ব্রেস্টফিডিংয়ে নিপল ফাটা: কারণ, প্রতিরোধ ও দ্রুত নিরাময়ের সহজ গাইড
ব্রেস্টফিডিং স্বাভাবিকভাবে আরামদায়ক হওয়ার কথা। ক্লান্ত লাগতে পারে, ঘুম কম হতে পারে, কিন্তু প্রতিবার বাচ্চা স্তন ধরলেই যদি মনে হয় নিপলে আগুন লেগেছে, তাহলে সেখানে সমস্যা আছে। নিপল ফাটা, রক্ত পড়া, তীক্ষ্ণ ব্যথা - এগুলো হলে আপনি দুর্বল নন, আপনি «ভুল করছেন» এমনও না, আর আপনি একা নন।
আপনি যা করতে পারেন, তা হলো যে কারণে ক্ষতি হচ্ছে সেটাকে বদলানো, আর শরীরকে এমনভাবে সাপোর্ট দেওয়া যেন সে দ্রুত সেরে উঠতে পারে। এই গাইডটা ঠিক সেটার জন্যই - ব্রেস্টফিডিং করার সময় স্তন ফাটা প্রতিরোধ এবং দ্রুত নিরাময়ের সহজ, ব্যবহারিক ধাপ, অপরাধবোধ ও জটিল কথা ছাড়া।
ব্রেস্টফিডিং এ স্তন ফাটা কেন হয়
অধিকাংশ নিপল ব্যথা আর ফাটার কারণ আপনার নিপল «অতিরিক্ত সেনসিটিভ» বলে না, বা «আপনার স্তন ব্রেস্টফিডিংয়ের জন্য বানানো না» তাইও না। সমস্যাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেকানিকাল, মানে ধরার ভঙ্গি আর টেকনিকের ভুলো।
সবচেয়ে সাধারণ কারণ: ভুল ল্যাচ
ব্রেস্টফিডিং এ নিপল ব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ভুল ল্যাচ।
বাচ্চা যদি কেবল নিপলটাই মুখে নেয়, পুরো স্তনের তুলনায় খুব কম অংশ নেয়, তাহলে প্রতিবার চোষার সময় নিপল ঘষা, চিপা আর চাপে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যে এই ঘর্ষণ থেকে যা হয়:
- প্রথম দু–এক দিন তীব্র ব্যথা আর লালচে ভাব
- তারপর দেখা যায় ফাটল, রক্ত পড়া, খাওয়ানোর পর নিপল «লিপস্টিকের মতো চ্যাপ্টা» বা এক পাশে চাপা হয়ে থাকা
একটা ভালো ল্যাচ মানে বাচ্চার মুখের কাজটা হবে স্তনের উপর, কেবল নিপলের উপর না।
আর কী কী কারণে স্তন ফাটতে পারে
অনেক সময় বাইরে থেকে ল্যাচ মোটামুটি ভালোই মনে হয়, কিন্তু অন্য কিছু কারণে ব্রেস্টফিডিং সমস্যা আর ব্যথা থেকে যায়।
1. শিশুর টং টাই এবং স্তন ফাটা
টং টাই (ankyloglossia) হলে বাচ্চার জিভের নিচের টিস্যু খুব টাইট থাকে, ফলে জিভ ঠিকমতো উপরে বা সামনে তুলতে পারে না। এতে ব্রেস্টফিডিং এ টানা ঠিকমতো ল্যাচ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
টং টাই থেকে স্তনপানে সমস্যা হলে সাধারণত যা দেখা যায়:
- বাচ্চা স্তন ছেড়ে বারবার সরে যায়, ঠিকমতো ধরে রাখতে পারে না
- খাওয়ানোর সময় বারবার «ক্লিক» বা চটচট শব্দ শুনতে পান
- বাচ্চা খুব বেশি বাতাস গিলে ফেলে, ফলে পেট ফাঁপা আর গ্যাস্ট্রিক হয়
- খুব ঘন ঘন খাওয়ানোর পরও ওজন ঠিকমতো বাড়ে না
- খাওয়ানোর পর আপনার নিপল চ্যাপ্টা, ভাঁজ পড়া, বা এক ধরনের দাগযুক্ত হয়ে যায়
- প্রথম সপ্তাহের পরও নিপল ব্যথা কমে না, বরং একই থাকে বা বাড়ে
টং টাই থাকলেও শিশুকে ব্রেস্টফিডিং করানো সম্ভব, তবে অনেক সময় শিশুর টং টাই কেটে দেওয়া (frenotomy) দরকার হয়। এটা একজন ল্যাক্টেশন কনসালট্যান্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু সার্জন দেখে সিদ্ধান্ত নেন।
2. ব্রেস্ট পাম্পের পাম্প ফ্ল্যাঞ্জ সাইজ সমস্যা
আপনি যদি ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহার করেন, ভুল পাম্প ফ্ল্যাঞ্জ সাইজ থেকেও নিপল ফাটা, গভীর ব্যথা আর কলার মতো ক্ষত হতে পারে।
ফ্ল্যাঞ্জ সাইজ ঠিক না হলে যা লক্ষ করেন:
- টানেলের ভেতরে অনেকটা এরিওলা ঢুকে যায় (সাধারণত সাইজ বেশি বড়)
- নিপল পাশে পাশে ঘষা খায় (সাধারণত সাইজ ছোট)
- নিপল আর এরিওলার ঠিক সংযোগস্থলে আংটির মতো ফোসকা বা ফাটল
- যত পাম্প করেন, নিপল ব্যথা তত বাড়ে
ফ্ল্যাঞ্জ সাইজ আন্দাজে নেওয়ার বিষয় না। এখন বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ অনেক দেশে হাসপাতালের ব্রেস্টফিডিং সাপোর্ট সেন্টার, এনজিওর ল্যাক্টেশন কাউন্সেলর বা প্রাইভেট আইবিসিএলসি (IBCLC) অনলাইন কনসালটেশন দিয়ে মায়েদের পাম্প সাইজ ঠিক করতে সাহায্য করছেন।
3. থ্রাশ এবং স্তন ফাটা
নিপল থ্রাশ হলো ইস্ট সংক্রমণ। বাইরে থেকে খুব বেশি ফাটা না দেখালেও ভিতরে প্রবল জ্বালাপোড়া হতে পারে।
সাধারণ নিপল থ্রাশের উপসর্গ:
- খাওয়ানোর সময় আর বিশেষ করে খাওয়ানো শেষ হওয়ার পর ভেতর থেকে জ্বালা বা ছুরি মারা মতো ব্যথা
- ব্যথা বুকের গভীর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়া
- নিপল চকচকে উজ্জ্বল গোলাপি বা লাল হয়ে যাওয়া
- প্রচণ্ড চুলকানো বা হালকা স্পর্শেই অসহনীয় সংবেদনশীলতা
- বাচ্চার মুখের ভেতরে সাদা দাগ, যেগুলো সহজে মুছে যায় না, বা খুব লাল ডায়াপার র্যাশ
থ্রাশ হলে মা আর বাচ্চা - দুজনকেই একসঙ্গে ফাঙ্গাল ওষুধ নিতে হয়। শুধু আপনাকে ক্রিম দিলেই পুরোপুরি আরাম হবে না, কারণ আপনারা একে অন্যকে আবার সংক্রমিত করতে থাকেন।
4. শুষ্ক ত্বক আর অ্যালার্জি বা জ্বালা
বারবার সাবান দিয়ে ধোয়া, খুব গরম পানি ব্যবহার, বা খুব শুকনো ঘরের বাতাস থেকেও শুষ্ক নিপল হয়, তারপর সহজেই চিরে গিয়ে স্তন ফাটা তৈরি হয়।
যা বোঝা যায়:
- নিপল আর এরিওলার চারপাশে খসখসে, খোসা ওঠা ত্বক
- টান টান টান অনুভূতি, টেনে ধরা লাগা
- ফাটলটা গভীর কাটা দাগের মতো না হয়ে বরং শুকনো ফাটা ঠোঁটের মতো
এখানে খুব অল্প কিছু নরমাল যত্ন আর আর্দ্রতা জোগালেই ভালো উন্নতি হয়, নিচে একটু পরে সেগুলো আছে।
আগে থেকেই সাবধান: নতুন মায়ের জন্য স্তন ফাটা প্রতিরোধ
ফাটা হয়ে যাওয়া নিপল সেরে ওঠা সম্ভব, কিন্তু নতুন করে যেন আর ক্ষতি না হয় সেটা রোধ করাই সবচেয়ে সহজ আর দ্রুত সমাধান। ভাবতে পারেন, বাচ্চা যখন ধীরে ধীরে ঠিকভাবে খাওয়া শিখছে, আপনি ততদিন ত্বকটাকে সুরক্ষা দিচ্ছেন।
ল্যাচ ঠিক করার উপায়: সঠিক ব্রেস্টফিডিং ল্যাচ
একটা ভালো ল্যাচ হলো নিপল ব্যথা আর ব্রেস্টফিডিং এ স্তন ফাটা কেন হয় - তার ৮০–৯০ শতাংশ সমাধান।
প্র্যাক্টিক্যাল কিছু টিপস নিচে দিলাম, আজ থেকেই ব্যবহার করতে পারবেন:
-
শুরু করুন নাক আর নিপল সমান লেভেলে রেখে
বাচ্চাকে এমনভাবে ধরুন, যেন তার নাক আপনার নিপলের সমান লাইনে থাকে। এতে সে মাথা সামান্য পেছনে কাত করে বড় করে মুখ খুলতে উৎসাহ পাবে, সামনে ঝুঁকে শুধু নিপল কামড়ে ধরবে না। -
বড় করে মুখ খোলার জন্য অপেক্ষা করুন
আপনার নিপলটা আলতোভাবে বাচ্চার ওপরের ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিন। সে যখন হাই তোলার মতো করে একেবারে বড় করে মুখ খুলবে, তখনই দ্রুত বাচ্চাকে স্তনের দিকে আনুন, স্তনকে বাচ্চার দিকে ঠেলে দেবেন না। -
ঠোঁট দুটো বাইরের দিকে ফুলে থাকা চাই
দুটো ঠোঁটই বাইরে দিকে মোড়ানো থাকবে, ছোট মাছের মুখের মতো। ভিতরে গুটিয়ে গেলে আলতো করে আঙুল দিয়ে ঠোঁটটা বাইরের দিকে উল্টে দিন। -
অ্যাসিমেট্রিক ল্যাচ ব্যবহার করুন
সঠিক ল্যাচে বাচ্চার মুখের ভেতরে এরিওলার নিচের দিকটা উপরের দিকের চেয়ে বেশি থাকবে। এটা পেতে নিপলটা সামান্য করে বাচ্চার তালুর দিকে (উপরের দিকে) তাক করে দিন, আগে চিবুক লাগবে, তারপর মুখের ওপরের দিক ঢুকবে। -
চিবুক যেন স্তনে লেগে থাকে, নাক প্রায় ফ্রি থাকে
বাচ্চার চিবুক স্তনে গিয়ে ঠেকবে। নাক খুব কাছাকাছি থাকলেও সাধারণত শ্বাসের জন্য একটু ফাঁক থাকে। যদি নাক ঢুকে গিয়ে চিবুক বরং দূরে থাকে, বেশিরভাগ সময়ই ল্যাচটা অগভীর হয়। -
ক্লিক শব্দ যেন না থাকে
আপনি একটা নিয়মিত চোষা - গেলা - বিরতি প্যাটার্ন শুনতে চাইবেন। বাচ্চা যদি বারবার ক্লিক শব্দ করে, সাধারণত বুঝতে হবে সে বারবার সাকশন হারাচ্ছে, মানে ল্যাচ শ্যালো বা টং টাই মতো সমস্যা থাকতে পারে। -
দশ সেকেন্ডের মধ্যে ব্যথা হালকা হওয়া উচিত
প্রথম কয়েক সেকেন্ড টান টান একটা টান অনুভব হওয়া স্বাভাবিক, বিশেষ করে একদম শুরুতে। কিন্তু পুরো ফিড জুড়ে ধারালো বা জ্বালাময় ব্যথা থাকা এমন কিছু না, যা «সহ্য করে নিতেই হবে»।
প্রথম ১০ সেকেন্ডের পরেও যদি ব্যথা ১০ এর মধ্যে ৩ এর বেশি মনে হয়, আলতো করে বাচ্চাকে সরিয়ে আবার নতুন করে ল্যাচ দিন। বারবার করতে ঝামেলা লাগতে পারে, কিন্তু প্রথমদিকে এই কষ্টটাই আপনাকে অনেকদিনের ফাটা আর গভীর ক্ষত থেকে বাঁচাবে।
সাকশন কীভাবে ভাঙবেন
চট করে টেনে বাচ্চাকে স্তন থেকে সরানো ঠিক না। এতে হঠাৎ টান লেগে নরম ত্বক ছিঁড়ে যেতে পারে, আগে থেকে থাকা ফাটা আরও খারাপ হয়।
নিরাপদে সাকশন ভাঙার উপায়:
- পরিষ্কার একটা আঙুল বাচ্চার মুখের কোনা দিয়ে আলতোভাবে ভিতরে ঢুকিয়ে দিন
- ছোট্ট «পপ» শব্দের মতো শোনা যাবে, সাকশন ছেড়ে যাবে
- তখন সহজেই বাচ্চাকে স্তন থেকে সরিয়ে ফেলুন
একটু প্র্যাক্টিস হলেই এটা স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে যাবে আর প্রতিবার আপনার নিপলকে সুরক্ষিত রাখবে।
নিপলের জন্য নরম যত্নের রুটিন
দামী স্কিন কেয়ার রুটিন দরকার নেই, কয়েকটা ছোট অভ্যাসই নিপল ফাটা প্রতিরোধে অনেকখানি কাজ দেয়।
1. খাওয়ানোর পর নিপল কিছুক্ষণ খোলা রাখুন
ভেজা ব্রা বা প্যাডের ভেতরে নিপল আর্দ্র হয়ে অনেকক্ষণ থাকলে ত্বক নরম হয়ে গিয়ে সহজে ফেটে যায়।
প্রতিটি ফিডের পর:
- প্রয়োজনে নরম কাপড় দিয়ে আলতোভাবে দুধ মুছে নিন
- ২–৩ মিনিটের জন্য নিপল খোলা রেখে শুষ্ক হতে দিন
- যদি সম্ভব হয় দিনে কিছু সময় ব্রা ছাড়া বা ঢিলা সুতির কাপড় পরে থাকুন
2. নিজের দুধই প্রাকৃতিক হিলার
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, নিপলের ওপর পাতলা করে নিজের বুকের দুধ লাগালে:
- ত্বকের আর্দ্রতা ঠিক থাকে, ফাটা তাড়াতাড়ি জোড়া লাগে
- দুধের অ্যান্টিবডি ইনফেকশন থেকে আংশিক সুরক্ষা দেয়
খাওয়ানোর একদম শেষে হাতে সামান্য দুধ বের করে নিয়ে নিপল আর এরিওলার চারপাশে লাগান, তারপর বাতাসে শুকাতে দিন।
3. সঠিক নিপল ক্রিম ব্যবহার
ব্যবহার করতে পারেন:
- মেডিক্যাল গ্রেড ল্যানোলিন
- অথবা ব্রেস্টফিডিংয়ের জন্য বানানো কোনো নিপল বাম, যেটা খাওয়ানোর আগে ধুয়ে ফেলতে হয় না এমনটা হলে ভালো
প্রতিবার খাওয়ানোর বা পাম্পিংয়ের পর মটরদানার সমান পরিমাণ ক্রিম হালকা করে লাগান। উদ্দেশ্য হলো ত্বক নরম, স্যাঁতসেঁতে রাখা, মোটা, চিটচিটে স্তর বানানো না।
4. নিপলে সাবান ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
সাবান ত্বকের প্রাকৃতিক তেল তুলে ফেলে, ত্বক শুকিয়ে যায়।
প্রতিদিনের কাজে:
- গোসলের সময় কুসুম গরম পানি দিয়ে শুধু ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট
- সরাসরি নিপলের উপর সাবান বা বডিওয়াশ ব্যবহার না করাই ভালো
- খুব ঘষাঘষি না করে নরম তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে নিন
যেগুলো ইতিমধ্যেই ফেটে গেছে: স্তন ফাটা দ্রুত নিরাময় করবেন কীভাবে
আপনার যদি ইতিমধ্যেই নিপল ফাটা থাকে, তারপরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে যাওয়া যায়। সামান্য রক্ত মিশে গেলেও দুধ বাচ্চার জন্য নিরাপদ।
এখন লক্ষ্য থাকবে: ব্যথা কমানো, ত্বককে সুরক্ষা দেওয়া আর নিরাময়ের সুযোগ করে দেওয়া, একই সঙ্গে বাচ্চার খাওয়াও যেন চলতে থাকে।
ফাটা নিপল নিয়ে কি স্তনপান চালিয়ে যেতে পারবো?
অধিকাংশ সময়ই পারবেন। বরং ব্রেস্টফিডিং চালিয়ে গেলে:
- দুধের সরবরাহ ঠিক থাকে
- বাচ্চা স্বাভাবিকভাবেই স্তন থেকে দুধ পেলেই সবচেয়ে ভালো হয়
- ল্যাচ ঠিক হলে অনেক মায়েরই ব্যথা ধীরে ধীরে কমতে থাকে
যদি ব্যথা এমন হয় যে প্রতিবার খাওয়ানোর কথা ভাবলেই গা কাঁপে, চোখে পানি চলে আসে, এটা স্পষ্ট সিগন্যাল যে আপনার বাড়তি সাপোর্ট দরকার, আপনি ব্যর্থ এমন না।
ধাপে ধাপে নিরাময়ের প্ল্যান
ত্বক নিরাময় করতে কিছুটা সময় লাগে, তবে নিচের ধাপগুলো স্তন ফাটা দ্রুত নিরাময় করতে সাহায্য করে।
1. প্রতিটা ফিডে ল্যাচকে গুরুত্ব দিন
মূল কারণ ঠিক না করলে কেবল বাহ্যিক যত্নে লাভ খুব কম। তাই:
- ব্যথা বেশি হলে বা নিপল «চিমটি কাটা» লাগলে আবার সাকশন ভেঙে নতুন করে ল্যাচ দিন
- বিভিন্ন পজিশন (যেমন ফুটবল/রাগবি হোল্ড, laid-back অবস্থান) ট্রাই করুন, যেটায় চাপ কম লাগে সেটা খুঁজে নিন
খুব ছোট ছোট পরিবর্তনও প্রেশার আর ঘর্ষণ অনেক কমিয়ে দেয়।
2. «Moist wound healing»: ক্ষত যেন একেবারে শুকিয়ে না যায়
গবেষণায় দেখা যায়, ফাটা ত্বক একেবারে শুকনো না রেখে হালকা স্যাঁতসেঁতে রাখলে দ্রুত সারে আর নতুন করে ফাটে কম।
এই moist wound healing করতে পারেন这样:
- প্রতিবার ফিডের পর ১–২ ফোঁটা দুধ নিপলের ওপর লাগিয়ে দিন
- যখন ত্বক হালকা ভেজা, তখনই পাতলা করে ল্যানোলিন বা নিপল বাম লাগান
- এমন ব্রেস্ট প্যাড ব্যবহার করুন, যেগুলো নিপলে আটকে যায় না, আর ভিজে গেলে দ্রুত পাল্টে ফেলুন
অনেকক্ষণ একেবারে খোলা রেখে শুকিয়ে দিলে আবার বাচ্চা ধরার সময় সেই জায়গাটা টেনে ফেটে যেতে পারে।
3. ফিডের মাঝে হাইড্রোজেল প্যাড ব্যবহার করে দেখতে পারেন
অনেক মা বলেন হাইড্রোজেল প্যাড লাগালে জ্বালা ও তাপ কম লাগে, একরকম ঠান্ডা আরাম দেয়।
ব্যবহার করতে চাইলে:
- ফ্রিজে রেখে একটু ঠান্ডা করে নিলে বাড়তি আরাম পাওয়া যায়
- ফিডের মাঝে সরাসরি নিপলের ওপর লাগিয়ে রাখুন
- খাওয়াবার আগে প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিষ্কার করে নিন
এগুলো বাধ্যতামূলক না, তবে খুব ফাটা আর জ্বালা করলে দু–এক সপ্তাহের জন্য ভালো সাপোর্ট হতে পারে।
4. খাওয়ানোর ভঙ্গি বদলাতে থাকুন
ল্যাচ যতই ভালো হোক, প্রতিবার একই পজিশনে খাওয়ালে চাপ পড়ে একই জায়গায়, ফলে সেই নির্দিষ্ট অংশটা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পজিশন বদলালে প্রেশার পয়েন্টও বদলে যায়।
চেষ্টা করতে পারেন:
- একবার ক্রস-ক্রেডল, পরেরবার রাগবি/ফুটবল হোল্ড
- রাতে শুয়ে সাইড-লায়িং পজিশনে খাওয়ানো, এতে আপনার শরীরও একটু বিশ্রাম পায়
- laid-back পজিশন, যাতে গ্র্যাভিটি বাচ্চাকে ডিপ ল্যাচ পেতে সাহায্য করে
ভাবুন, পায়ে ফোসকা উঠলে পরেরদিন অন্য জুতো পরেন, যাতে একই জায়গায় ঘষাঘষি কম হয়।
5. খুব বেশি ফাটা পাশে সাময়িকভাবে পাম্প ব্যবহার
এক পাশের নিপল যদি খুবই ফাটা বা ক্ষত হয় আর খাওয়ানো একদম সহ্য হয় না, তখন আপনি:
- তুলনামূলক কম ব্যথার পাশে বেশি বেশি ব্রেস্টফিডিং করান
- বেশি ফাটা পাশটা থেকে সঠিক সাইজের ফ্ল্যাঞ্জ দিয়ে এবং কম প্রেসারে পাম্প করে দুধ বের করুন
- বের করা দুধ চামচ, ছোট কাপ, বা «paced feeding» পদ্ধতিতে বোতল দিয়ে খাওয়াতে পারেন
এটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না, বরং কয়েকদিনের একটা সাময়িক কৌশল। লক্ষ্য থাকবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই পাশেও আবার বাচ্চাকে সরাসরি ল্যাচ করানো, তবে ততদিন অন্তত দুধের সরবরাহ যেন কমে না যায়।
6. ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ
ব্যথা থাকলেই যে সবকিছু সহ্য করে থাকতে হবে, এমন না।
আপনার স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন:
- ব্রেস্টফিডিং-সেইফ ডোজে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন
- ফিডের মাঝে কাপড় দিয়ে মোড়ানো ঠান্ডা প্যাক স্তনের ওপর কিছুক্ষণ রাখা
যদি হঠাৎ জ্বর আসে, সারা গা ব্যথা, কাঁপুনি, স্তনের কোনো অংশ লাল আর গরম লাগে, দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, এটা মাস্টাইটিস হতে পারে।
যখন কেবল ফাটা নয়, ভেতরের জ্বালা: থ্রাশ বুঝবেন কীভাবে
অনেক সময় ল্যাচ ঠিক করলেন, যত্ন নিচ্ছেন, তারপরও ব্যথা আগুনের মতো থাকে। তখনই থ্রাশ আছে কিনা একটু আলাদা করে খেয়াল করা দরকার।
গুরুত্বপূর্ণ নিপল থ্রাশের লক্ষণ:
- খাওয়ানো শেষ হওয়ার পরও ৩০–৬০ মিনিট পর্যন্ত জ্বালা বা ঝিলমিল ব্যথা
- শুধু নিপল নয়, বুকের ভেতর দিকে গুলি বা সুচ ফোটানোর মতো ব্যথা
- নিপল অস্বাভাবিক চকচকে উজ্জ্বল গোলাপি বা গাঢ় লাল
- কাপড়ের সামান্য ঘর্ষণেই অসহ্য লাগে, চুলকায় বা টনটনে ব্যথা
- ল্যাচ ভালো হওয়া আর নিয়মিত স্কিন কেয়ার সত্ত্বেও একটুও উন্নতি না হওয়া
বাচ্চার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করুন:
- গালের ভেতর, জিভ, মাড়িতে সাদা দাগ যেগুলো তুলো দিয়ে মুছতে গেলে সহজে উঠে না
- খাওয়ানোর সময় অস্থির হয়ে যাওয়া, বারবার টান দিয়ে ছেড়ে দেওয়া, কান্না
- ডায়াপার র্যাশ খুব লাল, চারপাশে ছোট ছোট লাল দাগ ছড়িয়ে আছে
ভালোমতো বসে গেলে থ্রাশ নিজে নিজে সেরে যায় না।
মা আর বাচ্চা দুইজনকেই একসঙ্গে অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসা লাগে, সাধারণত:
- আপনার জন্য অ্যান্টিফাঙ্গাল নিপল ক্রিম
- বাচ্চার মুখের ভেতরের জন্য অ্যান্টিফাঙ্গাল জেল বা ড্রপ
- প্রয়োজনে আপনার জন্য ট্যাবলেট, যদি বুকের গভীরে সংক্রমণ থাকে
নিজে থেকে কিছু একটা ক্রিম কিনে লাগানোর চেয়ে ভাল হলো গাইনোকলোজিস্ট, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা ল্যাক্টেশন কনসালট্যান্টের সঙ্গে কথা বলা। অনেক সময় কেবল স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করলে বরং ইস্টের সংক্রমণ বাড়তে পারে।
কখন ল্যাক্টেশন কনসালট্যান্ট বা ব্রেস্টফিডিং বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
এক পর্যায়ে ঘরোয়া টিপস যথেষ্ট না। এটা ব্যর্থতার প্রমাণ না, বরং আপনি যে একা লড়াই করছেন না তার ইঙ্গিত। এক–টু–ওয়ান সাপোর্ট অনেক সময় গোটা ছবি বদলে দেয়।
নিম্নের যেকোনোটা হলে একজন আইবিসিএলসি, প্রশিক্ষিত ব্রেস্টফিডিং কাউন্সেলর বা অভিজ্ঞ ডাক্তার/মিডওয়াইফের সাহায্য নিন:
- প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও ব্যথা কমছে না, একই রকম বা বেড়েই চলেছে
- নিপল ফাটা, রক্ত পড়া, দাগ জমে থাকা, কয়েকদিনের চেষ্টার পরও উন্নতি না হওয়া
- বাচ্চা ঠিকমতো ল্যাচ নিতে পারে না, বারবার ছেড়ে দেয়, অনেকক্ষণ ধরে খেয়েও তৃপ্ত লাগে না
- টং টাই সন্দেহ করছেন, বা প্রতিবার ক্লিক শব্দ আর কম দুধ টানার লক্ষণ দেখছেন
- থ্রাশ আছে মনে হচ্ছে, কীভাবে চিকিৎসা শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না
- পাম্প ব্যবহার শুরু করার পর থেকে ব্যথা বেড়েছে, ফাটা বাড়ছে, মানে পাম্প ফ্ল্যাঞ্জ সাইজ সমস্যা থাকতে পারে
বাংলাদেশে যা করতে পারেন:
- সরকারি বা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্রেস্টফিডিং কর্নার/ল্যাক্টেশন ম্যানেজমেন্ট সেন্টারে যোগাযোগ
- স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সিটি করপোরেশনের মাতৃসদনের কাউন্সেলিং সার্ভিস
- বিভিন্ন এনজিও (যেমন ব্র্যাক, ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি) এর ব্রেস্টফিডিং সাপোর্ট গ্রুপ
- প্রয়োজনে প্রাইভেট আইবিসিএলসি বা অভিজ্ঞ গাইনী/পেডিয়াট্রিশিয়ানের সঙ্গে সরাসরি বা অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট
ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ আশপাশের দেশগুলোতেও অনুরূপ চাইল্ড হেলথ ক্লিনিক, মাতৃসদন, এবং হেল্পলাইন থেকে একই ধরনের সাপোর্ট পাওয়া যায়।
শেষ কথা: ব্রেস্টফিডিং কষ্টের শাস্তি না
স্তনপান যেন শাস্তির মতো কষ্টদায়ক হওয়ার কথা না। একদম প্রথমদিকে সামান্য টান বা অস্বস্তি থাকা স্বাভাবিক, কারণ নতুন জায়গায় নতুন রকম প্রেশার পড়ছে। কিন্তু টানা তীক্ষ্ণ, জ্বালাপোড়া বা গুলি মারা ধরনের ব্যথা চলতেই থাকবে - এমনটা মেনে নেওয়ার দরকার নেই, এটা স্পষ্ট সাইন যে কিছু ঠিকঠাক করার প্রয়োজন আছে।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা পয়েন্ট আবার একসাথে:
- অধিকাংশ স্তন ফাটা আর নিপল ব্যথা আসে ভুল ল্যাচ থেকে, তাই সবার আগে ল্যাচ ঠিক করার উপায় অনুশীলন করুন
- লক্ষ্য রাখুন বড় করে মুখ খোলা, ঠোঁট বাইরে, চিবুক স্তনে, নিপলের নিচে বেশি এরিওলা, ক্লিক শব্দ না থাকা আর ফিডের পুরোটা সময় জুড়ে তীব্র ব্যথা না থাকা
- বাচ্চাকে সরানোর আগে সবসময় আঙুল দিয়ে সাকশন ভেঙে নিন, কখনও হঠাৎ টেনে না
- সহজ কিন্তু নিয়মিত নিপল কেয়ার রুটিন রাখুন: বাতাসে শুকোনো, সামান্য বুকের দুধ, ল্যানোলিন বা নিপল বাম, নিপলে সাবান নয়
- ফাটা হয়ে গেলে: যতটা পারেন স্তনপান চালিয়ে যান, moist wound healing করুন, প্রয়োজনে হাইড্রোজেল প্যাড, পজিশন বদল, আর খুব দরকার হলে অল্প সময়ের জন্য পাম্প ব্যবহার করুন
- থ্রাশের লক্ষণ চিনতে শিখুন, থাকলে মা আর বাচ্চা দুজনেরই চিকিৎসা লাগবে
- প্রথম সপ্তাহের পরও ব্যথা, ফাটা, টং টাই সন্দেহ, ল্যাচ বা পাম্প ফ্ল্যাঞ্জ সাইজ নিয়ে সমস্যা থাকলে দেরি না করে প্রফেশনাল সাহায্য নিন
আপনি আপনার বাচ্চার জন্য অসাধারণ একটা কাজ করছেন - তাকে নিজের দুধ খাওয়াচ্ছেন। একই সঙ্গে আপনারও অধিকার আছে আরামদায়ক আর নিশ্চিন্ত থাকার। ঠিকভাবে গাইডেন্স আর একটু সাপোর্ট পেলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্তন ফাটা ভালো হয়ে যায়, আর ব্রেস্টফিডিং হয়ে ওঠে যা হওয়ার কথা ছিল: কাছের, শান্ত, আর বেশিরভাগ সময়ই নির্ভার, প্রায় ব্যথামুক্ত একটি অভ্যাস।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।