টামি টাইম কী, কখন শুরু করবেন, কতক্ষণ রাখবেন এবং কিভাবে উপভোগ করবেন

মা বুকের উপর পেটের দিকে শুইয়ে টামি টাইম করার ছবি

বাচ্চাকে প্রথম বাড়ি নিয়ে আসার পর কয়েকটা সপ্তাহ যেন ঝড়ের মতো কেটে যায়। খাওয়ানো, ডায়াপার বদলানো, রাতে ঘুম ভাঙা, নিজের শেষ গোসলটা কবে দিয়েছেন তাও ঠিক মনে পড়ে না। এরই মধ্যে কেউ একজন বলে বসে, «টামি টাইম শুরু করো!» শুনেই মনে হয়, ব্যস্ত রুটিনে যেন আরেকটা নতুন কাজ যোগ হলো।

একটু থামুন, শ্বাস নিন। টামি টাইম আসলে মোটেও জটিল কিছু না, আর চাইলেই এটা দিনের সবচেয়ে মিষ্টি মুহূর্তগুলোর একটাও হয়ে উঠতে পারে।

এই গাইডে থাকছে টামি টাইম কী, কেন দরকার, টামি টাইম কখন শুরু করবেন, টামি টাইম কতক্ষণ করবেন এবং কিভাবে করলে বাচ্চা আর আপনি দুজনেই উপভোগ করবেন, এমনকি আপনার মনে যদি এখনই হয় যে বাচ্চা একেবারে পছন্দই করছে না।


টামি টাইম কী?

সহজ করে বললে টামি টাইম মানে হলো, শিশু জেগে থাকা অবস্থায় তাকে পেটের উপর উল্টে শুইয়ে রাখা, আর আপনি কাছ থেকে দেখে রাখছেন

ব্যস, এতটুকুই।

এর জন্য আলাদা দামি ম্যাট, ঝকমকে খেলনা, কিছুই লাগে না।

আপনি সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন, আপনার বুকের উপর নবজাতক পেটের দিকে শুয়ে, জেগে আছে - এটাও কিন্তু পুরোপুরি নবজাতকের জন্য টামি টাইম। আবার মেঝেতে একটা পরিষ্কার চাদর বা প্লে ম্যাট বিছিয়ে তার উপর বাচ্চাকে পেটে শুইয়ে আপনি পাশে বসে থাকলেন, এটাও ঠিক টামি টাইম।

মোট কথা, তিনটা জিনিস ঠিক আছে কিনা দেখুন:

  • বাচ্চা পেটে ভর দিয়ে শুয়ে আছে
  • বাচ্চা জেগে আছে
  • সব সময় আপনার নজরদারিতে আছে

ঘুমানোর সাথে এর পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশসহ বেশির ভাগ দেশে ডাক্তাররা পরামর্শ দেন, আকস্মিক শিশুমৃত্যু (SIDS) কমাতে শিশুকে সব সময় চিত হয়ে শুইয়ে ঘুম পাড়াতে। তাই মনে রাখুন, ঘুমের সময় পিঠে, খেলার সময় পেটে - মানেই টামি টাইম।


টামি টাইম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

অনেকেই শোনেন টামি টাইম উপকারিতা অনেক, কিন্তু কী কী সেটা ঠিক পরিষ্কার করে কেউ বোঝায় না। সহজ ভাষায় ভেঙে বলি।

১. গড়াগড়ি, বসা আর হামাগুড়ির প্রস্তুতি

শিশুকে পেটের দিকে শুইয়ে রাখলে সে স্বাভাবিকভাবেই মাথা তুলতে, এদিক ওদিক ঘুরাতে চেষ্টা করে। এই ছোট্ট চেষ্টাতেই কাজ হয় অনেকগুলো মাংসপেশিতে:

  • ঘাড়ের পেশি - মাথা শক্ত করে ধরে রাখার জন্য
  • কাঁধ আর হাতে - ওপরের অংশ ভর করে তোলার জন্য
  • পিঠ আর পেটের (কোর) পেশি - ভারসাম্য আর স্থিতি রাখার জন্য

এই শক্তিগুলোই পরে দরকার হয় যখন বাচ্চা:

  • গড়াগড়ি খেতে শুরু করে
  • ধীরে ধীরে ভর দিয়ে বসতে শেখে
  • হামাগুড়ি দেয়
  • আর একটু বড় হয়ে দাঁড়াতে ও হাঁটতে চায়

মানে, টামি টাইম আসলে একধরনের নমনীয় ঘাড় শক্ত করার ব্যায়াম আর পুরো শরীরের হালকা ব্যায়াম। শিশুর ঘাড় ও কাঁধ শক্ত করা, ভবিষ্যতে সঠিকভাবে নড়াচড়া শেখা - সব কিছুর একটা বেসিক প্রস্তুতি তৈরি করে এই টামি টাইম।

২. মাথা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া রোধে সাহায্য

আজকাল বাচ্চারা অনেক বেশি সময় পিঠে ভর দিয়ে পরে থাকে - ঘুম, দোলনা, কার সিট, প্রাম, বাউন্সার, সব কিছুতেই পিঠের উপর চাপ পড়ে। এক দিকের একই জায়গায় বেশি চাপ পড়লে মাথার পেছনটা বা এক পাশ একটু চ্যাপ্টা হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় প্লাজিওসেফালি

নিয়মিত টামি টাইম করলে সেই চাপের জায়গা বদলে যায়। অর্থাৎ মাথার পেছনের দিকে সারাক্ষণ ভর না পড়ে কিছুটা সময় পেটের দিকে থাকে, ফলে শিশুর মাথা চ্যাপ্টা হওয়ার ঝুঁকি কমে, অর্থাৎ সহজ ভাষায় প্লাজিওসেফালি প্রতিরোধেও সাহায্য করে।

বাংলাদেশ ও ভারতের বহু শিশু বিশেষজ্ঞ, এবং আন্তর্জাতিক গাইডলাইনেও, প্রতিদিনের রুটিনে নিয়মিত টামি টাইম যোগ করতে বলা হয় মাথার ঠিকঠাক আকার বজায় রাখার জন্য।

৩. মোটর ডেভেলপমেন্ট আর শরীর সম্পর্কে ধারণা

টামি টাইমের সময় ধীরে ধীরে শিশুর আচরণে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যেমন:

  • আশপাশে তাকানো
  • হাত বাড়িয়ে খেলনা ধরার চেষ্টা করা
  • দুপাশে শরীরের ভর একটু একটু করে সরিয়ে নেওয়া

এই সব ছোট ছোট কাজ মিলেই পরে গড়ে ওঠে:

  • হাত-চোখের সমন্বয়
  • নিজের হাত-পা সম্পর্কে সচেতনতা
  • শরীর ঠিক কোথায় আছে, কিভাবে নড়াচড়া করছে সেই অনুভূতি

পাশাপাশি, চিত হয়ে সব সময় সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে বাচ্চা নতুন কোণ থেকে ঘর দেখে, আপনার মুখ অন্যভাবে দেখতে পায়, সামনে রাখা খেলনা, ম্যাট বা চাদরের টেক্সচার আলাদা করে টের পায়। বাইরে থেকে যতটা ছোট ব্যাপার মনে হয়, বাচ্চার মস্তিষ্ক আর বিকাশের জন্য এগুলো কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।


টামি টাইম কখন শুরু করবেন

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর প্রথম দিক থেকেই চাইলে আপনি টামি টাইম শুরু করতে পারেন।

শুনতে খুব তাড়াতাড়ি লাগতে পারে, কিন্তু শুরুর দিককার নবজাতকের জন্য টামি টাইম আসলে অনেক নরম, অনেক বেশি আদুরে ধাঁচের। একদম ব্যায়াম ভাবার দরকার নেই, বরং বুকের কাছে জড়িয়ে রাখা ভাবুন।

জীবনের প্রথম এক-দু সপ্তাহে বুকের উপর টামি টাইম করলেই ভালো শুরু হয়ে যায়:

  • খাট বা সোফায় একটু হেলান দিয়ে শুয়ে থাকুন
  • আপনার বুকে বা পেটের উপর বাচ্চাকে পেটে ভর দিয়ে শুইয়ে দিন, মাথা এক পাশে ঘুরিয়ে রাখুন
  • প্রয়োজন মনে হলে ঘাড় ও মাথা হাতে হালকা সাপোর্ট দিন
  • আস্তে আস্তে কথা বলুন, গুনগুন করুন বা লোরি গেয়ে দিন

এটাও কিন্তু পুরোপুরি টামি টাইম হিসেবে ধরা হয়। শুরুতে নবজাতক খুব একটা মাথা তুলতে না-ও পারে, আপনার গায়ে মুখ গুঁজে আরাম করে থাকবে - তাতেও সমস্যা নেই, এভাবেই শুরু।

দিন বাড়ার সাথে সাথে আর আপনার আত্মবিশ্বাস একটু বাড়লে, খুব অল্প সময়ের জন্য বাচ্চাকে মেঝেতে পরিষ্কার ও শক্ত পৃষ্ঠে (প্লে ম্যাট, চাদর) পেটে শুইয়ে দেখতে পারেন, অবশ্যই সব সময় একদম পাশে থেকে।

মনেই যদি প্রশ্ন আসে টামি টাইম কখন শুরু করবো, উত্তর হলো - আপনি যত তাড়াতাড়ি মানসিকভাবে প্রস্তুত বোধ করবেন, প্রথম দিকের দিনগুলো থেকেই একটু একটু করে শুরু করতে পারেন। লক্ষ্য রাখুন, অল্প অল্প, বার বার।


টামি টাইম কতক্ষণ করবেন আর কত বার করবেন?

নতুন বাবা-মায়েরা খুব স্বাভাবিকভাবেই জানতে চান:

  • «আসলেই টামি টাইম কতক্ষণ হওয়া উচিত?»
  • «দিনে কত বার শিশুর টামি টাইম করাবো?»
  • «নবজাতকের টামি টাইম কতক্ষণ হলে ঠিক আছে?»

আপনার শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য দেখে ধরে নেওয়ার জন্য এখানে একটা ব্যবহারিক গাইড দিলাম।

জীবনের প্রথম ক’সপ্তাহ

  • একেকবার ১ থেকে ৩ মিনিট দিয়ে শুরু করুন
  • দিনে ২ থেকে ৩ বার ছোট ছোট সেশন রাখার চেষ্টা করুন
  • বুকের উপর টামি টাইমকেও কিন্তু সেশন হিসেবেই ধরুন

শুরুতে যদি বাচ্চা মোটে ৩০ সেকেন্ডও সামলাতে পারে, তাতেই হবে। ধীরে ধীরে সেখান থেকে সময় বাড়ানো যায়। আসল কথা, ছোট ছোট অনুশীলনই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।

প্রায় ১ মাসের কাছাকাছি

অনেক বাচ্চাই তখন দিনে মোট ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মতো টামি টাইম সামলে নিতে পারে। একটানা একবারে বসিয়ে দেওয়ার দরকার নেই, বরং একদম উল্টো।

পুরোটা সময়কে ভাগ করে নিন:

  • একবারে ৩ থেকে ৫ মিনিট
  • আরেক সময়ে আবার ৩ থেকে ৫ মিনিট
  • মাঝখানে কিছুটা বুকের উপর টামি টাইম

বাচ্চা যত শক্তিশালী আর আরামদায়ক বোধ করবে, একেকটা সেশনের দৈর্ঘ্য একটু একটু করে বাড়াতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় কথা, সব সময় বাচ্চার সিগন্যাল শুনুন। যদি কাঁদতে কাঁদতে খুব বিরক্ত হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গেই তুলে নিন, আদর করুন। আগে আরাম, পরে অনুশীলন। আবার একটু পরে, মুড ভালো হলে নতুন করে চেষ্টা করলেই হয়।


টামি টাইমের ভঙ্গি: শুধু মেঝেতে উল্টে শোয়ানো নয়

অনেকের মাথায় টামি টাইম মানেই ছবি ভেসে ওঠে - ছোট্ট নবজাতককে মেঝেতে পেটে শুইয়ে রাখা, আর সে মুখ বাঁকা করে পড়ে আছে। বুঝতেই পারি কেন তখন ব্যাপারটা ভয়ের আর চাপের মনে হয়।

কিছু সহজ টামি টাইম টিপস জানলে পুরো বিষয়ই অনেক নরম আর ফ্লেক্সিবল হয়ে যায়।

১. আপনার বুকের উপর টামি টাইম

নবজাতকের জন্য টামি টাইম শুরু করার সবচেয়ে সহজ আর আরামদায়ক পজিশনগুলো যেন এটি:

  • আপনি খাট, সোফা বা বড় চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসুন বা শুয়ে থাকুন
  • আপনার বুক বা পেটের উপর বাচ্চাকে পেটে ভর দিয়ে শুইয়ে দিন, মুখ আপনার দিকেই থাকবে
  • প্রয়োজনে হাত দিয়ে মাথা সামলিয়ে দিন
  • দুই হাত দিয়ে বাচ্চাকে ভালোভাবে বেষ্টন করে ধরুন, যেন নিরাপদ মনে হয়

আপনার শরীরের উষ্ণতা, হার্টবিটের শব্দ, আর কাছ থেকে আপনার মুখ - সব মিলিয়ে বাচ্চার কাছে এটা সাধারণত খুবই আরামদায়ক লাগে।

২. কোলে বা হাঁটুর উপর আড়াআড়ি শুইয়ে

এটাও খুব সহজ আর ব্যবহারিক একটা ভঙ্গি:

  • আপনি আরাম করে বসুন, হাঁটু একসাথে বা একটু ফাঁকায়
  • বাচ্চাকে আপনার উরুর উপর আড়াআড়ি করে পেটে ভর দিয়ে শুইয়ে দিন, মাথা এক পাশে ঘোরানো
  • এক হাত আলতো করে তার পিঠ বা নিতম্বের উপর রাখুন, যেন সে ভর অনুভব করে
  • চাইলে হাঁটু আস্তে আস্তে দোলাতে পারেন বা পিঠে হালকা চাপড় দিতে পারেন

ডায়াপার বদলের পর, বা ক্যারিয়ারে তোলার আগে ছোট্ট একটা টামি টাইম সেশন করাতে চাইলে এই পজিশন বেশ সুবিধাজনক।

৩. মেঝেতে রোল করা তোয়ালে দিয়ে

মেঝেতে দেওয়ার সময় এভাবে চেষ্টা করে দেখতে পারেন:

  • মেঝেতে প্লে ম্যাট বা পরিষ্কার মোটা চাদর বিছিয়ে নিন
  • একটা ছোট তোয়ালে রোল করে বাচ্চার বুকের নিচে রাখুন, দুই বগল বরাবর
  • বাচ্চার দুটো হাত তোয়ালের সামনের দিকে রেখে দিন, যেন হাত দিয়ে ভর দিতে পারে
  • আপনি তার চোখের সমতলেই গিয়ে শুয়ে বা বসে পড়ুন

তোয়ালে সামান্য উঁচু ভর দেয় বলে অনেক বাচ্চার জন্য মাথা তোলা আর আশপাশ দেখা সহজ হয়।

চাইলে আরও করতে পারেন:

  • মেঝেতে বসে নিজের উরুর উপর অর্ধেক শরীর রেখে পেটে শুইয়ে দেওয়া
  • শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ টামি টাইম কুশন বা ওয়েজ ব্যবহার (থাকলে)

যে ভঙ্গিটাই বেছে নিন না কেন, মনে রাখবেন টামি টাইমের সময় কখনই বাচ্চাকে একা ফেলে যাবেন না


টামি টাইম উপভোগ্য করার কৌশল

টামি টাইম যদি প্রতিবার যুদ্ধের মতো মনে হয়, তাহলে বাচ্চা তো কষ্ট পায়ই, আপনিও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে যাবেন। সামান্য কিছু পরিবর্তন অনেক সময় পুরো অভিজ্ঞতাটাই বদলে দিতে পারে।

চোখের সমতলে চলে আসুন

উপর থেকে বসে বা দাঁড়িয়ে বাচ্চার দিকে শুধু তাকিয়ে না থেকে, চেষ্টা করুন একদম তার চোখের সামনে চলে আসতে। পাশ ফিরে বা উল্টে শুয়ে পড়ুন, যাতে আপনার মুখ তার খুব কাছে থাকে। চোখে চোখ রাখুন, হাসুন, মজার মজার মুখভঙ্গি করুন। খেলনার চেয়ে বাচ্চারা মানুষের মুখই বেশি পছন্দ করে।

মানে, তার কাছে আপনি-ই সবচেয়ে বড় খেলনা আর বিনোদন।

সহজ কিন্তু আকর্ষণীয় খেলনা

অতিরিক্ত অনেক খেলনার দরকার নেই। কিছু ছোট্ট আইডিয়া:

  • একটা বেবি সেফ আয়না, তাতে সে নিজের মুখ দেখতে পাবে
  • ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট বা খুব উজ্জ্বল রঙের খেলনা, যেগুলো দূর থেকেও চোখে পড়ে
  • একটু বড় হলে, নরম ঝুনঝুনি বা শব্দ করে এমন কিছু খেলনা সামনে রাখা

খেলনাগুলো একদম সামনে নয়, একটু পাশ ঘেঁষে রাখুন, যেন সে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে উৎসাহ পায়। ধীরে ধীরে এক পাশ থেকে আরেক পাশে সরালে চোখ দিয়ে ট্র্যাক করতে শিখবে।

কথা, গান আর গল্প

আপনার কণ্ঠস্বর বাচ্চার কাছে খুব পরিচিত আর স্বস্তিদায়ক। তাই টামি টাইমের সময়:

  • ছোট কোনো ছড়া বা লোরি গাইতে পারেন
  • যা করছে সেটা নিয়ে বলুন: «দেখি তো, কী সুন্দর করে মাথা তুলছো», «আমি কিন্তু দেখছি তুমি আয়নার দিকে তাকিয়ে আছো»
  • কথা বলতে ইচ্ছা না করলে আস্তে গুনগুন করলেও হয়

এভাবে সময় কাটানো মানে শুধু টামি টাইম না, একই সঙ্গে বাচ্চার ভাষা শেখার আগের ধাপগুলোও তৈরি হচ্ছে।

ছোট রাখুন, কিন্তু আনন্দ দিয়ে

বিশেষ করে শুরুর দিকে সময় কম হলেও, অভিজ্ঞতা যেন ভাল থাকে - এটাকে অগ্রাধিকার দিন। খুশি আর শান্ত মুডে ২ মিনিট টামি টাইম হওয়া, কাঁদতে কাঁদতে ১০ মিনিট টেনে নেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ভালো।

সম্ভব হলে প্রতিটা সেশনের শেষটা যেন ইতিবাচক হয়। দেখবেন বাচ্চার বিরক্তি একটু বাড়ছে, এমন সময়েই তুলে নিয়ে একবার জড়িয়ে ধরুন, বুঝিয়ে দিন যে আপনি ওর কথা শুনছেন।


যদি আপনার বাচ্চা টামি টাইম একদমই না পছন্দ করে?

অনেক বাচ্চাই শুরুতে টামি টাইমে একটু কান্নাকাটি করে, অসন্তুষ্ট হয়। এতে ধরে নেওয়ার কিছু নেই যে আপনি ভুল করছেন।

আপনার মনে যদি হয়, বাচ্চা টামি টাইম একদম সহ্যই করতে পারছে না:

  • প্রথমে বুকের উপর থেকেই শুরু করুন
    বেশির ভাগ শিশু মেঝের চেয়ে বুকের উপর টামি টাইমকে অনেক বেশি পছন্দ করে। আপনার গন্ধ, উষ্ণতা আর কাছের দূরত্ব ওদের নিরাপদ বোধ করায়।

  • সেশন খুব ছোট রাখুন
    প্রথম দিকে ভাবুন ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট, তারপরই তুলে নিন। বাচ্চা একটু একটু করে অভ্যস্ত হলে কয়েক সেকেন্ড করে বাড়ান।

  • ঠিক সময় বেছে নিন
    ভালোভাবে ঘুমিয়ে উঠে আর পেট মোটামুটি ভরা, কিন্তু একদম টাটকা ভরা না - এমন সময় বেছে নিন। খুব ক্ষুধার্ত, খুব ঘুম পেয়েছে বা সারাদিনে অনেক বেশি স্টিমুলেশন পেলে তখন টামি টাইম করালে আরও বিরক্তি বাড়বে।

  • হালকা দোল বা নড়াচড়া ব্যবহার করুন
    হাঁটুর উপর পেটে শুইয়ে রেখে আলতো দোলানো, বা খুব সাবধানে আপনার হাতে ধরে এক্সারসাইজ বলের উপর সামান্য এগিয়ে-পিছিয়ে করা, অনেক সময় বাচ্চাকে শান্ত রাখে।

  • পৃষ্ঠ বা বিছানা বদলে দেখুন
    কেউ কেউ শক্ত ম্যাট পছন্দ করে, কারও আবার নরম চাদর ভালো লাগে। প্লে ম্যাট, ভাঁজ করা কম্বল বা নতুন টেক্সচারের চাদর দিয়ে একদিন করে ট্রাই করে দেখতে পারেন।

সবচেয়ে জরুরি, জোর করবেন না। বাচ্চা যদি খুব বেশি কাঁদে বা অস্বস্তি হয়, সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিন, বুকের কাছে নিন, একটু শান্ত হোক। অন্য সময়, অন্য ভঙ্গিতে, আরও ছোট সময়ের জন্য আবার চেষ্টা করা যাবে।

টামি টাইমে বাচ্চা কাঁদলে আপনি খারাপ মা বা বাবা হয়ে গেলেন না। বরং দুজনেই শেখার পথে আছেন।


কখন টামি টাইম না করাই ভালো

কিছু কিছু পরিস্থিতিতে টামি টাইম এড়িয়ে চলা ভালো:

  • একদম খাওয়ানোর পরপরই
    পেট ভরা অবস্থায় পেটে শুইয়ে দিলে অস্বস্তি লাগতে পারে, বমি বা দুধ উগরে দেওয়ার সম্ভবনাও বাড়ে। তাই ফিডের পর কিছুটা সময় বিরতি দিয়ে তারপর শুরু করুন।

  • যখন বাচ্চা খুব ক্লান্ত বা খুব ক্ষুধার্ত
    তখন টামি টাইম মানে তার জন্য আলাদা আরেকটা ঝামেলা, মিনি-ওয়ার্কআউটের শক্তি থাকেই না।

  • যদি বাচ্চা জ্বরে ভুগছে বা অসুস্থ
    তখন অগ্রাধিকার হবে শুধু আরাম দেওয়া। এ সময় টামি টাইমের জন্য আলাদা করে চাপ দেবেন না, আপনার শিশু বিশেষজ্ঞ বা নিকটস্থ হাসপাতাল/স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরামর্শ মেনে চলুন।

বাচ্চার যদি আগে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যা, খুব বেশি রিফ্লাক্স, পেশির টোন নিয়ে সন্দেহ, বা অন্য কোনো বিশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট বা কমিউনিটি ক্লিনিকের ডাক্তারদের কাছ থেকে টামি টাইম কিভাবে করবেন সে বিষয়ে ব্যক্তিগত পরামর্শ নেওয়াই ভালো।


আপনার জন্য ছোট্ট মনে করিয়ে দেওয়া কথা

টামি টাইম খুব উপকারী, এটা ঠিক। এর মাধ্যমে বাচ্চার পেশি শক্ত হয়, নড়াচড়া শেখার ভিত্তি তৈরি হয়, প্লাজিওসেফালি প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটা আপনার আর আপনার শিশুর জন্য প্রতিদিনের একান্ত কাছের সময় হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু এটাকে কোনো পরীক্ষার মতো ভাবার দরকার নেই, যেখানে আপনি পাস বা ফেল করবেন।

কিছু দিন আপনি ঠিকই পারবেন, দিনে ২ থেকে ৩ বার শিশুর টামি টাইম করাতে। আবার কিছু দিন যেন কেবল খাওয়ানো, ডায়াপার আর ঘুমের দৌড়াদৌড়িতেই কেটে যাবে, রাতের দিকে হঠাৎ মনে পড়বে, «আহা, আজ তো টামি টাইমই করালাম না!» - এই অনুভূতিটা প্রায় সব বাবা-মায়েরই হয়।

গুরুত্বপূর্ণ হলো:

  • আপনি এখন জানেন টামি টাইম কী, আর কেন এটা দরকার।
  • আপনি ইচ্ছা করছেন, দৈনন্দিন রুটিনের ভেতরেই সুযোগ পেলে কিছু শিশুর টামি টাইম জুড়ে দেওয়ার।
  • আপনি বাচ্চার ইশারা বোঝার চেষ্টা করছেন, বেশি চাপিয়ে দিচ্ছেন না।

এভাবে একটু একটু করে চালিয়ে যেতে থাকলে, আপনি টের না পেলেও বাচ্চা আস্তে আস্তে অনেকটা এগিয়ে যাবে। একদিন হঠাৎ দেখবেন, সে পেটে ভর দিয়ে সুন্দর করে কনুইয়ের উপর ভর করে মাথা উঁচু করে রেখেছে, কিংবা নিজেই টামি থেকে গড়িয়ে চিত হয়ে গেছে, তখন আপনার মনে হবে, «আরে, এটা তো কবে শিখে ফেললে তুমি!»

এই নীরব, প্রতিদিনের ছোট ছোট অগ্রগতিই আসলে টামি টাইমের আসল জাদু।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই প্রবন্ধগুলি আপনার জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।