আপনার ৭ সপ্তাহের শিশু: মাথা নিয়ন্ত্রণ, টামি টাইম, দৃষ্টি, সামাজিক বিকাশ ও কু-কু শেখার ধাপ

৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশ: মাথা নিয়ন্ত্রণ, হাসি ও যোগাযোগ

সাত সপ্তাহ। প্রথম মাস পার করেছেন, আয়নায় তাকালে এখন নিজের শিশুকেই চিনে ফেলেন, আর গোটা দিনটা আগের মতো একদম অগোছালো না লাগলেও একটু হলেও পরিচিত লাগছে।

শান্তি আর স্থিরতা হয়তো এখনো অনেক দূরের কথা, কিন্তু আপনি আর আপনার ৭ সপ্তাহের শিশু - দুজনই ধীরে ধীরে তাল মিলিয়ে নিচ্ছেন।

এ বয়সটাকে অনেক পেডিয়াট্রিশিয়ানই টার্নিং পয়েন্ট বলেন। আপনার ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশ এখন একটু স্পষ্ট হয়ে ওঠে - হাসি, নড়াচড়া, খাওয়া আর ঘুমের ধরনে পরিবর্তন, আর প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন এক মানুষকে দেখতে পাওয়ার আনন্দ।


সামগ্রিক চিত্র: ৭ সপ্তাহের শিশু কী করতে পারে

প্রায় ৭ সপ্তাহে এসে অনেক মা–বাবা লক্ষ্য করেন, নবজাতকের সেই একদম শুরুর ধাপটা একটু বদলাচ্ছে।

নবজাতকের বিকাশের বেশ কিছু ইঙ্গিত আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যেমন:

  • এলোমেলো হাত–পা ছোড়াছুড়ির বদলে কিছুটা উদ্দেশ্যমূলক নড়াচড়া
  • পরিচিত মুখ দেখলে আরও স্পষ্ট ও সামাজিক হাসি
  • জেগে থাকা সময়ে বেশি বিভিন্ন ধরনের কু–কু আর আওয়াজ
  • মোটামুটি একটা খাওয়া–খেলা–ঘুমের রুটিনের মতো প্যাটার্ন তৈরি হওয়া

প্রতিটি শিশু নিজের গতিতে বড় হয়, তাই ৭ সপ্তাহের শিশুর মাইলস্টোনগুলোকে তালিকা ধরে টিক চিহ্ন দেওয়ার মতো চাপ নেবেন না। এগুলো কেবল ধারনা পেতে সাহায্য করবে, বাধ্যতামূলক কিছু না।


শারীরিক বিকাশ: আরও শক্ত, আরও স্থির, আরও মসৃণ

৭ সপ্তাহের শিশুর মোটর উন্নয়ন খুব দ্রুত বদলাতে থাকে। হঠাৎ একদিন কোলে নিতে গিয়ে মনে হতে পারে, আগের মতো একদম ঢিলেঢালা আর ফ্লপ্পি লাগছে না। ভুল দেখছেন না, ও সত্যিই একটু শক্ত হয়ে উঠছে।

মাথা নিয়ন্ত্রণ: প্রতিদিন একটু করে মজবুত

অনেক মা–বাবার মনের প্রশ্ন থাকে, «শিশু কবে থেকে মাথা ধরে রাখতে পারে?»

৭ সপ্তাহ মানে আপনি ঠিক সেই ধাপের মাঝখানে আছেন।

এই বয়সে সাধারণত:

  • আগের সপ্তাহগুলোর তুলনায় মাথা নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ভালো হয়
  • কোলে তুলে বুকের সঙ্গে সোজা করে ধরলে, কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথা সোজা ধরে রাখতে পারে, সাথে সাথে আর দুলে পড়ে না
  • ডায়াপার বদলানোর সময় বা কোলে তুলতে গেলে, মাথা আগের মতো এতটা পিছিয়ে পড়ে না

আরও যা দেখতে পারেন:

  • পেটের ওপর শুইয়ে দিলে মাথা একটু তুলতে আর ঘোরাতে চেষ্টা করে
  • শোয়া অবস্থা থেকে ধীরে টেনে আধা বসা করলে, মাথা একদম ঝুলে না থেকে একটু সামলে রাখে

এই ৭ সপ্তাহের শিশুর মাথা নিয়ন্ত্রণ আরও ভালো করতে:

  • শিশুকে বুকের দিকে সোজা করে কোলে নিন, যেন ও নিজের গলার পেশী ব্যবহার করতে পারে
  • কাঁধের ওপরে মুখ বের করে রাখুন, পেছন দিক থেকে হালকা সাপোর্ট দিন
  • তুলতে–নামাতে গতি ধীর রাখুন, হঠাৎ টানাটানি করবেন না

শিশুর মাথা যদি সবসময় খুব ঢিলেঢালা লাগে, বা সব সময় একদিকে হেলানো থাকে আর হালকাভাবে ঘোরাতেও কষ্ট হয়, তাহলে নোট করে রাখুন। পরেরবার শিশু বিশেষজ্ঞ বা কমিউনিটি ক্লিনিকে (পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র / মাতৃসদন) গেলে একবার জানিয়ে দেখান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুরুতর কিছু হয় না, তবে বিশেষজ্ঞের চোখে দেখা ভালো।

টামি টাইম ৭ সপ্তাহে: বুক আরও উঁচুতে তুলছে

প্রথম প্রথম টামি টাইম করালে হয়তো ওর মুখ সোজা ম্যাটে লেগে যেত, আর একটু পরেই কান্না!

এখন, ৭ সপ্তাহের শিশুর টামি টাইম সাধারণত এরকম হয়:

  • পেটের ওপর শুয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে বুক একটু ওপরে তুলতে পারে
  • ডান–বাম দিকে মাথা ঘোরানো সহজ লাগে
  • কিছুক্ষণ শান্তভাবে চারপাশ দেখে, চুপচাপ কিন্তু সচেতন হয়ে শুয়ে থাকতে পারে

টামি টাইম কিভাবে করাবেন, যাতে ওরও ভালো লাগে আর আপনারও সুবিধা হয়:

  • সোফা বা বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ুন, শিশুকে আপনার বুকে পেটের ওপর রাখুন। আপনার মুখই ওর জন্য সব থেকে বড় মোটিভেশন।
  • খুব সাদাসিধে সাদা–কালো নকশার কার্ড, বা কনট্রাস্ট বেশি এমন ছবির বই ওর চোখের সমান লাইনে রাখুন।
  • একটানা ১৫ মিনিট না করে দিনে কয়েকবার ৩–৫ মিনিট করে করুন। ছোট ছোট কিন্তু বারবার করাই বেশি কার্যকর।

টামি টাইম শুরু করলেই যদি কান্না শুরু হয়, সময় ধরে দেখুন। প্রথমে ৩০ সেকেন্ড হলেও সেটা গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। আস্তে আস্তে সময় নিজে থেকেই বাড়বে।

নড়াচড়া এখন আরও মসৃণ

নবজাতক বয়সে হঠাৎ চমকে ওঠা আর টান টান কেঁপে ওঠা হাত–পা এখন একটু শান্ত হচ্ছে।

৭ সপ্তাহে:

  • হাত–পায়ের মুভমেন্ট অনেক বেশি মসৃণ হয়, শুধু হুট করে ছুড়ে মারার মতো থাকে না
  • ভালো লাগলে পা দিয়ে ছন্দ করে কিক মারতে দেখা যায়
  • উপরের খেলনা বা ঝুলানো র‍্যাটল, কখনো ভুলবশত, আবার কখনো বেশ হিসাব করে, হাত দিয়ে ঠেলে বা ছুঁতে দেখা যায়

শিশুর স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে, তাই জন্মের সময়কার রিফ্লেক্সভিত্তিক নড়াচড়া কমে গিয়ে, একটু বেশি উদ্দেশ্যমূলক নড়াচড়ার দিকে যাচ্ছে। ৭ সপ্তাহের শিশুর নড়াচড়া এমন বদলানো একদম স্বাভাবিক।

ছোট ছোট হাত: মুঠো আলগা হচ্ছে

এ সপ্তাহে একবার শিশুর হাতে ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখুন। খুব ছোট অথচ দারুণ একটা মাইলস্টোন চোখে পড়বে।

আগে যেখানে হাত প্রায় সবসময়ই শক্ত মুঠো করে থাকত, এখন দেখবেন:

  • ধীরে ধীরে মুঠো আলগা করে হাত খুলে রাখছে
  • কখনো কখনো পুরো হাত একদম খোলা অবস্থায় কয়েক সেকেন্ড থেমে আছে
  • হাত মুখের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, কখনো এক হাত দিয়ে আরেক হাত ধরছে বা সামান্য জোড়া লাগিয়ে রাখছে

এগুলো হলো পরের ধাপে গিয়ে খেলনা ধরা, আপনার আঙুল চেপে ধরা, গামছা টেনে ধরা - এসবের শুরু।

ওকে সাহায্য করতে পারেন এভাবে:

  • খুব নরম র‍্যাটল বা কাপড়ের ছোট খেলনা ওর হাতের তালুতে ধরিয়ে দিন
  • আপনার পরিষ্কার আঙুল ওর হাতে দিন, যেন হাত আর মুখ দিয়ে এক্সপ্লোর করতে পারে
  • পাতলা মসলিন / গামছা আলতো করে হাতে গুঁজে দিন, ও যেন নিজে নিজে «ধরতে» পারে

দেখতে যত ছোট মনে হয়, শিশুর বিকাশের ভাষায় এটা কিন্তু একদম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ - হাত সমন্বয় করে ব্যবহার শেখার শুরু।


দৃষ্টি বিকাশ: আরও পরিষ্কার, আরও রঙিন এক পৃথিবী

৭ সপ্তাহের শিশুর চোখ এখন বেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। যেই ঝাপসা দুনিয়া থেকে ও শুরু করেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আস্তে আস্তে আপনাকে আর চারপাশকে আরও পরিষ্কারভাবে দেখছে।

মাঝখান পেরিয়ে তাকানো: চোখ দিয়ে অনুসরণ

প্রায় ৭ সপ্তাহ বয়সে অনেক শিশু পারে:

  • আপনার মুখ বা খেলনাকে এক দিক থেকে মাঝ বরাবর পেরিয়ে আরেক দিক পর্যন্ত চোখ দিয়ে অনুসরণ করতে
  • তাকিয়ে থাকার সময় চোখ কম ক্রস হয় বা কম এদিক–ওদিক ভেসে বেড়ায়
  • আগ্রহের কিছু দেখলে মাথা ঘুরিয়ে চোখ দিয়ে অনুসরণের সাথে সাথে মাথাও ঘোরাতে

বাড়িতে ছোট্ট টেস্ট করতে পারেন:

  1. শিশুর চোখ থেকে প্রায় এক হাত দূরত্বে (২০–৩০ সেন্টিমিটার মতো) আপনার মুখ বা সাদাসিধে একটি খেলনা ধরুন।
  2. খুব ধীরে ডান দিক থেকে নাকের সামনে দিয়ে বাঁ দিকে নিন, আবার উল্টো দিকেও নিন।
  3. দেখুন, ও চোখ দিয়ে কতদূর পর্যন্ত অনুসরণ করে।

প্রতিবারই পুরোটা অনুসরণ করবে, এমন না। কয়েক সেকেন্ড খেলা করলেই যথেষ্ট। জোর করে বেশি সময় করানোর দরকার নেই।

শিশু কখন রঙ চিনে?

অনেক মা–বাবাই জানতে চান, «শিশু কখন রঙ চিনতে পারে?»

৭ সপ্তাহের নবজাতকের বিকাশ অনুযায়ী:

  • কিছু কিছু রঙ আলাদা করে বুঝতে শুরু করে, বিশেষ করে লাল আর উজ্জ্বল রঙগুলো
  • বেশি কনট্রাস্ট আছে এমন প্যাটার্ন (যেমন সাদা–কালো, লাল–সাদা) এখনো ফ্যাকাসে রঙের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়
  • খেয়াল করলে দেখবেন, কোনো উজ্জ্বল লাল খেলনা বা ঝুল, হালকা বেজ রঙের জিনিসের চেয়ে ও বেশি সময় ধরে তাকিয়ে থাকে

এ জন্য ঘরবাড়ি নতুন করে সাজানোর দরকার নেই। কয়েকটা উজ্জ্বল রঙের খেলনা, বড় ছবি সহ সাদাসিধে গল্পের বই, বা আপনার একটা রঙিন ওড়নাই শিশুর চোখের জন্য যথেষ্ট মজার।

মুখ বনাম জিনিস: মানুষই সবার আগে

এই বয়সে সবচেয়ে সুন্দর যে পরিবর্তনটা ধরা পড়ে, তা হলো - আপনার ৭ সপ্তাহের শিশু এখন স্পষ্টভাবে মানুষকে জিনিসের চেয়ে বেশি পছন্দ করে।

প্রায় ৭ সপ্তাহে:

  • মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগে, খেলনা বা দেয়ালের চেয়ে
  • আপনার চোখ–মুখের দিকে একদৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে
  • সামনে খেলনা আর আপনার মুখ - দুটোই থাকলে, বেশিরভাগ সময়েই আপনার মুখটাই বেছে নেয়

এখানেই সামাজিক বিকাশ আর দৃষ্টি বিকাশ একসাথে কাজ করছে। কথা বলার সময় মুখের অভিব্যক্তি একটু বাড়িয়ে বলুন, ধীরে হাসুন, ভ্রু উঠান, ঠোঁট গোল করে রাখুন। করতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, শিশুর কিন্তু ভীষণ ভালো লাগে।


সামাজিক বিকাশ: হাসি, উচ্ছ্বাস আর পরিচিত মানুষ

এ অংশটা সাধারণত সবচেয়ে আনন্দের। ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশ এখন শুধু শারীরিক না, সামাজিক দিক থেকেও বেশ এগোতে থাকে। এখন আর শুধু ক্ষুধা আর ঘুমের গল্প না, ও নিজের মতো করে সম্পর্ক গড়া শুরু করেছে।

হাসি এখন যোগাযোগের ভাষা

এর আগেও হয়তো হালকা হাসি দেখেছেন, ঘুম–ঘুম ভাবের মধ্যে। কিন্তু ৭ সপ্তাহে এসে অনেক মা–বাবা লক্ষ্য করেন:

  • শিশুর হাসি এখন যোগাযোগের অংশ
  • আপনাকে হাসাতে বা আপনার সাড়া পেতে ইচ্ছা করেই হয়তো হাসছে
  • আপনার মুখ দেখলেই আগের চেয়ে দ্রুত, স্পষ্ট হাসি দেখা যায়

ছোট্ট একটা «হ্যালো» আলাপ করতে পারেন এভাবে:

  • আপনি ওর দিকে তাকিয়ে হাসুন, আস্তে কিছু বলুন
  • সে প্রথমে তাকাবে, চোখ বড় হবে, তারপর হঠাৎ একগাল হাসি
  • আপনি আরেকটু উচ্ছ্বাস নিয়ে হাসুন, হয়তো বলুন, «আরে আমার বেবি, হাই!»
  • সে হাত–পা ছুড়বে, হয়তো আবার হাসবে

এই ছোট্ট ওঠানামাই শিশুর প্রাথমিক সামাজিক দক্ষতা। শব্দ ছাড়াই এটাই ওর ভাষা।

আপনাকে দেখে উচ্ছ্বাস

পরিচিত মুখ দেখলেই এখন অনেক শিশুই আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখায়, বিশেষ করে মূল কেয়ারগিভারদের ক্ষেত্রে।

যে সব লক্ষণ দেখতে পারেন:

  • আপনাকে দেখেই হালকা হাঁফ ধরা বা একটু দ্রুত শ্বাস নেওয়ার মতো
  • হাত নেড়ে–পা কিক করে উচ্ছ্বাস দেখানো
  • চোখ বড় বড় করে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকা, তারপর হাসি

ঘরে ঢোকার সময়, বিছানার ওপর ঝুঁকে তাকালে, বা ঘুম থেকে ওঠার পর কোলে নিলে - এসব মুহূর্তে ওর এই এক্সাইটমেন্ট আসলে একরকম স্পষ্ট বার্তা - «এই তো তুমি, আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম!»

চেনা–অচেনা মুখের তফাৎ

প্রায় ৭ সপ্তাহ থেকে শিশু ধীরে ধীরে শুরু করে:

  • চেনা আর অচেনা মানুষের মধ্যে ফারাক করতে
  • ঘরে যাদের বেশি দেখে, তাদের গলা আর মুখে বেশি সাড়া দেয়
  • নতুন কাউকে দেখলে একটু সিরিয়াস বা তাকিয়ে থাকা ভাব নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে

আপনি হয়তো দেখবেন:

  • আপনার কোলে থাকলে তাড়াতাড়ি শান্ত হয়, অতিথির কোলে গেলে একটু বেশি সময় নেয়
  • নতুন মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, কিন্তু একদম হাসে না, কেবল পর্যবেক্ষণ
  • অন্য কেউ কোলে নিয়ে থাকলেও আপনার গলা শুনলেই মুখ ঘুরিয়ে খুঁজে নেয়

একদম ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করা ধরনের স্ট্রেঞ্জার অ্যানজাইটি এখনো আসে না, সেটা একটু পরে হয়। এখন কেবল ওর ছোট্ট «নিজের গোষ্ঠী» বা ইননার সার্কেল তৈরি হওয়ার শুরু।


যোগাযোগ: কু–কু, নতুন ধ্বনি আর একা একা প্র্যাকটিস

শিশুর এই কচি–কচি আওয়াজগুলোই ভবিষ্যতের কথা বলা শেখার বীজ। এখন শুনতে শুধু মিষ্টি শব্দ মনে হলেও, ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশের জন্য এই পর্যায়টা অনেক অর্থবহ।

আরও বৈচিত্র্যময় কু–কু

৭ সপ্তাহের শিশু সাধারণত আগের তুলনায় বেশি:

  • বিভিন্ন টোন আর দৈর্ঘ্যের কু–কু করে
  • ছোট ছোট «আআ», «উউ», «এহ» ধরনের শব্দ করে
  • খুশি আর আরামদায়ক অবস্থায় একটানা কয়েকটা সাউন্ডের সিরিজ দিতে থাকে

খেয়াল করলে দেখবেন, ও বেশি ‘কথা’ বলে:

  • কোলে নিয়ে আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে
  • আপনি ওর আওয়াজ নকল করলে আর মাঝখানে থেমে গেলে
  • ডায়াপার বদলানোর সময় বা খাওয়ানোর পর, যখন পেট ভরা আর শরীর আরামদায়ক

ঘরে বসেই টার্ন–টেকিং অনুশীলন করতে পারেন:

  • ও একবার কু করল
  • আপনি কাছাকাছি শব্দ করে একই রকম আওয়াজ করলেন
  • একটু থামুন
  • ও আবার চেষ্টা করতে পারে

এটা নিয়ম করে করতে হবে না, আর বেশিক্ষণও না। মাঝে মাঝে এমন ক্ষুদ্র ‘ডুয়েট’ শিশুর যোগাযোগ বিকাশে অনেক কাজে লাগে।

প্রথম ধাপের ব্যঞ্জনধ্বনি–জাতীয় আওয়াজ

কিছু ৭ সপ্তাহের শিশু মুখ আর জিহ্বা একটু বেশি ব্যবহার করে নতুন ধ্বনি আবিষ্কার করতে শুরু করে।

কানে পেতে শুনলে পেতে পারেন:

  • গলার ভেতর থেকে আসা «গু» টাইপ ‘গ’ ধ্বনি
  • হালকা «ক্ক» ধরনের ‘ক’ ধ্বনি কু–কুর ভেতরে মিশে যায়

একেবারে পরিষ্কার বা সচেতনভাবে করা শব্দ এখনই আশা করা যায় না। এগুলো মূলত পরীক্ষা–নিরীক্ষা, মুখ–গলা–জিহ্বা দিয়ে কী কী করা যায় সেটা ও নিজেই খুঁজে দেখছে।

একা একা শুয়ে শব্দ প্র্যাকটিস

অদ্ভুত হলেও সত্যি, অনেক শিশু কিন্তু একলা খাটে শুয়ে থাকলেই সবচেয়ে বেশি প্র্যাকটিস করে

দেখতে বা শুনতে পেতে পারেন:

  • খাটে বা দোলনায় শুইয়ে রাখার পর বেবি মনিটর বা পাশের ঘর থেকে ধীরে ধীরে কু–কু শোনা যাচ্ছে
  • মনে হবে যেন নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছে
  • কু–কু, হালকা গোঁ–গোঁ, ছোট ছোট চিড়–চিড় আওয়াজ - সব মিলিয়ে একা একার কনভারসেশন

যদি ও শান্ত থাকে, পেট ভরা আর নিরাপদ পরিবেশে থাকে, তাহলে কিছুক্ষণ ওকে নিজের মতো থাকতে দিন। এটা ৭ সপ্তাহের শিশুর বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর আপনার জন্যও হয়তো অল্প সময়ের জন্য গরম চা বা কফি শেষ করে ফেলার বিরল সুযোগ।


আচরণ আর রুটিন: দিনটা একটু হলেও বোঝা যাচ্ছে

নতুন বাবা–মায়ের কাছে প্রথম কয়েক সপ্তাহ মোটামুটি ঝড়ের মতো কাটে। তবে ৭ সপ্তাহে এসে অনেকেই বলেন, «আচ্ছা, একটু হলেও প্যাটার্ন বুঝতে পারছি মনে হয়»।

ঢিলেঢালা খাওয়া–খেলা–ঘুমের রুটিন

এখন হয়তো আপনিও লক্ষ্য করছেন, দিনের ভিতরে মোটামুটি এমন একটা ধরন তৈরি হচ্ছে:

  1. খাওয়া - বুকের দুধ বা ফর্মুলা, আগে থেকে একটু বেশি গুছিয়ে আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত খাওয়া
  2. খেলা / জেগে থাকা সময় - কোলে নিয়ে কথা বলা, একটু টামি টাইম, ডায়াপার বদলানো
  3. ঘুম - একেক বার একেক সময়ের ঘুম, কিন্তু একদম এলোমেলো না, মোটামুটি ধরন থাকে

এটাকে কড়াকড়িভাবে টাইম–টেবিল বানানোর দরকার নেই। ঘড়ি ধরে, «এখনই ঘুমোতে হবে» টাইপ নিয়ম এ বয়সে চাপের হয়ে যায়। বরং একই সিকোয়েন্স বারবার হতে থাকাই ভালো - খাওয়া, একটু ইন্টারঅ্যাকশন, তারপর ঘুম।

শিশু ঘুমানোর প্রস্তুতিতে আছে, এমন কিছু সিগন্যাল:

  • চোখের দৃষ্টি একটু ঝাপসা মনে হয়, আপনার দিকে কম তাকাচ্ছে
  • হাত–পায়ের নড়াচড়া একটু ধীর আর আলস্য ভরা
  • বেশি স্টিমুলেশন হলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে
  • হালকা কান্না, বা আপনার গায়ে মুখ ঘষে ঘষে ঘুমের জায়গা খুঁজছে

ঘড়ির চেয়ে শিশুর সিগন্যালকে বেশি গুরুত্ব দিন। এ বয়সে ওরই শরীরঘড়ি সবথেকে ভালো গাইড।

সন্ধ্যার অস্থিরতা: একটু একটু কমে আসছে

বাংলা পরিবারে অনেকে একে «সন্ধ্যেবেলা কান্নার সময়» বা «উইচিং আওয়ার» বলে থাকেন। বিকেল–সন্ধ্যার দিকে শিশুকে সামলানো যেন আরও কষ্টকর লাগতে পারে।

৭ সপ্তাহে এসে অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে:

  • সন্ধ্যার এই অস্থিরতা কিছুটা কমে আসে, যদিও পুরোপুরি নাও যেতে পারে
  • একই সময়ের দিকে এখনো কান্না বা অস্থিরতা থাকতে পারে, তবে আগের মতো টানা দুই–তিন ঘণ্টা না
  • আপনি হয়তো খুঁজে পেয়েছেন, কী কী করলে কিছুটা আরাম পায় - একটু হাঁটা, সাদা শব্দ (ফ্যানের আওয়াজ, বৃষ্টির শব্দ), ঘর অল্প অন্ধকার করা, গরম পানিতে স্নান

এখনো যদি সন্ধ্যা মানেই আপনাদের বাড়িতে চ্যালেঞ্জ হয়, নিজেকে দোষ দেবেন না। কিছু শিশু স্বভাবগতভাবে সেনসিটিভ হয়, দিনের শেষে জমে থাকা ক্লান্তি আর উদ্দীপনায় ওরা বেশি অস্থির হয়। সাধারণত ১০–১২ সপ্তাহের দিকে এই ধাপ অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।

কিছুটা ধরাবাঁধা, তারপরও ভ্যারিয়েশন ভরা দিন

আরও কিছু ছোট পরিবর্তন যা ৭ সপ্তাহে ধরা পড়ে:

  • দিনের বেলা ঘুম (ন্যাপ) কিছুটা নিয়মিত প্যাটার্নে আসে, যদিও প্রতিবারের দৈর্ঘ্য আলাদা হতে পারে
  • কিছু শিশুর ক্ষেত্রে রাতে খাওয়ার ব্যবধান অল্প হলেও বাড়তে শুরু করে
  • দিনের কোন সময়গুলোতে ও বেশি হাসিখুশি, বেশি সোশ্যাল - তার একটা মোটামুটি আইডিয়া পেয়ে যান

মোবাইলে খুব সিম্পল নোট রাখুন, যেমন - কখন খাওয়ালেন, কখন ঘুমাল, কতক্ষণ জেগে থাকল। টানা কয়েকদিন লিখলে নিজেরই অজান্তে থাকা প্যাটার্ন চোখে পড়বে।


কখন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলবেন

প্রতিটি নবজাতকের বিকাশ একেক রকম। কেউ ৭ সপ্তাহের শিশুর মাইলস্টোন একটু আগে পেরিয়ে যায়, কেউ আবার একটু পরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভ্যারিয়েশন।

তবুও কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি ক্লিনিকের ডাক্তার বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলা ভালো, যেমন যদি:

  • কখনোই মনে না হয় যে শিশু কারও মুখের দিকে তাকাচ্ছে, বা কোনো খেলনা একটুও চোখ দিয়ে অনুসরণ করছে না
  • দরজা জোরে বন্ধ হওয়া, প্রেসারের কুকারের সিটি, রাস্তার হর্ন - এমন জোরে শব্দে একেবারেই কোনো সাড়া দেয় না
  • শরীর সবসময় অস্বাভাবিকভাবে খুব শক্ত, বা উল্টোভাবে খুব নরম আর ঢিলেঢালা
  • ১০–১২ সপ্তাহ পার হয়েও একটাও সামাজিক হাসি দেখতে না পান
  • আপনার মনে বারবার একটা অস্বস্তি কাজ করে, «কিছু যেন ঠিক নেই», যদিও ঠিক কী তা বুঝতে পারছেন না

আপনি সারাদিন শিশুর সঙ্গে থাকেন, ওকে সবচেয়ে বেশি দেখেন। তাই আপনার পর্যবেক্ষণ অনেক মূল্যবান। প্রয়োজনে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল, মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বিশ্বস্ত বেসরকারি পেডিয়াট্রিশিয়ানের কাছে গিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নিন।


এই ক্ষণস্থায়ী পর্বকে উপভোগ করার চেষ্টা

সাত সপ্তাহের দিনগুলো একেক দিন একেক রকম লাগতে পারে। কখনো বিকেল পর্যন্ত দিনটাই শেষ না হওয়া মনে হয়, আবার কখনো ছবি দেখে অবাক লাগে, «এতো বড় হয়ে গেল কবে!»

এ সময় আপনার শিশু প্রতিদিন প্র্যাকটিস করছে:

  • কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও নিজে মাথা ধরে রাখা
  • টামি টাইমে কনুইয়ে ভর দিয়ে বুক তুলতে চেষ্টা
  • হাত–পায়ের নড়াচড়া আগের চেয়ে অনেক মসৃণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা
  • বারবার হাতের মুঠো খুলে রাখা
  • চোখ দিয়ে আপনাকে ও খেলনা–বইকে অনুসরণ করে তাকিয়ে থাকা
  • কিছু কিছু রঙ আর কনট্রাস্ট ধরা, আর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগা
  • আপনাকে দেখে হাসি দিয়ে সাড়া দেওয়া
  • পরিচিত মুখ দেখলে উচ্ছ্বাসে হাত–পা নেড়ে ফেলা
  • চেনা–অচেনা মানুষের মধ্যে সামান্য পার্থক্য করা
  • নানা রকম কু–কু আওয়াজ, মাঝে মাঝে ছোট «গ» আর «ক» জাতীয় ধ্বনি মেশানো
  • একা খাটে শুয়ে নিজের মতো শব্দ প্র্যাকটিস করা
  • ধীরে ধীরে একটা মোটামুটি খাওয়া–খেলা–ঘুম রুটিনের মধ্যে ঢুকে পড়া

এর মধ্যকার সবগুলো লক্ষণ একই সঙ্গে এখনই দেখা নাও যেতে পারে, তাতে আবারও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শিশু বিকাশ মানে একেবারে সোজা দাগ টেনে এগোনো পথ না, বরং একটা বিস্তৃত সময়সীমার মধ্যে আস্তে আস্তে এগোনো।

আপনি কেবল সুযোগগুলো তৈরি করে যান - একটু নড়াচড়া, একটু দেখা–শোনা, শোনার মতো শব্দ, আর আপনার সাড়া। শিশুর ইশারা–ইঙ্গিতে উত্তর দিতে থাকুন, বারবার একই ভালোবাসার রুটিন দিয়ে দিনভর ঘিরে রাখুন।

আর যখন পারেন, দু–এক মিনিটের জন্য হলেও সব কাজ সরিয়ে রেখে শুধু ওকে দেখুন। ৭ সপ্তাহের এই ছোট্ট মানুষটা এখন আপনার দু’হাতের মধ্যে ঠিকমতো গুটিয়ে যায়, কিন্তু সময়টা চোখের পলকেই পাল্টে যাবে। এই ক্ষুদ্র, ক্লান্তিকর, তবুও অবিশ্বাস্য সুন্দর ধাপটা যতটা সম্ভব নিজের মতো করে উপভোগ করুন।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।
Erby

Erby

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।