কোলে শান্ত, বিছানায় গেলে অস্থিরতা - নবজাতক কেন কাঁদে এবং কী করবেন

কোলে থেকে বিছানায় নামালে নবজাতক কাঁদে কেন ও সমাধান

কোলের মধ্যে শান্ত, ঢিলে হয়ে থাকা শিশুকে বিছানায় নামাতেই যেন সে ছোট্ট অ্যালার্মে পরিণত হয়। পিঠ গদি ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা ছুড়তে পারে, শরীর পেছনের দিকে বাঁকিয়ে কাঁদতে পারে, কিংবা চোখ মেলে বিছানায় পড়ে থাকতে পারে। আপনি পাশে দাঁড়িয়ে ভাবতে পারেন, কী এমন ভুল হলো। যদি মনে হয়, “বিছানায় রাখলে কাঁদে কেন?”, জেনে রাখুন, এই সমস্যা খুবই সাধারণ। নবজাতকের ঘুমের শুরুর দিকের অন্যতম পরিচিত চ্যালেঞ্জ এটি।

সহজ করে বললে, কোলে থেকে বিছানায় যাওয়ার পরিবর্তনটি শিশুর অপরিণত স্নায়ুতন্ত্রের জন্য বেশ বড় ব্যাপার। আপনার শরীর উষ্ণ, নড়াচড়া করে এবং শিশুর কাছে পরিচিত। বিছানা সমতল, স্থির এবং আলাদা। বিছানায় রাখলে কাঁদে মানেই সে বিছানা অপছন্দ করে না, কিংবা আপনি কোনো খারাপ অভ্যাস তৈরি করেছেন, এমনও নয়। বেশির ভাগ সময় শিশুকে এই পরিবর্তনের মুহূর্তটি পার হতে একটু সাহায্য দরকার হয়।

এই লেখায় নবজাতকের ঘুম না আসার সব কারণ বা প্রতিটি শান্ত করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হবে না। বরং কোলে ঘুমিয়ে পড়ার পর বিছানায় নামানোর সময় শিশুর প্রতিক্রিয়া কেন হয়, সেটিই বোঝানো হবে। কারণটি বুঝতে পারলে কয়েকটি ছোট পরিবর্তনেই শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে বিছানায় রাখা অনেক কম stressful হতে পারে।

কোলে শান্ত, বিছানায় গেলেই অস্থির

হয়তো আপনি শিশুকে দুধ খাওয়ালেন, ঢেঁকুর তুলিয়ে আদর করলেন, তারপর ধীরে ধীরে দোলালেন। চোখের পাতা ভারী হলো, হাতের মুঠো আলগা হলো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সাবধানে তাকে বিছানায় নামালেন।

পিঠ গদি ছোঁয়ামাত্রই সব বদলে গেল।

শিশু স্টার্টল রিফ্লেক্সের কারণে হাত দুদিকে ছুড়ে দিতে পারে, মুখ কুঁচকে যেতে পারে এবং জোরে কাঁদতে শুরু করতে পারে। কিছু শিশু বিছানায় রাখলে শরীর আর্চ করে কাঁদে, যেন গদি থেকে উঠে আসতে চাইছে। আবার কেউ বিছানায় শুয়ে জেগেই কাঁদে, আর আপনি পাশে দাঁড়িয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।

রাতে শোয়ানোর সময়, রাতের দুধ খাওয়ানোর পর, এমনকি দিনের ঘুমের সময়ও এটি হতে পারে। শিশুকে পুরোপুরি ঘুমিয়ে পড়া মনে হলেও বিছানায় রাখার পর সে জেগে উঠতে পারে। বাচ্চা বিছানায় কাঁদে কেন, তার উত্তর সব সময় “ঘুমাতে চায় না” নয়। কোলে থাকা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, শরীরের অবস্থান বদলানো বা গদির স্পর্শের পরিবর্তনও তার অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

বিছানায় নামালে কাঁদে কেন?

একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। নিচের কারণগুলো সাধারণ এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক।

১. শরীরের উষ্ণতা, স্পর্শ ও নড়াচড়া হারিয়ে যায়

জন্মের আগে শিশু উষ্ণ, ঘেরা একটি পরিবেশে ছিল। সে আপনার হৃদস্পন্দন শুনত, আপনার চলাফেরার সঙ্গে নড়ত এবং একেবারে সমতল, স্থির কোনো জায়গায় হঠাৎ রাখা হতো না। জন্মের পরের প্রথম কয়েক মাসকে অনেকে “চতুর্থ ত্রৈমাসিক” বলেন, কারণ এই সময় শিশুর এখনও অনেকটা ঘনিষ্ঠতা ও শারীরিক আশ্বাসের প্রয়োজন থাকে।

কোলে শিশুর শরীরে চাপ, উষ্ণতা এবং হালকা দোল থাকে। বিছানায় এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে থাকে না। তাই ধীরে নামালেও নবজাতকের কাছে আচমকা নিচে নেমে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। এ কারণেই কোলে শান্ত থাকা শিশু বিছানায় রাখলে কাঁদতে পারে।

২. মোরো বা স্টার্টল রিফ্লেক্স

মোরো রিফ্লেক্স নবজাতকের স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া। শরীরের অবস্থান বদলালে বা হঠাৎ আশ্রয় কমে গেলে শিশু হাত ছুড়ে দিতে পারে, আঙুল মেলে ধরতে পারে এবং শরীর শক্ত করে ফেলতে পারে। এরপর সে কেঁদে উঠতে পারে। প্রথম কয়েক মাসে শিশু স্টার্টল রিফ্লেক্সের কারণে বারবার জেগে উঠতে পারে।

সঠিকভাবে ব্যবহার করা সোয়াডল শিশুর শরীর নিচে নেমে যাওয়ার অনুভূতি কমাতে এবং হাতের ঝাঁকুনিতে পুরোপুরি জেগে ওঠা ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে। তবে বুক ও কাঁধের কাছে সোয়াডল নিরাপদভাবে ফিট হলেও কোমর ও পায়ের জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকতে হবে। শিশু গড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে বোঝা গেলেই সোয়াডল বন্ধ করুন। শিশুকে সব সময় চিৎ করে, শক্ত ও সমতল গদির ওপর শোয়ান। গড়াতে পারে এমন শিশুর জন্য উপযুক্ত স্লিপ স্যাক পরবর্তী নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।

৩. তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন

আপনার বুক, হাত এবং পোশাক উষ্ণ। কিন্তু বিছানার চাদর শিশুর পিঠে তুলনামূলক ঠান্ডা লাগতে পারে, বিশেষ করে ঘর ঠান্ডা হলে। কোলে ঘুমিয়ে পড়া শিশুর ঘুম ভাঙার জন্য এই তাপমাত্রার পার্থক্যই যথেষ্ট হতে পারে।

প্রয়োজনে বিছানার চাদর অল্প সময়ের জন্য গরম পানির ব্যাগ দিয়ে উষ্ণ করা যায়। তবে শিশুকে রাখার আগেই গরম পানির ব্যাগটি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে। হাত দিয়ে চাদর পরীক্ষা করে নিন, যেন তা আরামদায়ক উষ্ণ হয়, গরম না হয়। বিছানায় কখনো গরম পানির ব্যাগ, হিটিং প্যাড বা অন্য কোনো উষ্ণ করার জিনিস রেখে যাবেন না। শিশুকে অতিরিক্ত কাপড়ও পরাবেন না।

৪. ক্ষুধা বা ঠিকমতো ঢেঁকুর না ওঠা

দুধ খেয়ে শিশুর চোখ লেগে আসতে পারে, কিন্তু তার পেট পুরোপুরি ভরেনি। কখনো দুধ খাওয়ার সময় গিলে ফেলা সামান্য বাতাস কোলে থাকলে বোঝা যায় না, চিৎ করে বিছানায় রাখার পর অস্বস্তি শুরু হয়। তখন মনে হয়, শিশুটি তো ঘুমিয়েই পড়েছিল, হঠাৎ কাঁদছে কেন।

দুধ খাওয়ানোর সময় স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল কি না, শিশু মাঝপথে বারবার মনোযোগ হারিয়েছিল কি না, অথবা সে মুখ দিয়ে খোঁজার মতো ভঙ্গি করছে কি না, দেখুন। হাত মুখে নেওয়া, বারবার চোষার চেষ্টা এবং অস্থিরতা ক্ষুধার ইঙ্গিত হতে পারে। দুধ খাওয়ানোর পর কিছুক্ষণ সোজা করে ধরে রাখুন। প্রয়োজনে আবার আলতো করে ঢেঁকুর তুলিয়ে নিন। তবে প্রতিবার জোরে বা শব্দ করে ঢেঁকুর উঠতেই হবে এমন নয়, তাই অনন্ত সময় ধরে পিঠ চাপড়ানোর দরকার নেই।

৫. পেটে গ্যাস বা হালকা রিফ্লাক্স

শিশুকে নাড়াচাড়া করলে বা সমতল করে শুইয়ে দিলে পেটের গ্যাসের চাপ বেশি লাগতে পারে। ছোট শিশুদের হালকা রিফ্লাক্সও সাধারণ, কারণ পাকস্থলীতে দুধ ধরে রাখার পেশি তখনও পুরোপুরি পরিণত হয় না। দুধ উঠে আসা, ভেজা ঢেঁকুর, শরীর মোচড়ানো, মুখ কুঁচকানো বা বিছানায় রাখার পরপরই কান্না এই সমস্যার সঙ্গে থাকতে পারে।

শিশুর বিছানা সমতল ও খালি রাখুন। গদি উঁচু করবেন না, বালিশ বা পজিশনার ব্যবহার করবেন না এবং কাত করে ঘুম পাড়াবেন না। রিফ্লাক্স ঘন ঘন হলে, দুধ খাওয়ায় সমস্যা হলে বা শিশুর ওজন ঠিকমতো না বাড়লে শিশু বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ধাত্রীর পরামর্শ নিন। নিরাপদ ঘুমের নিয়ম হলো শিশুকে শক্ত, সমতল গদিতে চিৎ করে শোয়ানো।

৬. অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়া

দিনের ঘুম বাদ যাওয়া বা অনেকক্ষণ জেগে থাকার কারণে শিশু আরও ভালো ঘুমাবে, এমনটা সব সময় হয় না। অতিরিক্ত ক্লান্ত হলে কিছু শিশু অস্থির হয়ে পড়ে, শরীর পেছনের দিকে বাঁকায়, তীব্রভাবে কাঁদে এবং কোলে না থাকলে শান্ত হতে পারে না। বাইরে থেকে তাকে খুব জেগে আছে মনে হলেও আসলে তার ঘুমের প্রবল প্রয়োজন থাকতে পারে।

ব্যস্ত একটি বিকেলের পর হঠাৎ “আমার শিশু কোলে না থাকলে ঘুমায় না” মনে হওয়ার কারণ এটাই হতে পারে। ঘুমের প্রাথমিক লক্ষণগুলো খেয়াল করুন, যেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা, ভ্রু লাল হয়ে যাওয়া, হাত-পায়ের অস্থির নড়াচড়া, হাই তোলা বা মুখের দিকে তাকানোর আগ্রহ কমে যাওয়া। শিশু খুব জোরে কাঁদা শুরু করার আগেই আলো কমিয়ে, কথা কম বলে এবং কোলে নিয়ে শান্ত করার প্রস্তুতি নিন।

৭. ঘুম পাড়ানোর সময়টি হয়তো একটু আগে হয়ে যাচ্ছে

এর উল্টোটাও হতে পারে। শিশু যদি যথেষ্ট সময় জেগে না থাকে, তার ঘুমের চাপ তৈরি নাও হতে পারে। তখন সে অল্প ক্লান্ত হয়ে বিরক্তিতে কাঁদবে, কিন্তু পুরো ঘুমিয়ে পড়ার মতো প্রস্তুত থাকবে না। দুধ বা আদরে চোখ লেগে এলেও দীর্ঘ ঘুমের জন্য সে তখনও প্রস্তুত নাও হতে পারে।

সব নবজাতকের জন্য একই সময়সূচি কাজ করে না। ঘড়ির কাঁটার বদলে শিশুর আচরণ দেখুন। বারবার অল্প সময়ের চেষ্টা শেষে যদি সে হাসিখুশি হয়ে জেগে ওঠে, তাহলে একটু পরে ঘুম পাড়িয়ে দেখতে পারেন। আবার সে যদি খুব অস্থির হয়ে পড়ে, পরেরবার আরও আগে ঘুমের প্রস্তুতি শুরু করুন।

৮. ঘরের পরিবেশ অস্বস্তিকর

অতিরিক্ত আলো, হঠাৎ নিস্তব্ধতা বা ঘরের অস্বস্তিকর তাপমাত্রায় বিছানায় যাওয়ার পরিবর্তনটি শিশুর কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। কিছু শিশু আলো কমানো ঘরে এবং আগে থেকেই চালু থাকা মৃদু সাদা শব্দে ভালো ঘুমায়। আবার কেউ সম্পূর্ণ নীরবতায় অস্বস্তি বোধ করে, স্বাভাবিক ঘরের হালকা শব্দে বরং শান্ত থাকে।

ঘর আরামদায়ক ঠান্ডা রাখুন, অতিরিক্ত গরম নয়। শিশুর হাত-পা ঠান্ডা কি না দেখে তাপমাত্রা বিচার করবেন না, বুক বা পিঠে হাত দিয়ে দেখুন। সাদা শব্দ ব্যবহার করলে সেটি যেন মৃদু হয় এবং বিছানা থেকে যথেষ্ট দূরে থাকে। শব্দ এত জোরে দেবেন না যে তার ওপর কথা বলতে আপনাকে গলা উঁচু করতে হয়।

৯. শিশুর শুধু কাছে থাকতে ইচ্ছে করছে

কোলে থাকতে চাওয়া শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। এটি কোনো জেদ নয়, আর নবজাতককে সাড়া দিলে সে “বখে যাবে” এমনও নয়। আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পরিকল্পনা তার নেই। কান্নার মাধ্যমে সে শুধু জানাচ্ছে, শরীরের উষ্ণতা ও স্পর্শ থেকে আলাদা হওয়াটা তার জন্য কঠিন লাগছে।

বিশেষ করে তিন-চার মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে কোলে ঘুম বা বেবিওয়্যারিং দিনের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে একা ঘুমানোর সম্ভাবনা নষ্ট হয় না। তবে স্লিং বা ক্যারিয়ার ব্যবহারের নিরাপত্তা মেনে চলুন। আপনার নিজের ঘুম চলে আসতে পারে মনে হলে শিশুকে অবশ্যই খালি, শক্ত ও সমতল বিছানায় নিয়ে যান।

শিশুকে বিছানায় রাখলে কিভাবে শান্ত করব

প্রতিবার কান্নাহীনভাবে শিশুকে বিছানায় রাখা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে জোর করে একা ঘুম পাড়ানো নয়। বরং কোলে থেকে বিছানায় যাওয়ার পরিবর্তনটি ধীরে করা এবং তার শান্ত থাকার সুযোগ তৈরি করা।

আগে থেকেই বিছানা প্রস্তুত রাখুন

দুধ খাওয়ানো বা দোলানো শুরু করার আগেই সবকিছু গুছিয়ে নিন:

  • শক্ত ও সমতল গদি, তার ওপর ভালোভাবে লাগানো চাদর
  • শিশুকে চিৎ করে শোয়ানোর ব্যবস্থা, বিছানায় কোনো বালিশ, আলগা কম্বল, খেলনা বা স্লিপ পজিশনার নয়
  • আরামদায়ক তাপমাত্রা ও মৃদু আলো
  • শিশুর উপকার হলে আগে থেকেই চালু করা মৃদু সাদা শব্দ
  • ঘুম পাড়ানোর সময় যে স্লিপ স্যাক বা সোয়াডল ব্যবহার করেছেন, সেটিই, তবে শিশুর বয়স ও নড়াচড়ার পর্যায়ে সোয়াডল এখনও নিরাপদ হলে

পরিচিত স্লিপ স্যাক ঘুমের একটি সংকেত হয়ে উঠতে পারে। এটি কোনো জাদুর সমাধান নয়, কিন্তু একই রুটিন বারবার হলে শিশু বুঝতে শেখে যে এখন ঘুমের সময়।

নিরাপদে চাদরের ঠান্ডা ভাব কমান

গদি বা চাদর ঠান্ডা মনে হলে শিশুকে শান্ত করার সময় অল্পক্ষণ গরম পানির ব্যাগ চাদরের ওপর রাখতে পারেন। কিন্তু শিশুকে বিছানায় রাখার আগে প্রতিবারই সেটি সরিয়ে ফেলুন এবং হাত দিয়ে নিশ্চিত হন, চাদর গরম হয়ে যায়নি। বৈদ্যুতিক প্যাড দিয়ে বিছানা গরম করবেন না। ঘুমন্ত শিশুর নিচে, পাশে বা বিছানায় কোনো গরম করার সরঞ্জাম রাখবেন না।

সম্ভব হলে গভীর ঘুমের অপেক্ষা করুন

দুধ খাওয়ানো বা দোলানোর পর খুব ছোট শিশুকে বিছানায় রাখার আগে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হতে পারে। তার হাত-পা ঢিলে হয়েছে কি না, শ্বাস ধীর হয়েছে কি না এবং মুখের পেশি শিথিল দেখাচ্ছে কি না, খেয়াল করুন। শিশুকে তোলার আগে বুক বা পেটে আলতো করে হাত রেখে ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে পারেন।

এই সামান্য বিরতি অনেক সময় সেই পরিচিত দৃশ্যটি এড়াতে সাহায্য করে, যেখানে আপনি ঘর থেকে বেরোতেই পেছন থেকে কান্না শুনতে পান।

ধীরে নামান এবং কিছুক্ষণ স্পর্শ ধরে রাখুন

প্রথমে শিশুর নিতম্ব ও পা গদিতে রাখুন, তারপর ধীরে কাঁধ ও মাথা নামান। বিছানায় রাখার পর প্রায় এক মিনিট বুক বা পেটের ওপর একটি হাত আলতো করে রেখে দিন। চাপটি স্থির ও হালকা হবে, ভারী নয়। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক এবং শরীর শান্ত মনে হলে ধীরে হাত সরিয়ে নিন।

শিশু নড়েচড়ে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে কোলে না তুলে একটু থামুন। হালকা গোঁ গোঁ শব্দ বা শরীর মোচড়ানো মানেই সে পুরোপুরি জেগে গেছে, এমন নয়। তবে কান্না বাড়তে থাকলে তাকে তুলে আবার শান্ত করুন। শিশুকে তীব্র কান্নায় পৌঁছে দেওয়ার কোনো পুরস্কার নেই।

সামান্য কাত করে শান্ত করুন, তারপর চিৎ করে দিন

কিছু শিশুর কাছে একবারে সমতল করে নামানোর অনুভূতিটা অস্বস্তিকর লাগে। কোলে থাকা অবস্থায় তাকে সামান্য পাশমুখী ভঙ্গিতে শান্ত করে বিছানায় রাখা যায়। এরপর ছেড়ে দেওয়ার আগে আলতো করে তাকে চিৎ করে দিন। শিশুর ঘুমের চূড়ান্ত অবস্থান অবশ্যই চিৎ হওয়া উচিত।

এতে নামানোর গতিটা কিছুটা ধীর ও মসৃণ লাগতে পারে। তবে শিশুকে কাত হয়ে ঘুমাতে রেখে যাবেন না।

যা করবেন না

প্রতিবার বিছানায় রাখার পর শিশু কাঁদলে ক্লান্ত অবস্থায় কিছু অনিরাপদ পদ্ধতিও সহজ সমাধান বলে মনে হতে পারে। এগুলো এড়িয়ে চলুন:

  • নবজাতককে কাঁদতে কাঁদতে একা ছেড়ে দেবেন না। এই বয়সে শিশুর সাড়া পাওয়া ও প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন নেওয়া দরকার। নবজাতকের জন্য আনুষ্ঠানিক ঘুমের প্রশিক্ষণ উপযুক্ত নয়।
  • কখনো শিশুকে ঝাঁকাবেন না। খুব অসহায় বা বিরক্ত লাগলে শিশুকে চিৎ করে নিরাপদ বিছানায় রাখুন, কয়েক মিনিট দূরে যান এবং কাছের বিশ্বস্ত কাউকে ফোন করুন।
  • বালিশ, গোটানো তোয়ালে বা কম্বল দিয়ে শিশুর চারপাশ ঘিরে দেবেন না। এতে শ্বাস বন্ধ হওয়া বা অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  • স্লিপ পজিশনার, ঢালু গদি বা নিজের মতো করে বানানো নেস্ট ব্যবহার করবেন না।
  • সোফা বা হাতলওয়ালা চেয়ারে শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন না। শিশুকে কোলে নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কের ঘুমিয়ে পড়ার জন্য এগুলো খুব ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা।

শিশুকে শান্ত করতে গিয়ে প্রতিটি দিনের প্রতিটি ঘুম বিছানাতেই করাতেই হবে, এমন নয়। কোনো কঠিন দিনে নজরদারির মধ্যে কোলে ঘুমও বাস্তবসম্মত একটি উপায় হতে পারে। তবে আপনি ঘুমিয়ে পড়তে পারেন মনে হলে শিশুকে অবশ্যই নিরাপদ বিছানায় সরিয়ে নিন।

কখন এটি স্বাভাবিক, আর কখন সাহায্য নেওয়া দরকার?

প্রথম কয়েক মাসে বিছানায় রাখলে কান্না করা খুবই সাধারণ। নবজাতক কেন কাঁদে, তার একটি স্বাভাবিক উত্তর হলো, কোলে থাকা তার কাছে বেশি নিরাপদ ও পরিচিত মনে হয়। এর অর্থ সব সময় কোনো সমস্যা হয়েছে এমন নয়। সময়ের সঙ্গে শিশুর স্টার্টল রিফ্লেক্স কমে, হজমশক্তি পরিণত হয় এবং স্নায়ুতন্ত্র পরিবর্তন সামলাতে শেখে। তখন অনেক শিশু ধীরে ধীরে বিছানায় বেশি সময় ঘুমাতে পারে।

তবে কান্না যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা থামানো না যায়, জ্বরের সঙ্গে হয়, দুধ খেতে না চায় বা ওজন ঠিকমতো না বাড়ে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা ধাত্রীর সঙ্গে কথা বলুন। শ্বাসকষ্ট, পেট ফুলে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ব্যথা, অতিরিক্ত নিস্তেজতা কিংবা জোরে ছিটকে বমি হলে দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ নিন। আপনার নিজের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিন। শিশুর স্বাভাবিক কান্নার ধরন বদলে গেলে আপনি তা বুঝতে পারবেন।

“বাচ্চা কেঁদে কেন” বা “বিছানায় রাখলে জেগে কাঁদে” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক সময় খুব সাধারণ। আপনার কোলে থেকে বিছানায় যাওয়ার পরিবর্তনটি এই মুহূর্তে তার জন্য একটু বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে। তার হয়তো উষ্ণতা, ধীরে নামানো, ঢেঁকুর, একটু আগে ঘুমের প্রস্তুতি বা আরও কিছুক্ষণ আপনার কাছাকাছি থাকা দরকার। এটি আপনার ব্যর্থতা নয়, খারাপ অভ্যাসও নয়। ছোট্ট শিশুটি শুধু আপনার সাহায্যে কোলে থেকে বিছানায় যাওয়ার পথটি ধীরে ধীরে শিখছে।


এই বিষয়বস্তু শুধুমাত্র তথ্যের উদ্দেশ্যে এবং এটি আপনার ডাক্তার, শিশু বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের পরামর্শের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আপনার যদি কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনাকে একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

Erby — নবজাতক ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য বেবি ট্র্যাকার

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।
Erby

Erby

বুকের দুধ খাওয়ানো, পাম্পিং, ঘুম, ডায়াপার এবং বিকাশের মাইলফলক ট্র্যাক করুন।