অনেকের কাছেই বেবি প্লে ম্যাট শিশুর জন্য কেনাকাটার তালিকার পরিচিত একটি জিনিস। রঙিন ডিজাইন, ঝোলানো পশুপাখি, ছোট আয়না, টুংটাং শব্দ বা গান - দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু এটি কি সত্যিই কিনতেই হবে? না, এমন নয়। তবে শিশুর মেঝেতে খেলা, হাত-পা নড়ানো ও নতুন কিছু শেখার সময়টাকে আরামদায়ক করতে এটি বেশ কাজে লাগতে পারে।
ভালো একটি শিশুর খেলনার ম্যাট শিশুকে শোয়া, তাকানো, হাত-পা ছোড়া, শরীর টানটান করা এবং ধীরে ধীরে নড়াচড়ার দক্ষতা চর্চার জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক জায়গা দেয়। এটি শিশুর বিকাশ রাতারাতি বদলে দেবে না, আবার সব পরিবারের জন্য অপরিহার্যও নয়। তবু অনেক মা-বাবার কাছে বসার ঘরের এক কোণে রাখা প্লে ম্যাট বেশ উপকারী হয়ে ওঠে।
প্লে ম্যাট হলো সাধারণত নরম প্যাডিংযুক্ত একটি ম্যাট, যেখানে শিশুকে জেগে থাকা অবস্থায় নজরদারিতে শুইয়ে খেলানো হয়। কিছু ম্যাট একেবারেই সমতল, আবার কিছুতে ওপরে বাঁকানো আর্চ থাকে, যেখান থেকে খেলনা ঝুলে থাকে।
আর্চ-যুক্ত মডেলকে সাধারণত এক্টিভিটি জিম, প্লে জিম বা বেবি এক্টিভিটি ম্যাট বলা হয়। শিশু চিৎ হয়ে শুয়ে ওপরে ঝোলানো খেলনা, সাদা-কালো নকশা, নিরাপদ আয়না কিংবা নরম ঝুনঝুনি দেখে। বয়স একটু বাড়লে সে খেলনার দিকে হাত বাড়ায়, ছুঁতে চেষ্টা করে, হাত দিয়ে ঠেলে দেয়, পরে ধরার চেষ্টাও শুরু করে।
অনেক এক্টিভিটি জিমে বাড়তি কিছু উপকরণ থাকে, যেমন:
অন্যদিকে সমতল বেবি ম্যাটে ওপরে ঝোলানো খেলনা থাকে না। এটি কুইল্টেড, ফোম-প্যাডেড বা সহজে মুছে পরিষ্কার করা যায় এমন কাপড়ের হতে পারে। বই দেখা, গড়াগড়ি দেওয়া, বসার অনুশীলন ও শিশুর টামি টাইমের জন্য এটি মেঝেতে একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করে।
মা-বাবাদের সাধারণ প্রশ্ন হলো, প্লে ম্যাট কবে শুরু করবেন? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর বয়স ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ হলে প্লে ম্যাট ব্যবহার শুরু করা যায়, যদি সে জেগে থাকে, স্বস্তিতে থাকে এবং সব সময় বড়দের নজরে থাকে।
এই বয়সে শিশু খেলনা ধরতে পারবে না। তার কাজ মূলত তাকিয়ে দেখা। মাথার ওপরে ঝোলানো খেলনা, বিশেষ করে সাদা-কালো নকশা বা স্পষ্ট বিপরীত রঙের কোনো বস্তু, কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।
নবজাতকের জন্য এক্টিভিটি ম্যাট সাধারণত ২ থেকে ৪ মাস বয়সে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এ সময় অনেক শিশু:
প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার গতি আলাদা। কেউ হয়তো নরম একটা হাতি দুলতে দেখেই ১০ মিনিট মুগ্ধ হয়ে থাকবে, আর কেউ সিলিং ফ্যানের দিকেই বেশি তাকাবে। দুটিই স্বাভাবিক।
তাহলে প্রশ্ন আসে, বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ প্লে ম্যাট কি নবজাতকরাও ব্যবহার করতে পারে? সঠিকভাবে ব্যবহার করলে অবশ্যই পারে। প্লে ম্যাট কেবল জেগে থাকা অবস্থায়, সমতল মেঝেতে এবং প্রাপ্তবয়স্কের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করতে হবে।
শিশু খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়লেও এটিকে ঘুমের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করবেন না। তাকে নিরাপদ, খালি খাট বা বেবি কটে শুইয়ে দিন। ম্যাট যেন সিঁড়ি, বারান্দা, রান্নাঘরের চুলা, পোষা প্রাণী, বৈদ্যুতিক তার ও ছোট বস্তু থেকে দূরে থাকে। ছোট বস্তু শিশুর শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্লে ম্যাট সুবিধা সব সময় চোখে পড়ার মতো নয়। আসল লাভ হলো শিশুর নড়াচড়া, পর্যবেক্ষণ ও নিজের মতো করে আবিষ্কারের সুযোগ পাওয়া।
জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহে শিশু চোখ দিয়ে ফোকাস করতে শেখে। ঝোলানো খেলনা, বিপরীত রঙের নকশা ও শিশুর জন্য তৈরি নিরাপদ আয়না তার দেখার আগ্রহ বাড়াতে পারে। খুব বেশি রঙ বা খেলনার দরকার নেই, কয়েকটি স্পষ্ট নকশাই যথেষ্ট।
ঝোলানো একটি খেলনা শিশুকে হাত নাড়ানোর কারণ দেয়। শুরুতে তার হাতের স্পর্শ কাকতালীয় হতে পারে। পরে সে বুঝতে শুরু করে, “হাত লাগলে জিনিসটা নড়ে!”
হাত বাড়ানো, খেলনা ঠেলা এবং ধীরে ধীরে মুঠোয় ধরা শিশুর হাত-চোখের সমন্বয় গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এখানে কোনো পড়াশোনার চাপ নেই, খেলতে খেলতেই শেখা।
খালি শক্ত মেঝের তুলনায় বেবি প্লে ম্যাট শিশুর টামি টাইমকে বেশি আরামদায়ক করতে পারে। শিশুর সামনে নরম খেলনা, কাপড়ের বই বা ভাঙবে না এমন আয়না রাখুন। এতে সে মাথা তুলতে ও এদিক-ওদিক ঘোরাতে উৎসাহ পায়।
শুরুটা ছোট সময় দিয়ে করুন। দিনে কয়েকবার ১-২ মিনিট করলেও সেটি মূল্যবান। শিশু খুব কান্নাকাটি করলে আগে বুকের ওপর উপুড় করে কিছুক্ষণ রাখুন, পরে আবার ম্যাটে চেষ্টা করুন।
ঘরের একটি পরিচ্ছন্ন, পরিচিত জায়গা শিশুর খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট থাকলে বেশ সুবিধা হয়। আপনি পাশে বসে কথা বলতে পারেন, কাপড় গুছাতে পারেন বা চা বানানোর সময় কাছাকাছি থেকে নজর রাখতে পারেন। বাউন্সার, দোলনা বা কার সিটে থাকার চেয়ে মেঝেতে সময় কাটালে শিশু শরীর নড়ানোর বেশি স্বাধীনতা পায়।
সব ধরনের ম্যাট সব ঘর বা সব বয়সের শিশুর জন্য সমান উপযোগী নয়। নতুন মায়ের জন্য প্লে ম্যাট গাইড হিসেবে প্রচলিত কয়েকটি ধরন নিচে দেওয়া হলো।
এটি সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় ধরন। নরম ম্যাটের ওপর এক বা দুটি আর্চ থাকে এবং তাতে শিশুর নাগালের মধ্যে খেলনা ঝুলে থাকে।
অনেক মডেলে গান, আলো কিংবা খুলে নেওয়া যায় এমন সেন্সরি খেলনা থাকে। প্রথম কয়েক মাসে, যখন শিশু বেশির ভাগ সময় চিৎ হয়ে শুয়ে ওপরে তাকায়, তখন এটি বিশেষভাবে কাজে লাগে।
যাদের জন্য ভালো: প্রায় ৪ সপ্তাহ থেকে ৫-৬ মাস বয়সী শিশু এবং একসঙ্গে ম্যাট ও খেলনার ব্যবস্থা চান এমন অভিভাবক।
সম্ভাব্য অসুবিধা: শিশু গড়াগড়ি দিতে বা হামাগুড়ি দিতে শুরু করলে সে দ্রুত এই নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইবে।
সমতল প্লে ম্যাট তুলনামূলক সহজ এবং সাধারণত বেশি দিন ব্যবহার করা যায়। টামি টাইম, গড়াগড়ি, বসার অনুশীলন, ছবির বই দেখা, ব্লক বা নরম খেলনা নিয়ে স্বাধীনভাবে খেলার জন্য এটি দারুণ।
আর্চ না থাকায় ব্যবহারের সুযোগও বেশি। রান্নাঘরের পাশে বিছিয়ে নিতে পারেন, দাদা-দাদির বাসায় নিয়ে যেতে পারেন, কিংবা শুকনো ঘাসের ওপর নিচে ওয়াটারপ্রুফ শিট দিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।
যাদের জন্য ভালো: নবজাতক সময়ের পরও দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যাবে এমন বহুমুখী ম্যাট চান যে পরিবারগুলো।
কম্বিনেশন মডেলে দুই ধরনের সুবিধাই থাকে। শুরুতে এটি প্লে জিম হিসেবে ব্যবহার করা যায়, পরে আর্চ ও খেলনা খুলে শুধু প্যাডেড ম্যাটটি রেখে দেওয়া যায়।
এগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে, তবে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা গেলে খরচ সার্থক হয়। শিশুর জন্য সেরা প্লে ম্যাট বাছাইয়ের সময় এই নমনীয় ডিজাইনটি বিবেচনায় রাখতে পারেন।
ডিজাইন সুন্দর হওয়া ভালো, তবে ব্যবহারিক দিকগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর জিনিসে দুধ গড়িয়ে পড়া, ডায়াপার লিক হওয়া বা হঠাৎ বমি করা খুবই স্বাভাবিক। তাই খুলে মেশিনে ধোয়া যায় এমন কভার বা সহজে মুছে পরিষ্কার করা যায় এমন ম্যাট বেছে নিন।
কেনার আগে কেয়ার লেবেল দেখে নিন। শুধু নির্দিষ্ট জায়গা মুছতে হবে, এমন ম্যাট নিয়মিত ব্যবহারে ঝামেলার হতে পারে।
যে ম্যাটের উপকরণ সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে তথ্য দেওয়া থাকে এবং বিষমুক্ত বলে উল্লেখ থাকে, সেটিই ভালো। প্যাকেট খোলার পর তীব্র রাসায়নিক গন্ধ পেলে কিছুক্ষণ বাতাসে রাখুন। গন্ধ না কমলে পণ্যটি বদলে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন।
সেলাই, খেলনা লাগানোর অংশ ও অলংকরণ শক্তভাবে বসানো আছে কি না দেখুন। যেন সহজে খুলে না আসে।
একসঙ্গে ২০টি খেলনা শিশুর প্রয়োজন নেই। অল্প কিছু বৈচিত্র্যই যথেষ্ট:
এসব শিশুকে নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ দেয়, কিন্তু অতিরিক্ত উদ্দীপনায় বিরক্ত করে না।
ম্যাটটি আপনার ঘরের মেঝের জন্য যথেষ্ট নরম কি না, সেটি দেখে নিন। টাইলস, মোজাইক, কাঠ বা ল্যামিনেটের মেঝে হলে ভালো কুশনিং দরকার। প্রয়োজনে ম্যাটের নিচে কার্পেট বা ভাঁজ করা কম্বল দিতে পারেন। কার্পেট করা ঘরে তুলনামূলক পাতলা প্যাডেড ম্যাটও চলতে পারে।
খুলে নেওয়া যায় এমন খেলনা সুবিধাজনক, কারণ এগুলো ধোয়া যায়, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করা যায় বা পরে প্রিয় টিথার লাগানো যায়। আর্চের উচ্চতা বদলানো গেলে আরও ভালো। খেলনা শিশুর চোখে পড়ার মতো কাছে থাকবে, তবে মুখের ওপর এসে পড়বে না।
বেশি ফিচার মানেই ভালো বেবি এক্টিভিটি ম্যাট নয়।
টানা ঝলমলে আলো, জোরে গান ও অবিরাম ইলেকট্রনিক শব্দ করে এমন ম্যাট এড়িয়ে চলাই ভালো। মাঝে মধ্যে হালকা সুর বাজলে সমস্যা নেই, কিন্তু একটি খেলনা যদি পুরো খেলার সময়টাই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে, তাহলে শিশুর মনোযোগ ছড়িয়ে যেতে পারে। আপনার মুখ, কণ্ঠস্বর ও কথোপকথন শিশুর কাছে ঝলমলে প্লাস্টিকের বোতামের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
ঢিলা অংশ, আলগা সাজসজ্জা, ধারালো প্রান্ত, দুর্বল সেলাই বা খুব পাতলা প্যাডিং আছে এমন পণ্যও বাদ দিন। দোকানে হাতে নিয়ে যদি ম্যাটটি দুর্বল মনে হয়, বাসায় ব্যবহারেও সেটি খুব একটা ভালো লাগবে না।
বেশির ভাগ শিশু নিয়মিত গড়াগড়ি দিয়ে সরে যেতে শুরু করলে বা হামাগুড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিলে আর্চ-যুক্ত এক্টিভিটি জিমে আগ্রহ কমে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি ৫ থেকে ৬ মাস বয়সের মধ্যে ঘটে, তবে কারও কারও আগ্রহ আরও আগেই কমতে পারে।
তবে ম্যাটের ব্যবহার তখনও শেষ হয়ে যায় না। আর্চ খুলে ফেলুন, বয়স অনুযায়ী কয়েকটি খেলনা দিন এবং মেঝেতে খেলার জন্য ম্যাটটি ব্যবহার করতে থাকুন। বসা, হামাগুড়ি দেওয়া, বই দেখা - এমনকি টডলার বয়সেও সমতল ম্যাট কাজে লাগে।
সোজা উত্তর হলো, না।
পরিষ্কার একটি চাদর বা কম্বল মেঝেতে বিছিয়ে, পাশে কয়েকটি নিরাপদ খেলনা রাখলেও শিশুর খেলার সুন্দর জায়গা তৈরি হয়ে যায়। নিচে ভাঁজ করা তোয়ালে দিলে প্যাডিং বাড়বে, পাশে সাদা-কালো ছবি বা কার্ড রাখতে পারেন। ৫ হাজার টাকার ডিজাইনার জিম আর সাধারণ ঝুনঝুনির দামের পার্থক্য শিশু বোঝে না।
বেস্ট প্লে ম্যাট বাংলাদেশ খুঁজতে গিয়ে মূল কথা ভুলে যাবেন না। আপনার ব্যবহারের জন্য যে ম্যাট পরিষ্কার রাখা সহজ, আরামদায়ক, নিরাপদ এবং বাজেটের মধ্যে, সেটিই সবচেয়ে ভালো। এক্টিভিটি জিম কিনলে যদি টামি টাইম সহজ হয় ও আপনার সুবিধা হয়, তাহলে এটি ভালো কেনাকাটা হতে পারে। না কিনলেও কোনো সমস্যা নেই। শিশুর দরকার মেঝেতে নিরাপদ কিছু সময়, দেখার মতো কয়েকটি জিনিস এবং কাছেই আপনজনের উপস্থিতি।