নতুন শিশুকে নিয়ে প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ অনেকটাই এমন লাগে, যেন ঘরে এক রহস্যময়, ছোট্ট ভিনগ্রহের অতিথি এসেছে। ওরা ফাঁকা দিকে তাকিয়ে থাকে, হঠাত্ চমকে ওঠে, এক শব্দে মুহূর্তে শান্ত হয় আবার আরেক শব্দে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। রাত তিনটেয় কোলে নিয়ে বসে থাকতে থাকতে মাথায় হতেই পারে, এখন আমার বাচ্চা আসলে কী দেখতে আর শুনতে পারে? ও কি আমাকে চিনতেই পারে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর - পারে। ওদের পৃথিবী এখন ছোট, নরম আর ধোঁয়াটে, কিন্তু অনুভূতিতে ভরা। প্রতি মিনিটে চলছে নবজাতকের সংবেদনশীল বিকাশ, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন আপনি।
এই গাইডে থাকছে, প্রথম কয়েক সপ্তাহে নবজাতক কি দেখতে পারে, কী শুনতে, ছুঁতে, ঘ্রাণ নিতে পারে আর খুব স্বাভাবিক, ঘরোয়া উপায়ে কীভাবে আপনি ওর শিশুর দৃষ্টি ও শ্রবণ বিকাশে সাহায্য করতে পারেন, কোন রকম বাড়তি চাপ ছাড়াই। মানে, একদম দৈনন্দিন জাদু।
শুরুতেই একটা তথ্য: নবজাতক ২০–৩০ সেমি দেখে সবচেয়ে ভালো। মানে, বুক বা বুকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় আপনার মুখ আর শিশুর চোখের মাঝের দূরত্ব প্রায় যতটা হয়, ঠিক ততটাই।
তাই যখন আপনি বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, ফর্মুলা দিচ্ছেন বা কেবল কোল দিচ্ছেন, আপনার মুখ থাকে ওর দৃষ্টির একদম মিষ্টি স্পটের ভেতরে। মনে হয় না, বেশ ইঞ্জিনিয়ারিং করা ডিজাইন?
এই ২০–৩০ সেমির বাইরে কী হয়?
যদি মনে প্রশ্ন আসে, নবজাতক কতটা দেখে, তাহলে ধরে নিন - ও আপনাকে কাছে থেকে বড় আকার, আলো–ছায়া আর কনট্রাস্ট সহকারে মোটামুটি বুঝতে পারে, কিন্তু সোফার ওপারে রাখা বুকশেলফের বই গুনে ফেলতে পারবে না।
শুরুর দিকে বাচ্চাদের চোখে সূক্ষ্ম শেড বা হালকা পার্থক্য খুব একটা ধরে না। নার্সারিতে হালকা গোলাপি, হালকা নীল, মিন্ট সবুজ কত সুন্দর সাজালেন, কিন্তু নবজাতকের চোখে সেগুলো আসলে প্রায় একইরকম নরম দাগ।
যা যা ওরা সবচেয়ে ভালো দেখতে পারে:
এই জন্যই এখন অনেক বাবা–মা নবজাতক উচ্চ কনট্রাস্ট পছন্দ করে জেনে কালো–সাদা কার্ড, মনোক্রোম মোবাইল, কনট্রাস্ট বুক ইত্যাদি কিনে রাখেন। এটা ফ্যাশন না, ওদের চোখ–মস্তিষ্কের জন্য এগুলো সত্যি সহজ।
অতিরিক্ত খেলনা কিনতেই হবে এমন না। ঘরের জিনিস দিয়েই কাজ চলে যায়:
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে থাকে। একদম ছোট নবজাতকও মুখের দিকে বেশি তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করে।
ঢাকা মেডিকেল, বিএসএমএমইউ বা বিশ্বের নানা গবেষণায়ও দেখা গেছে, কয়েক ঘণ্টার টুকুন বাচ্চাও মুখের মত দেখতে প্যাটার্নের দিকে বাকি এলোমেলো আকৃতির তুলনায় বেশি সময় তাকিয়ে থাকে। মানে কাগজে দুইটা ডট আর একটা লাইন দিয়ে বানানো মুখ ওদের কাছে অনেক বেশি মজার, জটিল ডিজাইনের চেয়ে।
প্রথম কয়েক সপ্তাহে:
এই পছন্দটাকেই কাজে লাগাতে পারেন শিশুর দৃষ্টি বিকাশে:
প্রথম এক–দুই সপ্তাহের মধ্যেই অনেক বাচ্চা খুব সাধারণ বস্তু অনুসরণ দেখাতে পারে।
দ্রুতগতির কিছু এগিয়ে পেছিয়ে যাচ্ছে - এটা ওদের পক্ষে ধরা কঠিন। কিন্তু ধীরে, আলতো করে নড়া কোনও বস্তু - সেটা সম্ভব।
চেষ্টা করতে পারেন এমনভাবে:
সাধারণত নবজাতক সবচেয়ে ভালো ট্র্যাক করতে পারে:
প্রতিবার আপনি দেখাতে গেলেই যে ও ট্র্যাক করবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। না করলেই সমস্যা হবে, এটাও না। এটাকে পরীক্ষা না ভেবে, নরম একটা সুযোগ হিসেবে নিন, যা ইচ্ছে করলে নেবে, না চাইলে নেবে না।
রঙ দেখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ে। জন্মের সময় দুনিয়াটা ওদের কাছে প্রায় ধূসর, কালো–সাদা। সামান্য একটু রঙ ধরতে পারলেও তা স্পষ্ট না।
যা যা জানা আছে নবজাতক রঙ দেখে কখন থেকে:
তাই প্রথম দিকের সপ্তাহগুলোতে, যদি চান ও কিছুটা রঙ ধরা শিখুক:
এ নিয়ে তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। দৃষ্টি বিকাশ নিজের গতিতেই এগোবে। আপনার কাজ শুধু এতটুকুই, ওর দুনিয়া যেন একদম শুধুই ফ্যাকাসে বা বেইজ না হয়।
দৃষ্টিশক্তির তুলনায় শিশুর শ্রবণ অনেকটাই প্রস্তুত অবস্থায়ই আসে। পেটে থাকাকালীনই মাসের পর মাস, ও আপনার শরীরের ভেতর দিয়ে আসা শব্দ শুনেছে।
জন্মের পরই বেশিরভাগ নবজাতক কি শুনতে পারে?
অর্থাৎ যখন ও দুনিয়াকে দেখতে লড়াই করছে, তখনই কান দিয়ে অনেকখানি বোঝাপড়া শুরু করে দিয়েছে।
প্রায় সবাই যেটা জানতে চায়: নবজাতক মায়ের কণ্ঠ চিনে কি? - হ্যাঁ, এবং বেশ স্পষ্টভাবে।
গর্ভাবস্থার পুরোটা জুড়েই আপনি কথা বলেছেন, হেসেছেন, কখনও ফোনে ঝগড়াও করেছেন, দোয়া পড়েছেন, গান শুনেছেন। বাচ্চা কিন্তু সেগুলো সবই পানি আর শরীরের টিস্যুর ভেতর দিয়ে, একটু জলতলের মত ভঙ্গিতে শুনেছে। তাই জন্মের আগেই আপনার কণ্ঠ ওর কাছে একরকম ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।
প্রথম কয়েক সপ্তাহে তাই দেখা যায়:
এটাকে কাজে লাগাতে পারেন এমনভাবে:
শুরুতে নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুর শ্রবণ বিকাশে আপনার গলার স্বরই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
হয়তো দেখেছেন, হঠাৎ আপনার বাচ্চা দুই হাত একদম ছড়িয়ে দেয়, হাতের তালু খুলে যায়, তারপর আবার দ্রুত গুটিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে, প্রায়ই কেঁদে ওঠার সঙ্গে। এটাকেই বলে নবজাতক স্টার্টল রিফ্লেক্স বা মোরো রিফ্লেক্স।
সাধারণত হঠাৎ, জোরে শব্দে এটা বেশি হয়:
এই রিফ্লেক্স:
কিছু সহজ সাহায্য করতে পারেন:
খেয়াল করলে দেখবেন, আপনি নিজেই শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় গলা একটু পাতলা–উচ্চ করে ফেলেন। কারও «আয় আয় বাবুটা» ধরণের বেবি টক শুনে মনে হতে পারে, আমরা সবাই যেন আলাদা ভাষায় কথা বলছি।
গবেষণায় দেখা গেছে, নবজাতকরা একটু উচ্চ–তাল গলার স্বর বেশি পছন্দ করে। ব্রিটিশ কাউন্সিল বা ইউরোপ–এশিয়ার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ বলছে, বাচ্চারা বেশি মনোযোগ দেয় এমন কথায় যা:
এই ধরনের কথা বলা, যেটাকে ইংরেজিতে অনেকেই «parentese» বলে, বাচ্চাকে সাহায্য করে:
তাই «দ্যাখ তো, কী মিষ্টি পা তোমার» এ ধরনের কথা যদি একটু আলাদা গলায় বেরিয়ে আসে, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এই গলার স্বর শুধু আদুরে না, শিশুর শ্রবণ ও যোগাযোগের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে দিতে কাজে লাগে।
গর্ভের ভেতর কিন্তু একেবারে নীরবতা নয়। সেখানে সবসময়:
এই জন্যই অনেক নবজাতক উচ্চ শব্দে ভয় পায়, কিন্তু নিয়মিত, নরম শব্দে বরং শান্ত হয়। যেমন:
এগুলো:
যদি হোয়াইট নয়েজ ব্যবহার করেন:
সব ইন্দ্রিয়ের ভিড়ে স্পর্শই সেই অনুভূতি, যা জন্মের পর থেকেই সবচেয়ে বেশি তৈরি থাকে।
ও হয়তো আপনাকে এখনও স্পষ্ট করে দেখতে পারে না, কিন্তু আপনাকে নিখুঁতভাবে অনুভব করতে পারে - আপনার গায়ের উষ্ণতা, পিঠে রাখা হাতের চাপ, কোলে জড়িয়ে ধরার ভঙ্গি, কাপড়ের টেক্সচার সব।
ডাক্তার, নার্স, মিডওয়াইফরা প্রায় সবাই একটা কথা বলেন - «স্কিন–টু–স্কিন করুন»। এত জোর করেই কেন বলেন, তার কারণ আছে।
একজন নবজাতকের জন্য মায়ের বা বাবার গায়ে নগ্ন ত্বক–লাগিয়ে থাকা (স্কিন–টু–স্কিন):
কিছু ব্যবহারিক আইডিয়া:
অনেক পরিবার পরে বলেন, সবচেয়ে শান্ত, আশ্বাসময় মুহূর্তগুলো এসেছে ঠিক এই স্কিন–টু–স্কিন সময়গুলোতেই।
নবজাতকের ঘ্রাণশক্তি আশ্চর্য ভালো। চোখ দিয়ে আপনার মুখ পরিষ্কার দেখা শুরু হবার অনেক আগেই ও আপনার গন্ধ চিনে ফেলে।
এই ঘ্রাণশক্তি সাহায্য করে:
আপনি লক্ষ্য করতে পারেন:
এর মানে এই নয় যে আপনাকে ধোয়া–মোছা ছেড়ে দিতে হবে। শুধু মনে রাখবেন, খুব বেশি তীব্র পারফিউম, ভারী সুগন্ধি লোশন, ঘরে বেশি এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করলে বাচ্চার সংবেদনশীল নাকের জন্য একটু বেশি হয়ে যেতে পারে।
নবজাতকের দৃষ্টি ও শ্রবণ বিকাশে সাহায্য করতে বিশেষ ক্লাস, অ্যাপ বা খরচসাপেক্ষ খেলনা ভরা সুটকেসের প্রয়োজন নেই। আপনার কোলে থাকা, আপনার ঘরের স্বাভাবিক পরিবেশই যথেষ্ট।
দিনে দিনে সহজ, বাস্তবসম্মত যেসব অভ্যাস রাখলে ভালো ফল হয়, সেগুলো নিচে।
আগেই বলেছি, নবজাতক ২০–৩০ সেমি দেখে সবচেয়ে ভালো। কাজে লাগিয়ে নিন।
প্রতিটা ফিডে কয়েক মিনিটও যদি এমনভাবে মুখোমুখি থাকেন, তাতে:
নবজাতকের দৃষ্টি ধীরে ধীরে জাগাতে:
সহজ একটা আইডিয়া: পুরনো ম্যাগাজিন থেকে কোনও সাদা–কালো ছবি কেটে নিয়ে কার্ডবোর্ডে আটকান, খাটের পাশের দেওয়ালে এমন জায়গায় লাগান, যেখানে বাচ্চা প্রায়ই ফাঁকা দৃষ্টি রেখে তাকিয়ে থাকে। কিছুদিন দেখবেন, ওর «স্টাডি সেশন» এখানেই বেশি হচ্ছে।
আপনার গলার স্বরই শিশুর শ্রবণ আর ভবিষ্যতের ভাষাজ্ঞান গড়ার প্রধান উপকরণ।
দিনের ভেতর অল্প একটু চেষ্টা:
আপনার গলা নিখুঁত না হলেও কোনও সমস্যা নেই। বাবা–মায়ের সামান্য বেসুরো, পরিচিত গানই বাচ্চার কাছে যে কোনও নিখুঁত রেকর্ডিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক।
স্পর্শ আর নিরাপত্তার জন্য:
সময় খুব লম্বা হলেই যে উপকার হবে, এমন নয়। পাঁচ–দশ মিনিটের ছোট ছোট সেশনও সমানভাবে কাজ দেয়।
বাইরের কোলাহলের দুনিয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে:
এসব শব্দ গর্ভের ভেতরের অভিজ্ঞতার মত শোনায়, যেন ওকে বারবার বলা হচ্ছে, «তুমি সেফ, তুমি কোলে আছো»।
ক্লান্তি, ঘুমের অভাব, নতুন দায়িত্ব - সব মিলিয়ে অনেক সময় মনে হতে পারে, বাচ্চার জন্য যেন আরও কিছু «করতে হবে»। আরও স্টিমুলেশন, আরও টয়, আরও ক্লাস, আরও শেখানো।
আসলে প্রথম কয়েক সপ্তাহটা গড়ে ওঠে একেবারেই সরল, বারবার হওয়া মুহূর্ত দিয়ে:
এইভাবেই ধীরে ধীরে নবজাতকের দৃষ্টি, শিশুর দৃষ্টি, নবজাতকের দৃষ্টি ও শ্রবণ বিকাশ, স্পর্শ আর ঘ্রাণ একসঙ্গে জুড়ে গড়ে তোলে ওর নিরাপদ ছোট্ট পৃথিবী।
তাই পরের বার রাত তিনটেয় বাচ্চা আপনার বুকে মাথা রেখে কোথাও আপনার থুতনি আর গলার মাঝখানে তাকিয়ে থাকে, ভাববেন না যে ও ফাঁকা দিকে তাকিয়ে আছে। সে আসলে মন দিয়ে দেখছে, শোনছে, গন্ধ নিচ্ছে সেই মানুষটাকে, যে এই মুহূর্তে ওর পুরো ব্রহ্মাণ্ড।
আর আপনি, আপনার অজান্তেই, ওর বিকাশের জন্য প্রতিটা দিনেই প্রচুর কিছু করে ফেলছেন।