শিশুর গাল বা গলায় হঠাৎ লাল দাগ, ত্বক খসখসে হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, মাথা ভরা সাদা সাদা ফোঁটা – প্রথমবার দেখলে বুক কাঁপা স্বাভাবিক। মাথায় প্রশ্নও চলে আসে, «এটা কি স্বাভাবিক? এখনই কি ডাক্তার দেখাতে হবে, নাকি কোনো ক্রিম দিলেই হবে?»
ভাল খবর হল, বেশিরভাগ নবজাতকের ত্বক সমস্যা দেখতে যত ভয়ংকর লাগে, আসলে তত গুরুতর হয় না। গর্ভের ভেতরের নরম পানির পরিবেশ ছেড়ে হঠাৎ বাইরের ধুলা, গরম-ঠান্ডা, জামা-কাপড়ের চাপে আসতেই শিশুর ত্বক নানা অদ্ভুতভাবে রিঅ্যাক্ট করে, এটা প্রায় সবার ক্ষেত্রেই হয়।
এই গাইডে ধীরে ধীরে দেখানো হচ্ছে নবজাতকের ত্বক কি স্বাভাবিক কি নয় - কোন ধরনের র্যাশ, খসখসে ভাব বা দাগ সাধারণত চিন্তার কারণ নয়, আর কখন দ্রুত ডাক্তার দেখানো দরকার। যাতে রাত ৩টায় «নবজাতকের ত্বকে সাদা ছোট ফোঁটা» সার্চ করতে গিয়ে একটু হলেও শান্ত থাকতে পারেন।
নবজাতকের ত্বক খুব পাতলা, নরম আর সংবেদনশীল। গর্ভের ভেতরে সে সারাক্ষণ উষ্ণ পানিতে ভাসত, তার গা ভরা থাকত সাদা ক্রিমের মতো এক স্তরে (ভারনিক্স)। হঠাৎ জন্মের পর শুকনো বাতাস, জামা-কাপড়, ডায়াপার, কখনো গরম কখনো ঠান্ডা – সব মিলিয়ে ত্বকের উপর বেশ চাপ পড়ে।
এই হঠাৎ বদলের ফলেই অনেক শিশুর ত্বকে দেখা যায়:
এগুলোর বেশিরভাগই:
চ্যালেঞ্জ শুধু একটাই - বুঝে ওঠা যে কোন নবজাতক র্যাশ স্বাভাবিক, আর কোনটা সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিত।
এখানে আগে আমরা কয়েকটা সাধারণ, মূলত নিরীহ শিশুর ত্বক এর পরিবর্তন নিয়ে কথা বলব, তারপর শেষে বলব কোন কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো জরুরি।
অনেক বাবা-মা ঘাবড়ে যান, কারণ:
বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের পর (post-term) জন্মানো বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নবজাতকের চামড়া ছেঁড়ে পড়া কেন এত বেশি হয়, সেজন্য অনেকেই ভয় পান।
গর্ভাবস্থার শেষের দিকে ভ্রূণের ত্বকের বাইরের স্তরটা একটু মোটা হয়ে যায়। জন্মের পর যখন সে আর পানি না, সরাসরি বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন ওই বাইরের স্তরটা শুকিয়ে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ঝরে পড়ে।
এটা কিন্তু আপনার নবজাতকের ত্বক যত্ন ঠিকমতো না করার জন্য হয় না। একেবারেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, পুরনো স্তর গিয়ে ভেতরের একেবারে নতুন নরম ত্বক বেরিয়ে আসে।
বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে:
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আলাদা চিকিৎসার দরকার হয় না।
যা করতে পারেন:
অনেকের ইচ্ছা হয় ওঠা চামড়াগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলতে, ওটা করবেন না। নিজে থেকে ঝরতে দিন।
মিলিয়া নবজাতক বলতে সাধারণত বোঝায়:
আপনি যদি «নবজাতকের ত্বকে সাদা ছোট ফোঁটা» বা «মিলিয়া নবজাতক» লিখে খুঁজে থাকেন, খুব সম্ভবত এই দানাগুলোর কথাই পাচ্ছেন।
মিলিয়া আসলে ছোট ছোট ব্লকড পোর। ত্বকের ভেতরের কেরাটিন (এক ধরনের প্রোটিন) বাইরে বেরোতে না পেরে ক্ষুদ্র সিস্টের মতো ফেঁপে থাকে।
এগুলো:
মিলিয়া সাধারণত:
এটারও আলাদা চিকিৎসা লাগে না।
কিন্তু করবেন না:
শুধু পরিষ্কার পানি বা খুব মৃদু বেবি ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুয়ে দিন, সময়মতো মিলিয়া নিজে থেকেই চলে যাবে।
শিশু একনে বা নবজাতক একনে শুনলেই অনেকের মনে টিনএজ ব্রণের ছবি আসে। আসলে ওটা থেকে আলাদা, তবে দেখতে বেশ নাটকীয় লাগতে পারে।
যা দেখা যায়:
হঠাৎ হঠাৎ উঠে আসায় বাবা-মা বেশ শঙ্কায় পড়েন, অথচ এটা খুবই সাধারণ নবজাতকের ত্বক সমস্যা।
ঠিক কারণ এখনো পুরো পরিষ্কার না, তবে ধারণা করা হয়:
এক কথায়, মা ঠিকমতো খায়নি, বেশি ঝাল খেয়েছে বা শিশুর মুখ নোংরা আছে বলে এমন হয় না।
শিশু একনে সাধারণত:
এই সময়ে ওঠানামা করতেই পারে, কিছুদিন ভালো, কিছুদিন খারাপ, এটা স্বাভাবিক।
বেশিরভাগ সময় আলাদা ওষুধের দরকার হয় না।
কিছু সহায়ক টিপস:
যদি দাগগুলো খুব বেশি লাল, ফুলে ওঠা, দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, বা ৩ মাস পার হয়েও একটুও কমছে না মনে হয়, তবে শিশু বিশেষজ্ঞ বা স্থানীয় ডাক্তারকে একবার দেখাতে ভালো। একজিমা, ফাঙ্গাল সংক্রমণ ইত্যাদি থেকে আলাদা করা তখন দরকার হতে পারে।
শুনতে নামটা বেশ ভয়ের - এরিথেমা টক্সিকাম। কিন্তু বাস্তবে এটা খুব স্বাভাবিক, নিরীহ এক ধরনের নবজাতক র্যাশ।
সাধারণত দেখা যায়:
দেখতে একটু পোকা কামড়ানো দাগ বা অ্যালার্জির হাইভের মতো লাগতে পারে। আজ যেমন দেখছেন, কালকে আবার অন্য জায়গায়, আবার কমেও যেতে পারে।
ডাক্তাররা ধরতে পারেন, এটা সম্ভবত শিশুর ত্বক আর ইমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিকভাবে ম্যাচিউর হওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ। এটা:
এরিথেমা টক্সিকাম সাধারণত:
এটার জন্য আলাদা চিকিৎসা লাগবে না।
আপনি:
শিশু যদি স্বাভাবিক মতো দুধ খায়, জেগে থাকে, জ্বর না থাকে, অন্য কোনো চিন্তার মতো উপসর্গ না থাকে, তবে এরিথেমা টক্সিকামকে সাধারণ, স্বাভাবিক র্যাশ হিসেবেই ধরা হয়।
অনেক বাবা-মা বলেন, «শিশুর গা যেন পুড়ে গিয়ে নকশা হয়ে গেছে» - আসলে ওটাই শিশুর ত্বকে মটলিং বা মার্বেলিং।
দেখতে হয়:
সাধারণত দেখা যায় যখন:
নবজাতকের রক্তনালি এখনো পুরোপুরি পরিপক্ক হয়নি। গরম-ঠান্ডা অনুযায়ী কখন সঙ্কুচিত হবে, কখন ঢিলে হবে তা নিয়ন্ত্রণে তারা একটু ধীর।
শরীর সামান্য ঠান্ডা লাগলেই ত্বকের উপরের রক্তনালি সঙ্কুচিত হয়ে এমন মার্বেলিং ধরনের নকশা তৈরি করে।
মটলিং সাধারণত:
অল্প সময়ের জন্য আসা-যাওয়া করা আর গরম করলে মিলিয়ে যাওয়া মটলিং সাধারণত স্বাভাবিক।
এর জন্য কোনো ওষুধ বা ক্রিমের দরকার নেই।
করতে পারেন:
তবে যদি নকশাটা সবসময়ই থেকে যায়, খুব গাঢ়, শিশুও যদি ফ্যাকাসে বা অস্বাভাবিক দুর্বল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এমন মনে হয়, তাহলে দ্রুত স্থানীয় ডাক্তার বা নিকটস্থ হাসপাতালের শিশু বিভাগে যোগাযোগ করুন।
মঙ্গোলিয়ান স্পট বলতে আমরা যা দেখি, তা আসলে:
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিশুরা, আফ্রিকান ও এশিয়ান বংশোদ্ভূত শিশুদের মধ্যে এগুলো খুবই সাধারণ। ফর্সা বাচ্চাদেরও হতে পারে।
অনেক সময় মা-বাবা বা আশপাশের মানুষ ভেবে বসেন, শিশু বুঝি পড়ে গিয়েছে বা কেউ মেরেছে। তবে ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, ধারের অংশগুলো মসৃণ, দাগ স্পর্শ করলে বাচ্চা ব্যথা পায় না।
মঙ্গোলিয়ান স্পট আসলে এক ধরনের জন্মদাগ। ত্বকের কিছু রঞ্জক কোষ (মেলানোসাইট) স্বাভাবিকের চেয়ে একটু গভীরে চলে যাওয়ার ফলেই এই রঙ হয়। এর সাথে আঘাত, চাপ, মারধর বা ডেলিভারির কোনো সমস্যার সম্পর্ক নেই।
এই জন্মদাগগুলো:
কিছু দাগ থেকে যেতে পারে, তবে ধীরে ধীরে রঙ ফিকে হয়ে যায়।
এটার কোনো চিকিৎসা লাগে না।
তবে যা করা জরুরি:
এগুলো ভবিষ্যতে অন্য কোনো সমস্যায় রূপ নেয় না, সাধারণত স্বাভাবিক, নিরীহ জন্মদাগ হিসেবেই থেকে যায়।
ক্রেডল ক্যাপ বা infant seborrhoeic dermatitis অনেক বাচ্চার মাথায় দেখা যায়:
কেবল মাথা নয়, কখনো ভুরু, কান-এর পেছনে বা ঘাড়, বগল, গলার ভাঁজেও দেখা যেতে পারে। দেখতে একটু অদ্ভুত, তাই অনেক বাবা-মা চিন্তায় পড়ে যান, যদিও শিশুর বেশিরভাগই এতে একটুও বিরক্ত হয় না।
ধারণা করা হয়, ক্রেডল ক্যাপ হয়:
এর সাথে ময়লা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব বা অ্যালার্জির তেমন সম্পর্ক নেই।
ক্রেডল ক্যাপ সাধারণত:
হালকা ধরনের ক্রেডল ক্যাপ বাসায়ই সামলানো যায়।
আপনি চেষ্টা করতে পারেন:
করবেন না:
যদি ত্বকটা খুব লাল হয়ে যায়, ফুলে ওঠে, পানি পড়ে বা পুঁজের মতো কিছু বের হয়, আর বাচ্চা খুব অস্বস্তি বোধ করে, তাহলে নিকটস্থ শিশু বিশেষজ্ঞ বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো ভালো। কখনো কখনো মেডিকেটেড শ্যাম্পু বা বিশেষ ক্রিম লাগতে পারে।
তাহলে, নবজাতক র্যাশ স্বাভাবিক কি না? বেশিরভাগ সময়ই হ্যাঁ। তবে কিছু কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলো দেখলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো দরকার। আমাদের দেশে সাধারণত শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগ বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই আগে যোগাযোগ করা হয়।
তাড়াতাড়ি ডাক্তার, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন যদি:
এ ধরনের গুরুতর লক্ষণ দেখলে দেরি না করে নিকটস্থ বড় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান, প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯ এ কল করে সাহায্য নিন।
সবচেয়ে বড় কথা, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। আপনার মনে যদি জোরেই বারবার আসে, «কিছু একটা ঠিক নেই», তাহলে সেটা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, এমনকি শেষ পর্যন্ত যদি সেটাও বের হয় যে এটা কেবল স্বাভাবিক নবজাতকের ত্বক সমস্যা ছিল, তবু।
শিশুর নরম শিশুর ত্বক সুস্থ রাখতে এবং অযথা ইরিটেশন কমাতে কিছু সাধারণ নিয়ম মানলে ভালো হয়:
অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর কেয়ার হল – একেবারে সিম্পল রাখা। অযথা বেশি কিছু না করে ত্বককে নিজের মতো করে অ্যাডজাস্ট করতে দেয়া।
স্ক্রিনশট বা সেভ করে রাখার মতো দ্রুত তালিকা:
ত্বক খসখসে হওয়া / খোসা ওঠা
মিলিয়া (নাকে/চিবুকে সাদা ছোট ফোঁটা)
শিশু একনে / নবজাতক একনে
এরিথেমা টক্সিকাম
মটলিং/মার্বেলিং
মঙ্গোলিয়ান স্পট
ক্রেডল ক্যাপ
আর অবশ্যই মনে রাখবেন, নিচের সতর্কতা সংকেতগুলো দেখলে দেরি না করে ডাক্তার:
জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে আপনার শিশুর ত্বক প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু বদলাবে। একদিন লাল, আরেকদিন খসখসে, কিছুদিন পরেই একেবারে নরম আর মসৃণ। বেশিরভাগ বদলই স্বাভাবিক, যদিও দেখতে অনেক সময় ভয় ধরিয়ে দিতে পারে।
দ্বিধা হলে ছবি তুলুন, ভালো আলোতে স্পষ্ট করে, আর আপনার শিশু বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি ক্লিনিকের ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখান। এতে আপনি অতিরিক্ত চিন্তাও কম করবেন, আর ধীরে ধীরে নিজেও বুঝে যাবেন, আপনার এই ছোট্ট মানুষটার শিশুর ত্বক ঠিক কেমনভাবে নিজের মতো করে বদলাচ্ছে আর বড় হচ্ছে।