৩ মাসের শিশু: কী কী করতে পারে, কীভাবে সাহায্য করবেন এবং কখন সতর্ক হবেন
তিন মাস বয়স অনেক পরিবারের কাছেই যেন এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। ৩ মাসের শিশু এখনও আপনার বুকের কাছে গুটিসুটি মেরে থাকতে পারে, কিন্তু এই সময়েই তাকে আগের চেয়ে বেশি সজাগ, প্রাণবন্ত ও কৌতূহলী মনে হয়। এক মুহূর্তে সে আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, পরের মুহূর্তে খেলনা দেখে শব্দ করছে, নিজের পা নড়াচড়া দেখছে, কিংবা খুব মনোযোগ দিয়ে ছোট্ট পুশ-আপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
৩ মাসের শিশু: এই বয়সে সে কী কী করতে পারে
প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার গতি আলাদা। তাই এই লেখা কোনো পরীক্ষা নয়, যা আপনার শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস করতেই হবে। কোনো ৩ মাসের শিশু বেশি শব্দ করে, কেউ আবার চুপচাপ চারপাশ দেখে। কেউ তাড়াতাড়ি গড়াতে শেখে, আবার কারও এতে আগ্রহ তৈরি হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগে। ৩ মাসের শিশুর বিকাশ ধীরে ধীরে এগোয়, আর নতুন দক্ষতাগুলো অনেক সময় হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়।
আপনি যদি ভাবেন, ৩ মাসের শিশু কি করতে পারে, তাহলে উত্তরটি হয়তো আপনাকে অবাক করবে। এই বয়সে শিশু শরীরের শক্তি বাড়ায়, নানা ধরনের শব্দ ও মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে সাড়া দেয় এবং নিজের কাজের ফলে চারপাশে কী পরিবর্তন হচ্ছে তা বুঝতে শুরু করে।
৩ মাসের শিশুর শারীরিক বিকাশ
শিশুর শারীরিক পরিবর্তনগুলোই সাধারণত সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ে। এখন সে শরীরের ওপর আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। তবে নড়াচড়া এখনও কিছুটা অস্থির, হঠাৎ এবং বেশ মজার হতে পারে।
মাথা আরও স্থির, শরীরের ওপরের অংশে শক্তি বাড়ে
আপনি শিশুকে বুকের সঙ্গে সোজা করে ধরলে বা বসার ভঙ্গিতে সহায়তা দিলে সে কিছুক্ষণ মাথা স্থির রাখতে পারে। ক্লান্ত হলে মাঝে মাঝে মাথা সামনের দিকে দুলে যেতে পারে, তবে একেবারে ছোট বয়সের মতো সবসময় মাথা ঝুলে থাকার প্রবণতা সাধারণত কমে আসে।
৩ মাস বয়সে টামি টাইম কিভাবে করাবেন, তা নিয়ে অনেক বাবা-মায়ের প্রশ্ন থাকে। শিশুকে জেগে থাকা অবস্থায় চিৎ করে নয়, পেটের ওপর উপুড় করে অল্প সময়ের জন্য রাখুন। অনেক শিশু তখন দুই হাতের কনুই বা বাহুর ওপর ভর দিয়ে বুক মেঝে থেকে তুলতে চেষ্টা করে। দেখতে একেবারে ছোট্ট পুশ-আপের মতো লাগে, আর মুখে থাকে ভীষণ গম্ভীর ভাব। এভাবে ঘাড়, কাঁধ, হাত ও পিঠের পেশি শক্ত হয়, যা পরে গড়ানো, বসা ও হামাগুড়ি দেওয়ার কাজে লাগবে।
টামি টাইমের সময় শিশুর সামনে আপনার মুখ বা তার পছন্দের কোনো নিরাপদ খেলনা রাখুন। রঙিন জিনিস মাথা তুলতে ও চারপাশে তাকাতে উৎসাহ দিতে পারে। তবে বিরক্ত বা কাঁদতে শুরু করলে জোর করবেন না। দিনে কয়েকবার অল্প সময় করে করানো, একবারে অনেকক্ষণ করানোর চেয়ে ভালো।
পেটে থেকে পিঠে ঘোরা শুরু হতে পারে
কিছু শিশু এই বয়সেই পেট থেকে পিঠে ঘোরা শুরু করে। কেউ আবার শুধু এদিক-ওদিক দুলতে থাকে, কোমর মুচড়ে দেয় বা কোনো জিনিস ধরতে গিয়ে হঠাৎ গড়িয়ে যায়। এগুলো শরীর সম্পর্কে সচেতনতা এবং পেশির নিয়ন্ত্রণ বাড়ার লক্ষণ।
শিশুর প্রথমবার গড়িয়ে পড়া এমন সময়ও হতে পারে, যখন আপনি একেবারেই প্রস্তুত নন। সে গড়ানোর চেষ্টা করছে বুঝতে পারলে বিছানা, সোফা বা ডায়াপার বদলানোর টেবিলে এক মুহূর্তের জন্যও একা রাখবেন না। ঘুমের জায়গা ফাঁকা ও নিরাপদ রাখুন এবং ঘুম পাড়ানোর সময় শিশুকে সবসময় চিৎ করে শোয়ান।
হাত, খেলনা আর পায়ের আঙুল
৩ মাসের শিশু নিজের হাত নিয়ে বেশ মুগ্ধ থাকতে পারে। সে আঙুলের দিকে তাকায়, হাত নাড়ায়, মুঠো খোলে ও বন্ধ করে, কিংবা শরীরের মাঝখানে দুই হাত একসাথে আনে। এই দক্ষতাকে হাত একসাথে আনা বলা যায়। শরীরের দুই পাশের সমন্বয় তৈরির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
এখন খেলনা ধরতে চেষ্টা করাও আরও উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়। ঝোলানো খেলনায় হাত ঠেকাতে পারে, ঝুনঝুনি ধরার জন্য হাত বাড়াতে পারে বা আপনার মুখের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রথম দিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। পরে খেলনায় হাত লাগলে সেটি নড়ে ওঠে, আর শিশুর মুখে ফুটে ওঠে বিস্ময়।
নিজের পা দেখা এবং পা নড়াচড়া করাও তার কাছে নতুন আনন্দের বিষয়। সে পা ওপরে তুলতে পারে, পায়ের আঙুল ধরতে পারে বা চাদরের নিচে পা নাচতে দেখে মুগ্ধ হতে পারে। খালি পা দেখতে ও অনুভব করতে সুবিধা হয়। তাই নিরাপদ পরিবেশে, আপনার নজরদারিতে, মেঝেতে শিশুকে কিছুক্ষণ স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে দিন।
৩ মাসের শিশুর দৃষ্টি: চারপাশকে আরও ভালোভাবে দেখা
এই বয়সে ৩ মাসের শিশুর দৃষ্টি দ্রুত উন্নত হয়। সে শুধু মুখের কাছের জিনিসে আটকে থাকে না, ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের জিনিসও দেখতে পারে। কোনো মানুষ বা খেলনা এক পাশ থেকে অন্য পাশে গেলে চোখ দিয়ে সেটিকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে।
দূর থেকেও পরিচিত মুখ চিনতে পারে
আপনি ঘরে ঢোকার আগেই হয়তো শিশু আপনাকে চিনতে শুরু করবে। আপনাকে দেখলে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, দূর থেকে হাসতে পারে বা আপনি হেঁটে যাওয়ার সময় চোখ দিয়ে আপনার মুখ অনুসরণ করতে পারে। পরিচিত মুখ এখন তার কাছে আগের চেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রঙ বোঝার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। উজ্জ্বল রং, গাঢ় বৈপরীত্য ও বড় নকশা তার মনোযোগ টানতে পারে। তবে ঘরের সাধারণ জিনিসও তার কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। নকশা করা পর্দা, বাতি বা ঘরের পোষা প্রাণীর দিকে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে।
শিশু নিজের হাতের দিকেও অনেকক্ষণ তাকাতে পারে। নড়তে থাকা আঙুলগুলো যে তার নিজের এবং সে ইচ্ছা করে এগুলো নড়াতে পারে, তা সে বুঝতে শুরু করছে। শরীর সম্পর্কে সচেতনতা, সমন্বয় এবং কাজের ফল বোঝার প্রাথমিক শিক্ষা এখান থেকেই তৈরি হয়।
দামি ভিজ্যুয়াল খেলনা কেনার দরকার নেই। রঙিন কাপড়, সহজ ছবির বোর্ড বই বা আপনার হাসিমুখই যথেষ্ট। খেলনা বা কোনো বস্তু ধীরে ধীরে সরান, যাতে শিশু চোখ দিয়ে তা অনুসরণ করতে পারে। তার চোখ ও মস্তিষ্ক এখনও একসঙ্গে কাজ করার অনুশীলন করছে।
৩ মাসের শিশুর সামাজিক বিকাশ: হাসি, খেলা ও মেলবন্ধন
এই বয়সে শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ আরও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। সে শুধু বাইরের উদ্দীপনায় সাড়া দেয় না, নিজেও মানুষের সান্নিধ্য চাইতে শুরু করে এবং কোন বিষয় তার ভালো লাগছে তা আপনাকে জানান দেয়।
৩ মাসে হাসা এবং প্রথম খিলখিল
এই সময়ের অন্যতম আনন্দের মাইলস্টোন হলো শিশুর হাসি। শুরুতে তা হয়তো হালকা শব্দের মতো শোনাবে। পেটে চুমু দিলে, মজার মুখভঙ্গি করলে বা লুকোচুরি খেললে ধীরে ধীরে তা খিলখিল হাসিতে পরিণত হতে পারে।
সব শিশু ঠিক তিন মাসে জোরে হাসবে, এমন নয়। কেউ হাসিমুখে বেশি থাকে, কিন্তু খিলখিল করে হাসতে আরও কিছুদিন সময় নেয়। তবু প্রথমবার সেই শব্দ শুনলে আপনি কাজ থামিয়ে তাকিয়ে পড়বেনই। সম্ভব হলে ভিডিও করে রাখুন, তবে ফোন কাছে না থাকলেও মন খারাপ করবেন না। কিছু মুহূর্ত শুধু মনে রাখার জন্যই আসে।
শিশু ভালো লাগলে নিজে থেকেই হাসতে পারে। আবার আপনি হাসলে বা কথা বললে প্রতিক্রিয়া হিসেবেও হাসতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াশীল হাসি সামাজিক সচেতনতা তৈরির অংশ। সে বুঝছে, মুখভঙ্গির মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করা যায় এবং তার নিজের মুখভঙ্গিও অন্যের প্রতিক্রিয়া আনতে পারে।
মানুষভেদে আলাদা প্রতিক্রিয়া
৩ মাসের শিশু বাবা-মা বা নিয়মিত যত্ন নেওয়া মানুষের প্রতি আলাদা টান দেখাতে পারে। আপনার কোলে দ্রুত শান্ত হয়ে যেতে পারে, আপনার কণ্ঠের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিতে পারে বা আপনি ঘর থেকে বের হলে অস্থির হতে পারে। আবার অন্য মানুষের ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া আলাদা হওয়াও স্বাভাবিক।
পরিচিত দাদু-দিদা বা নানি-নানুকে দেখে হয়তো সে বড় করে হাসে, কিন্তু নতুন অতিথিকে গম্ভীর মুখে দেখে। কোনো একজনের সঙ্গে বেশি চঞ্চল, অন্য কারও সঙ্গে শান্ত থাকতে পারে। এর মাধ্যমে সে মানুষকে মনে রাখা, পরিচিত কণ্ঠ চিনতে পারা এবং পাশে কে আছে অনুযায়ী আচরণ বদলানোর প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করছে।
সামাজিক খেলার জন্য জটিল কিছু দরকার নেই। গান গাইতে পারেন, শিশুর মুখভঙ্গি নকল করতে পারেন, জিভ বের করে দেখাতে পারেন বা মৃদু লুকোচুরি খেলতে পারেন। কথার মাঝে একটু থামুন, যাতে শিশুও শব্দ বা মুখভঙ্গির মাধ্যমে সাড়া দেওয়ার সুযোগ পায়। সে মুখ ফিরিয়ে নিলে বা বিরক্ত হলে বিরতি দিন। হয়তো তার একটু বিশ্রাম দরকার।
যোগাযোগ: আপনার শিশু এবার “কথা বলা” শুরু করছে
কথোপকথনের শুরু হয়ে গেছে। একতরফা মনে হলেও এই ছোট ছোট আলাপ আপনাদের দুজনের কাছেই বেশ অর্থপূর্ণ হতে পারে।
কু, চিৎকার ও দীর্ঘ আলাপ
অনেক শিশু তিন মাস বয়সে টানা টানা কু-কু শব্দ করে। “উউ”, “আআ” বা “ম্ম” ধরনের আওয়াজ শোনা যেতে পারে। আপনি কথা বললে সে উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ করে, কিছুক্ষণ থামে, যেন শুনছে, তারপর আবার শুরু করে। এভাবেই কথোপকথনের ছন্দ তৈরি হয়, শব্দ শেখার অনেক আগেই।
খেলার সময় আনন্দে সে চিৎকার বা তীক্ষ্ণ শব্দ করতে পারে। কেউ নিজের কণ্ঠের নতুন সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে উচ্চস্বরে আওয়াজ করে। কেউ আবার ঠোঁট ও জিহ্বা দিয়ে বুদবুদের মতো শব্দ, ফুঁ বা অন্য রকম আওয়াজ করার চেষ্টা করে।
শিশু এসব শব্দ করলে এমনভাবে উত্তর দিন, যেন সে সত্যিই কিছু বলছে। তার কু-কু শব্দ নকল করুন, ছোট বাক্যে জবাব দিন এবং কিছুক্ষণ চুপ থাকুন, যাতে সে আবার “বলতে” পারে। এতে কথা বলার অনেক আগে থেকেই যোগাযোগের পালাবদল সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।
প্রথম দিকের তুলনায় কান্না কিছুটা কমেও আসতে পারে। ক্ষুধা, অস্বস্তি, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে সে এখনও কাঁদবে। তবে ধীরে ধীরে আপনি তার কান্নার ধরন আলাদা করে বুঝতে শুরু করতে পারেন। কান্না কমেছে বলে আপনার প্রয়োজন কমে যায়নি। বরং আপনার শিশু যোগাযোগের আরও কিছু উপায় শিখছে।
জ্ঞানীয় বিকাশ: নানা ধরন ও ঘটনার সম্পর্ক বোঝা
শিশুর মস্তিষ্কে তখন অসংখ্য নতুন সংযোগ তৈরি হচ্ছে। সে কিছুটা বেশি সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে এবং পরের মুহূর্তে কী হতে পারে, তা আন্দাজ করার প্রাথমিক চেষ্টা করে।
পরিচিত রুটিনের অপেক্ষা করা
বোতল দেখতে পেলে, বুকের দুধ খাওয়ানোর ভঙ্গিতে আপনাকে বসতে দেখলে বা গোসলের পরিচিত শব্দ শুনলে শিশু উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারে। সে পা ছুড়তে পারে, হাসতে পারে, হাত নাড়তে পারে বা আগ্রহী শব্দ করতে পারে। কারণ রুটিন শুরু হওয়ার আগেই সে বুঝতে পারছে এরপর কী আসতে পারে।
এগুলো প্রাথমিক স্মৃতি ও প্রত্যাশা তৈরির লক্ষণ। নির্দিষ্ট দৃশ্য, শব্দ বা ভঙ্গির পর সাধারণত আনন্দদায়ক কিছু ঘটে, এই সম্পর্কটি সে ধীরে ধীরে মনে রাখতে শিখছে।
কাজ ও ফলের সম্পর্ক আবিষ্কার
ঝুনঝুনিতে হাত লাগলে শব্দ হয়। খেলনা ছুঁলে তা দুলতে থাকে। শিশু হাসলে বাবা-মাও হাসেন। এ ধরনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা থেকেই কাজ ও ফলের সম্পর্ক বোঝার শুরু।
শিশুকে হয়তো বারবার খেলনায় হাত দিতে, কিছুক্ষণ থামতে এবং শব্দ হলে আবার চেষ্টা করতে দেখবেন। সে অকারণে একই কাজ করছে না। নিজের মতো করে একটি ধারণা যাচাই করছে, “আমি এটা করলে ওটা হচ্ছে।”
হালকা, নিরাপদ এবং সহজে ধরা যায় এমন খেলনা দিন। একসঙ্গে অনেক খেলনা না দিয়ে হাতের নাগালে একটি রাখুন। একটি ঝুনঝুনিই শিশুর জন্য দীর্ঘ সময়ের আনন্দের কারণ হতে পারে, যখন সে বুঝতে চেষ্টা করছে কীভাবে এটি নড়ালে শব্দ হয়।
মনোযোগ ধরে রাখার সময় বাড়ে
তিন মাস বয়সে শিশু চলন্ত কোনো বস্তু বেশিক্ষণ দেখতে পারে, একটি গান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনতে পারে বা বইয়ের ছবির দিকে কিছুক্ষণ মন দিয়ে তাকিয়ে থাকতে পারে। তবু সে সহজেই অন্যদিকে মনোযোগ সরিয়ে নেয় এবং দ্রুত ক্লান্তও হয়ে পড়ে। তার মনোযোগের সময় ধীরে ধীরে বাড়ছে, এটিই মূল কথা।
শিশু যে বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তাকে সেটি দেখতে দিন। জানালার বাইরে পাতার নড়াচড়া দেখে মুগ্ধ হলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে দিন। আবার দুই পৃষ্ঠা দেখার পর বই সরিয়ে দিলে তাতেও সমস্যা নেই। এই বয়সে শেখা ঘটে দৈনন্দিন ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
৩ মাসের শিশুর ঘুম
এই সময় শিশুর ঘুম কিছুটা নিয়মে আসতে পারে, যদিও প্রতিরাতে একই রকম শান্ত ঘুম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিছু শিশু রাতে টানা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমাতে শুরু করে। ক্লান্ত বাবা-মায়ের কাছে এই দীর্ঘ সময়টুকু সত্যিই আশীর্বাদের মতো মনে হতে পারে।
দিনের ঘুমও কিছুটা অনুমানযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। মোটামুটি একটি রুটিন তৈরি হচ্ছে বলে মনে হবে, যদিও প্রতিদিন ঘুমের সময় সমান নাও হতে পারে। কোনো দিন শিশু ৯০ মিনিট ঘুমাতে পারে, আবার কোনো দিন প্রতিটি ঘুম মাত্র ২৫ মিনিটের হতে পারে। দুটিই স্বাভাবিক হতে পারে।
শিশুর ঘুম পাওয়ার লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখুন। যেমন, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, চোখ ঘষা, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা অস্বাভাবিক খিটখিটে হয়ে যাওয়া। প্রতিদিনের শান্ত ও একই ধরনের ঘুমের প্রস্তুতি শিশুকে বুঝতে সাহায্য করে যে ঘুমের সময় এগিয়ে এসেছে।
শিশুকে চিৎ করে, শক্ত ও সমতল বিছানায় শোয়ান। চারপাশে ঢিলেঢালা বালিশ, কম্বল, নরম খেলনা বা অন্য কোনো আলগা জিনিস রাখবেন না। শিশুর ঘুমের জায়গা নিরাপদ ও পরিষ্কার রাখুন।
ঘুমের বিকাশ সবসময় সরল পথে এগোয় না। দ্রুত বেড়ে ওঠা, অসুস্থতা, ভ্রমণ বা নতুন শারীরিক দক্ষতা শেখার সময় ঘুমে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটতে পারে। হঠাৎ রাতের ঘুম খারাপ হলে ধরে নেবেন না যে আপনার কোনো ভুল হয়েছে।
৩ মাসে কী আশা করবেন: স্বাভাবিক পার্থক্যকে গুরুত্ব দিন
৩ মাসের শিশুর মাইলস্টোন বোঝার জন্য একটি বিকাশের তালিকা সাধারণ ধারণা দিতে পারে, কিন্তু এতে সব সুস্থ শিশুর বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে না। মাইলস্টোন অর্জনের সময়সীমা বেশ বিস্তৃত। কোনো শিশু আগে নড়াচড়ার দিকে মন দেয়, আবার কেউ মুখ, কণ্ঠ ও শব্দে বেশি আগ্রহী হয়।
আপনার শিশু এখনও গড়াচ্ছে না, জোরে হাসছে না বা নির্ভুলভাবে খেলনার দিকে হাত বাড়াচ্ছে না, তাই বলে সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। তবে শিশুকে অস্বাভাবিকভাবে ঢিলে বা শক্ত মনে হলে, দুধ খেতে অসুবিধা হলে, শব্দ বা মুখে সাড়া না দিলে, কিংবা আগে শেখা কোনো দক্ষতা হারিয়ে ফেললে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞ বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
৩ মাসের শিশুর বিকাশের মাইলস্টোন লক্ষ্য করার উদ্দেশ্য হলো তার অগ্রগতি বোঝা, চাপ তৈরি করা নয়। মাথা একটু বেশি স্থির রাখা, দীর্ঘক্ষণ কু-কু শব্দ করা, খেলনায় হাত পৌঁছানো বা আপনি ঘরে ঢুকলে চিনে হাসা, এসব ছোট অর্জনও আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করুন।
এরপর কী আসতে পারে?
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আরও বেশি গড়ানোর চেষ্টা, টামি টাইমের সময় বুক উঁচু করে তোলা এবং আরও নিখুঁতভাবে হাত বাড়ানোর দক্ষতা দেখা যেতে পারে। শিশুটি শুধু খেলনায় হাত ঠেকাবে না, ধীরে ধীরে তা ধরতেও শুরু করতে পারে। মুখে বস্তু নেওয়া এবং আরও বেশি শব্দ করাও স্বাভাবিক।
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ৪ মাসের ঘুমের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তখন ঘুমের চক্র পরিণত হওয়ার কারণে রাতে বারবার জেগে ওঠা বা অল্প অল্প করে ঘুমানোর প্রবণতা বাড়তে পারে। সবার ক্ষেত্রে এমন হয় না। হলেও এর মানে এই নয় যে শিশুর ঘুম চিরদিনের জন্য খারাপ হয়ে গেছে। এটি রুটিনের ব্যর্থতা নয়, বরং বিকাশের আরেকটি পরিবর্তন।
এই প্রাণবন্ত সময়টুকু উপভোগ করুন। আপনার শিশু প্রতিদিন একটু একটু করে শক্তিশালী, সামাজিক ও কৌতূহলী হয়ে উঠছে। ৩ মাসের শিশুর মাইলস্টোন শুধু কোনো তালিকার কয়েকটি ঘর পূরণ করা নয়। মজার মুখভঙ্গির পর তার ছোট্ট হাসি, আপনার হাত ধরতে এগিয়ে আসা আঙুল, কিংবা আপনাকে দেখে মুখ উজ্জ্বল করে তোলা, এসবই তার বেড়ে ওঠার সবচেয়ে সুন্দর চিহ্ন।
আমরা, Erby অ্যাপের ডেভেলপাররা, এই তথ্যের ভিত্তিতে আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দায়িত্ব স্বীকার করি না, যা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে এবং এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।