সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া শরীরের জন্য ছোট কোনো ঘটনা নয়। স্বাভাবিক প্রসব, ফোর্সেপ বা ভ্যাকুয়াম সহায়তায় প্রসব, কিংবা সিজারিয়ান, যেভাবেই হোক না কেন, আগের রুটিনে দ্রুত ফিরে যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয় এটি। প্রসব পর ব্যায়ামের লক্ষ্য হওয়া উচিত ধীরে ধীরে শক্তি ফিরিয়ে আনা, ক্ষত সারতে দেওয়া, ঘুম-খাওয়ানো ও নতুন শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।
অনেকের ক্ষেত্রেই প্রসবের পর খুব হালকা নড়াচড়া শুরু করা যায় দ্রুত, কখনও প্রথম দিন থেকেই। তবে ক্যালেন্ডারের তারিখের চেয়ে ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মোটামুটি একটি ধারণা এমন হতে পারে:
এগুলো কেবল সাধারণ নির্দেশনা, বাধ্যতামূলক সময়সীমা নয়। প্রসব কঠিন হলে, বেশি ছিঁড়ে গেলে, সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, তলপেটে ব্যথা, জরায়ু বা যোনিপথে ভারী লাগা, কিংবা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে পরিকল্পনা বদলাতে হবে। সন্দেহ হলে গাইনি চিকিৎসক, ধাত্রী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক বা পেলভিক হেলথ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।
প্রসব পর হাঁটা আবার নড়াচড়ায় ফেরার সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ উপায়গুলোর একটি। এতে রক্তসঞ্চালন ভালো হয়, শরীরের জড়তা কমে এবং নবজাতককে নিয়ে ঘরে কাটানো দীর্ঘ দিনের মাঝে একটু খোলা হাওয়াও পাওয়া যায়।
শুরুটা খুব ছোট রাখুন। বাসার বারান্দা বা গলির মুখ পর্যন্ত পাঁচ মিনিট হাঁটাই হয়তো যথেষ্ট। কোনো কোনো দিন চা বসানোর ফাঁকে রান্নাঘরে একটু পায়চারি করাই আপনার সামর্থ্য হতে পারে। সেটিও ব্যায়াম হিসেবেই ধরা যায়।
ধীরে ধীরে সময় বাড়ান:
সিজারিয়ানের পর সোজা হয়ে দাঁড়াতে শুরুতে অস্বস্তি লাগতে পারে। কাশি, হাসি বা বিছানা থেকে ওঠার সময় অপারেশনের জায়গায় হালকা করে বালিশ চেপে ধরলে আরাম পাওয়া যায়। শোয়া অবস্থায় আগে কাত হয়ে, তারপর হাতের ভর দিয়ে ওঠা সাধারণত সহজ লাগে।
গর্ভাবস্থার পুরো সময় পেলভিক ফ্লোর পেশিগুলো জরায়ু, শিশুর ওজন এবং শরীরের বাড়তি চাপ বহন করেছে। স্বাভাবিক প্রসবের সময় এগুলো অনেকটা প্রসারিতও হয়। সিজারিয়ান হলেও গর্ভাবস্থার চাপ পেলভিক ফ্লোরে পড়ে। তাই প্রায় সব মায়ের পোস্টপার্টাম পুনরুদ্ধার ব্যায়ামের তালিকাতেই পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম থাকা দরকার।
এই পেশিগুলো মূত্রথলি, মলদ্বার ও জরায়ুকে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এগুলো দুর্বল হলে কাশি, হাঁচি, দৌড়ানো বা বাচ্চাকে কোলে তোলার সময় প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে। কারও কারও যোনিপথে টান টান, ভারী বা নিচের দিকে কিছু নেমে আসার মতো অনুভূতি হয়, বিশেষ করে দিনের শেষভাগে। এমন হলে ব্যায়াম কমিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রসবের পর কেগেল ব্যায়াম সহজ, কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে করাটা জরুরি।
পেশি শক্ত হলে ধীরে ধীরে প্রতিটি চাপ ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত ধরে রাখুন। সঙ্গে দ্রুত কেগেল ব্যায়ামও করতে পারেন, অর্থাৎ দ্রুত চাপ দিন ও ছেড়ে দিন, এভাবে ১০ বার।
প্রস্রাব করার সময় নিয়মিত মাঝপথে প্রস্রাব বন্ধ করে অনুশীলন করবেন না। এতে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হতে সমস্যা হতে পারে। শুধু একবার পেশি চেনার জন্য সেই অনুভূতি বোঝা যেতে পারে, এরপর টয়লেটের বাইরে অনুশীলন করুন।
একটি সহজ অভ্যাস তৈরি করুন। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় এক সেট, দাঁত ব্রাশের সময় এক সেট, আর রাতে ঘুমের আগে এক সেট। ছোট ছোট নিয়মিত অনুশীলনই কাজে দেয়।
গর্ভাবস্থায় পেটের মাঝের দুই পাশের সোজা পেশির মধ্যে ফাঁক তৈরি হওয়া খুবই সাধারণ। একে ডায়াস্টাস রেক্টি বা পেটের পেশি আলাদা হয়ে যাওয়া বলা হয়। এটি আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ নয়, ফিটনেসের ব্যর্থতাও নয়। পেটের দেয়ালকে সময় ও সঠিক ধরনের ব্যায়ামের সহায়তা দরকার, এটুকুই।
প্রসবের একেবারে প্রথম কয়েক দিন পার হওয়ার পর বাসায় একটি প্রাথমিক পরীক্ষা করতে পারেন:
ফাঁকটি যদি দুই আঙুলের চেয়ে বেশি মনে হয়, অথবা বসা, কাশি বা ব্যায়ামের সময় পেটের মাঝখান উঁচু হয়ে ঢিবির মতো দেখা যায়, তাহলে গভীর কোর পেশি আরও শক্ত করা দরকার হতে পারে। তবে আঙুলের মাপ শুধু একটি আনুমানিক ধারণা দেয়। টিস্যুর দৃঢ়তা ও পেশির কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
পেটের মাঝখান ফুলে ওঠা বা ঢিবি হওয়ার প্রবণতা থাকলে ক্রাঞ্চ, সিট-আপ, পূর্ণ প্ল্যাঙ্ক এবং তীব্র অ্যাবডোমিনাল ওয়ার্কআউট এড়িয়ে চলুন। পেলভিক হেলথ ফিজিওথেরাপিস্ট সবচেয়ে নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন।
এখানে লক্ষ্য হলো বাইরের ‘সিক্স প্যাক’ পেশিকে জোরে চাপ দেওয়া নয়, বরং পেটের গভীর পেশি, বিশেষ করে ট্রান্সভার্স অ্যাবডোমিনিসকে আবার সক্রিয় করা।
এই পোস্টপার্টাম পুনরুদ্ধার ব্যায়ামগুলো চেষ্টা করতে পারেন:
এখানে ধীর ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া দ্রুত ও কঠিন ব্যায়ামের চেয়ে বেশি উপকারী।
হাঁটা, শ্বাসের অনুশীলন ও পেলভিক ফ্লোর ব্যায়ামে স্বচ্ছন্দ হলে ধীরে ধীরে আরও কিছু হালকা পোস্টপার্টাম ব্যায়াম যোগ করতে পারেন। উদ্দেশ্য হলো দৈনন্দিন কাজের শক্তি ফিরিয়ে আনা - শিশুকে কোলে নেওয়া, কাপড়ের ঝুড়ি তোলা, মেঝে থেকে ওঠা, স্ট্রলার ঠেলা যেন কষ্টকর না লাগে।
শুরুর দিকে উপযোগী কিছু ব্যায়াম:
ব্যায়ামের সময় কম রাখুন। ১০ মিনিটের নিয়মিত অনুশীলন অনেক সময় এমন ৪৫ মিনিটের কষ্টের সেশনের চেয়ে ভালো, যার পর শরীর এত ব্যথা করে যে রাতে শিশুকে সামলানোই কঠিন হয়ে যায়।
গর্ভাবস্থার পর কিছু সময় শরীরের জয়েন্ট ও লিগামেন্ট তুলনামূলক ঢিলা থাকতে পারে। বুকের দুধ খাওয়ালে এই সময়টা আরও দীর্ঘ হতে পারে। তার ওপর রাতের ঘুম ভাঙা ভাঙা, ফলে শরীরের পুনরুদ্ধারও ধীর হয়। এখন নিজেকে প্রমাণ করার সময় নয়।
শুরুর কয়েক সপ্তাহ এড়িয়ে চলুন:
অনেকের জন্য দৌড়ে ফেরার কথা অন্তত ১২ সপ্তাহ পর ভাবা ভালো, অনেক সময় আরও পরে। তার আগে দ্রুত হাঁটা, স্কোয়াট, হালকা হপ এবং দৈনন্দিন কাজ ব্যথা, প্রস্রাব লিক, পেলভিসে ভারী ভাব বা অস্বস্তি ছাড়া করতে পারছেন কি না, তা দেখুন।
শরীর সাধারণত সংকেত দেয়। সেই সংকেতকে উপেক্ষা না করাই প্রসব পর ফিটনেস টিপসের সবচেয়ে জরুরি অংশ।
নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে ব্যায়াম কমান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
হঠাৎ খুব বেশি রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, পায়ের পেছনের পিণ্ডলি ফুলে যাওয়া বা অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯-এ কল করা যায়। নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন, শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন আপনি সবচেয়ে ভালো বুঝবেন।
ভালো খবর হলো, মাঝারি মাত্রার প্রসব পর ব্যায়াম সাধারণত দুধের পরিমাণ কমায় না এবং মায়ের দুধের স্বাদও নষ্ট করে না। স্বাভাবিক ব্যায়ামের পর দুধ ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আরামদায়ক রাখতে কিছু সহজ বিষয় মনে রাখুন:
দুধ কমে যাচ্ছে মনে হলে গাইনি চিকিৎসক, ল্যাকটেশন কাউন্সেলর বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি ব্যায়াম নয়, বরং পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা বিশ্রামের অভাব।
নড়াচড়া সব কঠিন দিন ঠিক করে দেবে না, আর মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বিকল্পও নয়। তবু নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ঘুমের মান ভালো করতে, শক্তি বাড়াতে, চাপ কমাতে এবং প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার উপসর্গ কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বেবি স্ট্রলার নিয়ে একটু হাঁটা মনকে হালকা করতে পারে। শিশুকে পাশে ম্যাটে শুইয়ে পাঁচ মিনিট স্ট্রেচিংও কাজে দেয়। এর লাভ শুধু শরীরে নয়। খাওয়ানো, ডায়াপার বদল, কাপড় ধোয়া আর ঘুমহীনতার ভিড়েও এটি মনে করিয়ে দেয় যে আপনি শুধু একজন পরিচর্যাকারী নন, আপনার নিজের শরীর ও প্রয়োজনও আছে।
আপনার যদি দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকে, অস্থিরতা বাড়ে, শিশুর সঙ্গে সংযোগ অনুভব না হয়, কিছুই সামলাতে পারছেন না মনে হয়, কিংবা নিজেকে বা অন্য কাউকে ক্ষতি করার ভয়ংকর চিন্তা আসে, দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। জরুরি ঝুঁকি থাকলে ৯৯৯-এ কল করুন বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
গর্ভাবস্থায় শরীর বদলাতে প্রায় নয় মাস সময় লেগেছে। প্রসবের পর মানিয়ে নিতে অন্তত নয় মাস সময় দিন। কারও কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লাগতে পারে, সেটিও স্বাভাবিক।
দ্রুত আগের পোশাকের মাপে ফেরা কোনো সাফল্যের মানদণ্ড নয়। সবচেয়ে কার্যকর প্রসব পর ফিটনেস পরিকল্পনা সেটিই, যা আপনাকে শক্তিশালী, স্থির এবং নিজের শরীরে স্বচ্ছন্দ অনুভব করায়।
পেলভিক ফ্লোর দিয়ে শুরু করুন। সুযোগ পেলেই হাঁটুন। ধীরে ধীরে অগ্রসর হোন। আর আয়নায় আগের মতো দেখানোর চেয়ে শরীরে ভালো লাগাকে বেশি গুরুত্ব দিন।