শিশুর কান্নার কারণ, লক্ষণ ও শান্ত করার কার্যকর উপায়, মা-বাবাদের সহজ নির্দেশিকা

শিশুর কান্নার কারণ জানুন, শান্ত করার কার্যকর উপায়

শিশুর কান্নার কারণ কী?

নিজের শিশুর কান্না শুনলে বুক ধড়ফড় করা, মাথায় অনেক চিন্তা একসঙ্গে ঘুরতে থাকা খুবই স্বাভাবিক। সবকিছু করার পরও যখন শিশু কাঁদছে, তখন মনে হতে পারে, “আমি আর কী করব?” মনে রাখবেন, আপনি ব্যর্থ নন। শিশুর কান্না মূলত যোগাযোগের ভাষা, আপনার অভিভাবকত্বের মূল্যায়ন নয়।

সময় গেলে শিশুর অভ্যাস ও সংকেতগুলো বুঝতে সহজ হয়। তার আগে একটি শান্ত, সহজ রুটিন ধরে একে একে সম্ভাব্য কারণগুলো দেখলে শিশুর কী প্রয়োজন তা বোঝা এবং তাকে নিরাপদে শান্ত করা সহজ হয়।

শিশু কথা বলতে পারে না বলে কান্নাই তার সাহায্য চাওয়ার প্রধান মাধ্যম। নবজাতক বলতে পারে না তার খিদে পেয়েছে, ঘুম পাচ্ছে, ঠান্ডা লাগছে, গরম লাগছে, একা লাগছে বা শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে। কান্নার মাধ্যমে সে জানায়, “আমার দিকে একটু খেয়াল করুন।”

কখনও কারণটি চোখের সামনেই থাকে। আবার বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে দীর্ঘ সময় ধরে নবজাতক কাঁদছে কেন, সেটি বোঝা বেশ কঠিন মনে হতে পারে।

শিশুর কান্নার সাধারণ কারণগুলো হলো:

  • খিদে - বিশেষত জন্মের পরের কয়েক সপ্তাহে সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এ সময় শিশুর বারবার দুধ চাইতে পারে।
  • ভেজা বা মলত্যাগ করা ডায়াপার - কেউ এতে খুব একটা বিরক্ত হয় না, আবার কেউ অস্বস্তিতে জোরে কাঁদে।
  • ঘুম পাওয়া - অতিরিক্ত ক্লান্ত শিশুকে ঘুম পাড়ানো বরং আরও কঠিন হতে পারে।
  • পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি - ঢেকুর না হওয়া, গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, রিফ্লাক্স বা হজমতন্ত্র পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় অস্বস্তি হতে পারে।
  • বেশি গরম বা ঠান্ডা লাগা - বড়দের মতো শিশু নিজের শরীরের তাপমাত্রা সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
  • অতিরিক্ত উত্তেজনা বা একঘেয়েমি - বেশি লোকজন, উজ্জ্বল আলো, টিভির শব্দ, দীর্ঘক্ষণ কোলে কোলে ঘোরা বা বেশি সময় জেগে থাকা শিশুকে অস্থির করে তুলতে পারে।
  • কাছাকাছি থাকার প্রয়োজন - কোলে থাকতে চাওয়া ছোট শিশুর স্বাভাবিক চাহিদা। এতে তাকে “অভ্যস্ত” বা নষ্ট করে ফেলা হয় না।
  • ব্যথা বা অসুস্থতা - তুলনামূলক কম হলেও কান্না অস্বাভাবিক হলে বা শিশুকে অসুস্থ মনে হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

একটি শিশুর একসঙ্গে একাধিক সমস্যা থাকতে পারে। খিদে পাওয়া শিশু আবার ঘুমকাতুরেও হতে পারে, আর গ্যাসের অস্বস্তিতে কাঁদতে কাঁদতে সে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। তাই একটি জাদুকরি সমাধান খোঁজার বদলে ধীরে ধীরে সম্ভাব্য কারণগুলো যাচাই করুন।

শিশুর কাঁদা বুঝবেন কিভাবে?

অনেক মা-বাবাই ভাবেন, কান্নার ধরন শুনেই হয়তো সব কারণ বোঝা যাবে। কিছু পরিচিত ইঙ্গিত অবশ্যই আছে, কিন্তু সব শিশুর জন্য একই রকম কোনো নির্ভুল অভিধান নেই। একই শিশুর কান্নাও দিনভেদে আলাদা শোনাতে পারে।

নিজের শিশুর স্বভাব, কান্নার ছন্দ এবং শরীরী ভাষা আপনি ধীরে ধীরে অন্য যে কারও চেয়ে ভালো বুঝবেন। তবু শব্দের তীব্রতা, বিরতি এবং শিশুর হাত-পা বা মুখের ভঙ্গি কিছুটা ধারণা দিতে পারে।

খিদে হলে শিশুর কান্না লক্ষণ: ছন্দময় এবং ধীরে ধীরে বাড়ে

খিদে পেলে শিশুর কান্না অনেক সময় হালকা অস্থিরতা, ছোট ছোট গুঙুনি বা একই ছন্দে বারবার শব্দ করার মাধ্যমে শুরু হয়। দুধ দিতে দেরি হলে কান্না ক্রমে জোরালো হয়। কান্নার আগেই অনেক শিশু খিদে পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়:

  • গালে আলতো স্পর্শ করলে মাথা ঘুরিয়ে মুখ খুলে স্তন বা বোতল খোঁজা
  • ঠোঁট চাটা, চোষার মতো শব্দ করা
  • মুঠো মুখে নেওয়া
  • হঠাৎ বেশি নড়াচড়া করা বা সজাগ হয়ে ওঠা

কান্না সাধারণত খিদের দেরিতে দেখা দেওয়া লক্ষণ। আগের ইঙ্গিতগুলো বুঝতে পারলে মা ও শিশুর দুজনের জন্যই খাওয়ানোর সময়টা অনেক শান্ত থাকে।

ঘুমের কান্না: ঘ্যানঘ্যানে, অস্থির এবং ক্রমে তীব্র

ঘুম পেলে শিশুর কান্না শুরুতে ঘ্যানঘ্যানে বা বিরক্তির মতো হতে পারে। সে চোখ ঘষতে পারে, কান টানতে পারে, ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারে, হাই তুলতে পারে অথবা মুখ ও খেলনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। কিছু শিশু ঘুমের চাপে উল্টো খুব ছটফট করে, হাত-পা ছোড়ে, যেন ঘুমের সঙ্গে লড়াই করছে।

নবজাতক অনেক সময় মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট জেগে থাকতে পারে। কান্না খুব বেড়ে যাওয়ার আগেই ঘুমের লক্ষণ দেখলে শিশুকে ঝিম করানোর উপায় হিসেবে আলো কমানো, শব্দ কমানো ও পরিচিত ঘুমের রুটিন শুরু করুন।

ব্যথা হলে শিশুর কান্না কেমন: হঠাৎ, তীক্ষ্ণ ও তীব্র

ব্যথা হলে শিশুর কান্না সাধারণ কান্নার চেয়ে হঠাৎ শুরু হতে পারে এবং স্বর হয় তীক্ষ্ণ, চিকন বা খুব জোরালো। সাধারণ অস্থিরতার ধাপ না পেরিয়েই সে চিৎকার করে উঠতে পারে। পা পেটের দিকে গুটিয়ে ফেলা, পিঠ বাঁকানো, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া বা সহজে শান্ত না হওয়া দেখা যেতে পারে।

একবার হঠাৎ জোরে কেঁদে ওঠা সব সময় গুরুতর সমস্যার লক্ষণ নয়। তবে মনে হলে, “আজকের কান্নাটা অন্য রকম,” সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন এবং শিশুকে ভালোভাবে দেখুন।

একঘেয়েমি বা অতিরিক্ত উত্তেজনায় শিশুর কান্না: থেমে থেমে অস্থিরতা

একঘেয়ে লাগলে শিশু একটু কাঁদে, কোলে নেওয়া বা কথা বললে চুপ করে, আবার কিছুক্ষণ পর অস্থির হয়। অতিরিক্ত উত্তেজনায় শিশুর কান্না দেখতে কাছাকাছি হলেও এ ক্ষেত্রে আশপাশের পরিবেশই অনেক সময় কারণ হয়। টিভির আওয়াজ, উজ্জ্বল আলো, অতিথিদের ভিড়, বেশি খেলনা বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা শিশুকে ক্লান্ত করে দিতে পারে।

মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, মুঠো শক্ত করা, হাত-পা ঝাঁকুনির মতো নড়াচড়া, ঘনঘন চোখ পিটপিট করা বা মুখ লাল হয়ে যাওয়া লক্ষ করুন। এ অবস্থায় বেশি খেলা বা আদর নয়, বরং মৃদু আলো, শান্ত ঘর, কোলে নেওয়া এবং একটানা নরম শব্দ কাজে দিতে পারে।

শিশু কাঁদতে শুরু করলে করণীয়: একটি শিশুর কাঁদা নির্ণয় তালিকা

শিশু খুব জোরে কাঁদলে অনেক সময় অভিভাবকের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তাই একটি শিশুর কাঁদা নির্ণয় তালিকা কাজে আসে। ধীরে ধীরে, একবারে একটি বিষয় পরীক্ষা করুন।

  1. শিশুর খিদে পেয়েছে কি?
    শেষবার দুধ খাওয়ার পর কিছু সময় হয়ে গেলে বা খিদের লক্ষণ থাকলে বুকের দুধ বা ফর্মুলা দিন। নবজাতক দিনে ৮ থেকে ১২ বার, কখনও তারও বেশি দুধ খেতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে বারবার দুধ চাইতে পারে।

  2. ডায়াপার বদলানো দরকার কি?
    ডায়াপার ভেজা, মলত্যাগ করেছে কি না, খুব আঁটসাঁট কি না বা ত্বকে লালচে দাগ ও র্যাশ হয়েছে কি না দেখুন।

  3. বেশি গরম বা ঠান্ডা লাগছে কি?
    হাত-পা নয়, শিশুর বুক বা ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে তাপমাত্রা বুঝুন। হাত-পা অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা থাকে। ঘুমের জন্য ঘরের তাপমাত্রা সাধারণত ১৬ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আরামদায়ক ধরা হয়। আবহাওয়া অনুযায়ী পাতলা এক স্তর কাপড় কমান বা বাড়ান।

  4. ঘুম পাচ্ছে কি?
    আলো কমিয়ে দিন, শব্দ কমান, পরিচিত ঘুমের প্রস্তুতি নিন। একদম নিখুঁত সময়ের অপেক্ষা করবেন না, ঘুমের প্রথম লক্ষণ দেখলেই চেষ্টা করুন।

  5. গ্যাস বা পেটব্যথা হতে পারে কি?
    দুধ খাওয়ানোর মাঝে ঢেকুর তুলতে বিরতি দিন। শিশুকে কাঁধে সোজা করে ধরুন, ধীরে ধীরে পা দুটো সাইকেল চালানোর মতো নড়ান অথবা শিশু শান্ত থাকলে পেটে ঘড়ির কাঁটার দিকে আলতো মালিশ করুন।

  6. পরিবেশে অতিরিক্ত উত্তেজনা আছে কি?
    শান্ত ঘরে যান, টিভি বন্ধ করুন, অতিথিদের একটু দূরত্ব রাখতে বলুন। পুরো নীরবতা দরকার না হলেও স্থির ও শান্ত পরিবেশ শিশুকে স্বস্তি দেয়।

  7. শুধু আদর ও নিরাপত্তা চাইছে কি?
    কোলে নিন, বুকের কাছে রাখুন, নরম স্বরে কথা বলুন। শিশু আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোলে আসতে চায় না। সে সবচেয়ে পরিচিত মানুষটির কাছ থেকে নিরাপত্তা ও শান্তি খোঁজে।

এই ধাপগুলো শিশুর কান্নার কারণ খুঁজতে বাস্তবভাবে সাহায্য করে। সব কিছু দেখার পরও নির্দিষ্ট কারণ না পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় মৌলিক প্রয়োজন পূরণ থাকার পরও শিশুর ঘুমাতে বা শান্ত হতে বাড়তি সাহায্য লাগে।

শিশু শান্ত করা: কার্যকর কিছু উপায়

সব শিশুর জন্য সব সময় একই কৌশল কাজ করবে না। অনেক ক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ উপায় একসঙ্গে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। আগে মৌলিক প্রয়োজনগুলো দেখুন, তারপর আরামের ব্যবস্থা করুন।

১. দুধ খাওয়ানো

ছোট শিশুর ক্ষেত্রে আগে খিদে আছে কি না দেখুন, কারণ এটি খুব সাধারণ কারণ। বুকের দুধ, ফর্মুলা বা আগে থেকে বের করে রাখা দুধ দিন। নবজাতকের ঘন ঘন দুধ চাওয়া স্বাভাবিক, এতে খারাপ অভ্যাস তৈরি হয় না।

দুধ খেতে খেতে শিশু বারবার কাঁদলে, পিঠ বাঁকালে, কাশলে, জোরে বমি করলে বা প্রায় প্রতিবার খাওয়ার সময় অস্বস্তিতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। স্তন্যপানজনিত সমস্যা বা রিফ্লাক্সের সমাধান করা যায়, তবে এ সময় সহায়তা প্রয়োজন।

২. ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে কোলে রাখা

শিশুর কান্না কমাতে ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখা খুব কার্যকর ও কোমল একটি পদ্ধতি। শিশুকে শুধু ডায়াপার পরিয়ে আপনার খালি বুকের ওপর সোজা করে রাখুন। এরপর তার পিঠ হালকা কাপড় বা চাদর দিয়ে ঢেকে দিন। আপনি আরাম করে বসুন এবং ঘুমিয়ে পড়বেন না।

আপনার শরীরের উষ্ণতা, হৃদস্পন্দন, গন্ধ ও শ্বাসের ছন্দ শিশুর তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন ও অস্থিরতা সামলাতে সাহায্য করে। এটি দুধ খাওয়ানো এবং মা-বাবার সঙ্গে শিশুর বন্ধন গড়তেও সহায়ক। শুধু জন্মের পরপরই নয়, সপ্তাহ বা মাস পেরোলেও এই পদ্ধতি কাজে দেয়।

৩. ৫টি ‘এস’ পদ্ধতি

নবজাতককে শান্ত করতে বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি হলো ৫টি ‘এস’। গর্ভের ভেতরের আবদ্ধ ও ছন্দময় অনুভূতির কাছাকাছি পরিবেশ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।

  • স্ব্যাডল বা হালকা করে জড়িয়ে রাখা - শিশুকে আরামদায়কভাবে জড়ান, তবে নিতম্ব ও পা ভাঁজ ও নড়াচড়া করার জায়গা রাখুন। জড়ানো অবস্থায় শিশুকে সব সময় চিৎ করে শোয়ান। শিশু পাশ ফিরতে বা গড়াতে চেষ্টা করলে জড়ানোর অভ্যাস বন্ধ করুন।
  • কোলে কাত করে ধরা - আপনি জেগে থেকে নজর রাখার সময় শিশুকে কাত করে বা উপুড় ভঙ্গিতে আপনার হাতের ওপর ধরতে পারেন। কিন্তু ঘুমের সময় শিশুকে অবশ্যই চিৎ করে, নিজের আলাদা সমতল ও পরিষ্কার বিছানায় শোয়াতে হবে।
  • শশ শব্দ করা - শিশুর কাছে একটানা নরম “শশশ” শব্দ করুন। প্রথমে কান্নার চেয়ে সামান্য জোরে হতে পারে, তবে কখনও কানের একদম কাছে নয়।
  • দোলানো - মাথা ও ঘাড় ভালোভাবে ধরে খুব মৃদু দোল দিন। শিশুকে কখনও ঝাঁকাবেন না, জোরে নড়াচড়া করাবেন না।
  • চোষার সুযোগ দেওয়া - বুকের দুধ, পরিষ্কার আঙুল বা প্যাসিফায়ার কিছু শিশুকে শান্ত করে। বুকের দুধ খাওয়ানো চললে খাওয়ানোর ছন্দ ঠিকমতো তৈরি হওয়ার পর, সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের দিকে প্যাসিফায়ার দেওয়া যেতে পারে, যদি চিকিৎসক ভিন্ন পরামর্শ না দেন।

প্রতিবার পাঁচটিই করতে হবে এমন নয়। এক বা দুটি পদ্ধতি চেষ্টা করে দেখুন, আপনার শিশুর কোনটি পছন্দ হয়।

৪. স্লিং বা বেবি ক্যারিয়ার ব্যবহার

সঠিকভাবে পরানো স্লিং বা বেবি ক্যারিয়ারে উষ্ণতা, শরীরের কাছাকাছি থাকা এবং হালকা নড়াচড়া একসঙ্গে পাওয়া যায়। অনেক শিশুর কাছে এটি খুব আরামদায়ক। বিশেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যায় যখন শিশু কোলে থাকতে চায় কিন্তু আপনার দুই হাতই দরকার, তখন এটি উপকারী।

নিরাপত্তার জন্য TICKS নিয়ম মানুন: স্লিংটি আঁটসাঁট হবে, শিশুর মুখ সব সময় দেখা যাবে, শিশুর মাথা চুমু দেওয়ার মতো কাছে থাকবে, থুতনি বুকের সঙ্গে লেগে থাকবে না এবং পিঠ ভালোভাবে সমর্থিত থাকবে। কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে যাবে না। স্লিংয়ে শিশুকে দুধ খাওয়ালে সব সময় তার মুখ ও শ্বাসপ্রশ্বাস দেখা যাচ্ছে কি না নিশ্চিত করুন।

৫. সাদা শব্দ

একটানা, কম মাত্রার শব্দ কিছু শিশুকে শান্ত করে, কারণ এতে বাড়ির হঠাৎ শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। বৃষ্টির শব্দ, ফ্যানের মৃদু আওয়াজ বা নির্দিষ্ট সাদা শব্দের রেকর্ডিং ব্যবহার করা যেতে পারে। গানের মতো বারবার সুর বদলায় এমন শব্দ এ ক্ষেত্রে কম কার্যকর হতে পারে।

শব্দের মাত্রা প্রায় ৫০ ডেসিবেল বা তার কম রাখুন, অর্থাৎ স্বাভাবিক নিচু স্বরের কথাবার্তার কাছাকাছি। যন্ত্রটি শিশুর খাট থেকে দূরে রাখুন। সারারাত শিশুর মাথার পাশে জোরে শব্দ চালিয়ে রাখা নিরাপদ নয়।

৬. জায়গা বদলানো

ঘরে কিছুতেই কাজ না হলে জায়গা বদলান। বারান্দায় যান, খোলা জানালার পাশে দাঁড়ান বা ধীরে ধীরে একটু বাইরে হাঁটুন। তাজা বাতাস ও ভিন্ন পরিবেশ অনেক সময় কান্নার ধারাটা ভাঙতে সাহায্য করে।

অন্য ঘরে গেলেও উপকার হতে পারে। কখনও কখনও শিশুর পাশাপাশি মা-বাবারও একটু নতুন পরিবেশ দরকার হয়।

৭. কুসুম গরম পানিতে গোসল

ঘুমের আগে কুসুম গরম পানিতে গোসল করালে অস্থির শিশু কিছুটা আরাম পেতে পারে। পানি যেন গরম না হয়, শুধু আরামদায়ক উষ্ণ থাকে। গোসলের আগে তোয়ালে, কাপড়, ডায়াপার সব হাতের কাছে রাখুন, যাতে সব সময় এক হাত শিশুর গায়ে থাকে।

সব শিশু গোসল পছন্দ করে না। পানিতে নামলেই যদি সে আরও বেশি কাঁদে, তাহলে জোর করবেন না। এমন কোনো রাতের রুটিন দরকার নেই যা সবার কষ্ট বাড়ায়।

৮. গাড়িতে বা প্রামে একটু ঘোরা

গাড়ি বা প্রামের একটানা হালকা নড়াচড়া অনেক শিশুকে শান্ত করে। রাতের দিকে শিশুর কান্না বেড়ে গেলে বা সন্ধ্যা খুব কঠিন মনে হলে এটি কাজে লাগতে পারে। শিশুকে অবশ্যই বয়স ও ওজন অনুযায়ী উপযুক্ত কার সিট বা প্রামের হারনেসে নিরাপদে বসাতে হবে।

গাড়ির সিটে ঘুমিয়ে পড়লে গন্তব্যে পৌঁছে সুযোগমতো শিশুকে চিৎ করে শক্ত ও সমতল ঘুমের জায়গায় শুইয়ে দিন। কার সিট ভ্রমণের জন্য, নিয়মিত ঘুমের জন্য নয়।

কলিকের লক্ষণ এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

সুস্থ দেখালেও কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া শিশু যদি দীর্ঘ সময় অনেক কাঁদে, তখন অনেকেই একে কলিক বা পেটের অস্বস্তিজনিত কান্না বলেন। প্রচলিত হিসেবে দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি, সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন, অন্তত ১ সপ্তাহ ধরে কান্না চললে একে কলিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহে শুরু হয়, ৬ থেকে ৮ সপ্তাহে বেশি দেখা যায় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে কমে আসে।

কলিকের সম্ভাব্য লক্ষণ:

  • তীব্র কান্না, বিশেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে
  • মুখ লাল বা গরম হয়ে যাওয়া
  • মুঠো শক্ত করে রাখা
  • পিঠ বাঁকানো
  • হাঁটু পেটের দিকে টেনে নেওয়া
  • দুধ খাওয়ানো, ঢেকুর তোলা ও কোলে নেওয়ার পরও শান্ত হতে কষ্ট হওয়া

কলিক খুব ক্লান্তিকর হতে পারে, কিন্তু এর জন্য মা-বাবার কোনো ভুল দায়ী নয়। গ্যাসের ড্রপ, ভেষজ ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট বা দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনার আগে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।

বাংলাদেশে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার জন্য ৯৯৯ নম্বরে কল করুন অথবা দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান, যদি শিশুর:

  • বয়স ৩ মাসের কম এবং জ্বর ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়
  • শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, ঠোঁট বা ত্বক নীলচে/খুব ফ্যাকাশে দেখায়, অথবা অস্বাভাবিক ঢিলে হয়ে যায়
  • বারবার জোরে বমি হয় বা বমির রং সবুজ হয়
  • পেট অস্বাভাবিক ফুলে শক্ত হয়ে যায়
  • দুধ কম খায় এবং স্বাভাবিকের তুলনায় ভেজা ডায়াপার অনেক কম হয়
  • এমন র্যাশ হয় যা চাপ দিলে ফিকে হয় না
  • কান্না খুব দুর্বল, অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ বা দীর্ঘ সময় ধরে অন্য রকম শোনায়
  • আপনার মনে জোরালোভাবে হয় যে শিশুর কিছু একটা সমস্যা হয়েছে

নিজের শিশুকে আপনি সবচেয়ে ভালো চেনেন। সন্দেহ হলে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন না।

কিছুতেই শান্ত না হলে: শিশুর এবং নিজের নিরাপত্তা

এমন সময় আসতেই পারে যখন আপনি দুধ খাইয়েছেন, ডায়াপার বদলেছেন, ঢেকুর তুলিয়েছেন, কোলে নিয়েছেন, দোল দিয়েছেন, হাঁটিয়েছেন, শশ শব্দ করেছেন, তবু শিশুর কান্না থামছে না। তখন রাগ, ভয়, অসহায়ত্ব, দুঃখ, এমনকি প্রচণ্ড বিরক্তি আসতে পারে। এসব অনুভূতি অস্বাভাবিক নয়। শিশুর কান্না এমনভাবেই তৈরি যে তা উপেক্ষা করা কঠিন। কষ্ট হচ্ছে মানে আপনি দুর্বল নন।

এ সময় সবচেয়ে জরুরি হলো পরের কাজটি নিরাপদভাবে করা।

আপনি যদি মনে করেন আর সামলাতে পারছেন না:

  1. শিশুকে চিৎ করে খালি, নিরাপদ খাট বা মজেস বাস্কেটে শুইয়ে দিন।
  2. পাঁচ মিনিটের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যান। দরজার বাইরে দাঁড়ালেও হবে।
  3. ধীরে শ্বাস নিন, পানি পান করুন, মুখে পানি দিন অথবা নিজেকে সামলাতে কানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করুন।
  4. কাউকে ফোন করুন। সঙ্গী, বন্ধু, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, স্বাস্থ্যকর্মী বা প্রয়োজনে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করুন।

নিরাপদ খাটে শুয়ে থাকা কান্নারত শিশু, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া কারও কোলে থাকার চেয়ে নিরাপদ। আর কখনও শিশুকে ঝাঁকাবেন না। শিশুকে ঝাঁকালে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মারাত্মক মস্তিষ্কের আঘাত, এমনকি মৃত্যু হতে পারে।

শিশুর কান্না থামানোর উপায় মানেই একটি নিখুঁত কৌশল খুঁজে পাওয়া নয়। শিশুকে লক্ষ্য করা, সাড়া দেওয়া, একবার ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করা এবং কিছু দিন যে সত্যিই কঠিন হবে তা মেনে নেওয়াই এর অংশ। শিশুর নিখুঁত মা-বাবা দরকার নেই। তার দরকার নিরাপত্তা, স্নেহ, আর এমন অভিভাবক যিনি প্রয়োজন হলে নিজের জন্যও সাহায্য নেন।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।
Erby

Erby

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।