আপনি প্রসবের ঝড়ঝাপটা সামলে, বাসায় ফেরা প্রথম ক’টা ঝাপসা দিন কাটিয়েছেন। এখন হয়তো হেঁটে যাওয়ার গাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে প্রশ্ন ঘুরছে - «নবজাতককে বাইরে কবে নেওয়া যায়?» বা «নবজাতকের প্রথম হাঁটা কত তাড়াতাড়ি করানো ঠিক হবে?»
চিন্তা একটু কমিয়ে ফেলি। ক্যালেন্ডারে গোল করে রাখা কোনো নির্দিষ্ট দিন নেই। আসল ব্যাপার হচ্ছে, আপনার শিশুর অবস্থা, আবহাওয়া আর আপনার শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি। এই গাইডে থাকছে - নবজাতকের প্রথম হাঁটা কখন থেকে শুরু করতে পারেন, কতক্ষণ শিশু বাইরে থাকবে, কীভাবে পোশাক পরাবেন, আর কী কী সঙ্গে নিলে নবজাতকের প্রথম আউটিং আরামদায়ক ও কম স্ট্রেসফুল হয়।
এ বিষয়ে কোনো কড়াকড়ি নিয়ম নেই। বাংলাদেশে অনেক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও গাইনি ডাক্তাররা মনে করেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়ার কয়েক দিন পরই ছোট্ট ছোট্ট হাঁটা শুরু করা যায়, যদি:
শিশু বাইরে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের এখানে আবহাওয়া বড় ভূমিকা রাখে।
মৃদু আরামদায়ক গরম (প্রায় ২৪–২৮ °C)
এই তাপমাত্রায় বাসায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই খুব ছোট ছোট হাঁটা দেওয়া যায়। অনেক নতুন মা-বাবা ৩–৪ দিন পর থেকেই বাড়ির সামনে বা ছাদের উপর হালকা হাঁটা দেন।
হালকা ঠান্ডা বা কম তাপমাত্রা (প্রায় ১৫–২৪ °C)
নবজাতকের জন্য বেশ আরামদায়ক আবহাওয়া। তবে হাওয়া বেশি থাকলে একটু বাড়তি কাপড় আর মাথায় টুপি দিয়ে নেবেন।
শীতকালে নবজাতক বাইরে নেওয়া (প্রায় ১০ °C বা তার নিচে, দেশের উত্তরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকায়)
শীতে নবজাতক নিয়ে বাইরে যাওয়া একেবারে নিষেধ না, তবে একটু বাড়তি সাবধান থাকা ভালো। খুব ছোট ছোট আউটিং, দিনের তুলনামূলক উষ্ণ সময়ে, ঠান্ডা হাওয়া ও কুয়াশা এড়িয়ে। যদি এমন ঠান্ডা হয় যে আপনার নিজের গাল ও হাত কাঁপছে, তাহলে নবজাতকের জন্য তা যথেষ্ট কড়াই।
প্রচণ্ড গরমের সময় (৩৫ °C এর উপরে)
এ সময় গরমে নবজাতক বাইরে নেওয়া যতটা সম্ভব সীমিত রাখা ভালো, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা জরুরি। ভাবছেন, গরমের তীব্রতায় বা heatwave এ নবজাতককে বাইরে নেওয়া যায় কি না? সম্ভব হলে একেবারে না, খুব প্রয়োজন হলে ভোর বা সন্ধ্যার দিকে, অল্প সময়ের জন্য, কেবল ছায়ায়।
যদি শিশুটি প্রিম্যাচিউর (নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মানো) হয়, বা শ্বাসকষ্ট, হার্ট, ইনফেকশনসহ অন্য কোনো জটিলতা থাকে, তাহলে নবজাতকের প্রথম আউটিং কখন হবে, সেটা নিয়ে নিজের গাইনি, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা কমিউনিটি ক্লিনিক/উপজেলা হাসপাতালের ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
নতুন মায়ের জন্য দুপুর গড়িয়ে গেলেও যখন এখনো পায়জামা-পাঞ্জাবিতেই আছেন, তখন বাইরে বেরোনোর চিন্তাই ক্লান্তিকর লাগতে পারে। কিন্তু নবজাতককে বাইরে নেওয়ার কিছু সত্যিকারের উপকার আছে - আপনার শিশুর জন্যও, আপনার নিজের জন্যও।
তাজা বাতাস আর কোমল উত্তেজনা
নতুন নতুন শব্দ, আলো, চারপাশের নড়াচড়া শিশুর মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে পৃথিবী চিনতে শেখায়। খুব ভিড় বা কোলাহল না, শান্ত গলি বা ছাদে হাঁটাই যথেষ্ট।
দিন-রাতের ঘুমের রুটিন গড়ে ওঠা
প্রাকৃতিক daylight বা দিনের আলো শিশুর বায়োলজিক্যাল ক্লক (circadian rhythm) বানাতে সাহায্য করে। সকালে বা দিনের বেলায় নিয়মিত কিছুক্ষণ বাইরে থাকলে ধীরে ধীরে ওরা দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে শেখে। এতে সময়ের সাথে ঘুমের প্যাটার্ন অনেকটাই গোছানো হতে পারে।
নবজাতক সূর্যালোক ভিটামিন ডি
বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের জন্মের পরই ডাক্তাররা ভিটামিন ডি ড্রপ দিতে বলেন, বিশেষ করে শুধু মায়ের দুধ খেলে। তবুও দিনের মৃদু রোদে একটু বেরোনো শিশুর শরীরের ঘড়ি আর সামগ্রিক সুস্থতার জন্য ভালো, শর্ত একটাই - সরাসরি তীব্র রোদে শিশুর উলঙ্গ বা খোলা ত্বক যেন না পড়ে।
মনের উপর ভালো প্রভাব
সারাক্ষণ ঘরের ভেতর বন্দি থাকার অনুভূতি নতুন মায়েদের মধ্যে খুব সাধারণ। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে হওয়া গবেষণায় দেখা গেছে, হালকা হাঁটাহাঁটি আর সামান্য সময়ের জন্য হলেও বাইরে বেরোনো প্রসব পরবর্তী হতাশা ও দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে।
প্রসবের পর শরীরকে আলতোভাবে চালু রাখা
ধীরে ধীরে হাঁটা শরীরের রক্ত চলাচল বাড়ায়, পেশি টোন ফিরে পেতে সাহায্য করে, আর আপনি নিজেও একটু ফ্রেশ অনুভব করেন। জোরে হাঁটার দরকার নেই, বাসার সামনে সামান্য এদিক-ওদিক করলেই হয়।
পরিবেশ বদলের স্বাদ
কখনো কখনো যা লাগে তা হলো, ছায়ায় বসে এক কাপ চা বা কফি, আর হালকা বাতাসের মধ্যে প্রামের ভিতর ঘুমানো বাচ্চা। ছোট্ট এই পরিবর্তনই মানসিকভাবে অনেকটা হালকা করে দেয়।
আরেকটা প্রায় সবার প্রশ্ন - শিশু বাইরে নেওয়া কতক্ষণ নিরাপদ?
সহজভাবে ধরতে পারেন:
শিশুর দিকে সবসময় খেয়াল রাখুন, ও খুব স্পষ্ট করে ইঙ্গিত দেয়।
খুব ছোট বাচ্চার বাইরে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকা জরুরি না। স্বল্প সময়ের শান্ত হাঁটা, দিনে একবার বা দুইবার, এইটুকুই যথেষ্ট।
সময় ঠিক করাটাও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গরমকালে।
গ্রীষ্মকাল (চৈত্র–জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়)
শীতের শেষ আর বসন্ত, বর্ষার মাঝামাঝি আর শরৎকাল
এই সময়গুলো বাংলাদেশে নবজাতক নিয়ে হাঁটার জন্য অনেকটাই আরামদায়ক। মধ্য সকাল বা বিকেলের দিক বেশ ভালো যায়।
শীতকাল (পৌষ–মাঘ, উত্তরাঞ্চল বা গ্রামে বেশি)
যতটা সম্ভব দিনের সবচেয়ে রোদেলা আর উষ্ণ সময়, সাধারণত বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে বাইরে বেরোলে ভালো। খুব সকাল বা সন্ধ্যার কনকনে ঠান্ডা, কুয়াশা আর বেশি বাতাস এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
নবজাতকের জন্য নিরাপদ আউটিং কল্পনা করতে এই টেম্পারেচার গাইডটা মনে রাখতে পারেন, স্থানীয় হিসাবেই চিন্তা করা হলো:
৩৫ °C এর উপরে (প্রচণ্ড গরম)
প্রায় ২৫–৩০ °C
প্রায় ১৮–২৫ °C
প্রায় ১০–১৮ °C
১০ °C এর নিচে (বাংলাদেশে খুব কম হলেও, পাহাড়ি বা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হতে পারে)
সবসময় মনে রাখবেন, হাওয়া আর আর্দ্রতা (humidity) তাপমাত্রার অনুভূতি বদলে দেয়। প্রচণ্ড গরমে আর্দ্রতা বেশি থাকলে শিশুর গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়, আর কুয়াশা আর হাওয়াযুক্ত কম তাপমাত্রা শুকনো ঠান্ডার চেয়ে বেশি কষ্টকর লাগতে পারে।
নতুন মা-বাবার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা অনেক সময় কাপড় নিয়েই হয়। সাধারণ নিয়ম হলো, আপনি যত স্তরের কাপড় পরেছেন, তার চেয়ে আপনার নবজাতককে এক স্তর বেশি।
ধরা যাক তাপমাত্রা প্রায় ২০–২৪ °C, মানে আমাদের সাধারণ আরামদায়ক দিন:
তাপমাত্রা যদি কমে ১৫–১৮ °C এর কাছাকাছি হয়:
তাপমাত্রা যদি ২৫–৩০ °C এর মধ্যে হয়:
খুব গরমে অনেক সময় শুধু একটা সুতি রম্পার বা হালকা ভেস্টই যথেষ্ট, পায়ের উপর ঢিলেঢালা একটা মসলিন কাপড় দিতে পারেন, তবে অবশ্যই শিশুকে পুরোপুরি ঢেকে বায়ু চলাচল বন্ধ করবেন না।
আপনি যেটাতে বেশি স্বস্তি পান, শিশুর বয়স আর সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে সেটাই ব্যবহার করতে পারেন।
নবজাতকের জন্য ফ্ল্যাট পজিশন দেওয়া যায় এমন স্ট্রোলার বা প্রাম
নবজাতকের মেরুদণ্ড সোজা রেখে ঘুমানোর জন্য এগুলো ভালো। সবসময় খেয়াল রাখবেন, স্ট্রোলারে যেন ভালো sunshade (ছায়া) আর বৃষ্টির কভার থাকে, যাতে হাওয়া, গরম আর ধুলোবালি কিছুটা ঠেকানো যায়।
সফট স্লিং বা বেবি ক্যারিয়ার
অনেক মা-বাবা পেটের সাথে লাগিয়ে রাখার জন্য স্লিং ভালোবাসেন, এতে বাচ্চা নিজেকে নিরাপদ মনে করে, আর মা-বাবার হাত ফাঁকা থাকে। তবে মনে রাখবেন, আপনার শরীরের গরমও শিশুর জন্য অতিরিক্ত তাপের মত কাজ করে, তাই ক্যারিয়ারে রাখলে শিশুকে এক স্তর কম কাপড় দিন।
খেয়াল রাখবেন, স্ট্রোলারের সামনের অংশ একেবারে ঘন কম্বল বা কাপড় দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দিবেন না। এতে ভিতরে গরম আর বদ্ধভাব তৈরি হয়, বাতাস চলাচল কমে যায়। স্ট্রোলারের জন্য আলাদা sunshade, অথবা পাতলা, বায়ু চলাচল হয় এমন মসলিন কাপড় খুব ঢিলে করে একপাশ থেকে ঝুলিয়ে ছায়া তৈরি করাই ভালো।
জন্মের পরের প্রথম কয়েক মাসে আপনার শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো পুরোদমে গড়ে ওঠেনি। বাইরে খোলা হাওয়ায় সরাসরি বাতাস থেকে ইনফেকশন হওয়ার ভয় খুব কম, বরং ঝুঁকি বেশি মানুষের ভিড় আর সরাসরি সংস্পর্শ থেকে।
যতটা সম্ভব চেষ্টা করুন:
শান্ত পার্ক, গলিপথ, শান্ত ছাদ, লেকের পাড় বা শান্ত ক্যাফের বারান্দা ভিড়ভাট্টা ইনডোর জায়গার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
প্রথমবার বেরোতে গিয়ে অর্ধেক সময় চলে যায় শুধু ব্যাগ গোছাতে গিয়ে। তাই আগে থেকে মাথায় একটা ছোট্ট নবজাতকের প্রথম হাঁটা নির্দেশিকা/চেকলিস্ট থাকলে সুবিধা হয়। খুব বেশি কিছু না, বেসিকগুলো থাকলেই আপনি অনেক রিল্যাক্স থাকবেন।
ব্যাগে রাখতে পারেন:
পুরো ঘর নিয়ে বেরোনোর দরকার নেই। মূল ফোকাস রাখুন - ডায়াপার বদল, খাওয়ানো, শিশুর গরম-ঠান্ডা সামলানো, আর আপনার নিজের সুবিধা।
প্রায় সব নতুন মা-বাবারই কিছু না কিছু দুশ্চিন্তা থাকে নবজাতকের প্রথম হাঁটা নিয়ে। কয়েকটা খুব কমন ভয় আর তার সহজ সমাধান নিচে দিলাম।
বাচ্চা কাঁদবেই। ঘরে, বাইরে, গাড়িতে, বাজারে - সব জায়গাতেই। কান্না তার ভাষা।
কিছু টিপস:
পথে যারা আপনাকে দেখছে, তারা আপনার মতো করে একটুও জাজ করছে না। বেশিরভাগ মানুষ খেয়ালই করে না, আর যাদের নজরে পড়ে, তারা সাধারণত নিজের সন্তানের শৈশবের কান্না মনে করে সহানুভূতিই অনুভব করে।
পারবেন, নিশ্চিন্তে। আপনি চাইলে বাইরেই শিশুকে বুকের দুধ বা বোতলের দুধ খাওয়াতে পারেন। এখন বাংলাদেশে পার্ক, ফুড কোর্ট, ক্লিনিক অনেক জায়গাতেই মা-শিশুর জন্য আলাদা কর্নার রাখা হচ্ছে, আর আইন অনুযায়ীও যে কোনো জায়গায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো আপনার অধিকার।
বুকের দুধ খাওয়ালে:
বোতলে খাওয়ালে:
শুধু বাইরের খোলা হাওয়ায় থাকার কারণে শিশুর অসুস্থ হয়ে যাওয়া খুব সাধারণ নয়, বরং অনেক সময় এটা ভালোই। বেশি ঝুঁকি থাকে:
তাই শান্ত পার্কে ২০ মিনিটের হাঁটা অনেক সময় বড় শপিং মলে দেড় ঘণ্টা থাকার চেয়ে অনেক নিরাপদ।
নবজাতকের প্রথম হাঁটা কোনো পরীক্ষা না, যার পাস-ফেল আছে। এটা কেবল আপনার আর আপনার ছোট্ট শিশুর জন্য একটুকরো নরম, ধীর রুটিনে ফিরে আসা, ঘরের বাইরে সামান্য সময় কাটানো।
শুরুটা করুন ছোট করে:
পরের বার আবার গুগলে «নবজাতককে বাইরে কবে নেওয়া যায়» বা «নবজাতক বাইরে কিভাবে নেওয়া» লিখে সার্চ দিতে ইচ্ছে করলে একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করুন -
শিশু কি মোটামুটি সুস্থ?
আবহাওয়া কি সহনীয়?
আপনি কি নিজে একটু বেরোনোর মতো মানসিক ও শারীরিক শক্তি পাচ্ছেন?
এই তিনটার উত্তর যদি মোটামুটি হ্যাঁ হয়, তাহলে আজই হতে পারে আপনার নবজাতকের প্রথম আউটিং এর জন্য একদম ঠিক দিন।