শিশু বারবার কাঁদে? পার্পল ক্রায়িং, কোলিক ও কাঁদা কমানোর কার্যকর উপায়
রাত ২টা। আবার দুধ খাওয়ানো, ডায়াপার বদলানো, ঢেঁকুর তোলানো আর কোলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা শেষেও যদি কান্না না থামে, তখন মনে হওয়াই স্বাভাবিক, “আমার শিশু কাঁদছে কেন?” হয়তো ভাবছেন, চোখে পড়ার মতো কোনো কারণ কি বাদ পড়ে যাচ্ছে?
আপনি ব্যর্থ নন। কোলে নিলে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাবে, এমনও নয়। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আপনি কোনো ভুল করছেন না।
নবজাতক কাঁদে খুব তীব্রভাবে, বারবার, আর তা ভীষণ ক্লান্তিকর হতে পারে। তবে এর পেছনে শিশুর বেড়ে ওঠার একটি পরিচিত ধারা রয়েছে। অনেক পরিবারের জন্য প্রথম কয়েকটি সপ্তাহই সবচেয়ে কঠিন যায়, তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সহজ হয়। এই সময়টা সত্যিই কেটে যায়।
নবজাতকের কাঁদার স্বাভাবিক নিয়ম
জন্মের পরের সপ্তাহগুলোতে বেশির ভাগ শিশুর কান্না বাড়তে থাকে। নতুন বাবা-মায়ের কাছে বিষয়টি অবাক লাগতে পারে। অনেকে ভাবেন, জন্মের পরপরই বাচ্চা সবচেয়ে বেশি কাঁদবে, পরে ক্রমে শান্ত হবে। বাস্তবে সাধারণত উল্টো চিত্র দেখা যায়।
নবজাতকের কাঁদার নিয়ম সাধারণত এমন হতে পারে:
- জন্মের প্রথম কয়েক দিনে কান্নার পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে।
- পরের কয়েক সপ্তাহে ধীরে ধীরে কান্না বাড়ে।
- ৬-৮ সপ্তাহে কাঁদা বেশি কেন, এই প্রশ্নটি তখন প্রায় সব অভিভাবকের মনেই আসে। এ সময়েই কান্না সাধারণত সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
- এই পর্যায়ে শিশু দিনে গড়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা কাঁদতে বা অস্থির হতে পারে।
- এরপর কান্না ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
- প্রায় ৩-৪ মাসে অধিকাংশ শিশুর কান্না অনেকটাই কমে এবং তাকে শান্ত করাও সহজ হয়।
তাহলে নবজাতক কতক্ষণ কাঁদে? এর কোনো একক উত্তর নেই। কোনো শিশু সারাদিনে মোট ৪৫ মিনিট কাঁদতে পারে, আবার কারও কয়েক দফায় দীর্ঘ সময় অস্থিরতা চলতে পারে। গড় হিসাব সব শিশুর জন্য এক রকম নয়। তবে প্রথম দিকের সপ্তাহে খুব বেশি কান্না মানেই যে শিশুর শারীরিক অসুখ আছে, তা নয়।
অবশ্য ক্লান্ত অবস্থায় ২-৩ ঘণ্টা কান্নাও খুব দীর্ঘ মনে হয়। এক কাপ চা ঠান্ডা হওয়ার আগেই শেষ করতে না পারা, ঘুমের অভাব, সারাক্ষণ কোলে রাখার ক্লান্তি, সব মিলিয়ে সময়টা ভারী লাগতে পারে। তবু বড় ছবিটা মনে রাখুন, কান্না বাড়ে, একসময় চূড়ায় পৌঁছায়, তারপর কমে।
বাচ্চা কাঁদে কখন কমবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, এখন যতটা দীর্ঘ মনে হচ্ছে, সাধারণত তার আগেই পরিবর্তন দেখা যায়।
অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে প্রথম বড় উন্নতি চোখে পড়ে। সন্ধ্যার অস্থিরতা কমে আসতে পারে। শিশু কিছুটা সময় শান্তভাবে জেগে থেকে আপনার মুখের দিকে তাকাবে, হাত-পা নাড়বে বা খেলনার দিকে আগ্রহ দেখাবে। শান্ত করতে তখনও চেষ্টা লাগবে, কিন্তু সবকিছু আর অসহায় মনে হবে না।
৩-৪ মাসে কাঁদা কখন কমে, এর উত্তরও শিশুভেদে ভিন্ন। তবে এই বয়সে বেশির ভাগ শিশু নবজাতক সময়ের সবচেয়ে তীব্র কান্নার পর্যায় পেরিয়ে যায়। এর মানে এই নয় যে তারা আর কখনো কাঁদবে না। ক্ষুধা, ঘুম, অতিরিক্ত শব্দ-আলো বা কোলে থেকে নামিয়ে রাখার প্রতিবাদে শিশু কাঁদবেই। তবে কারণ বোঝা যায় না এমন দীর্ঘ, শান্ত না হওয়া কান্নার সময় সাধারণত কমে যায়।
তাই “আমার বাচ্চা কাঁদা বন্ধ করবে কবে?” প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই। কান্না শিশুর যোগাযোগের ভাষা। সময়ের সঙ্গে যা বদলায়, তা হলো কান্নার পরিমাণ, তীব্রতা এবং শিশুর প্রয়োজন বোঝার ক্ষেত্রে আপনার আত্মবিশ্বাস।
পার্পল ক্রায়িং কী, সহজ ব্যাখ্যা
শিশু বিশেষজ্ঞ, ধাত্রী বা নবজাতক পরিচর্যা বিষয়ক পরামর্শে আপনি পার্পল ক্রায়িং কথাটি শুনতে পারেন। নাম শুনে মনে হতে পারে কান্নার সময় শিশু বেগুনি রঙের হয়ে যায়, আসলে তা নয়। জীবনের প্রথম দিকের এমন একটি স্বাভাবিক সময়কে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়, যখন শিশুর কান্না অনিয়মিত, দীর্ঘ এবং সামলানো কঠিন মনে হয়।
পার্পল ক্রায়িং ব্যাখ্যা করতে PURPLE শব্দটির প্রতিটি অক্ষর একটি বৈশিষ্ট্য বোঝায়:
- P - Peak of crying: সপ্তাহের সঙ্গে কান্না বাড়তে থাকে এবং সাধারণত ৬ থেকে ৮ সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি হয়।
- U - Unexpected timing: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ কান্না শুরু বা বন্ধ হতে পারে।
- R - Resists soothing: আপনি সব ঠিকভাবে করলেও পরিচিত উপায়ে শিশু শান্ত নাও হতে পারে।
- P - Pain-like face: মুখ লাল হওয়া, মুঠি শক্ত করা বা পা পেটের দিকে গুটিয়ে আনার মতো লক্ষণ দেখে মনে হতে পারে ব্যথা করছে, যদিও শিশু শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে।
- L - Long-lasting: কান্নার পর্ব দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
- E - Evening clustering: দিনের শেষ ভাগে, বিশেষ করে সন্ধ্যায়, কান্না একসঙ্গে বেশি দেখা যায়।
এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। এর অর্থ এই নয় যে শিশু আপনার কাছে অসুখী, বুকের দুধ কম হচ্ছে, বা বেশি কোলে নেওয়ার কারণে কোনো সমস্যা হয়েছে।
সবকিছু করেও যখন কান্না থামে না, তখন এই ধারণাটি কিছুটা ভরসা দিতে পারে। দুধ খাওয়ালেন, ঢেঁকুর তুলালেন, ডায়াপার বদলালেন, দোলালেন, গান গাইলেন, হাঁটলেন, আবার শুরু থেকে করলেন। তবু বাচ্চা কাঁদে।
সব কান্নার তৎক্ষণাৎ সমাধান থাকে না। এটি মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্তু এর জন্য নিজেকে দোষ দেওয়ার কারণ নেই।
কোলিক লক্ষণ, নাকি স্বাভাবিক কান্না?
দীর্ঘ সময় ধরে কান্না করলে, বিশেষ করে সন্ধ্যায়, অনেকেই একে কোলিক বলে থাকেন। প্রচলিত সংজ্ঞায়, সুস্থ একটি শিশু দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি, সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন, টানা ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় কাঁদলে তাকে কোলিক বলা হয়।
বাস্তবে কোলিক আর নবজাতকের স্বাভাবিক কান্নার মধ্যে সীমারেখা সব সময় পরিষ্কার নয়। যেসব শিশুকে কোলিক বলা হয়, তাদের অনেকেই হয়তো স্বাভাবিক কান্নার পর্যায়ের তুলনামূলক তীব্র অংশটি পার করছে।
কোলিক মানে শিশু জেদি বা কঠিন স্বভাবের, তা নয়। এটি এমন কোনো নির্দিষ্ট রোগনির্ণয়ও নয়, যার একটিমাত্র চিকিৎসা আছে। কোলিকের একটি প্রমাণিত একক কারণ পাওয়া যায়নি। কারও ক্ষেত্রে পেটের অস্বস্তি ভূমিকা রাখতে পারে, তবে শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গেও কান্নার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
শিশু ভালোভাবে দুধ খেলে, ওজন বাড়লে, নিয়মিত প্রস্রাব হলে এবং কান্নার ফাঁকে তাকে স্বাভাবিক দেখালে, এটি কান্নার স্বাভাবিক সর্বোচ্চ সময়ও হতে পারে। তবু নিজের পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিন। আপনার শিশুকে আপনি সবচেয়ে ভালো চেনেন।
রাতের কাঁদা ক্লাস্টার কেন হয়?
অনেক পরিবারের কাছেই বিকেল নামা মানে দুশ্চিন্তা শুরু। সকাল ১১টায় যে শিশু মোটামুটি শান্ত ছিল, সে হয়তো বিকেল ৫টা থেকে থামছেই না। একে অনেকে ‘সন্ধ্যার অস্থিরতা’ বলেন, যদিও এটি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে।
রাতের কাঁদা ক্লাস্টার কেন হয়, তার কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে:
- ইন্দ্রিয়ের ওপর চাপ: সারাদিনের আলো, শব্দ, মানুষের মুখ, কোলে নেওয়া, চলাফেরা, সবকিছু নবজাতকের মস্তিষ্ককে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। সন্ধ্যায় সেটি তার জন্য বেশি হয়ে যেতে পারে।
- অতিরিক্ত ক্লান্তি: ছোট শিশুরা খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ক্লান্ত হলে তাদের ঘুমাতে বা শান্ত হতে আরও কষ্ট হয়।
- দৈনিক হরমোনের ছন্দ: কর্টিসলসহ কিছু হরমোনের ওঠানামা ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যদিও বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
- সন্ধ্যার দুধ খাওয়ার ধরন: বুকের দুধ খাওয়া শিশুরা সন্ধ্যায় ঘন ঘন দুধ চাইতে পারে। একে ক্লাস্টার ফিডিং বলা হয়। এ সময় দুধের প্রবাহ কিছুটা ভিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর অর্থ দুধ কম হচ্ছে না।
একটি ব্যাখ্যা সব শিশুর ক্ষেত্রে খাটে না। সন্ধ্যায় নবজাতক কাঁদে, কারণ সে এখনো নিজের শরীর ও অনুভূতি সামলাতে শেখেনি, এটিও খুব স্বাভাবিক কারণ হতে পারে।
সম্ভব হলে দিনের এই সময়টায় কাজের চাপ কমিয়ে দিন। আলো মৃদু রাখুন, অতিথি বা ভিড় এড়িয়ে চলুন, সহজ খাবারের ব্যবস্থা রাখুন। বাসনের স্তূপ বা কাপড় ভাঁজ করা কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতেই পারে। এই সময়ে শুধু দিন পার করে নেওয়াও যথেষ্ট।
শিশুর স্নায়ুতন্ত্র এখনো শিখছে
কান্না শিশুর প্রথম যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর একটি। একই সঙ্গে এটি তার স্নায়ুতন্ত্র পরিণত হওয়ারও অংশ।
নবজাতক এখনো বড় শিশুর মতো নিজের আবেগ বা শারীরিক অস্বস্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পাশ ফিরে শোয়া, প্রিয় কোনো জিনিস ধরা, গভীর শ্বাস নেওয়া বা বুঝে নেওয়া যে অস্বস্তি কিছুক্ষণ পর কেটে যাবে, এসব তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার কাছে সব অনুভূতিই তৎক্ষণাৎ এবং খুব বড় মনে হয়। ক্ষুধা খুব তীব্র, ঘুমও খুব তীব্র, ঘরের শব্দও তেমনই অসহনীয় লাগতে পারে।
মস্তিষ্ক বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশু ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। ঘুম-জাগার ছন্দ গুছিয়ে আসে, হজমের সমস্যা কমতে পারে, আলো-শব্দ ও মানুষের উপস্থিতি সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ে। সময়ের সঙ্গে আপনার সান্নিধ্যকেও সে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে।
এই কারণেই কান্নার ধারা সময়ের সঙ্গে বদলায়। শুধু কোনো বিশেষ কাপড় জড়িয়ে দেওয়া, সাদা শব্দ শোনানো বা নির্দিষ্টভাবে দোলানোর কৌশল আবিষ্কার করার কারণে নয়। এসব উপকারী হতে পারে, তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী নবজাতক কতটা কাঁদে?
বিভিন্ন দেশের শিশুদের কান্না নিয়ে করা গবেষণায় একটি মোটামুটি একই ধারা পাওয়া যায়। জন্মের পর কান্না বাড়ে, প্রথম দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়, তারপর কমতে থাকে। গবেষণাভেদে গড় সময় কিছুটা আলাদা হয়, কারণ কোথাও শুধু কান্না, কোথাও কান্নার সঙ্গে অস্থিরতাও হিসাব করা হয়।
আশার কথা হলো, ১০ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ শিশুর কান্নায় স্পষ্ট উন্নতি দেখা যায়।
এর মানে এই নয় যে ১২ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার দিন থেকেই প্রতিটি কঠিন সন্ধ্যা হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে। উন্নতি সব সময় সরলরেখার মতো হয় না। দুদিন ভালো যেতে পারে, তারপর আবার একদিন খুব কঠিন হতে পারে। কিন্তু একেকটি রাতকে আলাদা করে বিচার না করে দুই-তিন সপ্তাহের চিত্র দেখলে পরিবর্তনটা অনেক সময় স্পষ্ট হয়।
বেশি কান্নার সপ্তাহগুলোতে শিশুর কাঁদা কমানোর উপায়
প্রতিটি কান্নার কারণ খুঁজে বের করতেই হবে, এমন নয়। কখনো লক্ষ্য শুধু শিশুর পাশে থাকা এবং পরের ১০ মিনিট পার করা।
শিশুর কাঁদা কমানোর উপায় হিসেবে এগুলো চেষ্টা করতে পারেন:
- ক্ষুধার ইঙ্গিত থাকলে দুধ দিন। বিশেষ করে বুকের দুধ খাওয়া শিশুর সন্ধ্যার ক্লাস্টার ফিডিং স্বাভাবিক।
- শিশুকে বুকের কাছে ধরে রাখুন। দুজনের জন্য আরামদায়ক হলে ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখাও উপকারী হতে পারে।
- ছন্দময় নড়াচড়া চেষ্টা করুন, যেমন প্রামে করে হাঁটা, বেবি ক্যারিয়ারে নিয়ে হাঁটা, হালকা দোলানো বা ঘরের মধ্যে ধীরে পায়চারি করা।
- একটানা মৃদু শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। ‘শশশ’ শব্দ, পানির কলের শব্দ বা নিচু ভলিউমের সাদা শব্দ কিছু শিশুকে শান্ত করে।
- পরিবেশ বদলান। খোলা বারান্দায় দাঁড়ান, দরজার কাছে যান বা আশপাশে অল্প হাঁটুন।
- সাধারণ বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখুন: ডায়াপার, ঘরের তাপমাত্রা, পোশাক, ঢেঁকুর, ক্ষুধা ও ঘুম।
- সন্ধ্যার দিকে উত্তেজনা কম রাখুন। উজ্জ্বল আলো, উচ্চ শব্দ এবং বারবার কোলে নেওয়ার জন্য অনেক মানুষের ভিড় কমান।
কিছু শিশু কোলে থাকলেই সবচেয়ে শান্ত হয়। কেউ আবার নড়াচড়া পছন্দ করে। কোনো শিশু ক্যারিয়ারে আরাম পায়, আবার কাউকে বাইরে নিয়ে না গেলে শান্ত করা কঠিন হয়। বাচ্চা কাঁদলে করণীয় একেক শিশুর জন্য একেক রকম হতে পারে। নিরাপদভাবে নতুন উপায় চেষ্টা করতে পারেন।
আপনারও যত্ন দরকার
একটানা কান্নার শব্দ সবচেয়ে ধৈর্যশীল মানুষকেও সীমায় ঠেলে দিতে পারে। রাগ, ভয়, কান্না বা একধরনের অসাড়তা অনুভব করলে আপনি খারাপ মা-বাবা নন। এর অর্থ হলো, আপনার সহায়তা দরকার।
ভেঙে পড়ার আগেই একটি পরিকল্পনা রাখুন:
- সঙ্গী, পরিবারের সদস্য বা বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে দায়িত্ব ভাগ করুন। টানা ৩০ মিনিটের বিশ্রামও স্নায়ুকে শান্ত করতে পারে।
- কারও সঙ্গে কথা বলুন। কাছের মানুষ, চিকিৎসক, শিশু বিশেষজ্ঞ বা স্থানীয় মা ও শিশু সহায়তা সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- শিশুকে নিরাপদে কোলে রেখে কম মাত্রার ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা যায়। শিশুর সাড়া আপনি শুনতে পারবেন, কিন্তু শব্দের তীব্রতা কিছুটা কম লাগবে।
- নিজেকে সামলাতে না পারলে শিশুকে নিরাপদে তার খাট বা সমতল বিছানায় চিত করে শুইয়ে কয়েক মিনিট দূরে যান। ধীরে শ্বাস নিন, পানি পান করুন, অন্য ঘরে এক মুহূর্ত দাঁড়ান।
- কখনোই শিশুকে ঝাঁকাবেন না। নিজের অনুভূতি নিয়ে ভয় লাগলে শিশুকে নিরাপদ জায়গায় রেখে দ্রুত সাহায্য নিন।
বাংলাদেশে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজন হলে ৯৯৯ নম্বরে কল করুন। শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, ঠোঁট নীল বা ধূসর দেখালে, শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে, সাড়া না দিলে, খিঁচুনি হলে বা জরুরি চিকিৎসার দরকার মনে হলে দেরি করবেন না।
শিশুর কান্নায় কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
বেশির ভাগ নবজাতকের কান্নাই স্বাভাবিক। তবু শিশুর কান্না অন্য রকম মনে হলে বা আপনার মনে উদ্বেগ থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরামর্শ নিন।
দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ নিন যদি শিশুর থাকে:
- বয়স ৩ মাসের কম হলে ৩৮°C বা তার বেশি জ্বর
- শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট নীল বা ধূসর হওয়া, কিংবা অস্বাভাবিক নিস্তেজতা
- বারবার জোরে বমি, সবুজ রঙের বমি, অথবা বমি কিংবা পায়খানায় রক্ত
- দুধ কম খাওয়া বা আগের তুলনায় প্রস্রাবের ডায়াপার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
- অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ, দুর্বল বা একেবারে ভিন্ন ধরনের কান্না
- পেট ফুলে যাওয়া, র্যাশ, আঘাতের চিহ্ন
- হঠাৎ করে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কান্না
কেউ কোলিক বলেছে বলে শুধু অপেক্ষা করে থাকার দরকার নেই। আশ্বস্ত হওয়া ভালো, কিন্তু আপনার উদ্বেগ মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজন হলে শিশুকে পরীক্ষা করাও জরুরি।
শুধু কঠিন দিন নয়, পরিবর্তনের ধারাটাও দেখুন
কঠিন একটি সপ্তাহে মনে হতে পারে কিছুই বদলাচ্ছে না। Erby অ্যাপ-এ দুধ খাওয়া, ঘুম ও কান্নার তথ্য লিখে রাখলে পুরো চিত্রটি বুঝতে সুবিধা হয়। কখন কান্না শুরু হয়, কতক্ষণ থাকে, কী চেষ্টা করেছেন এবং সন্ধ্যা, দুধ খাওয়া বা ঘুমের সঙ্গে কোনো মিল আছে কি না, নোট করুন।
দুই বা তিন সপ্তাহ পর অনেক অভিভাবক এমন ছোট পরিবর্তন দেখতে পান, যা প্রতিদিনের ব্যস্ততায় চোখে পড়েনি। হয়তো কান্না একটু পরে শুরু হচ্ছে, সবচেয়ে দীর্ঘ কান্নার সময়টা ছোট হয়েছে, অথবা দিনে শান্ত থাকার মুহূর্ত বেড়েছে। যখন ভাবছেন, “বাচ্চা কাঁদে কখন কমবে?”, তখন এই ছোট প্রমাণগুলো অনেক ভরসা দেয়।
আপনার শিশু আপনাকে কোনো পরীক্ষায় ফেল করানোর চেষ্টা করছে না। সে একেবারে নতুন একটি স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কঠিন সময় পার করছে, আর এই সময় আপনি তার নিরাপদ আশ্রয়।
এই পর্যায়টি স্থায়ী নয়। আপনার শিশু কম কাঁদবে। আপনি সব সময় এতটা ক্লান্ত থাকবেন না। আর আপনি যতটা ভাবছেন, তার চেয়েও ভালোভাবে সব সামলাচ্ছেন।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।