সাত সপ্তাহ। প্রথম মাস পার করেছেন, আয়নায় তাকালে এখন নিজের শিশুকেই চিনে ফেলেন, আর গোটা দিনটা আগের মতো একদম অগোছালো না লাগলেও একটু হলেও পরিচিত লাগছে।
শান্তি আর স্থিরতা হয়তো এখনো অনেক দূরের কথা, কিন্তু আপনি আর আপনার ৭ সপ্তাহের শিশু - দুজনই ধীরে ধীরে তাল মিলিয়ে নিচ্ছেন।
এ বয়সটাকে অনেক পেডিয়াট্রিশিয়ানই টার্নিং পয়েন্ট বলেন। আপনার ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশ এখন একটু স্পষ্ট হয়ে ওঠে - হাসি, নড়াচড়া, খাওয়া আর ঘুমের ধরনে পরিবর্তন, আর প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন এক মানুষকে দেখতে পাওয়ার আনন্দ।
প্রায় ৭ সপ্তাহে এসে অনেক মা–বাবা লক্ষ্য করেন, নবজাতকের সেই একদম শুরুর ধাপটা একটু বদলাচ্ছে।
নবজাতকের বিকাশের বেশ কিছু ইঙ্গিত আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যেমন:
প্রতিটি শিশু নিজের গতিতে বড় হয়, তাই ৭ সপ্তাহের শিশুর মাইলস্টোনগুলোকে তালিকা ধরে টিক চিহ্ন দেওয়ার মতো চাপ নেবেন না। এগুলো কেবল ধারনা পেতে সাহায্য করবে, বাধ্যতামূলক কিছু না।
৭ সপ্তাহের শিশুর মোটর উন্নয়ন খুব দ্রুত বদলাতে থাকে। হঠাৎ একদিন কোলে নিতে গিয়ে মনে হতে পারে, আগের মতো একদম ঢিলেঢালা আর ফ্লপ্পি লাগছে না। ভুল দেখছেন না, ও সত্যিই একটু শক্ত হয়ে উঠছে।
অনেক মা–বাবার মনের প্রশ্ন থাকে, «শিশু কবে থেকে মাথা ধরে রাখতে পারে?»
৭ সপ্তাহ মানে আপনি ঠিক সেই ধাপের মাঝখানে আছেন।
এই বয়সে সাধারণত:
আরও যা দেখতে পারেন:
এই ৭ সপ্তাহের শিশুর মাথা নিয়ন্ত্রণ আরও ভালো করতে:
শিশুর মাথা যদি সবসময় খুব ঢিলেঢালা লাগে, বা সব সময় একদিকে হেলানো থাকে আর হালকাভাবে ঘোরাতেও কষ্ট হয়, তাহলে নোট করে রাখুন। পরেরবার শিশু বিশেষজ্ঞ বা কমিউনিটি ক্লিনিকে (পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র / মাতৃসদন) গেলে একবার জানিয়ে দেখান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুরুতর কিছু হয় না, তবে বিশেষজ্ঞের চোখে দেখা ভালো।
প্রথম প্রথম টামি টাইম করালে হয়তো ওর মুখ সোজা ম্যাটে লেগে যেত, আর একটু পরেই কান্না!
এখন, ৭ সপ্তাহের শিশুর টামি টাইম সাধারণত এরকম হয়:
টামি টাইম কিভাবে করাবেন, যাতে ওরও ভালো লাগে আর আপনারও সুবিধা হয়:
টামি টাইম শুরু করলেই যদি কান্না শুরু হয়, সময় ধরে দেখুন। প্রথমে ৩০ সেকেন্ড হলেও সেটা গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। আস্তে আস্তে সময় নিজে থেকেই বাড়বে।
নবজাতক বয়সে হঠাৎ চমকে ওঠা আর টান টান কেঁপে ওঠা হাত–পা এখন একটু শান্ত হচ্ছে।
৭ সপ্তাহে:
শিশুর স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে, তাই জন্মের সময়কার রিফ্লেক্সভিত্তিক নড়াচড়া কমে গিয়ে, একটু বেশি উদ্দেশ্যমূলক নড়াচড়ার দিকে যাচ্ছে। ৭ সপ্তাহের শিশুর নড়াচড়া এমন বদলানো একদম স্বাভাবিক।
এ সপ্তাহে একবার শিশুর হাতে ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখুন। খুব ছোট অথচ দারুণ একটা মাইলস্টোন চোখে পড়বে।
আগে যেখানে হাত প্রায় সবসময়ই শক্ত মুঠো করে থাকত, এখন দেখবেন:
এগুলো হলো পরের ধাপে গিয়ে খেলনা ধরা, আপনার আঙুল চেপে ধরা, গামছা টেনে ধরা - এসবের শুরু।
ওকে সাহায্য করতে পারেন এভাবে:
দেখতে যত ছোট মনে হয়, শিশুর বিকাশের ভাষায় এটা কিন্তু একদম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ - হাত সমন্বয় করে ব্যবহার শেখার শুরু।
৭ সপ্তাহের শিশুর চোখ এখন বেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। যেই ঝাপসা দুনিয়া থেকে ও শুরু করেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আস্তে আস্তে আপনাকে আর চারপাশকে আরও পরিষ্কারভাবে দেখছে।
প্রায় ৭ সপ্তাহ বয়সে অনেক শিশু পারে:
বাড়িতে ছোট্ট টেস্ট করতে পারেন:
প্রতিবারই পুরোটা অনুসরণ করবে, এমন না। কয়েক সেকেন্ড খেলা করলেই যথেষ্ট। জোর করে বেশি সময় করানোর দরকার নেই।
অনেক মা–বাবাই জানতে চান, «শিশু কখন রঙ চিনতে পারে?»
৭ সপ্তাহের নবজাতকের বিকাশ অনুযায়ী:
এ জন্য ঘরবাড়ি নতুন করে সাজানোর দরকার নেই। কয়েকটা উজ্জ্বল রঙের খেলনা, বড় ছবি সহ সাদাসিধে গল্পের বই, বা আপনার একটা রঙিন ওড়নাই শিশুর চোখের জন্য যথেষ্ট মজার।
এই বয়সে সবচেয়ে সুন্দর যে পরিবর্তনটা ধরা পড়ে, তা হলো - আপনার ৭ সপ্তাহের শিশু এখন স্পষ্টভাবে মানুষকে জিনিসের চেয়ে বেশি পছন্দ করে।
প্রায় ৭ সপ্তাহে:
এখানেই সামাজিক বিকাশ আর দৃষ্টি বিকাশ একসাথে কাজ করছে। কথা বলার সময় মুখের অভিব্যক্তি একটু বাড়িয়ে বলুন, ধীরে হাসুন, ভ্রু উঠান, ঠোঁট গোল করে রাখুন। করতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, শিশুর কিন্তু ভীষণ ভালো লাগে।
এ অংশটা সাধারণত সবচেয়ে আনন্দের। ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশ এখন শুধু শারীরিক না, সামাজিক দিক থেকেও বেশ এগোতে থাকে। এখন আর শুধু ক্ষুধা আর ঘুমের গল্প না, ও নিজের মতো করে সম্পর্ক গড়া শুরু করেছে।
এর আগেও হয়তো হালকা হাসি দেখেছেন, ঘুম–ঘুম ভাবের মধ্যে। কিন্তু ৭ সপ্তাহে এসে অনেক মা–বাবা লক্ষ্য করেন:
ছোট্ট একটা «হ্যালো» আলাপ করতে পারেন এভাবে:
এই ছোট্ট ওঠানামাই শিশুর প্রাথমিক সামাজিক দক্ষতা। শব্দ ছাড়াই এটাই ওর ভাষা।
পরিচিত মুখ দেখলেই এখন অনেক শিশুই আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখায়, বিশেষ করে মূল কেয়ারগিভারদের ক্ষেত্রে।
যে সব লক্ষণ দেখতে পারেন:
ঘরে ঢোকার সময়, বিছানার ওপর ঝুঁকে তাকালে, বা ঘুম থেকে ওঠার পর কোলে নিলে - এসব মুহূর্তে ওর এই এক্সাইটমেন্ট আসলে একরকম স্পষ্ট বার্তা - «এই তো তুমি, আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম!»
প্রায় ৭ সপ্তাহ থেকে শিশু ধীরে ধীরে শুরু করে:
আপনি হয়তো দেখবেন:
একদম ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করা ধরনের স্ট্রেঞ্জার অ্যানজাইটি এখনো আসে না, সেটা একটু পরে হয়। এখন কেবল ওর ছোট্ট «নিজের গোষ্ঠী» বা ইননার সার্কেল তৈরি হওয়ার শুরু।
শিশুর এই কচি–কচি আওয়াজগুলোই ভবিষ্যতের কথা বলা শেখার বীজ। এখন শুনতে শুধু মিষ্টি শব্দ মনে হলেও, ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশের জন্য এই পর্যায়টা অনেক অর্থবহ।
৭ সপ্তাহের শিশু সাধারণত আগের তুলনায় বেশি:
খেয়াল করলে দেখবেন, ও বেশি ‘কথা’ বলে:
ঘরে বসেই টার্ন–টেকিং অনুশীলন করতে পারেন:
এটা নিয়ম করে করতে হবে না, আর বেশিক্ষণও না। মাঝে মাঝে এমন ক্ষুদ্র ‘ডুয়েট’ শিশুর যোগাযোগ বিকাশে অনেক কাজে লাগে।
কিছু ৭ সপ্তাহের শিশু মুখ আর জিহ্বা একটু বেশি ব্যবহার করে নতুন ধ্বনি আবিষ্কার করতে শুরু করে।
কানে পেতে শুনলে পেতে পারেন:
একেবারে পরিষ্কার বা সচেতনভাবে করা শব্দ এখনই আশা করা যায় না। এগুলো মূলত পরীক্ষা–নিরীক্ষা, মুখ–গলা–জিহ্বা দিয়ে কী কী করা যায় সেটা ও নিজেই খুঁজে দেখছে।
অদ্ভুত হলেও সত্যি, অনেক শিশু কিন্তু একলা খাটে শুয়ে থাকলেই সবচেয়ে বেশি প্র্যাকটিস করে।
দেখতে বা শুনতে পেতে পারেন:
যদি ও শান্ত থাকে, পেট ভরা আর নিরাপদ পরিবেশে থাকে, তাহলে কিছুক্ষণ ওকে নিজের মতো থাকতে দিন। এটা ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর আপনার জন্যও হয়তো অল্প সময়ের জন্য গরম চা বা কফি শেষ করে ফেলার বিরল সুযোগ।
নতুন বাবা–মায়ের কাছে প্রথম কয়েক সপ্তাহ মোটামুটি ঝড়ের মতো কাটে। তবে ৭ সপ্তাহে এসে অনেকেই বলেন, «আচ্ছা, একটু হলেও প্যাটার্ন বুঝতে পারছি মনে হয়»।
এখন হয়তো আপনিও লক্ষ্য করছেন, দিনের ভিতরে মোটামুটি এমন একটা ধরন তৈরি হচ্ছে:
এটাকে কড়াকড়িভাবে টাইম–টেবিল বানানোর দরকার নেই। ঘড়ি ধরে, «এখনই ঘুমোতে হবে» টাইপ নিয়ম এ বয়সে চাপের হয়ে যায়। বরং একই সিকোয়েন্স বারবার হতে থাকাই ভালো - খাওয়া, একটু ইন্টারঅ্যাকশন, তারপর ঘুম।
শিশু ঘুমানোর প্রস্তুতিতে আছে, এমন কিছু সিগন্যাল:
ঘড়ির চেয়ে শিশুর সিগন্যালকে বেশি গুরুত্ব দিন। এ বয়সে ওরই শরীরঘড়ি সবথেকে ভালো গাইড।
বাংলা পরিবারে অনেকে একে «সন্ধ্যেবেলা কান্নার সময়» বা «উইচিং আওয়ার» বলে থাকেন। বিকেল–সন্ধ্যার দিকে শিশুকে সামলানো যেন আরও কষ্টকর লাগতে পারে।
৭ সপ্তাহে এসে অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে:
এখনো যদি সন্ধ্যা মানেই আপনাদের বাড়িতে চ্যালেঞ্জ হয়, নিজেকে দোষ দেবেন না। কিছু শিশু স্বভাবগতভাবে সেনসিটিভ হয়, দিনের শেষে জমে থাকা ক্লান্তি আর উদ্দীপনায় ওরা বেশি অস্থির হয়। সাধারণত ১০–১২ সপ্তাহের দিকে এই ধাপ অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।
আরও কিছু ছোট পরিবর্তন যা ৭ সপ্তাহে ধরা পড়ে:
মোবাইলে খুব সিম্পল নোট রাখুন, যেমন - কখন খাওয়ালেন, কখন ঘুমাল, কতক্ষণ জেগে থাকল। টানা কয়েকদিন লিখলে নিজেরই অজান্তে থাকা প্যাটার্ন চোখে পড়বে।
প্রতিটি নবজাতকের বিকাশ একেক রকম। কেউ ৭ সপ্তাহের শিশুর মাইলস্টোন একটু আগে পেরিয়ে যায়, কেউ আবার একটু পরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভ্যারিয়েশন।
তবুও কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি ক্লিনিকের ডাক্তার বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলা ভালো, যেমন যদি:
আপনি সারাদিন শিশুর সঙ্গে থাকেন, ওকে সবচেয়ে বেশি দেখেন। তাই আপনার পর্যবেক্ষণ অনেক মূল্যবান। প্রয়োজনে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল, মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বিশ্বস্ত বেসরকারি পেডিয়াট্রিশিয়ানের কাছে গিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নিন।
সাত সপ্তাহের দিনগুলো একেক দিন একেক রকম লাগতে পারে। কখনো বিকেল পর্যন্ত দিনটাই শেষ না হওয়া মনে হয়, আবার কখনো ছবি দেখে অবাক লাগে, «এতো বড় হয়ে গেল কবে!»
এ সময় আপনার শিশু প্রতিদিন প্র্যাকটিস করছে:
এর মধ্যকার সবগুলো লক্ষণ একই সঙ্গে এখনই দেখা নাও যেতে পারে, তাতে আবারও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শিশু বিকাশ মানে একেবারে সোজা দাগ টেনে এগোনো পথ না, বরং একটা বিস্তৃত সময়সীমার মধ্যে আস্তে আস্তে এগোনো।
আপনি কেবল সুযোগগুলো তৈরি করে যান - একটু নড়াচড়া, একটু দেখা–শোনা, শোনার মতো শব্দ, আর আপনার সাড়া। শিশুর ইশারা–ইঙ্গিতে উত্তর দিতে থাকুন, বারবার একই ভালোবাসার রুটিন দিয়ে দিনভর ঘিরে রাখুন।
আর যখন পারেন, দু–এক মিনিটের জন্য হলেও সব কাজ সরিয়ে রেখে শুধু ওকে দেখুন। ৭ সপ্তাহের এই ছোট্ট মানুষটা এখন আপনার দু’হাতের মধ্যে ঠিকমতো গুটিয়ে যায়, কিন্তু সময়টা চোখের পলকেই পাল্টে যাবে। এই ক্ষুদ্র, ক্লান্তিকর, তবুও অবিশ্বাস্য সুন্দর ধাপটা যতটা সম্ভব নিজের মতো করে উপভোগ করুন।