আপনি মাত্রই মা হয়েছেন। জীবনের সব হিসাব একদম এলোমেলো হয়ে গেছে, আর চারপাশের সবার কথা শুনলে মনে হচ্ছে এই সময়টাই নাকি আপনার জীবনের „সবচেয়ে সুখের সময়“ হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবে, আপনি হয়তো বাথরুমে কাঁদছেন, স্বামী বা পরিবারের ওপর হঠাৎ চটে যাচ্ছেন, কিংবা রাত ৩টায় বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার চোখে ঘুম নেই, মনে বারবার ভাবনা আসছে - „আমার মধ্যে কী সমস্যা হচ্ছে?“
যদি এই কথাগুলো আপনার পরিচিত শোনায়, তাহলে জেনে রাখুন - আপনি ভাঙা নন, আপনি খারাপ মা নন, আর একদমই একা নন।
এই লেখায় আমরা আলাদা করে দেখব বেবি ব্লুজ বনাম প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন (প্রসবোত্তর বিষণ্নতা), প্রসবোত্তর উদ্বেগ কেমন দেখতে হতে পারে, আর কীভাবে বুঝবেন এটা „স্বাভাবিক“ হরমোন বদলের প্রভাব, নাকি আপনার বাড়তি সাহায্য দরকার।
একটা লাইনও যদি আপনার নিজের কথা মনে করিয়ে দেয়, অনুগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত পড়ুন। অনেক নারীর জন্য এই তথ্যগুলো সত্যি সত্যিই জীবন বাঁচাতে পারে।
বাংলাদেশে বা পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ গাইনি/দাই-ই আগেই বলে দেন, সন্তানের জন্মের পর কিছুদিন একটু কাঁদুনি আর অস্থিরতা থাকবে। তখন খুব একটা গুরুত্ব না লাগলেও, বাসায় এসে, চারপাশ শান্ত হতেই, বিষয়টা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭০–৮০% নতুন মায়ের বেবি ব্লুজ হয়। মানে ১০ জনে ৭–৮ জন কোনো না কোনোভাবে এটা অনুভব করেন।
এর পিছনে মূল কারণগুলো সাধারণত:
এগুলো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। আপনার শরীর আর মস্তিষ্ক খুব অল্প সময়ে অনেক বড় পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তারই প্রভাব।
বেশিরভাগ মায়েরাই প্রসবের খুব শুরুতেই মানসিক ওঠানামা টের পান।
বেবি ব্লুজ কবে শুরু হয়?
সাধারণত ডেলিভারির ২য় বা ৩য় দিন থেকে
(অনেকে বলেন, হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরা বা প্রথম দমটা অ্যাড্রেনালিন কমে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়)।
সবচেয়ে বেশি তীব্র থাকে কবে?
অনেকের জন্য ৫ম দিনটা যেন „ধসে পড়ার দিন“।
এই দিনটা নিয়ে অনেক মা বলেন, “ওইদিন সারা দিন শুধু কেঁদেছি।”
বেবি ব্লুজ কত দিন স্থায়ী হয়?
সাধারণত ২ সপ্তাহের মধ্যে নিজে নিজেই অনেকটাই কমে যায়।
ক্লান্তি আর আবেগপ্রবণতা কিছুদিন থাকতে পারে, তবে হঠাৎ হঠাৎ চড়া মুড সুইংটা ধীরে ধীরে কমে যায়।
যদি ২ সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও লক্ষণগুলো একই রকম তীব্র থাকে, তখনই সময় হয়েছে আপনার গাইনি, মেডিসিন স্পেশালিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলার - এটা প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন (প্রসবোত্তর বিষণ্নতা) কি না, তা ভেবে দেখার।
বেবি ব্লুজের সময় আবেগের অবস্থা খুব জটিল লাগে। এক মুহূর্তে বাচ্চার মুখ দেখে হেসে উঠছেন, পরের মুহূর্তেই টোস্ট একটু পুড়ে যাওয়ায় চোখে পানি।
সাধারণ বেবি ব্লুজ লক্ষণ হতে পারে:
হঠাৎ হঠাৎ মুড সুইং
একসময় ভালো, পরক্ষণেই কান্না বা রাগে ভরা।
অকারণ কান্না
বিশেষ করে বিকেল–সন্ধ্যার দিকে, বা আত্মীয়রা চলে যাওয়ার পর হঠাৎ কেঁদে ফেলা।
খিটখিটে মেজাজ
স্বামী, মা, শাশুড়ি বা অন্য কারও ওপর হঠাৎ রেগে যাওয়া, অল্পতেই বিরক্ত হওয়া।
উদ্বেগ
আগের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা - বাচ্চা দুধ ঠিকমতো খেল কি না, ঘুমাল কি না, আপনি কি „ঠিকভাবে“ সামলাতে পারছেন ইত্যাদি।
বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকলেও নিজের ঘুম না আসা
শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভিতরের চিন্তা থামছে না।
অতিমাত্রায় চাপ অনুভব করা
সারাদিনের কাজ - বুকের দুধ খাওয়ানো, ডায়াপার বদলানো, নিজের গোসল - সব মিলিয়ে যেন ম্যারাথন দৌড়ানোর মত লাগে।
তবু বেবি ব্লুজের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়:
যদি আপনার অভিজ্ঞতা মোটামুটি এরকম হয়, তাহলে অনেকটাই সম্ভব আপনি বেবি ব্লুজ জোনে আছেন। এই সময়ে বিশ্রাম, আশেপাশের মানুষের সহায়তা আর আশ্বাস খুব কার্যকর হয়।
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন বা প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা শুধু „বেবি ব্লুজ একটু বেশি দিন ধরে থাকা“ নয়। এটা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা, যার জন্য সঠিক চিকিৎসা খুব জরুরি - যেমন ডায়াবেটিস বা থাইরয়েড হলে চিকিৎসা লাগে, তেমনি।
বাংলাদেশ ও ভারতসহ আমাদের অঞ্চলের গবেষণাগুলো বলছে, প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ মা সন্তানের জন্মের প্রথম বছরেই প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় ভোগেন। মানে অন্তত প্রতি ১০ জনে ১–২ জন। বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে, কারণ অনেকেই মুখে বলতে লজ্জা পান, „আমি ভালো নেই“।
এখানেই মূল গোলমালটা হয়।
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন:
তাই যদি আপনার মনে হয়, „বাচ্চা তো ৪–৫ মাসের হয়ে গেছে, এখন আর প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন কীভাবে হবে?“
হতে পারে, কারণ পুরো এক বছরকেই আমরা প্রসবোত্তর সময় ধরে দেখি।
সবার অভিজ্ঞতা এক না, তবু কিছু প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা লক্ষণ অনেক মায়ের মধ্যেই মিল পাওয়া যায়।
যদি নিচের মধ্যে বেশ কয়েকটা লক্ষণ প্রতিদিন বা প্রায় প্রতিদিন, টানা ২ সপ্তাহের বেশি থাকে, তাহলে প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন কিভাবে চিনবেন - সেই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, আপনার অবশ্যই সাহায্য নেওয়া উচিত:
লাগাতার দুঃখ বা শূন্যতা অনুভব
প্রায় সারাদিন মন খারাপ, ভেতরে এক ধরনের ফাঁকা ফাঁকা লাগা, আশা না দেখা।
আগ্রহ ও আনন্দ হারিয়ে ফেলা
আগে যা ভালো লাগত (সিরিয়াল, বই, গান, বন্ধুর সাথে কথা, এমনকি বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরা) আর কোনো কিছুর মধ্যে আনন্দ না পাওয়া।
বাচ্চার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া
বাচ্চার প্রয়োজনীয় যত্ন নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভিতরে বিরক্তি, রাগ বা উদাসীনতা।
তীব্র উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাক
হঠাৎ হঠাৎ খুব ভয় লাগা, বুক ধড়ফড় করা, হাত কাঁপা, মনে হওয়া এখনই অজ্ঞান হয়ে যাবেন বা নিয়ন্ত্রণ হারাবেন।
বাচ্চার সাথে সম্পর্ক গড়তে না পারা
সবাই যে „মায়ের কোলেই নাকি স্বর্গ“ বলে, তেমন অনুভূতি একেবারেই না হওয়া। কিছুই না লাগতে পারে, আবার অকারণে রাগও আসতে পারে।
দৈনন্দিন কাজ করতে অক্ষমতা
পোশাক বদলানো, গোসল, ফোনে মেসেজের উত্তর দেওয়া - এসব ছোটো কাজও অসম্ভব মনে হওয়া।
পরিবার ও বন্ধুদের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া
ফোন ধরতে ইচ্ছে না করা, দেখা করতে না চাওয়া, মনে হওয়া কেউই আপনাকে বুঝবে না।
ঘুমের পরিবর্তন
বাচ্চা ঘুমুলেও নিজের ঘুম না আসা, বা অস্বাভাবিক বেশি ঘুমিয়ে পড়া।
খাওয়ার অভ্যাস বদলে যাওয়া
একদম খিদে না পাওয়া, কিংবা উল্টো খুব বেশি খেয়ে ফেলা।
নিজেকে অকেজো, খারাপ মা বা অপরাধী মনে হওয়া
নিজের প্রতি খুব বেশি কঠোর সমালোচনা, যা বাস্তবতার সাথে মিলেই না।
নিজেকে বা বাচ্চাকে ক্ষতি করার চিন্তা মাথায় আসা
এটা অপ্রিয় কল্পনা, অবাঞ্ছিত ছবি বা ভাবনা হিসেবে আসতে পারে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে এ নিয়ে পরিকল্পনাও তৈরি হতে পারে।
শেষের এই দুইটা বিষয়ে খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার:
নিজেকে বা বাচ্চাকে ক্ষতি করার চিন্তা মাথায় আসা মানে আপনি দানব নন। এটা আপনার অসুস্থতার গভীরতা বোঝায়। আপনার দরকার ত্বরিত ও সহানুভূতিশীল চিকিৎসা, দোষারোপ নয়।
অনেক নারীর ক্ষেত্রে মূল অনুভূতি কেবল দুঃখ না, বরং অস্বাভাবিক ভয় আর টেনশন।
আপনি হয়তো সারাক্ষণ টেনশনে আছেন, বুক ধড়ফড় করছে, প্রতি ২–৩ মিনিট পরপর দেখে নিচ্ছেন বাচ্চা শ্বাস নিচ্ছে কি না, রাতের বেলায় বাচ্চার গায়ে কোনো দাগ দেখলে সাথে সাথে গুগলে সার্চ দিচ্ছেন।
এটা হতে পারে প্রসবোত্তর উদ্বেগ (postpartum anxiety), যা একা থাকতে পারে, আবার প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনের সাথেও থাকতে পারে।
কিছুটা দুশ্চিন্তা একেবারেই স্বাভাবিক, কিন্তু প্রসবোত্তর উদ্বেগ লক্ষণ সাধারণ দুশ্চিন্তার থেকে আলাদা:
অতিরিক্ত চিন্তা, যা থামেই না
মাথায় বারবার খারাপ আশঙ্কা আসছে, আপনি নিজেকে যুক্তি দিয়েও শান্ত করতে পারছেন না।
দ্রুতগতির চিন্তা
এক „যদি এমন হয়“ থেকে আরেক „যদি ওটা হয়“ - এভাবে মাথার ভেতর চিন্তা দৌড়াদৌড়ি করছে, মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।
বারবার দেখা বা আশ্বাস চাওয়া
বাচ্চার নিঃশ্বাস, দুধ খাওয়া, ঘুম - সবকিছুই আপনি বারবার চেক করছেন, আর বারবার অন্যদের কাছ থেকে „ঠিক আছে তো?“ শুনতে চাইছেন।
শরীরের লক্ষণ
বুক ধড়ফড়, গলা-বুক শক্ত লেগে থাকা, মাথা ঘোরা, ঘাম, মনে হওয়া এখনই কোনো ভয়ানক ঘটনা ঘটবে।
কোনওভাবেই রিল্যাক্স করতে না পারা
বাচ্চা নিরাপদে ঘুমুলেও শরীর–মন টেনশন থেকে বেরোতে পারছে না, ভেতরে সব সময় অ্যালার্ম বাজছে মনে হচ্ছে।
কিছুকিছু কাজ এড়িয়ে চলা
„যদি কিছু হয়ে যায়“ ভেবে বাইরে যেতে না চাওয়া, অন্য কারও কোলে বাচ্চা দিতে না চাওয়া, এমনকি নিজে ঘুমানোরও ভয় (ঘুমিয়ে থাকলে যদি কিছু হয় বুঝতে পারবেন না এই ভয়)।
অনেক মা ভাবেন, „আমার তো মন খুব বেশি খারাপ না, শুধু খুব ভয় আর টেনশন লাগে, তাহলে কি আমার প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন হতে পারে?“
হ্যাঁ, পারে। প্রসবের পর মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা একধরনের নয় - বিষণ্নতা, উদ্বেগ, দুটো একসাথে - সবই হতে পারে।
এদের পার্থক্যটা পাশাপাশি দেখে নিলে সহজ হয়। পড়তে পড়তে নিজেকে নিয়ে একটু নরমভাবে ভাবুন - আপনার অভিজ্ঞতা কোন দিকের সাথে বেশি মেলে।
বেবি ব্লুজ
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন
তাই যদি তীব্র লক্ষণ ২ সপ্তাহ পরও শুরু হয় বা থেকে যায়, তাহলে বেবি ব্লুজের চেয়ে বরং প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন ভাবার সময় এসেছে।
বেবি ব্লুজ
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন
বেবি ব্লুজ
প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন
আপনি যদি মনে মনে ভাবেন, „বেবি ব্লুজ কত দিন স্থায়ী হয়? আমি তো ৪ সপ্তাহ ধরে খুব খারাপ বোধ করছি!“
তাহলে এটা একটা বড় সিগন্যাল - প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন লক্ষণ নিয়ে অবশ্যই পেশাদার কারও সাথে কথা বলা দরকার।
ঘুমের ঘাটতি সবকিছুকেই দশগুণ খারাপ করে তোলে। তারপরও কয়েকটা প্রশ্ন নিজেকে করতে পারেন:
যদি যাদুর মত একটানা ভালো ঘুম হতো এক সপ্তাহ, আপনি কি মনে করেন আগের মত বেশিরভাগটাই ঠিক হয়ে যেতেন?
নাকি এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে ভালো ঘুমের কথাও কল্পনা করলে খুব একটা আশা জাগে না?
দিনের মধ্যে কি অন্তত কিছু সময় নিজেকে একটু „ঠিকঠাক“ মনে হয়?
নাকি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত একটানা একই অন্ধকার, ভারী অনুভূতি?
আশেপাশের কেউ কি বলেছে, „তোমাকে এখন খুব অন্যরকম লাগছে“ বা „তুমি খুব চুপচাপ/ডাউন হয়ে গেছ“?
সবশেষে, নিজের ভেতরের সেই ছোট্ট কণ্ঠস্বরটাকে গুরুত্ব দিন। যদি মনে মনে বারবার আসে, „আমার হয়তো সাহায্য দরকার“, তাহলে সেটাকে অবহেলা করবেন না। এই বোধটাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ।
অনেক মা প্রসবোত্তর সাহায্য কোথায় পাব তা খোঁজার আগেই নিজেদের থামিয়ে দেন। মনে হয়, „আমি তো মা, আমায়ই সামলাতে হবে“, বা „অন্যদের কত কষ্ট, আমার এসব বলাটা লজ্জার“।
বাস্তব কথা হল - একেবারে ভেঙে পড়ার আগেই সাহায্য নেওয়া দরকার।
বাংলাদেশ / ভারতীয় প্রেক্ষাপট:
সাহায্য চাইলে „বাচ্চা কেড়ে নেবে“ - এই ভয়টা আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত। বাস্তবে, ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশ্য থাকে আপনাকে আর আপনার বাচ্চাকে একসাথে রেখে, নিরাপদ রাখা। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য আপনাকে শক্তি আর সুস্থতা ফিরিয়ে দেওয়া, শাস্তি দেওয়া নয়।
ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে একদম বইয়ের ভাষায় সব বুঝিয়ে বলতে হবে - এমন কোনো নিয়ম নেই। কথাটা শুধু শুরু করতে হবে।
সম্ভব হলে প্রথমে একজন ভরসার মানুষকে খুলে বলুন:
বলতে পারেন, যেমন:
চাইলে এই ধরনের লেখা আগে থেকে ফোনে সেভ করে রেখে, প্রয়োজনে তাদের পড়তে দেখাতে পারেন। অনেক সময় মুখে বলতে কষ্ট হলেও লেখা দেখালে বোঝাতে সুবিধা হয়।
বাংলাদেশ / ভারতীয় প্রেক্ষাপটে আপনি কথা বলতে পারেন:
বলতে পারেন, উদাহরণ হিসেবে:
„ডেলিভারির পর থেকে আমি প্রায়ই খুব মন খারাপ আর চিন্তায় থাকি। এটা ২ সপ্তাহের বেশি হয়েছে, তাই ভাবছি আমার হয়তো প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন হয়েছে।“
এর সাথে নির্দিষ্ট প্রসবোত্তর ডিপ্রেশন লক্ষণ বা প্রসবোত্তর উদ্বেগ লক্ষণ গুলোও বলুন - যেমন, বাচ্চার সাথে টান না লাগা, প্যানিক অ্যাটাক, সব সময় হতাশ লাগা, নিজেকে বা বাচ্চাকে নিয়ে ভয়ের চিন্তা ইত্যাদি।
আপনার কষ্টকে গুরুত্ব দিয়ে শোনার অধিকার আপনার আছে। যদি মনে হয় কেউ হালকাভাবে নিচ্ছে, তাহলে অন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া বা একটু জোর দিয়ে নিজের কথা বোঝানোর অধিকারও আপনার আছে।
অনেক ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী একটা ছোট প্রশ্নমালা ব্যবহার করেন, এর নাম Edinburgh Postnatal Depression Scale (EPDS), বাংলায় পরিচিত „এডিনবার্গ প্রসবোত্তর বিষণ্নতা স্কেল“ নামে।
এখানে মোট ১০টা প্রশ্ন থাকে, যেগুলো গত ৭ দিনে আপনার অনুভূতি নিয়ে:
প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর একটা অপশন বেছে দেওয়ার মতো - যেমন „প্রায় সব সময়“, „মাঝে মাঝে“, „একদম না“ ইত্যাদি।
সবগুলো মিলে একটা স্কোর বের হয়, যা দেখে বোঝা যায়, আপনার প্রসবোত্তর চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন কি না।
এই EPDS স্কোর নিজে নিজে ডায়াগনোসিস নয়, তবে খুব ভালো একটা সূচক, যা পরের ধাপ ঠিক করতে সাহায্য করে।
আপনি চাইলে ইন্টারনেটে „Edinburgh Postnatal Depression Scale বাংলা“ বা ইংরেজি ভার্সন সার্চ করে আগে থেকে পূরণ করে রাখতে পারেন, তারপর প্রিন্ট বা ফোনে দেখিয়ে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে পারেন।
প্রসবোত্তর বিষণ্নতা আর প্রসবোত্তর উদ্বেগ - দুটোই চিকিৎসাযোগ্য। অনেক নারী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। „বছরটা কেটে যাবে, সহ্য করে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে“ - এই ধারণা আপনাকে অপ্রয়োজনীয় কষ্টে ফেলতে পারে।
সাধারণ যেসব থেরাপি ব্যবহার করা হয়:
কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)
এখানে আপনি শেখেন, কোন ধরনের ভাবনা আপনাকে আরও ভেঙে দিচ্ছে, আর কীভাবে সেই ভাবনাগুলো একটু বাস্তবসম্মত, সহনশীল চিন্তায় বদলানো যায়। আচরণেও ছোট ছোট পরিবর্তন আনা নিয়ে কাজ হয়।
কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি
এখানে নিরাপদ পরিবেশে ধীরে ধীরে কথা বলতে পারেন - প্রসবের অভিজ্ঞতা, শরীরের পরিবর্তন, „মা“ হয়ে যাওয়ার পরিচয়–সংকট, দাম্পত্য সম্পর্ক, শ্বশুরবাড়ি বা বাপের বাড়ির চাপ - সবকিছু নিয়েই।
বাংলাদেশ ও ভারতে বড় শহরগুলোতে এখন অনেক হাসপাতাল, এনজিও আর প্রাইভেট সেন্টারে ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিস্ট এর মাধ্যমে প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ হয়।
কেউ কেউ আবার অনলাইন ভিডিও সেশনও নেন। অপেক্ষার লাইন থাকতে পারে, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যোগাযোগ করা ভালো।
এ ছাড়া কিছু এনজিও, চার্চ/মসজিদভিত্তিক সংগঠন, এবং হাসপাতাল পরিচালিত সাপোর্ট গ্রুপ থাকে, যেখানে একদল নতুন মা একসাথে বসে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এতে „আমি একা নই“ এই অনুভূতি অনেক সাহায্য করে।
অনেক সময় শুধু থেরাপি যথেষ্ট হয় না, বিশেষ করে যখন লক্ষণ খুব তীব্র, দীর্ঘদিন ধরে চলেছে, বা প্রসবোত্তর আত্মহত্যার চিন্তা বারবার আসছে।
তখন ডাক্তার অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (বিষণ্নতার ওষুধ) প্রস্তাব করতে পারেন।
বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়েরা স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত থাকেন, „ওষুধ নিলে বাচ্চার ক্ষতি হবে না তো?“ - তাই এখানে কিছু বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার:
মনে রাখতে হবে, অচিকিত্সিত প্রসবোত্তর বিষণ্নতা থেকেও মা–বাচ্চা দুজনেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন - মায়ের শারীরিক–মানসিক অবস্থা, বাচ্চার যত্ন নেওয়া, দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের গড়ে ওঠা - সবকিছুতেই প্রভাব পড়ে।
তাই শুধুই „ওষুধের সাইড ইফেক্ট“ নিয়ে ভেবে থেমে গেলে, অন্য দিকটা বাদ পড়ে যেতে পারে।
কোন ওষুধ, কত ডোজ, কতদিন - এসব ব্যাপারে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ/অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তারর পরামর্শ নিন। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ শুরু বা বন্ধ করবেন না।
কথা বলা আর ওষুধ যতই থাকুক, একা সব সামলে নিতে গেলে প্রায়ই ভালো হওয়া কঠিন হয়। তাই কিছু বাস্তব পরিবর্তন খুব জরুরি:
বাসার কাজে সহায়তা
কেউ একজন রান্না করে দিলে, হাঁড়ি–বাসন ধুয়ে দিলে, একটু কাপড় কাচতে বা ঘর গুছাতে সাহায্য করলে আপনার উপর থেকে অনেক চাপ কমে।
বাচ্চাকে একটু কোলে রাখলেও আপনি নিশ্চিন্তে গোসল বা খাবার খেয়ে নিতে পারেন।
ঘুমের ব্যবস্থা করা
স্বামী বা পরিবারের কেউ যদি রাতের একটা ফিডের দায়িত্ব নেন (প্রয়োজনে একবার ফর্মুলা/এক্সপ্রেসড মিল্ক), তাহলে অন্তত টানা ৩–৪ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান।
কারও কারও ক্ষেত্রে দিনে একটু „ন্যাপ“ দেয়াও অনেক কাজে লাগে।
সমবয়সী মায়েদের সাপোর্ট
কাছাকাছি শিশু ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার বা এনজিও পরিচালিত „মাদারস গ্রুপ“, „মা ও শিশু ক্লাব“, কিংবা অনলাইন ফেসবুক গ্রুপ/ফোরাম - যেখানে অন্য মায়েরাও খোলামেলা ভাবে নিজেদের সংগ্রামের গল্প বলেন।
সীমানা ঠিক করা
সব আত্মীয়–পড়শির ভিজিট আপনার জন্য ভালো না-ও লাগতে পারে। কেউ যদি আসার নাম করে শুধুই সমালোচনা করেন, ক্লান্ত মা-বাচ্চাকে না দেখে নিজ গরজে ছবি তুলেই যান, তাহলে না বলতে শেখা দরকার।
আপনার যা সাহায্য প্রয়োজন, সেটা স্পষ্ট করে বলতে পারেন - „তুমি এলে একবার বাসন ধুয়ে দিলে খুব উপকার হতো“ টাইপ।
এসব কোনো বিলাসিতা না। এগুলোই অনেক সময় বেবি ব্লুজকে প্রসবোত্তর ডিপ্রেশনে গড়ে ওঠা থেকে আটকে রাখে, আর যদি ডিপ্রেশন শুরু হয়ে যায়, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতেও সাহায্য করে।
আমাদের চারপাশে নতুন মাতৃত্বের ছবি মানেই - নরম কম্বল, হেসেখেলে থাকা বাচ্চা, সাজগোজ করা ঝকঝকে মা।
কিন্তু কেউ দেখায় না ভোর ৪টার খাওয়ানোর সময় আপনাকে কেমন লাগে, কিংবা রাতের অন্ধকারে যখন মনে হয় নিজের জীবনটাকে আর চিনতেই পারছেন না।
এখান থেকে একটা জিনিস মনে রাখুন:
প্রসবোত্তর বিষণ্নতা, প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা লক্ষণ, বেবি ব্লুজ, প্রসবোত্তর উদ্বেগ - শব্দগুলো একটু ঘোলাটে লাগতেই পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল - এই মুহূর্তে আপনি কেমন আছেন, প্রতিদিনের জীবন কতটা সামলাতে পারছেন?
যদি এই লেখার একটাও অংশ আপনাকে মনে করিয়ে দেয়, „এটা তো আমার কথা“, তাহলে আজই চেষ্টা করুন:
প্রসবোত্তর সাহায্য কোথায় পাব সেটা খোঁজা, সাহায্য চাইতে মুখ খোলা - এগুলো দুর্বলতা নয়, এগুলো সাহসের কাজ।
আপনি ইতিমধ্যেই অসাধারণ কঠিন কাজ করেছেন - একজন মানুষকে শরীরে ধারণ, প্রসব এবং এখন তাকে বড় করে তোলা। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও সেই একই দায়িত্বশীলতার অংশ, যা আপনাকে আরও বেশি „ভালো মা“ হতে সাহায্য করবে, কারণ ভেতরে ভেতরে আপনিও একটু একটু করে আবার „আপনি“ হয়ে উঠবেন।