুর কলিকও আছে, বা কান্না আপনার সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন ঢালাও ভাবে সহ্য না করে শিশু বিশেষজ্ঞ বা কাছের ভালো শিশু হাসপাতালে দেখানোই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।
শিশুর গ্যাস কমানোর নিরাপদ, কোমল উপায়
ঘরে বসেই ব্যবহার করতে পারেন এমন কিছু বাচ্চার গ্যাসের ঘরোয়া উপায় এখানে দেওয়া হলো। একেক সময় কয়েকটা কৌশল একসাথে করে দেখতে পারেন।
১. বাইসাইকেল পা (সাইকেল চালানোর ভঙ্গি)
খুব সহজ, কিন্তু অনেক সময় অবিশ্বাস্য কাজ দেয়।
- বাচ্চাকে পিঠের ওপর চিৎ করে শুইয়ে দিন, শক্ত ও নিরাপদ জায়গায়।
- দুই পায়ের গোড়ালি হালকা করে ধরে রাখুন।
- খুব আস্তে আস্তে একবার এক পা, একবার আরেক পা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে সাইকেল চালানোর মতো ভঙ্গিতে নড়াচড়া করুন।
- বাচ্চার মুখের ওপর নজর রাখুন, কষ্ট পেলে থেমে যান।
এভাবে নড়াচড়া করলে অন্ত্রের ভেতরের গ্যাস একটু একটু করে সামনে দিকে সরতে থাকে। দিনে কয়েকবার, বিশেষ করে দুধ খাওয়ার পর বা রাতে শোওয়ার আগে কয়েক মিনিট করাতে পারেন।
২. শিশুর গ্যাসের জন্য পেটে হালকা মালিশ
নরম, স্নিগ্ধ ম্যাসাজ শিশুর গ্যাস কমাতে সাহায্য করতে পারে। চাপ কমে, গ্যাস এগিয়ে যায়।
কিছু সতর্কতা:
- ঘরটা যেন গরম বা আরামদায়ক থাকে, শিশুর গা যেন ঠান্ডা না লাগে
- আপনার হাত পরিষ্কার ও হালকা গরম হওয়া ভালো
- চাইলে অল্প একটু বেবি অয়েল বা নারিকেল তেল লাগাতে পারেন, যাতে হাতে করে মালিশ করতে সুবিধা হয়
- কখনই খুব জোরে চাপ দেবেন না, সবসময় নরমভাবে করবেন
কয়েকটা প্যাটার্ন চেষ্টা করতে পারেন:
-
ঘড়ির কাঁটার দিকে বৃত্ত আঁকা
কল্পনা করুন শিশুর পেটের ওপর একটা ঘড়ি আছে। নাভির চারপাশে আপনার আঙুল বা হাতের তালু দিয়ে আস্তে আস্তে ঘড়ির কাঁটার দিক ঘুরে ছোট ছোট বৃত্ত আঁকুন। আমরা যেমন খাই, তেমনি অন্ত্রের ভেতরও খাবার ওই দিকেই ঘোরে, তাই এই দিকটা গ্যাস বের হতে সাহায্য করে। -
“I Love U” প্যাটার্ন
১. প্রথমে আপনার ডান দিক থেকে দেখতে গেলে, বাচ্চার পেটের বাম পাশে (আপনার ডান হাতে) ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত আস্তে একটা সোজা লাইন টানুন - এটা হলো “I”।
২. এবার উপরের দিক থেকে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে সোজা এসে, তারপর বাঁ দিক দিয়ে নিচে নামুন - উল্টো “L” এর মতো।
৩. শেষে আবার ডান দিকের নিচের অংশ থেকে ওপর দিকে উঠে, নাভি ঘুরে বাঁ দিকে নেমে আসুন - উল্টো “U” এর মতো।
দিনে কয়েকবার, প্রতি বার কয়েক মিনিটের বেশি না। বাচ্চা যদি অস্থির হয়ে কাঁদতে থাকে বা পছন্দ না করে, সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিন।
৩. টামি টাইম
টামি টাইম শুধু ঘাড় শক্ত করা আর হাতের শক্তি বাড়ানোর জন্য না, শিশুর পেট ফোলা ও গ্যাস কমাতেও কাজে লাগে।
শিশুকে যখন পেটে ভর দিয়ে শোয়ান:
- পেটের ওপর হালকা চাপ পড়ে, গ্যাস নড়াচড়া করার সুযোগ পায়
- নিজে থেকেই হাত পা নাড়াচাড়া করে, যা গ্যাস এগোতে সাহায্য করে
শুরুর দিকে প্রতিবার ১ থেকে ২ মিনিট করলেই যথেষ্ট, দিনে কয়েকবার করতে পারেন। সবসময় নজরদারিতে রাখবেন। খেলনার ম্যাটে বা আপনার বুকে উল্টে শুইয়ে, আপনি পিঠে হেলান দিয়ে থাকতে পারেন। বাচ্চা খুব গ্যাসে কষ্ট করলে ডায়াপার পাল্টানোর পর একটু টামি টাইম দিলে আরাম পেতে পারে।
৪. কাজে দেয় এমন বেলচা করানোর ভঙ্গি
ঠিকমতো শিশুকে বেলচা করানো হলে অনেক গ্যাস শুরুতেই বেরিয়ে যায়, পরে অন্ত্রে নেমে গিয়ে বেশি সমস্যা করে না।
তিনটা পজিশনই একেক শিশু একেকভাবে পছন্দ করে। দেখে নিন কোনটা আপনার বাচ্চার জন্য ভালো কাজ করে।
-
কাঁধের ওপর তুলে
- বাচ্চাকে সোজা করে আপনার বুকের সাথে এমনভাবে লাগিয়ে ধরুন, যেন তার থুতনি আপনার কাঁধের পাশে থাকে।
- এক হাত দিয়ে মাথা আর ঘাড় সাপোর্ট দিন।
- অন্য হাত দিয়ে পিঠে খুব আস্তে টোকা দিন বা গোল গোল করে মালিশ করুন।
-
কোলের ওপর বসিয়ে
- আপনাকে মুখ করে, বা সামান্য সাইডে ঘুরিয়ে বাচ্চাকে আপনার হাঁটুর ওপর বসান।
- আপনার হাতের তালু দিয়ে বাচ্চার বুকের সামনের দিক থেকে চিবুকের নিচের অংশটা ধরে রাখুন, খেয়াল রাখবেন গলায় যেন চাপ না পড়ে।
- সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে দিন, তারপর পিঠে আস্তে টোকা বা মালিশ করুন।
-
কোলের ওপর উলটো করে
- আপনার দুই হাঁটুর উপর বাচ্চাকে পেটের দিক নিচে দিয়ে শুইয়ে দিন।
- মাথা যেন সবসময় বুকের চাইতে একটু উঁচু থাকে, হাতে সাপোর্ট দিন।
- এবার পিঠে আস্তে আস্তে চাপড় দিন বা মালিশ করুন।
কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি ঢেঁকুর দেয়, আবার কারও একটু বেশি সময় লাগে। শুধু শেষে না, মাঝখানেও একবার বেলচা করানো অনেক সময় উপকার করে।
৫. গরম সেঁক
হালকা গরম সেঁক দিলে পেটের মাংসপেশি একটু ঢিলে হয়, শিশুর গ্যাসের কষ্ট কিছুটা কমতে পারে।
যেভাবে করবেন:
- একটা পরিষ্কার ছোট তোয়ালে বা গামছা নিন
- গরম (খুব গরম না, গরম-গরম) পানিতে ভিজিয়ে ভালো করে নিংড়ে নিন, যাতে পানি না ঝরে
- আগে আপনার নিজের কব্জিতে লাগিয়ে দেখুন, যেন আরামদায়ক গরম থাকে, একটুও পোড়া পোড়া না লাগে
- তারপর বাচ্চার জামার ওপরে হালকা করে পেটে রেখে দিন, কয়েক মিনিট থাকুক
সবসময় বাচ্চার পাশে থাকবেন, যদি অস্বস্তি হয় বা কাপড় ঠান্ডা হয়ে যায়, সরিয়ে ফেলুন।
৬. কলিক হোল্ড
কলিক হোল্ড বা «টাইগার ইন দ্য ট্রি» পজিশন কলিক আর শিশুর গ্যাস দুটোতেই অনেকের পছন্দের কৌশল।
- আপনার (ডান) হাতটা সামনে সোজা করে ধরুন,
- বাচ্চাকে উল্টো করে পেটের দিক আপনার হাতের ওপর রাখুন
- তার মুখ আপনার কনুইয়ের কাছে থাকবে, মাথা সামান্য উঁচু করে সাপোর্ট দিন
- অন্য হাত দিয়ে বুকের নিচে বা পোঁদের দিকে ধরে রাখুন
এভাবে কোলে নিয়ে সামান্য হাঁটাহাঁটি, দুলুনি, বা আস্তে আস্তে দোলাতে পারেন। পেটের ওপর চাপ আর নড়াচড়া মিলিয়ে অনেক সময় ফাঁপা গ্যাস বেরিয়ে আসে, বাচ্চা শান্ত হয়।
দুধ খাওয়ানোর কিছু বদল যা গ্যাস কমাতে পারে
অften দেখা যায়, যা খাওয়ানো হচ্ছে তা বদল না করেও শুধু খাওয়ানোর ভঙ্গি বদলালে নবজাতক গ্যাস অনেকটাই কমে যায়।
বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের জন্য
-
ল্যাচ ঠিক আছে কি না খেয়াল রাখুন
গভীর ল্যাচ মানে বাচ্চা যেন স্তনবৃন্ত ছাড়াও চারপাশের আরিওলার বড় অংশ মুখের ভেতর নেয়। বেশি টুকটাক শব্দ, «ক্লিক» করা বা বারবার দুধ মুখের কোণ দিয়ে পড়ে গেলে বুঝবেন ল্যাচ খুব পারফেক্ট না। প্রয়োজনে ল্যাকটেশন কনসালটেন্ট, বিশেষজ্ঞ নার্স বা অভিজ্ঞ স্তন্যদান পরামর্শদাতার সাহায্য নিন। -
বিভিন্ন অবস্থানে চেষ্টা করুন
কারও কারও ক্ষেত্রে প্রায় বসানো অবস্থায় (আরও সোজা করে) দুধ দিলে গিলতে সুবিধা হয়, আবার কেউ লেইড-ব্যাক অবস্থায় (আপনি হেলান দিয়ে শুয়ে, বাচ্চা উপরে) ভালো খায়। কোনটা নিলে কম বাতাস ঢোকে, লক্ষ্য করুন। -
মাঝখানেও বেলচা করান
খুব গ্যাসি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে একদিক বুক শেষ হওয়ার আগেও একটু থেমে বেলচা করিয়ে আবার খাওয়াতে পারেন।
ফর্মুলা বা বোতলের দুধ খাওয়া শিশুদের জন্য
-
নিপলের ফ্লো ঠিকমতো বাছাই করুন
ফ্লো বেশি দ্রুত হলে বাচ্চা গিলতে না পেরে হাঁ করে টেনে নিয়ে অনেক বাতাস গিলে ফেলে। আবার খুব ধীর হলে বেশি জোর লাগিয়ে টানতে হয়, তাতেও বাতাস যায়। বয়স আর খাওয়ার স্টাইল বুঝে ঠিক মাপের নিপল ব্যবহার করতে একটু ট্রায়াল অ্যান্ড এরর লাগতেই পারে। -
বোতল সবসময় একটু কাত করে রাখুন
খাওয়ানোর সময় যেন সবসময় নিপলের ভেতরটা দুধে ভরা থাকে, অর্ধেক দুধ, অর্ধেক হাওয়া যেন না থাকে। -
পেসড বটল ফিডিং (ধীরে, নিয়ন্ত্রিত ফিডিং)
বাচ্চাকে অল্প সোজা করে কোলে বসিয়ে বা কোলে হেলিয়ে, বোতলটা প্রায় সমান্তরাল রেখে, মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে খাওয়ান। এতে বাচ্চা নিজে নিজের মতো করে টানতে পারে, বাতাস কম গিলে। -
মাঝে আর শেষে দু’বারই বেলচা করান
অর্ধেক খাওয়ার পর, আবার শেষেও ঢেঁকুর ওঠানো ভালো।
বুক হোক বা বোতল, সামান্য উঁচু করে, একেবারে চিৎ করে না শুইয়ে দুধ খাওয়ালে রিফ্লাক্স আর গ্যাস দুই-ই কিছুটা কমে।
গ্যাসের ওষুধ, প্রোবায়োটিক, আর কখন ডাক্তার দেখাবেন
বাজারে শিশুর গ্যাসের জন্য নানান ড্রপ, সিরাপ, প্রোবায়োটিক পাওয়া যায়। কিছু কারও কারও ক্ষেত্রে কাজে দেয়, কিছু একদমই না, আর গবেষণার ফল মিলেমিশে রয়েছে।
সিমেথিকন গ্যাস ড্রপ
অনেক শিশুর গ্যাসের ওষুধ এ মূল উপাদান থাকে সিমেথিকন। ধারণা অনুযায়ী, এটি পেট আর অন্ত্রের ভিতরে ছোট ছোট গ্যাস বাবলগুলোকে ভেঙে বড় করে, যাতে সহজে বের হয়ে যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা:
- নির্দেশিকা মতো দিলে সাধারণত ছোট বাচ্চাদের জন্যও তুলনামূলক নিরাপদ ধরা হয়
- বেশ কিছু বাবা-মা জানান, এতে বাচ্চার পেটের ফাঁপা ভাব কিছুটা কমে
- কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সব ক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট লাভ দেখা যায়নি, তাই ১০০% নিশ্চয়তা নেই
সব সময় ওষুধের প্যাকেটের ডোজ ঠিকঠাক মেনে চলুন। নতুন কিছু শুরু করার আগে শিশু বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় ভালো ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ, বিশেষ করে যদি বাচ্চা খুব ছোট হয়, বা প্রিম্যাচিউর হয়।
প্রোবায়োটিক ও শিশুর গ্যাস
অনেকে জানতে চান, প্রোবায়োটিক দিলে শিশুর গ্যাস বা শিশুর কলিক কমবে কি না।
- কিছু নির্দিষ্ট স্ট্রেইন, বিশেষ করে Lactobacillus reuteri (এল. রিউটেরি), স্তন্যপানকারী কলিকি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কয়েকটি গবেষণায় উপকারের ইঙ্গিত দিয়েছে
- কলিক কমাতে প্রমাণ কিছুটা শক্ত, কিন্তু একেবারে সাধারণ গ্যাসে কতটা সাহায্য করে, সেটা এখনও সব শিশুর জন্য একরকম পরিষ্কার না
যদি প্রোবায়োটিক নিয়ে ভাবেন:
- আগে শিশু বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলুন
- একেবারে শিশুদের জন্য বানানো, বয়স উপযোগী প্রোবায়োটিকই ব্যবহার করুন
- কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত দেওয়ার পরই বোঝা যায় কাজ করছে কি না, ততদিন ধৈর্য রাখতে হবে
যেসব ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার দেখানো দরকার
শিশুর গ্যাস সাধারণত ভয় পাওয়ার মতো কিছু না, কিন্তু কিছু সতর্ক সংকেত আছে, যেগুলো দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
- পেট খুব বেশি ফুলে গেছে, শক্ত টান টান, ছুঁলেই মনে হয় ব্যথা পাচ্ছে
- বারবার সবুজ বা ভীষণ হলুদ বমি, বা জোরে অনেক দূর গিয়ে বমি (প্রজেক্টাইল ভমিটিং)
- মলে রক্ত দেখা যাচ্ছে
- জ্বর, বাচ্চা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম, ঢিলে ঢালা বা একেবারে ক্লান্ত লাগছে
- ঠিকমতো দুধ খাচ্ছে না, ভিজা ডায়াপার কমে গেছে, সার্বিকভাবে নিস্তেজ লাগছে
নিজের অনুভূতিকে হালকা করে নেবেন না। কিছু ঠিক লাগছে না মনে হলে দেরি না করে কাছের শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি/বেসরকারি হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগ বা জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন। বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে কল করেও দ্রুত পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া যায়।
শেষ কথা: আপনার দোষ না
শিশুর গ্যাসের জন্য রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে কেটে যায়। গোঁ গোঁ আওয়াজ, হঠাৎ হঠাৎ পা পেটে তোলা, একেবারে কান ফাটানো কান্না - সব মিলিয়ে নিজেকেই দোষী মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু এতে এই অর্থ হয় না যে:
- আপনার দুধ «খারাপ»
- আপনি ভুল ফর্মুলা বেছে ফেলেছেন
- আপনি দুধ খাওয়াতে «ভুল» করছেন
অধিকাংশ সময়ই ব্যাপারটা খুব সরল - একটা ছোট্ট মানুষ, যার হজমপ্রণালি এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি, সামান্য বাড়তি সাহায্য চাইছে।
একটু সময় নিয়ে একসাথে ব্যবহার করতে পারেন:
- বাইসাইকেল পা আর পেটের হালকা ম্যাসাজ
- টামি টাইম আর কলিক হোল্ড
- নানা ধরনের বেলচা করানোর পজিশন
- দুধ খাওয়ানোর ভঙ্গি আর গতি সামান্য ঠিকঠাক করা
তারপরও যদি মনে হয় কিছুই সামাল দিতে পারছেন না, বা বুঝতেই পারছেন না এটা শিশুর গ্যাস নাকি শিশুর কলিক, একা একা সব বোঝার চেষ্টা না করে শিশু বিশেষজ্ঞ, গাইনী ডাক্তার, কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী বা অভিজ্ঞ নার্সের সাথে কথা বলুন।
এই সময়টা সত্যিই কেটে যায়। কিছুদিন পর বাচ্চার অন্ত্র ধীরে ধীরে পরিপক্ব হয়, বাচ্চার গ্যাস কমে আসে, আর একদিন হঠাৎ খেয়াল করবেন, কবে শেষ রাতে ৩টায় উল্টো করে সাইকেল চালানোর ভঙ্গি করিয়েছিলেন, মনে করতেও পারছেন না।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।